নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরে আন্তরিকতার পাশাপাশি বাণিজ্যও বাড়বে
jugantor
নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরে আন্তরিকতার পাশাপাশি বাণিজ্যও বাড়বে

  ড. এ কে আব্দুল মোমেন  

২০ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় দেশ হিমালয়কন্যা নেপাল। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুসম্পর্ক বিরাজ করছে বহু বছর ধরে। সম্প্রতি সেই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। এই তো ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রীয় সফরে নেপাল ঘুরে এসেছেন।

এবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে গত ২২ মার্চ রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন তিনি। এটিই নেপালের কোনো রাষ্ট্রপতির প্রথম বাংলাদেশ সফর। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত হয়েছে বাংলাদেশ।

উভয় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ সফরের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে উভয় দেশের মধ্যে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে এ চুক্তিগুলো দুই দেশের জন্যই সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে আনবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে দশ দিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ শিরোনামে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে যোগ দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘Charismatic leader, well-organizer, person of determination and courage and stout

freedom fighter’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলার জনগণ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আহ্বানে সাড়া দিয়েই বাংলার জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির বাংলাদেশের মাটিতে আগমন উপলক্ষ্যে বিমানবন্দরে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। তারপর তাকে নিয়ে রওয়ানা হন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্ম-উৎসর্গকারী বীর শহিদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

সফররত নেপালি রাষ্ট্রপতির সম্মানে আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেন। তিনি ২০১৯ সালে নেপালে তার শুভেচ্ছা সফরের আনন্দময় স্মৃতির উল্লেখ করেন এবং মহামারিজনিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সফরের জন্য নেপালের রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেন এবং সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় উভয় দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরা হয়। সফরকালে নেপালের রাষ্ট্রপতি ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন এবং জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এমপির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখেন। তিনি বেশকিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন এবং পরিদর্শন শেষে ভিজিটর’স বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসাবে এসেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল। এ সফর আবহমান সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের ভিত্তির ওপর রচিত বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বেগবান ও জোরদার করবে। সফরকালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চারটি দ্বিপাক্ষিক ইন্সট্রুমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকগুলো হলো: পর্যটন সহযোগিতা, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি সহযোগিতা জোরদার করা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি এবং রোহানপুর-সিগবাদ রেলওয়ে রুট সংস্কারবিষয়ক। এসব চুক্তি দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

নেপাল একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপাল নিরপেক্ষ অবস্থান পালন করলেও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে তারা। এর পর থেকেই সেদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। নেপালের বাজারটি এতদিন ভারতের দখলে থাকলেও গত কয়েক বছরে নেপালের বাজারে বেশ ভালোভাবেই প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

নেপালের বাজারে খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, ফার্নিচার ও ওষুধ যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। এ ছাড়া উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি, বিশেষ করে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধিসহ দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব কারণে নেপালে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রসারিত হচ্ছে উভয় দেশের অর্থনীতি।

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির সঙ্গে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় নেপালের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘Most inspiring woman leader in the

world’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জাতির পিতার কন্যাকে দক্ষিণ এশিয়া তথা সারা বিশ্বের জন্যই ‘রোল মডেল’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি চায়, তাহলে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ৫০ বছর এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তার আগমনে বাংলাদেশ অত্যন্ত খুশি ও আনন্দিত বলে তাকে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উভয় নেতা বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়টি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি স্বাক্ষরিত হলে উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করছি, চুক্তিটি দ্রুতই স্বাক্ষরিত হবে।

এ সময় রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি নেপালে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় সচিব পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণবিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকগুলো ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে জলবিদ্যুৎ সেক্টরে বর্ধিত সহযোগিতার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এ সফরকালে Sanitary and

Phytosanitary (SPS) সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ হিসাবে নেপালের পাশে সব সময় দায়িত্বশীল প্রতিবেশীর মতোই দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। নেপালকেও পাশে পেয়েছে একইভাবে। বিগত বছর হঠাৎ করেই নেপালে সার সংকট দেখা দিলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে সাড়া দিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সার নেপালে ত্বরিত সরবরাহের ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশটির পাশে দাঁড়ান, যদিও বাংলাদেশ সার রপ্তানিকারক দেশ নয়।

রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই রাষ্ট্রনায়কোচিত ঔদার্যের জন্য সপ্রশংস কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিশ্বমানবতার কল্যাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মঙ্গলময় হাত সব সময়ই প্রসারিত থাকবে। তার নির্দেশনাক্রমে বাংলাদেশকে আমরা সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে তথা মাল্টিমোডাল কানেকটিভিটি হাবে রূপান্তরিত করতে চাই। এ জন্য ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পরিবহণ-সংযোগ অবারিত ও সুগম করার নানাবিধ উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

১৯৭৬ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-নেপাল ট্রানজিট চুক্তির প্রটোকলের সংযোজনী হিসাবে রোহানপুর-সিংঘাবাদ রেল সংযোগ পয়েন্টকে অন্তর্ভুক্ত করে দুই দেশের বাণিজ্য সচিবদের মধ্যে একটি Letter of Exchange (LoE) স্বাক্ষরিত হয়েছে এই সফরকালে। ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানের ব্যবহারের সুযোগ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। নেপাল চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী।

এ ক্ষেত্রে modalities নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেপাল। এ ছাড়া বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর এবং নেপালের বিরাটগড়/ভদ্রপুরের মধ্যে সরাসরি বিমান সংযোগ স্থাপনেও নেপাল আগ্রহী। বাংলাদেশ প্রস্তাব দুটিকে স্বাগত জানিয়েছে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে স্বাক্ষরিত BBIN Motor Vehicles Agreement বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিদ্যমান রুটগুলো ছাড়াও নতুন কিছু রুট অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটির ত্রিদেশীয় Passenger Protocol স্বাক্ষরে বাংলাদেশ ও ভারত ইতোমধ্যে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে নেপালের সম্মতি খুব দ্রুত পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।

হিমালয়কন্যা নেপাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। পর্যটন খাত থেকে বার্ষিক আয়ের একটি বড় অংশ অর্জন করে থাকে তারা। নেপালে সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যটক প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটন সেক্টরে সহযোগিতা নিবিড় করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর নেপাল থেকে বহু ছাত্রছাত্রী মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অধ্যয়ন করতে আসে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়।

এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি ভান্ডারির এ সফরকালে দুদেশের মধ্যে ২০২২-২৫ মেয়াদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি (CEP) স্বাক্ষরিত হয়েছে। নেপালের মানবসম্পদ (HRD) ও যুব উন্নয়নে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আইটি সেক্টরেও নেপালকে বিবিধ সহায়তা দেবে বাংলাদেশ।

নেপালের হিমালয় পর্বতমালায় বৈশ্বিক উষ্ণতাজনিত glacier melting-এর ফলে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসাবে বাংলাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘ ও Climate Vulnerable Forum (CVF)-সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে উভয় দেশ একযোগে কাজ করে যেতে একমত হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর বিস্তারিত প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে এ ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য নেপালকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

নেপাল বাংলাদেশের অন্যতম নিকট প্রতিবেশী দেশই শুধু নয়, বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এ দেশটি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই ভালো। এখানে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও অনেক বেশি।

বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্য, প্লাস্টিক, ব্যাটারি, কনস্ট্রাকশন ম্যাটারিয়ালস, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স, মোটরসাইকেল, মেলামাইন-সিরামিক, ফুটওয়্যার ও তৈরি পোশাক পণ্যের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে নেপালের বাজারে। ভালো মানের পোশাক কারখানা বা তৈরি পোশাকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উভয় দেশই আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সবকিছু মিলিয়ে নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির এবারের বাংলাদেশ সফর উভয় দেশের জন্যই সম্ভাবনার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর সুদূরপ্রসারী ফল উভয় দেশকেই সমৃদ্ধ করবে।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরে আন্তরিকতার পাশাপাশি বাণিজ্যও বাড়বে

 ড. এ কে আব্দুল মোমেন 
২০ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপ্রিয় দেশ হিমালয়কন্যা নেপাল। বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুসম্পর্ক বিরাজ করছে বহু বছর ধরে। সম্প্রতি সেই সম্পর্ক আরও জোরদার হয়েছে। অর্থনীতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উভয় দেশের মধ্যে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। এই তো ২০১৯ সালে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ রাষ্ট্রীয় সফরে নেপাল ঘুরে এসেছেন।

এবার বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে গত ২২ মার্চ রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে আসেন তিনি। এটিই নেপালের কোনো রাষ্ট্রপতির প্রথম বাংলাদেশ সফর। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সম্মানিত হয়েছে বাংলাদেশ।

উভয় দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ সফরের বিরাট গুরুত্ব রয়েছে। নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরকালে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে উভয় দেশের মধ্যে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে এ চুক্তিগুলো দুই দেশের জন্যই সুদূরপ্রসারী ফল বয়ে আনবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষ্যে দশ দিনব্যাপী ‘মুজিব চিরন্তন’ শিরোনামে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসাবে যোগ দিয়ে তিনি বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা করেন। বক্তৃতায় তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘Charismatic leader, well-organizer, person of determination and courage and stout

freedom fighter’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর কৃতিত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, তার বিচক্ষণ নেতৃত্ব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্তগুলো এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলার জনগণ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও আহ্বানে সাড়া দিয়েই বাংলার জনগণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা আজ বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির বাংলাদেশের মাটিতে আগমন উপলক্ষ্যে বিমানবন্দরে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ। তারপর তাকে নিয়ে রওয়ানা হন সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের আত্ম-উৎসর্গকারী বীর শহিদদের স্মৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য।

সফররত নেপালি রাষ্ট্রপতির সম্মানে আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি একটি রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করেন। তিনি ২০১৯ সালে নেপালে তার শুভেচ্ছা সফরের আনন্দময় স্মৃতির উল্লেখ করেন এবং মহামারিজনিত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সফরের জন্য নেপালের রাষ্ট্রপতিকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান। দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করেন এবং সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রগুলোয় সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন।

এ সময় উভয় দেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা তুলে ধরা হয়। সফরকালে নেপালের রাষ্ট্রপতি ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন এবং জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এমপির সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঘুরে ঘুরে দেখেন। তিনি বেশকিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন এবং পরিদর্শন শেষে ভিজিটর’স বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হিসাবে এসেছিলেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি দল। এ সফর আবহমান সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের ভিত্তির ওপর রচিত বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বেগবান ও জোরদার করবে। সফরকালে বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চারটি দ্বিপাক্ষিক ইন্সট্রুমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সমঝোতা স্মারকগুলো হলো: পর্যটন সহযোগিতা, স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি সহযোগিতা জোরদার করা, সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি এবং রোহানপুর-সিগবাদ রেলওয়ে রুট সংস্কারবিষয়ক। এসব চুক্তি দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

নেপাল একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপাল নিরপেক্ষ অবস্থান পালন করলেও স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে তারা। এর পর থেকেই সেদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে বাংলাদেশের। নেপালের বাজারটি এতদিন ভারতের দখলে থাকলেও গত কয়েক বছরে নেপালের বাজারে বেশ ভালোভাবেই প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

নেপালের বাজারে খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল, ফার্নিচার ও ওষুধ যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। এ ছাড়া উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি, বিশেষ করে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধিসহ দূরদর্শী পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। এসব কারণে নেপালে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রসারিত হচ্ছে উভয় দেশের অর্থনীতি।

নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির সঙ্গে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় নেপালের রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘Most inspiring woman leader in the

world’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। তিনি জাতির পিতার কন্যাকে দক্ষিণ এশিয়া তথা সারা বিশ্বের জন্যই ‘রোল মডেল’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি চায়, তাহলে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও যে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার গৌরবোজ্জ্বল ৫০ বছর এবং জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তার আগমনে বাংলাদেশ অত্যন্ত খুশি ও আনন্দিত বলে তাকে জানিয়েছেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উভয় নেতা বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) স্বাক্ষরের বিষয়টি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি স্বাক্ষরিত হলে উভয় দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। আমরা আশা করছি, চুক্তিটি দ্রুতই স্বাক্ষরিত হবে।

এ সময় রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি নেপালে উৎপাদিত জলবিদ্যুৎ আমদানির জন্য বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জলবিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় সচিব পর্যায়ের স্টিয়ারিং কমিটি এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণবিষয়ক কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকগুলো ইতোমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে জলবিদ্যুৎ সেক্টরে বর্ধিত সহযোগিতার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। এ সফরকালে Sanitary and

Phytosanitary (SPS) সহযোগিতা সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ হিসাবে নেপালের পাশে সব সময় দায়িত্বশীল প্রতিবেশীর মতোই দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। নেপালকেও পাশে পেয়েছে একইভাবে। বিগত বছর হঠাৎ করেই নেপালে সার সংকট দেখা দিলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুরোধে সাড়া দিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার টন ইউরিয়া সার নেপালে ত্বরিত সরবরাহের ব্যবস্থা করে দিয়ে দেশটির পাশে দাঁড়ান, যদিও বাংলাদেশ সার রপ্তানিকারক দেশ নয়।

রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই রাষ্ট্রনায়কোচিত ঔদার্যের জন্য সপ্রশংস কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিশ্বমানবতার কল্যাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মঙ্গলময় হাত সব সময়ই প্রসারিত থাকবে। তার নির্দেশনাক্রমে বাংলাদেশকে আমরা সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে তথা মাল্টিমোডাল কানেকটিভিটি হাবে রূপান্তরিত করতে চাই। এ জন্য ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পরিবহণ-সংযোগ অবারিত ও সুগম করার নানাবিধ উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

১৯৭৬ সালে সম্পাদিত বাংলাদেশ-নেপাল ট্রানজিট চুক্তির প্রটোকলের সংযোজনী হিসাবে রোহানপুর-সিংঘাবাদ রেল সংযোগ পয়েন্টকে অন্তর্ভুক্ত করে দুই দেশের বাণিজ্য সচিবদের মধ্যে একটি Letter of Exchange (LoE) স্বাক্ষরিত হয়েছে এই সফরকালে। ২০১০ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরকালে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানের ব্যবহারের সুযোগ প্রদানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। নেপাল চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী।

এ ক্ষেত্রে modalities নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেপাল। এ ছাড়া বাংলাদেশের সৈয়দপুর বিমানবন্দর এবং নেপালের বিরাটগড়/ভদ্রপুরের মধ্যে সরাসরি বিমান সংযোগ স্থাপনেও নেপাল আগ্রহী। বাংলাদেশ প্রস্তাব দুটিকে স্বাগত জানিয়েছে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে স্বাক্ষরিত BBIN Motor Vehicles Agreement বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিদ্যমান রুটগুলো ছাড়াও নতুন কিছু রুট অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটির ত্রিদেশীয় Passenger Protocol স্বাক্ষরে বাংলাদেশ ও ভারত ইতোমধ্যে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে নেপালের সম্মতি খুব দ্রুত পাওয়া যাবে বলে আমরা আশা করছি।

হিমালয়কন্যা নেপাল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। পর্যটন খাত থেকে বার্ষিক আয়ের একটি বড় অংশ অর্জন করে থাকে তারা। নেপালে সর্বোচ্চসংখ্যক পর্যটক প্রেরণকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এ পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটন সেক্টরে সহযোগিতা নিবিড় করতে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর নেপাল থেকে বহু ছাত্রছাত্রী মেডিকেল ও প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অধ্যয়ন করতে আসে, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়।

এ সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রপতি ভান্ডারির এ সফরকালে দুদেশের মধ্যে ২০২২-২৫ মেয়াদের জন্য একটি সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি (CEP) স্বাক্ষরিত হয়েছে। নেপালের মানবসম্পদ (HRD) ও যুব উন্নয়নে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং আইটি সেক্টরেও নেপালকে বিবিধ সহায়তা দেবে বাংলাদেশ।

নেপালের হিমালয় পর্বতমালায় বৈশ্বিক উষ্ণতাজনিত glacier melting-এর ফলে নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসাবে বাংলাদেশে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘ ও Climate Vulnerable Forum (CVF)-সহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক ফোরামে উভয় দেশ একযোগে কাজ করে যেতে একমত হয়েছে। রোহিঙ্গা ইস্যুর বিস্তারিত প্রেক্ষাপট, পরিস্থিতি ও প্রত্যাবাসন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে এ ইস্যুতে বাংলাদেশকে সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদানের জন্য নেপালকে অনুরোধ জানানো হয়েছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

নেপাল বাংলাদেশের অন্যতম নিকট প্রতিবেশী দেশই শুধু নয়, বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এ দেশটি একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক ও যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ ও নেপালের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুবই ভালো। এখানে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও অনেক বেশি।

বাংলাদেশে উৎপাদিত খাদ্য, প্লাস্টিক, ব্যাটারি, কনস্ট্রাকশন ম্যাটারিয়ালস, ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স, মোটরসাইকেল, মেলামাইন-সিরামিক, ফুটওয়্যার ও তৈরি পোশাক পণ্যের বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে নেপালের বাজারে। ভালো মানের পোশাক কারখানা বা তৈরি পোশাকের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উভয় দেশই আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

সবকিছু মিলিয়ে নেপালের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারির এবারের বাংলাদেশ সফর উভয় দেশের জন্যই সম্ভাবনার একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এর সুদূরপ্রসারী ফল উভয় দেশকেই সমৃদ্ধ করবে।

ড. এ কে আব্দুল মোমেন : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন