Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক জীবন গড়ে উঠেছিল যেভাবে

Advertisement

Icon

ড. এসএম এক্রাম উল্যাহ

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক জীবন গড়ে উঠেছিল যেভাবে

Advertisement

আগস্ট বাঙালির জীবনে শোকের মাস। সার্বিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ব্যথাতুর মনে ১৫ আগস্ট শোক দিবস হিসাবে পালন করে।

অন্যদিকে পাকিস্তানের দালালচক্র ও মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ শক্তি এখনো নানাভাবে দেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এ ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে জাতি নিষ্কৃতি চায়। এ প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক গঠন ও মনন এবং বাঙালির করণীয় নিয়ে আলোকপাত করা দরকার।

শৈশব থেকেই বঙ্গবন্ধুর মধ্যে অসাধারণ গুণ ও ইচ্ছাশক্তি এবং রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ লক্ষ করা যায়। এ দৃঢ়চেতা ও সাহসী নেতা রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছেন। ১৯৩৭ সালে তিনি তার গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ মাস্টার প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সেবা সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন।

নিজ শিক্ষকের মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধু এ সমিতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং অসহায়-দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষের মনোজগতে প্রবেশ করেন। নিজেকে ও বাঙালি কিশোর-তরুণদের উজ্জীবিত করতে, কুসংস্কার দূর করতে এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে তিনি গুরুসদয় প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রতচারী’ আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন।

অসংখ্য গুণের অধিকারী বঙ্গবন্ধু নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলার ও বিশ্ব-রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট, জওহরলাল নেহেরু, ইন্দিরা গান্ধীসহ উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবিদের মতো উত্তরাধিকার সূত্রে তার রাজনীতিতে আগমন না ঘটলেও রাজনীতি করার ক্ষেত্রে বাবা লুৎফর রহমান ও প্রিয় সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুননেছার প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন উৎসাহ ছিল। বাবার এ উৎসাহের কথা তিনি নিজেই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে স্বীকার করেছেন। তার বাবা তাকে বলেছিলেন, ‘‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা... একটা কথা মনে রেখ, ‘Sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা ন’’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)। বাবার এ আদর্শ ও নীতিবোধের শিক্ষা বঙ্গবন্ধু জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অনুপ্রেরণা হিসাবে নিয়েছেন। বস্তুত, বঙ্গবন্ধু উত্তরাধিকার সূত্রে নেতৃত্ব লাভ করেননি, নেতা হয়েই জন্মেছেন।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায় তিনি কীভাবে রাজনৈতিক বিশ্বাস, চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা, মূল্যবোধ, বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে রাজনৈতিক দীক্ষা নিয়েছেন। শৈশবে চোখের চিকিৎসা-পরবর্তী সময় থেকেই বঙ্গবন্ধু সমাজ ও রাজনীতি, রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনা, সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদবিরোধী চেতনা, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত চিন্তা-চেতনা, সেক্যুলার ধারণা এবং স্বাধীনতার চেতনা ও আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা লাভ করেন মাদারীপুরের পূর্ণদাসসহ অনেক স্বদেশি আন্দোলনকারী এবং স্বদেশি আন্দোলনের প্রবক্তা নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর কাছে থেকে।

নেতাজির ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক স্লোগান হিসাবে ‘জয় বাংলা’কে বেছে নেন। নেতাজির শিক্ষা মনেপ্রাণে গ্রহণ ও অনুসরণ করেন। তার দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক দুষ্টচক্রের ডামাডোলের মধ্যে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের নির্দেশনা দেন। ১৯৩৩ সালে নেতাজি একইভাবে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। নেতাজির পাশাপাশি তার অগ্রজ শরৎচন্দ্র বসুর দ্বারাও প্রভাবিত হন বঙ্গবন্ধু।

১৯৩৮ সালে শেরেবাংলা একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে আসেন বঙ্গবন্ধু। সেই থেকে তাদের দুজনের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দীক্ষালাভ শুরু হয় এবং তাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দল গঠন, বিকাশ-পরিচর্যা, নেতৃত্ব সৃষ্টি ও একনিষ্ঠ কর্মীবাহিনী গঠন, জনগণের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি এবং তা অব্যাহত রাখা ইত্যাদি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেরেবাংলার কাছ থেকে দীক্ষা লাভ করেন। কারণ উপর্যুক্ত বিষয়গুলোতে শেরেবাংলার ছিল বিস্ময়কর ক্ষমতা ও দক্ষতা। তার উপস্থাপিত লাহোর প্রস্তাবও বঙ্গবন্ধুকে অনুপ্রাণিত করেছিল। কারণ বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিলেন, লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। পরে ১৯৬৬ সালে তিনি একই রকমভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্যতম মাইলফলক হিসাবে বিবেচিত ‘ছয় দফা’ উপস্থাপন করেন।

নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রজ্ঞাবান ও উদার গণতান্ত্রিক নেতা সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ও উন্নয়ন বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন তার Protégé। পুঁজিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আদর্শ, পশ্চিমা ধাঁচের সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, ব্রিটিশ মানবতাবাদী উদারনৈতিক ঐতিহ্য, সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ, সেক্যুলারিজম ইত্যাদি বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শিক্ষালাভ করেন সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে। নিজের মানসিক ও রাজনৈতিক গঠন, অভ্যাস, পছন্দ-অপছন্দ এবং নিজ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে এবং গুণাবলি অর্জনে বঙ্গবন্ধু তার ভাবগুরু সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষা কাজে লাগিয়েছেন।

সোহরাওয়ার্দীর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু আবুল হাশিমের কাছ থেকে গণমুখী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তাধারার শিক্ষা এবং মওলানা ভাসানীর কাছ থেকে অসহায়, দারিদ্র্যপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত জনগণের জন্য কল্যাণমুখী রাজনীতি ও রাজনৈতিক ময়দানে তাৎক্ষণিক কৌশল অবলম্বনের শিক্ষা গ্রহণ করেন; বাঙালি জাতির মঙ্গলার্থে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত হন অসহায়, শোষিত ও বঞ্চিত গণমানুষের ত্যাগী নেতা হিসাবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও মনন গঠনের ক্ষেত্রে তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, ফকির মজনু শাহ, প্রফুল্ল চাকী, প্রীতিলতা, সূর্যসেন, বাঘা যতীন, নুরল দিন, চারণ কবি মুকুন্দ দাস প্রমুখ কার্যকর ও অর্থবহ ভূমিকা পালন করেছেন।

উপর্যুক্ত রাজনৈতিক গুরু ও অগ্রজদের আদর্শ ও দীক্ষা গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু হয়েছিলেন অনন্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সবার নেতৃত্বগুণের সমন্বয়ে তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল আলোকিত অপূর্ব নেতৃত্বগুণ। অগ্রজদের অতিক্রম করে তিনি বাংলার রাজনীতিতে এক অনন্য উচ্চতায় নিজেকে আসীন করেছিলেন; হয়েছিলেন বাংলার আকাশে সমুজ্জ্বল নক্ষত্র।

তিনি ছিলেন সার্থক দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি বাংলার সর্বস্তরের জনগণকে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের চেতনায় জাগ্রত করে একটি স্বাধীন বাঙালি জনসমাজ তথা জাতি এবং বাংলাদেশ নামক স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি করেন। এ কারণেই তিনি ইতিহাসে অন্যদের থেকে আলাদা এবং সহস্রাব্দের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি।

বাংলার ইতিহাস শোষণ-বঞ্চনা-নির্যাতন, হাসি-কান্না, অবিরত সংগ্রাম, রক্ত ও জয়ের ইতিহাস। এখানে শোষক শ্রেণি, বিশ্বাসঘাতক, পরশ্রীকাতরদের বারবার মোকাবিলা করতে হয়েছে। আদর্শ ও নীতিহীনদের আনাগোনা এখানে সবসময়ই ছিল, আজও বিদ্যমান। এখনো নীতি-আদর্শহীন শোষক ও মীরজাফররা নানাভাবে দল ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করার, এমনকি উৎখাতের চেষ্টা করছে। এসব দুষ্টচক্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অন্যায়-অপকর্ম করে স্বার্থ উদ্ধার, দলীয় বিভেদ সৃষ্টি, ধর্মের দোহাই ও ধর্মকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ইত্যাদি অপকর্ম করছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একার পক্ষে সম্ভব নয় এ অবস্থা থেকে দেশকে উদ্ধার করা। বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের একনিষ্ঠভাবে এ অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে কাজ করতে হবে। ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু নীতি ও আদর্শের রাজনীতির যে স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে হবে প্রকৃত নেতাকর্মীদের।

হটাতে হবে অশুভ শক্তিকে। জনগণকে দেখাতে হবে বঙ্গবন্ধুর দেখানো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি ও স্বাধীনতার পথ। আমাদের হাঁটতে হবে সেই পথেই।

ড. এসএম এক্রাম উল্যাহ : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

Advertisement

বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক জীবন.

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম