তবুও একটা আইন হোক
jugantor
তবুও একটা আইন হোক

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে এযাবতকালে যতগুলো নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, তার সবকটিই ছিল অসাংবিধানিক। ঠিক একই কারণে সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। কথাগুলো অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে কি তাই?

এ দেশে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে। এখন শুধু যে বিরোধী দলের দিক থেকেই কথাগুলো বলা হয়, তা না; সরকারদলীয় জোটের অনেক সদস্যই এমন কথা বলতে শুরু করেছেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে এগিয়ে আসছে আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই আলোচনায় এসেছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথাও।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। এরপর দায়িত্ব নেবে নতুন নির্বাচন কমিশন এবং তাদের অধীনেই হবে আগামী সংসদ নির্বাচনটি। এ নতুন কমিশনটি কীভাবে গঠিত হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ আলোচনার সূত্র ধরেই এসেছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে আইনের প্রশ্ন।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য এসেছে। পত্রিকাটিকে আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। যে কারণে রাষ্ট্রপতি সবার ঐকমত্যে একটি ব্যবস্থা চালু করেছেন।

তার জানা মতে, এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থান নেই। তিনি বলেছেন, সংবিধানে যেহেতু বলা আছে, তাই এ বিষয়ে একটি আইন করার ব্যাপারে তারা যে চিন্তা ভাবনা করছেন না, তা নয়। কিন্তু এখন যেটি আছে, সেখানে আইনের কমতি নেই। এবার কোন পদ্ধতিতে ইসি গঠন করা হবে, তা মহামান্য রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।

আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, সার্চ কমিটি গঠনের বিদ্যমান প্রক্রিয়াটিও একটা আইন। এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না। আইনে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, সেভাবেই হবে। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করবেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। এখানে বেআইনি কিছু কী হচ্ছে? এটা তো আইনের মাধ্যমেই হচ্ছে। তিনি কি ঠিক বললেন?

নির্বাচন কমিশনের আইনের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ নিয়ে কয়েকটি কথা বলে রাখা ভালো। দীর্ঘকাল থেকে আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত আইন করার জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল। সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগে ৯৫(২) অনুচ্ছেদে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, যার তৃতীয়টি অর্থাৎ (গ) হচ্ছে ‘সুপ্রিমকোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা।’ সুতরাং সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য একটি আইন থাকা উচিত; কিন্তু সেটি না থাকলে সংবিধানের ব্যত্যয় হয় না।

আসা যাক, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রশ্নে। একটু বুঝে নেওয়া যাক, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সংবিধান কী বলছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং ওই বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এখানে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের দুটি বাক্য আবার একটু দেখে নেওয়া যাক-‘সার্চ কমিটি গঠনের বিদ্যমান প্রক্রিয়াটিও একটা আইন। এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না।’

নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি কি আদৌ কোনো আইন? মোটেও না; এমন কোনো আইনের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। তিনি যখন বলছেন, এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না-এ কথাটাও গ্রহণ করা সম্ভব নয়; কারণ আইনে যদি না থাকে, তাহলে বেআইনি কিছু হওয়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে? অথচ আইনমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, ‘সংবিধানে যেহেতু বলা আছে, তাই এ বিষয়ে একটি আইন করার ব্যাপারে তারা যে চিন্তাভাবনা করছেন না, তা নয়।’

আইনমন্ত্রী একজন বিজ্ঞ আইনজীবী। একটি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, হতে হয়; সেটি তিনি সাধারণ যে কোনো মানুষের চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানেন। কোনো বিষয়ে সংবিধান যখন স্পষ্টভাবে আইন প্রণয়নকেই একমাত্র অপশন বলে রায় দেয়, তখন সেখানে আইন ছাড়া কোনো কিছু করায় যতই ঐকমত্যের ব্যাপার থাকুক না কেন; সেটি আইনসিদ্ধ নয়, অসাংবিধানিক। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোকেই আঘাত করে।

একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইনের ভিত্তিতে এবং আইনগুলোর ব্যাপারে মৌলিক নির্দেশনা দেয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন ও সংবিধান। এ জন্যই দেখা যাবে, করোনার মধ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় দুই মাসের মধ্যে অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সেই অধিবেশনগুলো নামকাওয়াস্তে দুই-তিন দিন করে চললেও প্রতিটি অধিবেশনে বেশ কয়েকটি আইন পাশ করা হয়। দেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপারে একের পর এক আইন তৈরি হয় দেশের সংসদে।

এটাই হওয়ার কথা। খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য একটা আইন করলে সমস্যা কোথায়? কেন মন্ত্রী একটি আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেও এ আইন ক্ষমতায় থাকাকালীন করেননি? এমন কী এখনো যখন সব মহল থেকে আইন প্রণয়ন নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তখনো কেন সরকার আইনটি প্রণয়ন করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে না? নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার আগে সব স্টেকহোল্ডারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আইন প্রণয়নের জন্য এখনো যথেষ্ট সময় আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটা আইন প্রণয়ন করলেই কি একটা দক্ষ-নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাবে? উত্তর হচ্ছে, না। যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হলে এ দেশে আইন কেন, সংবিধানকেও পাশ কাটিয়ে চলা যায়। তর্কের খাতিরে তবুও ধরে নেওয়া যাক, আইনের অধীনে একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠিত হলো। এর পরের প্রশ্ন-এতেই কি একটা অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গ্যারান্টি দেওয়া যাবে?

সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, নির্বাচন তো করে নির্বাচন কমিশন; সরকার নয়। নির্বাচন কমিশন তো স্বাধীন, তাই নির্বাচনি সরকারটি কেমন, সেটি কোনো ব্যাপার নয়। বিষয়টা মোটেও এতটা সরল নয়। আমরা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মতো এত বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করতে হয়। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন নির্বাহী বিভাগের ওপরে কতটুকু ক্ষমতার চর্চা করতে পারবে, সেটি নিয়ে সংবিধানের ১২০ ও ১২৬ অনুচ্ছেদ দুটি ভীষণ অস্পষ্ট। ফলে

একটা সরকার যদি না চায়, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক, তাহলে কোনোভাবেই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা এ দেশে সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের সামনে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে সরকার। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গঠিত শামসুল হুদা কমিশন আওয়ামী লীগের সময়ে কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে সরকারের দিক থেকে নানা অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছিলেন। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশে আদৌ একটা সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হওয়া সম্ভব কিনা, সেটি প্রায় শতভাগ নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের সদিচ্ছার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা এ সদিচ্ছা কখনোই দেখিনি।

কিন্তু সবকিছুর পরও কথা থেকে যায়। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের সংসদে শত শত আইন পাশ হয়েছে। হচ্ছে এখনো। কিন্তু একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন এখনো করা হয়নি। এ আইনের অনুপস্থিতি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। আমি তো আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু বুঝি, তাতে মনে হয়-হাইকোর্টে একটি রিট করলেই জানা যাবে, বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন কমিশন আদতে অবৈধ ছিল।

আইনমন্ত্রী আসলে পাশ কাটাতে চাইছেন। সরকার আগের মতো গতানুগতিকতার পথেই হাঁটতে চাইছে। কিন্তু এ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে আমরা সেটি মেনে নিতে পারি না। নির্বাচন কমিশন একা একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, মানি সেটি। কিন্তু তবুও একটা আইন প্রণীত হোক আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন করার আগেই।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

তবুও একটা আইন হোক

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে এযাবতকালে যতগুলো নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, তার সবকটিই ছিল অসাংবিধানিক। ঠিক একই কারণে সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলোর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায়। কথাগুলো অতিশয়োক্তি মনে হতে পারে; কিন্তু আসলে কি তাই?

এ দেশে অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে। এখন শুধু যে বিরোধী দলের দিক থেকেই কথাগুলো বলা হয়, তা না; সরকারদলীয় জোটের অনেক সদস্যই এমন কথা বলতে শুরু করেছেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে এগিয়ে আসছে আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তাই আলোচনায় এসেছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের কথাও।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ফেব্রুয়ারিতে। এরপর দায়িত্ব নেবে নতুন নির্বাচন কমিশন এবং তাদের অধীনেই হবে আগামী সংসদ নির্বাচনটি। এ নতুন কমিশনটি কীভাবে গঠিত হবে, সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ আলোচনার সূত্র ধরেই এসেছে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে আইনের প্রশ্ন।

একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে আইনমন্ত্রীর বক্তব্য এসেছে। পত্রিকাটিকে আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচন কমিশন গঠনের দায়িত্ব দিয়েছে। যে কারণে রাষ্ট্রপতি সবার ঐকমত্যে একটি ব্যবস্থা চালু করেছেন।

তার জানা মতে, এ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থান নেই। তিনি বলেছেন, সংবিধানে যেহেতু বলা আছে, তাই এ বিষয়ে একটি আইন করার ব্যাপারে তারা যে চিন্তা ভাবনা করছেন না, তা নয়। কিন্তু এখন যেটি আছে, সেখানে আইনের কমতি নেই। এবার কোন পদ্ধতিতে ইসি গঠন করা হবে, তা মহামান্য রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার।

আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, সার্চ কমিটি গঠনের বিদ্যমান প্রক্রিয়াটিও একটা আইন। এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না। আইনে যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে, সেভাবেই হবে। সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। তারা রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করবেন। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। এখানে বেআইনি কিছু কী হচ্ছে? এটা তো আইনের মাধ্যমেই হচ্ছে। তিনি কি ঠিক বললেন?

নির্বাচন কমিশনের আইনের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগ নিয়ে কয়েকটি কথা বলে রাখা ভালো। দীর্ঘকাল থেকে আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত আইন করার জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা হয়েছিল। সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগে ৯৫(২) অনুচ্ছেদে সুপ্রিমকোর্টের বিচারক হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, যার তৃতীয়টি অর্থাৎ (গ) হচ্ছে ‘সুপ্রিমকোর্টের বিচারক পদে নিয়োগ লাভের জন্য আইনের দ্বারা নির্ধারিত যোগ্যতা।’ সুতরাং সুপ্রিমকোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য একটি আইন থাকা উচিত; কিন্তু সেটি না থাকলে সংবিধানের ব্যত্যয় হয় না।

আসা যাক, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রশ্নে। একটু বুঝে নেওয়া যাক, এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সংবিধান কী বলছে। নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ বলছে, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং ওই বিষয়ে প্রণীত কোনো আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ অর্থাৎ নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য আইন তৈরি ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। এখানে আইনমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের দুটি বাক্য আবার একটু দেখে নেওয়া যাক-‘সার্চ কমিটি গঠনের বিদ্যমান প্রক্রিয়াটিও একটা আইন। এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না।’

নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য সার্চ কমিটি কি আদৌ কোনো আইন? মোটেও না; এমন কোনো আইনের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। তিনি যখন বলছেন, এখানে বেআইনি কিছুই হচ্ছে না-এ কথাটাও গ্রহণ করা সম্ভব নয়; কারণ আইনে যদি না থাকে, তাহলে বেআইনি কিছু হওয়ার প্রশ্ন আসে কীভাবে? অথচ আইনমন্ত্রী এর আগে বলেছিলেন, ‘সংবিধানে যেহেতু বলা আছে, তাই এ বিষয়ে একটি আইন করার ব্যাপারে তারা যে চিন্তাভাবনা করছেন না, তা নয়।’

আইনমন্ত্রী একজন বিজ্ঞ আইনজীবী। একটি রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হয়, হতে হয়; সেটি তিনি সাধারণ যে কোনো মানুষের চেয়ে অনেক ভালোভাবে জানেন। কোনো বিষয়ে সংবিধান যখন স্পষ্টভাবে আইন প্রণয়নকেই একমাত্র অপশন বলে রায় দেয়, তখন সেখানে আইন ছাড়া কোনো কিছু করায় যতই ঐকমত্যের ব্যাপার থাকুক না কেন; সেটি আইনসিদ্ধ নয়, অসাংবিধানিক। এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোকেই আঘাত করে।

একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় আইনের ভিত্তিতে এবং আইনগুলোর ব্যাপারে মৌলিক নির্দেশনা দেয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন ও সংবিধান। এ জন্যই দেখা যাবে, করোনার মধ্যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় দুই মাসের মধ্যে অধিবেশন ডাকা হয়েছে। সেই অধিবেশনগুলো নামকাওয়াস্তে দুই-তিন দিন করে চললেও প্রতিটি অধিবেশনে বেশ কয়েকটি আইন পাশ করা হয়। দেশের প্রতিটি খুঁটিনাটি ব্যাপারে একের পর এক আইন তৈরি হয় দেশের সংসদে।

এটাই হওয়ার কথা। খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন নিয়োগের জন্য একটা আইন করলে সমস্যা কোথায়? কেন মন্ত্রী একটি আইনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেও এ আইন ক্ষমতায় থাকাকালীন করেননি? এমন কী এখনো যখন সব মহল থেকে আইন প্রণয়ন নিয়ে এত কথা হচ্ছে, তখনো কেন সরকার আইনটি প্রণয়ন করতে পদক্ষেপ নিচ্ছে না? নতুন কমিশন গঠিত হওয়ার আগে সব স্টেকহোল্ডারের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে আইন প্রণয়নের জন্য এখনো যথেষ্ট সময় আছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটা আইন প্রণয়ন করলেই কি একটা দক্ষ-নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করা যাবে? উত্তর হচ্ছে, না। যথেষ্ট ক্ষমতার অধিকারী হলে এ দেশে আইন কেন, সংবিধানকেও পাশ কাটিয়ে চলা যায়। তর্কের খাতিরে তবুও ধরে নেওয়া যাক, আইনের অধীনে একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠিত হলো। এর পরের প্রশ্ন-এতেই কি একটা অবাধ, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের গ্যারান্টি দেওয়া যাবে?

সরকারি দলের পক্ষ থেকে প্রায়ই বলা হয়, নির্বাচন তো করে নির্বাচন কমিশন; সরকার নয়। নির্বাচন কমিশন তো স্বাধীন, তাই নির্বাচনি সরকারটি কেমন, সেটি কোনো ব্যাপার নয়। বিষয়টা মোটেও এতটা সরল নয়। আমরা খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝতে পারি, নির্বাচন প্রক্রিয়ার মতো এত বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে ব্যবহার করতে হয়। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনকালীন নির্বাহী বিভাগের ওপরে কতটুকু ক্ষমতার চর্চা করতে পারবে, সেটি নিয়ে সংবিধানের ১২০ ও ১২৬ অনুচ্ছেদ দুটি ভীষণ অস্পষ্ট। ফলে

একটা সরকার যদি না চায়, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হোক, তাহলে কোনোভাবেই একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা এ দেশে সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের সামনে পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারবে সরকার। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় গঠিত শামসুল হুদা কমিশন আওয়ামী লীগের সময়ে কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে গিয়ে সরকারের দিক থেকে নানা অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছিলেন। তাই এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশে আদৌ একটা সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন হওয়া সম্ভব কিনা, সেটি প্রায় শতভাগ নির্ভর করে ক্ষমতাসীন সরকারের সদিচ্ছার ওপর। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আমরা এ সদিচ্ছা কখনোই দেখিনি।

কিন্তু সবকিছুর পরও কথা থেকে যায়। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশের সংসদে শত শত আইন পাশ হয়েছে। হচ্ছে এখনো। কিন্তু একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন গঠনের আইন এখনো করা হয়নি। এ আইনের অনুপস্থিতি সংবিধানের চরম লঙ্ঘন। আমি তো আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যতটুকু বুঝি, তাতে মনে হয়-হাইকোর্টে একটি রিট করলেই জানা যাবে, বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচন কমিশন আদতে অবৈধ ছিল।

আইনমন্ত্রী আসলে পাশ কাটাতে চাইছেন। সরকার আগের মতো গতানুগতিকতার পথেই হাঁটতে চাইছে। কিন্তু এ রাষ্ট্রের একজন নাগরিক হিসাবে আমরা সেটি মেনে নিতে পারি না। নির্বাচন কমিশন একা একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, মানি সেটি। কিন্তু তবুও একটা আইন প্রণীত হোক আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন করার আগেই।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন