প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সাফল্যের চাবিকাঠি নয়
jugantor
প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সাফল্যের চাবিকাঠি নয়

  মাছুম বিল্লাহ  

১০ জুন ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোয় মানুষের মেধা পুরোপুরি বিকশিত হতে পারছে কি? অর্থাৎ যে ছেলে বা মেয়েটিকে আমরা শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেতে দেখি, তাকে কি আমরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সে রকম অবদান রাখতে দেখি?

জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যারা অবদান রেখে থাকেন, তাদের একাডেমিক জীবন খুব একটা উজ্জ্বল বা উল্লেখযোগ্য হতে দেখা যায় না। সমাজকে যারা নেতৃত্ব দেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা ক্লাসে পেছনের সারিতে বসতেন অথবা নিয়মিত ক্লাস করতেন না কিংবা ক্লাস থেকে কোনো এক সময় বহিষ্কৃত হয়েছেন।

আমরা বলে থাকি, যে ছেলে ক্লাসে কোনোদিন কথাই বলত না কিংবা কোনোদিন ঠিকমতো ক্লাস করেনি-আজ সে এতবড় শিল্পপতি কিংবা এতবড় বিজ্ঞানী কিংবা দুনিয়াজোড়া পরিচিত খেলোয়াড়। আসলে যার হওয়ার কথা ছিল খেলোয়াড়, আমরা তাকে ডাক্তার বানানোর কথা চিন্তা করে সেভাবে ক্লাস করিয়েছি, ক্লাসে মূল্যায়ন করেছি, যা তার মেধা পরিস্ফুটনের বিরুদ্ধে গেছে।

ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ সত্যজিৎ রায় ভালো স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করে অর্থনীতিতে স্নাতক হলেও প্রাতিষ্ঠানকি শিক্ষা তার গড়ে ওঠার পথে তেমন সহায়ক হয়েছে বলে তিনি কখনো মনে করেননি। শান্তিনিকেতনে কলাভবনের শিক্ষারও আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি তিনি ঘটাননি। তবে সেখানে কয়েকজন শিল্পী-শিক্ষকের সান্নিধ্য এবং দেশি-বিদেশি কয়েকজন বন্ধুর সাহচর্য তার জীবনে মূল্যবান অবদান রেখেছিল বলে মনে করতেন তিনি। ভারতীয় চিত্রকলা সম্পর্কে তার মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টির পাশাপাশি সংগীতচর্চার বিস্তার ঘটেছে এ পর্বে।

এ বাস্তবতায় বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বদলে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে। করোনা মহামারি এসে সেই ধারণায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। সারা বিশ্বেই এখন শিক্ষা ও সৃজনশীল শিক্ষার ধারণা বদলে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য পর্যায়ের চাকরির খাত আগামী ২০ বছরে ৪৭ শতাংশ সংকুচিত হবে যাবে।

ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট জানাচ্ছে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তির কর্মীরা যে কাজ করছে, তার প্রায় ৫০ শতাংশ কম্পিউটারাইজ্ড করে ফেলা সম্ভব; আর যদি তা করা হয় তাহলে এ খাতের কর্মীরা চাকরি হারাবে।

সমীক্ষা বলছে, ভবিষ্যতে চাকরির বাজার বা অর্থপূর্ণ উৎপাদনশীল কাজে মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল, কল্পনাশক্তি এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। উদ্ভাবনমূলক অর্থনীতিতে নতুন উদ্ভাবন ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে মানবীয় আবেগ ও কল্পনাশক্তি। ওই সমীক্ষায় আরও বলা হয়, এসব কারণে শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে হবে।

দুই দশক পরে যে সমস্যা বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে, তা মোকাবিলায় পড়াশোনার ধরন বদলানোর বিকল্প নেই। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বদলে উদ্ভাবনমূলক, সৃষ্টিশীল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে বেশকিছু ধারা গড়ে উঠেছে, যেগুলো কিছু দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ধারাগুলো মূলধারার অসংগতিগুলোকে তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত তিন দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গড়ে উঠেছে।

এখন সেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি স্তর রয়েছে- ক. স্কুল চয়েস : এ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কোন্ বিষয়ে পড়তে চায় তা নির্ধারণ করতে পারবে; খ. অলটারনেটিভ স্কুল : বিকল্প ধারার এ শিক্ষা পদ্ধতি নতুন জীবনদর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাদের পড়াশোনার ধরন, বিষয় নির্বাচন, শিক্ষার্থীকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, ভাবনার স্বাধীনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

যেটি প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিতে থাকে না। দেখা যাচ্ছে, এ পদ্ধতির লেখাপড়ায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব কম; গ. ব্যক্তিমালিকানাধীন; ঘ. হোম বেইজড এডুকেশন : এটি আমাদের দেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত।

এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই যে, শিশুদের মেধা বিকাশে মুখস্থবিদ্যার বাইরেও কিছু প্রয়োজন। আমাদের সাধারণ শিক্ষা পদ্ধতি তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও প্রচলিত পরীক্ষার ফল নিয়ে অভিভাবক ও সমাজ যতটা উদ্বিগ্ন, তারা ততটা উদ্বিগ্ন নয় তাদের সন্তানের মেধা কতটা বিকশিত হচ্ছে তা নিয়ে। মুখস্থবিদ্যা বা অন্যের তৈরি কোনো কিছুর হুবহু ব্যবহার বেশ গুরুত্বের সঙ্গে এখনো মূল্যায়ন করা হয়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি! যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল?’ তিনি ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না-বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।’ উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরি-বাকরি, সমাজে ও প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন-সবই নির্ভর করে প্রাপ্ত ফলের ওপর। তাই সবাই যেন উঠেপড়ে লেগে থাকে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের জন্য। কিন্তু এটি যে আখেরে সবসময় ভালো ফল দেয় না, তা আমরা কমই ভেবে দেখি।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এ দেশের শিল্প-কারখানার কর্মী চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের মোট বেকারের ৪৬ শতাংশ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বেকার তৈরি করছে বেশি। তাই দ্রুত এ ধারা থেকে বের হতে হবে। দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের চাহিদা জানাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জানতে হবে দেশের প্রয়োজন কী। যুগ ও দেশের চাহিদা সামনে রেখে এখনই শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার।

এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এটি বিচ্ছিন্নভাবে করলে খুব একটা লাভ হয় না। সময়ের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি করে রেখেছে বহুদিন ধরে।

জনশক্তি খাত থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, বর্তমানে তা আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ, কারিগরি জ্ঞান না থাকা স্বল্পশিক্ষিত কর্মীরা দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগরি জ্ঞান থাকা কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে।

জাপানে শিশুরা হেঁটে স্কুলে যায়। প্রায় প্রত্যেক অভিভাবকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি আছে; কিন্তু সেটি তারা সন্তানের সহপাঠীকে দেখাতে স্কুলে নিয়ে যায় না। জাপানে স্কুল হচ্ছে শিশুদের পরম আনন্দের জায়গা। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একত্রে বসে খাবার খায়। শিশুরা বিদ্যালয়ে কেউ অকৃতকার্য হয় না, কিন্তু শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অকৃতকার্য হন। সুন্দরের পূজা করা আর নৈতিকতার শিক্ষা জাপানের শিক্ষার মৌলিক দিক।

ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষা, যার কারণে তাদের মধ্যে মনের মিল আছে, একে অপরের প্রতি ঘৃণা নেই। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, স্বাধীন চিন্তা ও আত্মনির্ভরশীলতা থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতিও তারা দায়বদ্ধ। বিনয়-শিষ্টাচার, সৌন্দর্যবোধ ও নৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে আত্মিক বিকাশ লাভ জাপানে শিক্ষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আমাদেরও এদিকে অবিলম্বে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অনেক সময় চলে গেছে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘অন্য বই পড়তে গেলে অনেক সময় অনেক বাবা-মা বলেন, ক্লাসের পড়া নষ্ট হচ্ছে। এটি করবেন না। আপনার সন্তানকে ক্লাসের বই ছাড়াও যত বই পড়তে পারে পড়তে দিন।

সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞান হোক, ভ্রমণ কাহিনি, জীবনী, আইসিটির বই পড়তে দিন।’ পৃথিবীতে যত মানুষ সফল হয়েছে, তাদের সবারই যে ডিগ্রি আছে তা কিন্তু নয়। তবে তাদের অনেকেই বই পড়েছেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও অনেক বই পড়েছেন। তাই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে আমাদের অনেক বই পড়তে হবে। শুধু পাঠ্যবই নয়, নানা বিষয়ের বই। চমৎকার কথা বলেছেন মাননীয়া মন্ত্রী।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, যারা এখন প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করছে, তাদের যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বয়স হবে, সে সময়কার কাজ বা বৃত্তি অথবা পেশা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, যার সম্পর্কে এখন আমাদের কোনো ধারণাই নেই। তার মানে হচ্ছে, আর বিলম্ব না করে ওই সময়ের উপযোগী শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের দিতে হবে; তা না হলে তারা আন্তর্জাতিক দৌড় থেকে ছিটকে পড়বে।

মাছুম বিল্লাহ : সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও বাউবি শিক্ষক

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা সাফল্যের চাবিকাঠি নয়

 মাছুম বিল্লাহ 
১০ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

প্রচলিত শিক্ষা কাঠামোয় মানুষের মেধা পুরোপুরি বিকশিত হতে পারছে কি? অর্থাৎ যে ছেলে বা মেয়েটিকে আমরা শ্রেণিতে প্রথম স্থান পেতে দেখি, তাকে কি আমরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সে রকম অবদান রাখতে দেখি?

জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যারা অবদান রেখে থাকেন, তাদের একাডেমিক জীবন খুব একটা উজ্জ্বল বা উল্লেখযোগ্য হতে দেখা যায় না। সমাজকে যারা নেতৃত্ব দেন, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তারা ক্লাসে পেছনের সারিতে বসতেন অথবা নিয়মিত ক্লাস করতেন না কিংবা ক্লাস থেকে কোনো এক সময় বহিষ্কৃত হয়েছেন।

আমরা বলে থাকি, যে ছেলে ক্লাসে কোনোদিন কথাই বলত না কিংবা কোনোদিন ঠিকমতো ক্লাস করেনি-আজ সে এতবড় শিল্পপতি কিংবা এতবড় বিজ্ঞানী কিংবা দুনিয়াজোড়া পরিচিত খেলোয়াড়। আসলে যার হওয়ার কথা ছিল খেলোয়াড়, আমরা তাকে ডাক্তার বানানোর কথা চিন্তা করে সেভাবে ক্লাস করিয়েছি, ক্লাসে মূল্যায়ন করেছি, যা তার মেধা পরিস্ফুটনের বিরুদ্ধে গেছে।

ভারতীয় তথা বাংলা চলচ্চিত্রের প্রবাদপুরুষ সত্যজিৎ রায় ভালো স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করে অর্থনীতিতে স্নাতক হলেও প্রাতিষ্ঠানকি শিক্ষা তার গড়ে ওঠার পথে তেমন সহায়ক হয়েছে বলে তিনি কখনো মনে করেননি। শান্তিনিকেতনে কলাভবনের শিক্ষারও আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি তিনি ঘটাননি। তবে সেখানে কয়েকজন শিল্পী-শিক্ষকের সান্নিধ্য এবং দেশি-বিদেশি কয়েকজন বন্ধুর সাহচর্য তার জীবনে মূল্যবান অবদান রেখেছিল বলে মনে করতেন তিনি। ভারতীয় চিত্রকলা সম্পর্কে তার মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টির পাশাপাশি সংগীতচর্চার বিস্তার ঘটেছে এ পর্বে।

এ বাস্তবতায় বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বদলে মেধাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি গুরুত্ব বাড়ছে। করোনা মহামারি এসে সেই ধারণায় নতুন মাত্রা দিয়েছে। সারা বিশ্বেই এখন শিক্ষা ও সৃজনশীল শিক্ষার ধারণা বদলে যাচ্ছে। ২০১৭ সালে প্রকাশিত অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক সমীক্ষা বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য পর্যায়ের চাকরির খাত আগামী ২০ বছরে ৪৭ শতাংশ সংকুচিত হবে যাবে।

ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাককিনসে গ্লোবাল ইনস্টিটিউট জানাচ্ছে, আজকের তথ্যপ্রযুক্তির কর্মীরা যে কাজ করছে, তার প্রায় ৫০ শতাংশ কম্পিউটারাইজ্ড করে ফেলা সম্ভব; আর যদি তা করা হয় তাহলে এ খাতের কর্মীরা চাকরি হারাবে।

সমীক্ষা বলছে, ভবিষ্যতে চাকরির বাজার বা অর্থপূর্ণ উৎপাদনশীল কাজে মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল, কল্পনাশক্তি এবং আবেগীয় বুদ্ধিমত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে। উদ্ভাবনমূলক অর্থনীতিতে নতুন উদ্ভাবন ও সম্ভাবনার ক্ষেত্রে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে মানবীয় আবেগ ও কল্পনাশক্তি। ওই সমীক্ষায় আরও বলা হয়, এসব কারণে শিক্ষাব্যবস্থাকে বদলে ফেলতে হবে।

দুই দশক পরে যে সমস্যা বিশ্বজুড়ে দেখা দেবে, তা মোকাবিলায় পড়াশোনার ধরন বদলানোর বিকল্প নেই। মুখস্থবিদ্যা, পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বদলে উদ্ভাবনমূলক, সৃষ্টিশীল শিক্ষাব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে বেশকিছু ধারা গড়ে উঠেছে, যেগুলো কিছু দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ধারাগুলো মূলধারার অসংগতিগুলোকে তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত তিন দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গড়ে উঠেছে।

এখন সেখানে শিক্ষাব্যবস্থায় চারটি স্তর রয়েছে- ক. স্কুল চয়েস : এ পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কোন্ বিষয়ে পড়তে চায় তা নির্ধারণ করতে পারবে; খ. অলটারনেটিভ স্কুল : বিকল্প ধারার এ শিক্ষা পদ্ধতি নতুন জীবনদর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তাদের পড়াশোনার ধরন, বিষয় নির্বাচন, শিক্ষার্থীকে তার নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন, ভাবনার স্বাধীনতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।

যেটি প্রথাগত শিক্ষা পদ্ধতিতে থাকে না। দেখা যাচ্ছে, এ পদ্ধতির লেখাপড়ায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার খুব কম; গ. ব্যক্তিমালিকানাধীন; ঘ. হোম বেইজড এডুকেশন : এটি আমাদের দেশের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত।

এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই যে, শিশুদের মেধা বিকাশে মুখস্থবিদ্যার বাইরেও কিছু প্রয়োজন। আমাদের সাধারণ শিক্ষা পদ্ধতি তা করতে ব্যর্থ হচ্ছে। একটি শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও প্রচলিত পরীক্ষার ফল নিয়ে অভিভাবক ও সমাজ যতটা উদ্বিগ্ন, তারা ততটা উদ্বিগ্ন নয় তাদের সন্তানের মেধা কতটা বিকশিত হচ্ছে তা নিয়ে। মুখস্থবিদ্যা বা অন্যের তৈরি কোনো কিছুর হুবহু ব্যবহার বেশ গুরুত্বের সঙ্গে এখনো মূল্যায়ন করা হয়।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষার বাহন’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘মুখস্থ করিয়া পাস করাই তো চৌর্যবৃত্তি! যে ছেলে পরীক্ষাশালায় গোপনে বই লইয়া যায় তাকে খেদাইয়া দেওয়া হয়; আর যে ছেলে তার চেয়েও লুকাইয়া লয়, অর্থাৎ চাদরের মধ্যে না লইয়া মগজের মধ্যে লইয়া যায়, সেই বা কম কী করিল?’ তিনি ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘অত্যাবশ্যক শিক্ষার সহিত স্বাধীন পাঠ না মিশাইলে ছেলে ভালো করিয়া মানুষ হইতে পারে না-বয়ঃপ্রাপ্ত হইলেও বুদ্ধিবৃত্তি সম্বন্ধে সে অনেকটা পরিমাণে বালক থাকিয়াই যায়।’ উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, চাকরি-বাকরি, সমাজে ও প্রতিষ্ঠানে মূল্যায়ন-সবই নির্ভর করে প্রাপ্ত ফলের ওপর। তাই সবাই যেন উঠেপড়ে লেগে থাকে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের জন্য। কিন্তু এটি যে আখেরে সবসময় ভালো ফল দেয় না, তা আমরা কমই ভেবে দেখি।

আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এ দেশের শিল্প-কারখানার কর্মী চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। দেশের মোট বেকারের ৪৬ শতাংশ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা বেকার তৈরি করছে বেশি। তাই দ্রুত এ ধারা থেকে বের হতে হবে। দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের চাহিদা জানাতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জানতে হবে দেশের প্রয়োজন কী। যুগ ও দেশের চাহিদা সামনে রেখে এখনই শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো দরকার।

এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়, উদ্যোক্তা ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। এটি বিচ্ছিন্নভাবে করলে খুব একটা লাভ হয় না। সময়ের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ফলে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ আকর্ষণে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে। বিদেশে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো রেমিটেন্স দেশের অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব সৃষ্টি করে রেখেছে বহুদিন ধরে।

জনশক্তি খাত থেকে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, বর্তমানে তা আরও কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের অদক্ষ, কারিগরি জ্ঞান না থাকা স্বল্পশিক্ষিত কর্মীরা দক্ষ ও অভিজ্ঞ কারিগরি জ্ঞান থাকা কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে।

জাপানে শিশুরা হেঁটে স্কুলে যায়। প্রায় প্রত্যেক অভিভাবকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি আছে; কিন্তু সেটি তারা সন্তানের সহপাঠীকে দেখাতে স্কুলে নিয়ে যায় না। জাপানে স্কুল হচ্ছে শিশুদের পরম আনন্দের জায়গা। সেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একত্রে বসে খাবার খায়। শিশুরা বিদ্যালয়ে কেউ অকৃতকার্য হয় না, কিন্তু শিক্ষক দায়িত্ব পালন করতে না পারলে অকৃতকার্য হন। সুন্দরের পূজা করা আর নৈতিকতার শিক্ষা জাপানের শিক্ষার মৌলিক দিক।

ধর্মনিরপেক্ষ নৈতিক শিক্ষা, যার কারণে তাদের মধ্যে মনের মিল আছে, একে অপরের প্রতি ঘৃণা নেই। অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, স্বাধীন চিন্তা ও আত্মনির্ভরশীলতা থেকে শুরু করে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রতিও তারা দায়বদ্ধ। বিনয়-শিষ্টাচার, সৌন্দর্যবোধ ও নৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে আত্মিক বিকাশ লাভ জাপানে শিক্ষার মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

আমাদেরও এদিকে অবিলম্বে দৃষ্টি দেওয়া উচিত। অনেক সময় চলে গেছে। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘অন্য বই পড়তে গেলে অনেক সময় অনেক বাবা-মা বলেন, ক্লাসের পড়া নষ্ট হচ্ছে। এটি করবেন না। আপনার সন্তানকে ক্লাসের বই ছাড়াও যত বই পড়তে পারে পড়তে দিন।

সাহিত্য বা জ্ঞান-বিজ্ঞান হোক, ভ্রমণ কাহিনি, জীবনী, আইসিটির বই পড়তে দিন।’ পৃথিবীতে যত মানুষ সফল হয়েছে, তাদের সবারই যে ডিগ্রি আছে তা কিন্তু নয়। তবে তাদের অনেকেই বই পড়েছেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও অনেক বই পড়েছেন। তাই প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হলে আমাদের অনেক বই পড়তে হবে। শুধু পাঠ্যবই নয়, নানা বিষয়ের বই। চমৎকার কথা বলেছেন মাননীয়া মন্ত্রী।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী, যারা এখন প্রাথমিক শিক্ষাক্রমে প্রবেশ করছে, তাদের যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের বয়স হবে, সে সময়কার কাজ বা বৃত্তি অথবা পেশা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের, যার সম্পর্কে এখন আমাদের কোনো ধারণাই নেই। তার মানে হচ্ছে, আর বিলম্ব না করে ওই সময়ের উপযোগী শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের দিতে হবে; তা না হলে তারা আন্তর্জাতিক দৌড় থেকে ছিটকে পড়বে।

মাছুম বিল্লাহ : সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ও বাউবি শিক্ষক

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন