খাবারের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে
jugantor
খাবারের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে

  সালাহ্উদ্দিন নাগরী  

১০ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

খাবারের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে

‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’-কালের বিবর্তনে কবি সুকান্তের ‘এ পৃথিবী’র চেহারায় খুব একটা পরিবর্তন কি এসেছে? ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব কোনোকালেই মনে হয় মানুষের পিছু ছাড়েনি। তাই তো এখনো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় কাতর। সিরিয়া, লিবিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে মানুষ ঘাসের স্যুপ, ঘাসের রস, ডাস্টবিনের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। মা তার কোলের শিশুকে বিক্রি করে দিচ্ছে। মৃত্যুর আগে সিরীয় এক ছোট্ট শিশু আর্তনাদ করে বলছে-‘আমি আল্লাহকে সব বলে দিব।’

পৃথিবীর অভাগা মানুষ কি কখনো ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে না? ২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বছরে বিশ্বের প্রায় ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের বরাত দিয়ে গত বছর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে-ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও দক্ষিণ সুদানসহ বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোয় করোনার কারণে খাদ্য সংকট আরও বেড়েছে। এর প্রভাব থেকে মধ্যম আয়ের দেশগুলোও বাদ যায়নি। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে মহামারির কারণে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে থাকার পর্যায়ে নেমে এসেছে।

এর মাঝেও বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। একদিকে খাদ্যের অপচয় হচ্ছে আর অন্যদিকে বিশ্বে ক্ষুধায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে; প্রায় ৮০ কোটি মানুষ প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভুগছে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও এ বৈপরীত্য চোখে পড়ছে। ওসব দেশে যেমন খাবারের অপচয় হচ্ছে, একইসঙ্গে অনেককে না খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে। এমন কী খোদ যুক্তরাজ্যেই ৮৪ লাখ মানুষকে একবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান বলেছিলেন, সম্পদের স্বল্পতা নয়; খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ। জাতিসংঘ বলছে, মানুষের জন্য উৎপাদিত খাবারের মধ্যে অপচয় হয় ১৩০ কোটি টন (মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ)।

খাবারের অপচয় রোধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতা কতটুকু? অনেক বাড়িতে প্রতিবেলায় এত এত খাবার রান্না হয় যে, খেতে না পারার কারণে পরে তা ফেলে দিতে হয়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি বাসাবাড়িতে ভিক্ষুক, দুস্থ ও অসহায় মানুষজন সাহায্যের জন্য এলে ভাত-রুটি যা থাকত, তাই খাইয়ে দেওয়া হতো। ওটিই হয়তো হতো সে অভুক্তের সারা দিনের আহার। গরিবের এভাবে ক্ষুধা নিবারণের এ রেওয়াজটি আজ আর ইটপাথরের খাঁচায় বন্দি বাসাবাড়িতে চোখে পড়ে না বললেই চলে। এ ধরনের মানবিক কাজগুলো আবার চালু করা যেতে পারে।

আমাদের কিছু কিছু অভ্যাস খাবার অপচয়ে সামান্য পরিমাণে হলেও ভূমিকা রাখে। অনেক অনুষ্ঠানে আয়োজকের আর্থিক সামর্থ্য প্রদর্শনের জন্য খাবারের পদের সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক থাকে এবং ওয়েটাররাও অনেক সময় এত বেশি পরিমাণে খাবার তুলে দেয়, যা পরে নষ্ট হয়। ঘরে-বাইরে দাওয়াতে অতিথিদের জোর করে বেশি বেশি খাবার তুলে দেওয়ার প্রবণতা এ সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এতে খাবারের অপচয় হয়। অতিথি আপ্যায়নে অন্যের পাতে জোর করে খাবার তুলে দেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। যার যতটুকু প্রয়োজন, যতটুকু খেতে পারবে-সে ততটুকুই নেবে। ভালোবাসা ও সম্মান দেখাতে গিয়ে অন্যের পাতে জোর করে তুলে দেওয়া খাবারের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে বছরে মোট খাবারের ১৭ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও দোকানে অপচয় হয়। আমাদের আরেকটি অভ্যাসে ভীষণ অবাক হই-খাওয়ার টেবিলে হরেকরকমের সুস্বাদু খাবার পরিবেশিত হলে পেট ভরে যাওয়ার পরও চোখের ক্ষুধা সামলাতে না পেরে অনেকে প্লেটে খাবার তুলতেই থাকে। পরে খেতে না পেরে ওইসব খাবারের জায়গা হয় বনপ্লেটে। এফএও’র তথ্যমতে, উৎসবের দিনগুলোতে এ অপচয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

আমাদের খাদ্য বিলাসিতা থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে। ‘প্রয়োজন’কে সীমিত পর্যায়ে নিতে আসতে হবে। ব্যক্তি সতর্কতাও খাদ্য অপচয় রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক পরিবারে সপ্তাহ বা মাসের বাজার একত্রে করা হয়; ফ্রিজবন্দি ওইসব শাকসবজি এক পর্যায়ে পচে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফেলে দিতে হয়। একজন মানুষ বা একটি পরিবার প্রতিবেলায় যে খাবার অপচয় করে, সেটি হয়তো অনেক সময় ধর্তব্যের ভেতর আসে না। দুমুঠো ভাত, এক বাটি সবজি, শক্ত হয়ে যাওয়া দুটো রুটি ফেলে দেওয়া হচ্ছে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছাড়াই; কিন্তু বছর শেষে মাথাপিছু সে অপচয়ের পরিমাণ ১০০ কেজিতে গিয়ে ঠেকে। তাই প্রয়োজনের বেশি খাবার কেনা ও রান্না করা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আমাদের সমাজে কিছুদিন আগেও খাবার গ্রহণে আভিজাত্য প্রকাশের এক অদ্ভুত রীতি চালু ছিল। কোনো অনুষ্ঠান বা দাওয়াতে কোমল পানীয়, চা, কফি বা কোনো কিছু খেতে দেওয়া হলে কিছুটা রেখে দেওয়া হতো। মনে করা হতো গ্লাস, বোতলের পুরো পানীয় বা প্লেটের পুরো খাবার খেয়ে নিলে অন্যরা হয়তো আনকালচারড বা গেঁয়ো ভাববে। তাই অনেক পরিবারে বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হতো ‘কোথাও বেড়াতে গেলে কোনো কিছু খেতে দিলে পুরোটা খেতে হয় না।’ এখন অবশ্য আমরা এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছি।

বিশ্বে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাবারের অপচয় হয়, তা উৎপাদনে ১৪০ কোটি হেক্টর জমি ব্যবহৃত হয়; যা বিশ্বের মোট কৃষি জমির ২৮ শতাংশ। এ বাড়তি খাবার উৎপাদনে প্রতিনিয়ত বনভূমিকে কৃষিজমিতে পরিণত করা হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস উৎপাদনে কীটনাশক, রাসায়নিক সার ব্যবহারে নদী-নালা, খাল-বিল, ফসলের খেত বিষময় হয়ে উঠছে। এতে মানুষসহ জীবজন্তু, পশুপাখি বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর কার্বন নিঃসরণসহ পরিবেশ দূষণে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে অপচয়কৃত খাবার আর এতে প্রতি বছর ৩৩০ কোটি টন কার্বনডাই অক্সসাইড বাতাসে ছড়াচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সুষ্ঠু যোগাযোগ ও বাজার ব্যবস্থা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষিরা অনেক সময় শস্যের উৎপাদিত মূল্যই পায় না। এর ফলে তারা ফসল মাড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয়। খাদ্যের এ অপচয় আরও অনেক ধরনের অপচয়কে তার সঙ্গী করে নেয়। এতে পানি, জ্বালানি, পরিবহণ, সময়; সর্বোপরি অর্থের অপচয় হয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চরম নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। অপচয়কৃত খাদ্যের শেষ ঠিকানা হয় ভাগাড়। এতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনও ত্বরান্বিত করছে।

অপচয়ে রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়। অপচয় প্রবণতা ত্যাগ করে দেশের সম্পদরক্ষায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতে হবে। অপচয় রোধের মাধ্যমে সম্পদের পরিমাণ বাড়ানো যায়-এ ধারণা দেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে গেঁথে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ভোগবিলাসিতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কোনো মত, প্রথা অথবা ধর্ম অপচয়কে সমর্থন করে না; বরং সব ধর্মেই মিতব্যয়িতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আমাদের পবিত্র কুরআনের ১৭নং সূরা-আল ইসরা’র ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তো তার প্রতিপালকের প্রতি

না-শোকর।’ একজন মানুষ কতটুকু খাবে, কীভাবে খাবে তার গাইডলাইন ইসলাম দিয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে-তোমাদের পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে, এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূরণ কর এবং বাকি অংশ খালি রাখো; অথবা এমন পরিমাণে আহার কর, যেন খাওয়া শেষে তৎক্ষণাৎ সমপরিমাণ খাবার খেতে পারো। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানও ইসলামের এ ব্যাখ্যা পুরোপুরি সমর্থন করে। কিন্তু আমাদের অনেকের তো গলা পর্যন্ত আহার না করলে ক্ষুধাই মেটে না! বিশ্বে সচ্ছল ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে ভোগার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ।

সামান্য আন্তরিক হলে আমাদের বেঁচে যাওয়া খাবারে ক্ষুধার্ত অনেক মানুষের আহারের সংস্থান হয়ে যায়। ইসলামে বলা হয়েছে-তোমার প্রতিবেশী কেউ যদি অভুক্ত থাকে, তা হলে তার দায়দায়িত্ব তোমার ওপরেও বর্তায়। আমরা ক’জন বিষয়টি বিবেচনায় রাখি? বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার অনেকেই এখন এতিমখানায় পাঠিয়ে দেন; আবার অনেক সংস্থা গরিব-দুঃখীদের খাওয়ানোর জন্য এসব খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এ ভালো উদ্যোগগুলো আরও সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আওতায় আনতে হবে। একটি পরিবার, একটি হোটেল-রেস্তোরাঁ বা একটি কমিউনিটি সেন্টারের বেঁচে যাওয়া খাবারে যদি একজন অভুক্তেরও ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবৃত্তি হয়, তাহলে সেটাই বা কম কী?

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

খাবারের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে

 সালাহ্উদ্দিন নাগরী 
১০ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
খাবারের অপচয় রোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে
ফাইল ছবি

‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়’-কালের বিবর্তনে কবি সুকান্তের ‘এ পৃথিবী’র চেহারায় খুব একটা পরিবর্তন কি এসেছে? ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব কোনোকালেই মনে হয় মানুষের পিছু ছাড়েনি। তাই তো এখনো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় কাতর। সিরিয়া, লিবিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে মানুষ ঘাসের স্যুপ, ঘাসের রস, ডাস্টবিনের ফেলে দেওয়া খাবার খেয়ে দুর্ভিক্ষের সঙ্গে লড়াই করে যাচ্ছে। মা তার কোলের শিশুকে বিক্রি করে দিচ্ছে। মৃত্যুর আগে সিরীয় এক ছোট্ট শিশু আর্তনাদ করে বলছে-‘আমি আল্লাহকে সব বলে দিব।’

পৃথিবীর অভাগা মানুষ কি কখনো ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে না? ২০১৭ সালের আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বছরে বিশ্বের প্রায় ১১ শতাংশ মানুষের ক্ষুধা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থা অক্সফামের বরাত দিয়ে গত বছর দেশের একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে-ইয়েমেন, আফগানিস্তান, সিরিয়া ও দক্ষিণ সুদানসহ বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলগুলোয় করোনার কারণে খাদ্য সংকট আরও বেড়েছে। এর প্রভাব থেকে মধ্যম আয়ের দেশগুলোও বাদ যায়নি। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলে মহামারির কারণে লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে থাকার পর্যায়ে নেমে এসেছে।

এর মাঝেও বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষার জন্য হাজার হাজার টন খাদ্যশস্য সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হচ্ছে। একদিকে খাদ্যের অপচয় হচ্ছে আর অন্যদিকে বিশ্বে ক্ষুধায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে; প্রায় ৮০ কোটি মানুষ প্রচণ্ড অপুষ্টিতে ভুগছে। পশ্চিমা দেশগুলোতেও এ বৈপরীত্য চোখে পড়ছে। ওসব দেশে যেমন খাবারের অপচয় হচ্ছে, একইসঙ্গে অনেককে না খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে। এমন কী খোদ যুক্তরাজ্যেই ৮৪ লাখ মানুষকে একবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের প্রধান বলেছিলেন, সম্পদের স্বল্পতা নয়; খাদ্যের অপচয়ই বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার প্রধান কারণ। জাতিসংঘ বলছে, মানুষের জন্য উৎপাদিত খাবারের মধ্যে অপচয় হয় ১৩০ কোটি টন (মোট উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ)।

খাবারের অপচয় রোধে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা কাজ করে যাচ্ছে; কিন্তু ব্যক্তি পর্যায়ে আমাদের প্রচেষ্টা, উদ্যোগ ও আন্তরিকতা কতটুকু? অনেক বাড়িতে প্রতিবেলায় এত এত খাবার রান্না হয় যে, খেতে না পারার কারণে পরে তা ফেলে দিতে হয়। আমাদের ছোটবেলায় দেখেছি বাসাবাড়িতে ভিক্ষুক, দুস্থ ও অসহায় মানুষজন সাহায্যের জন্য এলে ভাত-রুটি যা থাকত, তাই খাইয়ে দেওয়া হতো। ওটিই হয়তো হতো সে অভুক্তের সারা দিনের আহার। গরিবের এভাবে ক্ষুধা নিবারণের এ রেওয়াজটি আজ আর ইটপাথরের খাঁচায় বন্দি বাসাবাড়িতে চোখে পড়ে না বললেই চলে। এ ধরনের মানবিক কাজগুলো আবার চালু করা যেতে পারে।

আমাদের কিছু কিছু অভ্যাস খাবার অপচয়ে সামান্য পরিমাণে হলেও ভূমিকা রাখে। অনেক অনুষ্ঠানে আয়োজকের আর্থিক সামর্থ্য প্রদর্শনের জন্য খাবারের পদের সংখ্যা ও পরিমাণ অনেক থাকে এবং ওয়েটাররাও অনেক সময় এত বেশি পরিমাণে খাবার তুলে দেয়, যা পরে নষ্ট হয়। ঘরে-বাইরে দাওয়াতে অতিথিদের জোর করে বেশি বেশি খাবার তুলে দেওয়ার প্রবণতা এ সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এতে খাবারের অপচয় হয়। অতিথি আপ্যায়নে অন্যের পাতে জোর করে খাবার তুলে দেওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। যার যতটুকু প্রয়োজন, যতটুকু খেতে পারবে-সে ততটুকুই নেবে। ভালোবাসা ও সম্মান দেখাতে গিয়ে অন্যের পাতে জোর করে তুলে দেওয়া খাবারের বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বজুড়ে বছরে মোট খাবারের ১৭ শতাংশ রেস্তোরাঁ ও দোকানে অপচয় হয়। আমাদের আরেকটি অভ্যাসে ভীষণ অবাক হই-খাওয়ার টেবিলে হরেকরকমের সুস্বাদু খাবার পরিবেশিত হলে পেট ভরে যাওয়ার পরও চোখের ক্ষুধা সামলাতে না পেরে অনেকে প্লেটে খাবার তুলতেই থাকে। পরে খেতে না পেরে ওইসব খাবারের জায়গা হয় বনপ্লেটে। এফএও’র তথ্যমতে, উৎসবের দিনগুলোতে এ অপচয়ের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।

আমাদের খাদ্য বিলাসিতা থেকে সরে আসার চেষ্টা করতে হবে। ‘প্রয়োজন’কে সীমিত পর্যায়ে নিতে আসতে হবে। ব্যক্তি সতর্কতাও খাদ্য অপচয় রোধে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক পরিবারে সপ্তাহ বা মাসের বাজার একত্রে করা হয়; ফ্রিজবন্দি ওইসব শাকসবজি এক পর্যায়ে পচে বা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ফেলে দিতে হয়। একজন মানুষ বা একটি পরিবার প্রতিবেলায় যে খাবার অপচয় করে, সেটি হয়তো অনেক সময় ধর্তব্যের ভেতর আসে না। দুমুঠো ভাত, এক বাটি সবজি, শক্ত হয়ে যাওয়া দুটো রুটি ফেলে দেওয়া হচ্ছে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছাড়াই; কিন্তু বছর শেষে মাথাপিছু সে অপচয়ের পরিমাণ ১০০ কেজিতে গিয়ে ঠেকে। তাই প্রয়োজনের বেশি খাবার কেনা ও রান্না করা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

আমাদের সমাজে কিছুদিন আগেও খাবার গ্রহণে আভিজাত্য প্রকাশের এক অদ্ভুত রীতি চালু ছিল। কোনো অনুষ্ঠান বা দাওয়াতে কোমল পানীয়, চা, কফি বা কোনো কিছু খেতে দেওয়া হলে কিছুটা রেখে দেওয়া হতো। মনে করা হতো গ্লাস, বোতলের পুরো পানীয় বা প্লেটের পুরো খাবার খেয়ে নিলে অন্যরা হয়তো আনকালচারড বা গেঁয়ো ভাববে। তাই অনেক পরিবারে বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হতো ‘কোথাও বেড়াতে গেলে কোনো কিছু খেতে দিলে পুরোটা খেতে হয় না।’ এখন অবশ্য আমরা এ ধরনের সংস্কৃতি থেকে অনেকটাই সরে এসেছি।

বিশ্বে প্রতি বছর যে পরিমাণ খাবারের অপচয় হয়, তা উৎপাদনে ১৪০ কোটি হেক্টর জমি ব্যবহৃত হয়; যা বিশ্বের মোট কৃষি জমির ২৮ শতাংশ। এ বাড়তি খাবার উৎপাদনে প্রতিনিয়ত বনভূমিকে কৃষিজমিতে পরিণত করা হচ্ছে। এর ফলে পরিবেশ ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলমূল, শাকসবজি, মাছ-মাংস উৎপাদনে কীটনাশক, রাসায়নিক সার ব্যবহারে নদী-নালা, খাল-বিল, ফসলের খেত বিষময় হয়ে উঠছে। এতে মানুষসহ জীবজন্তু, পশুপাখি বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদনে জ্বালানির ব্যবহার গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর কার্বন নিঃসরণসহ পরিবেশ দূষণে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখে অপচয়কৃত খাবার আর এতে প্রতি বছর ৩৩০ কোটি টন কার্বনডাই অক্সসাইড বাতাসে ছড়াচ্ছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সুষ্ঠু যোগাযোগ ও বাজার ব্যবস্থা না থাকায় প্রত্যন্ত অঞ্চলের চাষিরা অনেক সময় শস্যের উৎপাদিত মূল্যই পায় না। এর ফলে তারা ফসল মাড়াইয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই পচে নষ্ট হয়। খাদ্যের এ অপচয় আরও অনেক ধরনের অপচয়কে তার সঙ্গী করে নেয়। এতে পানি, জ্বালানি, পরিবহণ, সময়; সর্বোপরি অর্থের অপচয় হয়, যা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে চরম নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করে। অপচয়কৃত খাদ্যের শেষ ঠিকানা হয় ভাগাড়। এতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনও ত্বরান্বিত করছে।

অপচয়ে রাজার ভাণ্ডারও ফুরিয়ে যায়। অপচয় প্রবণতা ত্যাগ করে দেশের সম্পদরক্ষায় নিজেদের নিয়োজিত রাখতে হবে। অপচয় রোধের মাধ্যমে সম্পদের পরিমাণ বাড়ানো যায়-এ ধারণা দেশের প্রতিটি মানুষের অন্তরে গেঁথে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ, অতিরিক্ত ভোগবিলাসিতা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। কোনো মত, প্রথা অথবা ধর্ম অপচয়কে সমর্থন করে না; বরং সব ধর্মেই মিতব্যয়িতাকে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। আমাদের পবিত্র কুরআনের ১৭নং সূরা-আল ইসরা’র ২৭নং আয়াতে বলা হয়েছে- ‘অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তো তার প্রতিপালকের প্রতি

না-শোকর।’ একজন মানুষ কতটুকু খাবে, কীভাবে খাবে তার গাইডলাইন ইসলাম দিয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে-তোমাদের পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে, এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূরণ কর এবং বাকি অংশ খালি রাখো; অথবা এমন পরিমাণে আহার কর, যেন খাওয়া শেষে তৎক্ষণাৎ সমপরিমাণ খাবার খেতে পারো। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানও ইসলামের এ ব্যাখ্যা পুরোপুরি সমর্থন করে। কিন্তু আমাদের অনেকের তো গলা পর্যন্ত আহার না করলে ক্ষুধাই মেটে না! বিশ্বে সচ্ছল ব্যক্তিরা বিভিন্ন ধরনের অসুখ-বিসুখে ভোগার অন্যতম কারণ হলো অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্য গ্রহণ।

সামান্য আন্তরিক হলে আমাদের বেঁচে যাওয়া খাবারে ক্ষুধার্ত অনেক মানুষের আহারের সংস্থান হয়ে যায়। ইসলামে বলা হয়েছে-তোমার প্রতিবেশী কেউ যদি অভুক্ত থাকে, তা হলে তার দায়দায়িত্ব তোমার ওপরেও বর্তায়। আমরা ক’জন বিষয়টি বিবেচনায় রাখি? বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেঁচে যাওয়া খাবার অনেকেই এখন এতিমখানায় পাঠিয়ে দেন; আবার অনেক সংস্থা গরিব-দুঃখীদের খাওয়ানোর জন্য এসব খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এ ভালো উদ্যোগগুলো আরও সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় আওতায় আনতে হবে। একটি পরিবার, একটি হোটেল-রেস্তোরাঁ বা একটি কমিউনিটি সেন্টারের বেঁচে যাওয়া খাবারে যদি একজন অভুক্তেরও ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবৃত্তি হয়, তাহলে সেটাই বা কম কী?

সালাহ্ উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী

snagari2012@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন