এমপিও নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন
jugantor
এমপিও নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন

  শরীফুজ্জামান আগা খান  

০৩ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

১৩ এপ্রিল যুগান্তরে এমপিও নীতিমালা ২০২১-এর ওপর আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। ওই লেখার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন শিক্ষক ফোনে নীতিমালার কয়েকটি দিকের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে কোনো কোনো বিষয়ে তারা অভিমতও দেন। এরকম কতিপয় বিষয় নিয়ে আগের সম্পূরক এ লেখা।

এখন হাইস্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। নিবন্ধনের পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষক নির্বাচনের কাজ এনটিআরসিএ করে থাকে। এতদিন সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগাররা কর্মচারী হিসাবে গণ্য হতেন। ম্যানেজিং কমিটির হাতে এ পদে নিয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। নীতিমালায় তাদের শিক্ষক পদে উন্নীত করায় অন্যান্য বিষয় শিক্ষকের মতো এ নিয়োগও এনটিআরসিএ-এর এখতিয়ারে চলে যাওয়ার কথা। তাহলে এখন কি সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগার পদে নিবন্ধন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ স্থগিত থাকবে? যেসব প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভেতর ছিল, তারা কি নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারবে? মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও লাইব্রেরি রয়েছে। সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগাররা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও তাদের নিয়োগের সুযোগ চান।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী পদে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মচারী নিয়োগের কাজ ম্যানেজিং কমিটি করে থাকে। অনেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এখনই নিয়োগ দিতে উৎসাহী। তাদের প্রশ্ন, বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদে এ নতুন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে কি? একটি কলেজ এমপিওভুক্ত হতে কোন বিভাগে কতজন শিক্ষার্থী লাগবে-নীতিমালায় তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কলেজের স্বীকৃতি একটি, দুটি কিংবা তিনটি বিভাগ নিয়ে হতে পারে। এখন একটি কলেজের দুটি বিভাগের মধ্যে একটি কিংবা তিনটি বিভাগের ভেতর দুটি বিভাগ শর্ত পূরণ করলে এ জাতীয় কলেজ ওই বিভাগ নিয়ে কি এমপিওভুক্ত হতে পারবে; নাকি পুরো কলেজ নন-এমপিওই রয়ে যাবে?

কলেজে কোনো বিভাগে দুই শ্রেণিতে ২০ জন করে হলে ৪০ জন কিংবা ৩০ জন করে হলে ৬০ জন-এরকম গুণিতক হারে কাম্য শিক্ষার্থী থাকার শর্ত রয়েছে। একজন শিক্ষক বললেন, প্রতি শ্রেণিতে এ সংখ্যা নির্দিষ্ট না করে দুই শ্রেণি মিলিয়ে গড়ে এ সংখ্যা পূরণ করার শর্ত থাকলে সুবিধা হয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো প্রধান এবং সহকারী প্রধান অন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও উচ্চপদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি বিভাগীয় প্রার্থী হিসাবে গণ্য হন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ম্যানেজিং কমিটি এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কিন্তু সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ রকম নিয়ম নেই। নীতিমালার ১২.২ ধারায় বলা হয়েছে-এনটিআরসিএ-এর সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক/প্রদর্শক/প্রভাষক কোনো প্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সমপদে ও সমস্কেলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করে জনস্বার্থে আদেশ জারি করতে পারবে। এ আদেশ জারি ভবিষ্যতে সম্ভাবনা অর্থে না রেখে নীতিমালা প্রণয়ন এবং আদেশ জারি করা আশু প্রয়োজন। এখন এমপিও, নন-এমপিও নির্বিশেষে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে শূন্যপদের জন্য শিক্ষক নির্বাচন করা হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের সময় সচরাচর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খুব বেশি দূরে বাড়ি নয়; এমন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এনটিআরসিএ থেকে নির্বাচিত শিক্ষক কেবল জেলার বাইরে থেকে নয়, অন্য বিভাগ থেকেও আসছে। দূর থেকে আগত একজন শিক্ষকের প্রতিষ্ঠানের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে চাকরি করতে হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়ি ভাড়া পান মাত্র এক হাজার টাকা (নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে তো বেতনই নেই)। উপজেলা পর্যায়ে কোনো রকমের একটি বাসার ভাড়া তিন হাজার টাকার কম নয়। এ অবস্থায় নিজ এলাকা ছেড়ে দূরে গিয়ে চাকরি করতে হলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও বদলির বিধান চালু করলে শিক্ষকরা চাকরি করার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।

সহকারী শিক্ষকরা দশ বছর সন্তোষজনকভাবে চাকরি পূর্ণ করলে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র শিক্ষক হবেন। আর কলেজের প্রভাষকরা আট বছর চাকরি পূর্তিতে মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি পাবেন। নন-এমপিও শিক্ষকরা নিয়োগের সময় থেকে তাদের চাকরির বয়স গণনা চান। অনেক শিক্ষক বিনা বেতনে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় পার করেছেন। কারও কারও বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায় গিয়ে পড়েছে। বিনা বেতনে চাকরির মেয়াদকাল হিসাবে না ধরলে অনেকেই কোনো পদোন্নতি ছাড়াই চাকরির মেয়াদ শেষ করবেন।

নানা ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের দীর্ঘসূত্রতা খুবই পীড়াদায়ক। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালোভাবে পাঠদান কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রতিবছর শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার সময় সেই প্রতিশ্রুতি ছিল; কিন্তু ২০১৬ সালের পর আর প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ওদিকে নিবন্ধনধারী শিক্ষকপ্রার্থীদের অনেকেই ৩৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় বয়স জটিলতায় পড়ছেন। তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। সম্প্রতি শূন্যপদে তৃতীয়বারের মতো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়। এ আবেদন গ্রহণ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলে। এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শেষ হবে, কে জানে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের আওতায় এলে ১ থেকে ২ বছরের ভেতর সরকারীকরণের কাজ সমাধা হওয়ার কথা। অথচ সরকারি ঘোষিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৪ থেকে ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সরকারি হতে পারেনি। ২০১৯ সালে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী প্রতিবছর এমপিও নীতিমালার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু এরপর নতুন নীতিমালার শর্ত ঠিক করতেই প্রায় দুবছর লেগে গেল। এখন কবে এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ করা হবে, তাই নিয়ে আমরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছি। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গতিশীল ভূমিকায় দেখতে চাই; যাতে শিক্ষকদের আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকতে না হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশিদ আমিনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন নীতিমালা অনুসারে এমপিওর আবেদন গ্রহণের সফটওয়্যার আপগ্রেড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আসছে অর্থবছরে নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাজেট বরাদ্দ পেলে আবেদন গ্রহণ করা হতে পারে। বর্তমানে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের হিসাবনিকাশ চলছে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি খাতে কী পরিমাণ বরাদ্দ লাগবে, অনতিবিলম্বে সেই হিসাব করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠাবে। গতবার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি খাতে প্রাপ্ত বাজেটের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থের সংগতি ছিল না। নতুন স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্তি খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৬৫ কোটি টাকা; কিন্তু ব্যয় হয় ৪৫০ কোটি টাকা। ৪১৪ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যায়। অন্যদিকে, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮২ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় হয় ৪৩০ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ১৪৯ কোটি টাকা পরবর্তী সময়ে জোগান দিতে হয়। আগেভাগে হিসাব করে ফেললে সঠিক বাজেট নির্ধারণের কাজটা সহজ হয়। নতুন নীতিমালায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার-এ তিনটি বিষয়ের ওপর স্কোরিং করে এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হবে। এ তিনটি বিষয়ের তথ্য বেনবেইস এবং শিক্ষা বোর্ডে রয়েছে। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে কী সংখ্যক নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির যোগ্য বিবেচিত হবে এবং এ খাতে কী পরিমাণ বাজেটে লাগবে-আবেদন গ্রহণের আগেই সেই হিসাবটা করে ফেলা যায়। তাহলে তখন আর প্রাপ্ত বাজেট এবং এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের মধ্যে তেমন একটা হেরফের হবে না।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটি পেজে নিয়মিত বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে থাকেন। এসব পোস্টে নিজেদের বেদনা-বঞ্চনা, বিপন্নতা, দিশেহারা দশা, অপমৃত্যু, আত্মহত্যা এরকম বিষয় স্থান পায়। তারা এমপিওভুক্তির অধিকার নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভও প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নন-এমপিও সমস্যা থেকে মুক্তির আকুতি জানান। এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণে বিলম্বের দরুন এ করোনার ভেতর নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় দাঁড়ানো কাম্য হতে পারে না।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা বর্তমানে অভাব-অনটনে জর্জরিত। প্রধানমন্ত্রী করোনাকালে গত বছর একবার নন-এমপিও শিক্ষকপ্রতি পাঁচ হাজার এবং কর্মচারীপ্রতি আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দিয়েছিলেন। এতে আমাদের অর্থকষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছিল। সামনে ঈদ। নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা ঈদে যে কিছু কেনাকাটা করবেন, হাতে সেই অর্থ নেই। আসছে ঈদের আগে আরেকবার প্রণোদনার অর্থ পেলে আমাদের পক্ষে ঈদ পালন করা সম্ভব হতো।

শরীফুজ্জামান আগা খান : আহ্বায়ক, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ

এমপিও নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে কিছু প্রশ্ন

 শরীফুজ্জামান আগা খান 
০৩ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
ফাইল ছবি

১৩ এপ্রিল যুগান্তরে এমপিও নীতিমালা ২০২১-এর ওপর আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়। ওই লেখার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন শিক্ষক ফোনে নীতিমালার কয়েকটি দিকের ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে কোনো কোনো বিষয়ে তারা অভিমতও দেন। এরকম কতিপয় বিষয় নিয়ে আগের সম্পূরক এ লেখা।

এখন হাইস্কুল ও কলেজে শিক্ষক পদে নিয়োগ পেতে নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। নিবন্ধনের পরীক্ষা গ্রহণ এবং শিক্ষক নির্বাচনের কাজ এনটিআরসিএ করে থাকে। এতদিন সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগাররা কর্মচারী হিসাবে গণ্য হতেন। ম্যানেজিং কমিটির হাতে এ পদে নিয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। নীতিমালায় তাদের শিক্ষক পদে উন্নীত করায় অন্যান্য বিষয় শিক্ষকের মতো এ নিয়োগও এনটিআরসিএ-এর এখতিয়ারে চলে যাওয়ার কথা। তাহলে এখন কি সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগার পদে নিবন্ধন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত নিয়োগ স্থগিত থাকবে? যেসব প্রতিষ্ঠান পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়ার ভেতর ছিল, তারা কি নিয়োগ সম্পন্ন করতে পারবে? মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মতো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও লাইব্রেরি রয়েছে। সহকারী গ্রন্থাগারিক-কাম-ক্যাটালগাররা নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়েও তাদের নিয়োগের সুযোগ চান।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মচারী পদে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কর্মচারী নিয়োগের কাজ ম্যানেজিং কমিটি করে থাকে। অনেক ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এখনই নিয়োগ দিতে উৎসাহী। তাদের প্রশ্ন, বর্তমান ম্যানেজিং কমিটির মেয়াদে এ নতুন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে কি? একটি কলেজ এমপিওভুক্ত হতে কোন বিভাগে কতজন শিক্ষার্থী লাগবে-নীতিমালায় তা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো কলেজের স্বীকৃতি একটি, দুটি কিংবা তিনটি বিভাগ নিয়ে হতে পারে। এখন একটি কলেজের দুটি বিভাগের মধ্যে একটি কিংবা তিনটি বিভাগের ভেতর দুটি বিভাগ শর্ত পূরণ করলে এ জাতীয় কলেজ ওই বিভাগ নিয়ে কি এমপিওভুক্ত হতে পারবে; নাকি পুরো কলেজ নন-এমপিওই রয়ে যাবে?

কলেজে কোনো বিভাগে দুই শ্রেণিতে ২০ জন করে হলে ৪০ জন কিংবা ৩০ জন করে হলে ৬০ জন-এরকম গুণিতক হারে কাম্য শিক্ষার্থী থাকার শর্ত রয়েছে। একজন শিক্ষক বললেন, প্রতি শ্রেণিতে এ সংখ্যা নির্দিষ্ট না করে দুই শ্রেণি মিলিয়ে গড়ে এ সংখ্যা পূরণ করার শর্ত থাকলে সুবিধা হয়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো প্রধান এবং সহকারী প্রধান অন্য এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমপদে ও উচ্চপদে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি বিভাগীয় প্রার্থী হিসাবে গণ্য হন। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ম্যানেজিং কমিটি এ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কিন্তু সহকারী শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এ রকম নিয়ম নেই। নীতিমালার ১২.২ ধারায় বলা হয়েছে-এনটিআরসিএ-এর সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক/প্রদর্শক/প্রভাষক কোনো প্রতিষ্ঠানে পদ শূন্য থাকা সাপেক্ষে সমপদে ও সমস্কেলে প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের জন্য মন্ত্রণালয় নীতিমালা প্রণয়ন করে জনস্বার্থে আদেশ জারি করতে পারবে। এ আদেশ জারি ভবিষ্যতে সম্ভাবনা অর্থে না রেখে নীতিমালা প্রণয়ন এবং আদেশ জারি করা আশু প্রয়োজন। এখন এমপিও, নন-এমপিও নির্বিশেষে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এনটিআরসিএ-এর মাধ্যমে শূন্যপদের জন্য শিক্ষক নির্বাচন করা হচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির হাতে নিয়োগের সময় সচরাচর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে খুব বেশি দূরে বাড়ি নয়; এমন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হতো। কিন্তু এনটিআরসিএ থেকে নির্বাচিত শিক্ষক কেবল জেলার বাইরে থেকে নয়, অন্য বিভাগ থেকেও আসছে। দূর থেকে আগত একজন শিক্ষকের প্রতিষ্ঠানের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে চাকরি করতে হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা বাড়ি ভাড়া পান মাত্র এক হাজার টাকা (নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলে তো বেতনই নেই)। উপজেলা পর্যায়ে কোনো রকমের একটি বাসার ভাড়া তিন হাজার টাকার কম নয়। এ অবস্থায় নিজ এলাকা ছেড়ে দূরে গিয়ে চাকরি করতে হলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। সে কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও বদলির বিধান চালু করলে শিক্ষকরা চাকরি করার ক্ষেত্রে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন।

সহকারী শিক্ষকরা দশ বছর সন্তোষজনকভাবে চাকরি পূর্ণ করলে পদোন্নতি পেয়ে সিনিয়র শিক্ষক হবেন। আর কলেজের প্রভাষকরা আট বছর চাকরি পূর্তিতে মূল্যায়নের ভিত্তিতে পদোন্নতি পাবেন। নন-এমপিও শিক্ষকরা নিয়োগের সময় থেকে তাদের চাকরির বয়স গণনা চান। অনেক শিক্ষক বিনা বেতনে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় পার করেছেন। কারও কারও বয়স এখন পঞ্চাশের কোঠায় গিয়ে পড়েছে। বিনা বেতনে চাকরির মেয়াদকাল হিসাবে না ধরলে অনেকেই কোনো পদোন্নতি ছাড়াই চাকরির মেয়াদ শেষ করবেন।

নানা ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজের দীর্ঘসূত্রতা খুবই পীড়াদায়ক। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভালোভাবে পাঠদান কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রতিবছর শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠার সময় সেই প্রতিশ্রুতি ছিল; কিন্তু ২০১৬ সালের পর আর প্রতিষ্ঠানে শূন্যপদে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ওদিকে নিবন্ধনধারী শিক্ষকপ্রার্থীদের অনেকেই ৩৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় বয়স জটিলতায় পড়ছেন। তারা আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। সম্প্রতি শূন্যপদে তৃতীয়বারের মতো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার জন্য আবেদন গ্রহণ করা হয়। এ আবেদন গ্রহণ ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চলে। এখন নিয়োগ প্রক্রিয়া কবে নাগাদ শেষ হবে, কে জানে।

একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারীকরণের আওতায় এলে ১ থেকে ২ বছরের ভেতর সরকারীকরণের কাজ সমাধা হওয়ার কথা। অথচ সরকারি ঘোষিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৪ থেকে ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সরকারি হতে পারেনি। ২০১৯ সালে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির তালিকা প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী প্রতিবছর এমপিও নীতিমালার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু এরপর নতুন নীতিমালার শর্ত ঠিক করতেই প্রায় দুবছর লেগে গেল। এখন কবে এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণ করা হবে, তাই নিয়ে আমরা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছি। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে গতিশীল ভূমিকায় দেখতে চাই; যাতে শিক্ষকদের আর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে থাকতে না হয়।

সম্প্রতি প্রকাশিত খবরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোমিনুর রশিদ আমিনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, নতুন নীতিমালা অনুসারে এমপিওর আবেদন গ্রহণের সফটওয়্যার আপগ্রেড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আসছে অর্থবছরে নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির বাজেট বরাদ্দ পেলে আবেদন গ্রহণ করা হতে পারে। বর্তমানে আগামী অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দের হিসাবনিকাশ চলছে। আমাদের প্রত্যাশা, নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি খাতে কী পরিমাণ বরাদ্দ লাগবে, অনতিবিলম্বে সেই হিসাব করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠাবে। গতবার নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি খাতে প্রাপ্ত বাজেটের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থের সংগতি ছিল না। নতুন স্কুল ও কলেজ এমপিওভুক্তি খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৬৫ কোটি টাকা; কিন্তু ব্যয় হয় ৪৫০ কোটি টাকা। ৪১৪ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যায়। অন্যদিকে, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির জন্য বরাদ্দ ছিল ২৮২ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যয় হয় ৪৩০ কোটি টাকা। অতিরিক্ত ১৪৯ কোটি টাকা পরবর্তী সময়ে জোগান দিতে হয়। আগেভাগে হিসাব করে ফেললে সঠিক বাজেট নির্ধারণের কাজটা সহজ হয়। নতুন নীতিমালায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা এবং পাবলিক পরীক্ষায় পাশের হার-এ তিনটি বিষয়ের ওপর স্কোরিং করে এমপিওভুক্তির যোগ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত হবে। এ তিনটি বিষয়ের তথ্য বেনবেইস এবং শিক্ষা বোর্ডে রয়েছে। সেখান থেকে তথ্য নিয়ে কী সংখ্যক নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির যোগ্য বিবেচিত হবে এবং এ খাতে কী পরিমাণ বাজেটে লাগবে-আবেদন গ্রহণের আগেই সেই হিসাবটা করে ফেলা যায়। তাহলে তখন আর প্রাপ্ত বাজেট এবং এমপিওভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের মধ্যে তেমন একটা হেরফের হবে না।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকটি পেজে নিয়মিত বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে থাকেন। এসব পোস্টে নিজেদের বেদনা-বঞ্চনা, বিপন্নতা, দিশেহারা দশা, অপমৃত্যু, আত্মহত্যা এরকম বিষয় স্থান পায়। তারা এমপিওভুক্তির অধিকার নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভও প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নন-এমপিও সমস্যা থেকে মুক্তির আকুতি জানান। এমপিওভুক্তির আবেদন গ্রহণে বিলম্বের দরুন এ করোনার ভেতর নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় দাঁড়ানো কাম্য হতে পারে না।

নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা বর্তমানে অভাব-অনটনে জর্জরিত। প্রধানমন্ত্রী করোনাকালে গত বছর একবার নন-এমপিও শিক্ষকপ্রতি পাঁচ হাজার এবং কর্মচারীপ্রতি আড়াই হাজার টাকা প্রণোদনা দিয়েছিলেন। এতে আমাদের অর্থকষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়েছিল। সামনে ঈদ। নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা ঈদে যে কিছু কেনাকাটা করবেন, হাতে সেই অর্থ নেই। আসছে ঈদের আগে আরেকবার প্রণোদনার অর্থ পেলে আমাদের পক্ষে ঈদ পালন করা সম্ভব হতো।

শরীফুজ্জামান আগা খান : আহ্বায়ক, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী পরিষদ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন