ক্যালেন্ডারে জ্ঞানবিপ্লব!
jugantor
ক্যালেন্ডারে জ্ঞানবিপ্লব!

  পবিত্র সরকার  

১৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের খড়গপুর আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজি) প্রকাশিত একটি ক্যালেন্ডার নিয়ে খুব হইচই হচ্ছে, তাতে নাকি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস পুনর্লিখনের এক অসম সাহসিক প্রয়াস দেখা গেছে।

আপনারা হয়তো জানেন, ভারতে আইআইটিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও দামি, দেশে প্রযুক্তিবিদ্যার শেষ কথা। সেখান থেকে যারা পাশ করে, তাদের অর্ধেক আমেরিকায় চাকরি নিয়ে চলে যায়। অবশ্য তাদের মানববিদ্যার বিভাগ আছে, কিন্তু খানিকটা বড়লোকের গরিব আত্মীয়ের মতো।

এমনই একটি আইআইটি ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু যুগান্তকারী কথা বলছে, তা-ও আর কোথাও নয়, ক্যালেন্ডারে! আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ইতিহাসে পণ্ডিত তো দূরের কথা, ভালো ছাত্রও কোনোকালে ছিলাম না; তবু ভাবলাম, ব্যাপারটা তো দেখতে হয়! একে আইআইটি, তারা কিনা ঢেলে সাজাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস! বইয়ে না, জার্নালে না-ক্যালেন্ডারে, যা বছর গেলে লোকে ফেলে দেবে, না হয় বাচ্চারা বইয়ের মলাট দেবে, অতিমারির পর বই বলে যদি কিছু থাকে। দেখে যে প্রশ্নগুলো মনে এলো, তা এরকম-

প্রথমত, আমি জানতাম না, আইআইটি এ রকম জ্ঞানগর্ভ ক্যালেন্ডার বের করে। ক্যালেন্ডার বের করার মধ্যে অপরাধের কিছুই নেই, অনেক প্রতিষ্ঠানই মনের ফুর্তিতে ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ইত্যাদি বের করে। তাতে কর্মী আর গ্রাহকদের উপকার হয়। কিন্তু আইআইটির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এ রকম জ্ঞানগর্ভ ক্যালেন্ডার আগে তারা বের করেছে কিনা জানি না।

হয়তো করেছে, কিন্তু ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে ভারতীয় চিন্তাজগতে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধাব, এ রকম লক্ষ্য নিয়ে বোধহয় আগে কোনো ক্যালেন্ডার মুখ দেখায়নি। দেখালে মিডিয়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, এখন যেমন পড়েছে।

দুই নম্বর, আইআইটির কর্তারা যে ভেবেছেন-তাদের প্রচারিত এতসব দামিদামি পৃথিবী কাঁপানো সংবাদ প্রচারের জন্য ক্যালেন্ডারই শ্রেষ্ঠ উপায়, কোনো গবেষণা পত্রিকা নয়, বইও নয়; সেটি আমার একটু আশ্চর্য লাগল। কারণ পৃথিবীতে যুগান্তকারী এবং ভূমিকম্প জাগানো কথা বলতে হলে জ্ঞানী লোকেরা কোনো আন্তর্জাতিক ‘জার্নাল’ বেছে নেন।

যেমন ডাক্তারিতে ‘ল্যানসেট’, পদার্থবিজ্ঞানে ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’, ভাষাবিজ্ঞানে আমেরিকার ‘ল্যাঙ্গুয়েজ’, ‘লিঙ্গুইস্টিক এনকুয়ারি’ ইত্যাদি। পাঠকরা আরও কত নাম দিতে পারবেন। ভারতেও কত নামি অ্যাকাডেমিক জার্নাল আছে। এ ক্যালেন্ডার কর্তারা সেসবের মধ্যে না ঢুকে একটা ক্যালেন্ডারের বারো-তেরোটা পাতা বেছে নিলেন এ জ্ঞানের পৃথিবী উলটে দেওয়া মতামতগুলো প্রচারের জন্য, এটি কীরকম অদ্ভুত মনে হচ্ছে। এ লেখায় উৎসনির্দেশ নেই, পাদটীকা নেই, ব্যাখ্যা নেই-শুধু কতগুলো কথা আপ্তবাক্যের মতো বলে যাওয়া। ‘আমরা বলছি, কাজেই ব্যাটারা, তোদের এগুলো সত্যি বলে মানতে হবে, না মানিস তো তোদের চৌদ্দপুরুষ নরকে পচবে’-ভাবখানা এই রকম! ক্যালেন্ডারে এ রকম বিদ্যাবিপ্লবের পদ্ধতি খুবই নতুন, জানি না পৃথিবীর বিদ্বজ্জনসমাজ এটাকে নাচতে-নাচতে মেনে নেবে কিনা।

তিন নম্বর প্রশ্ন : আইআইটি গোষ্ঠীর সবাই কি জানতেন যে এ রকম একটা বৈপ্লবিক ক্যালেন্ডার তৈরি হতে যাচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে, এবং এটি তাদের সম্মিলিত সর্বসম্মত গবেষণার এক শ্রেষ্ঠ উৎপাদন? এতে উৎকীর্ণ কথাগুলো তাদের দুনিয়ার সবার কাছে ‘বুদ্ধু’ প্রমাণ করবে না, এ ব্যাপারে কি তারা নিশ্চিত আর আত্মবিশ্বাসী আছেন?

আমি আশা করব, আইআইটির কর্তৃপক্ষ বা তাদের মুখপাত্র এ বিষয়ে তাদের মত খোলাসা করে হতচ্ছাড়া আর মূর্খ পাবলিককে জানাবেন, বলবেন যে, ‘ওই ক্যালেন্ডারই আমাদের বাণী’; এবং ভারতের সব আইআইটি এই মত পোষণ করে। এরপর থেকে স্কুল-কলেজে বইপত্র তুলে দেওয়া হবে, শুধু ক্যালেন্ডার পাঠ্য হবে, সেই ব্যবস্থা তারা করতে চলেছেন?

তা এই ক্যালেন্ডারে আছে কী? অধৈর্য পাঠককে শান্ত করার জন্য এবার বলি। এতে বলা হচ্ছে, মহেন্জোদারো আর বৈদিক সভ্যতা দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছে পরপর, তাদের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই। আর জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে ভারতের বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা হয়েছে (‘জংলি পশ্চিমারা আমাদের ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না’)। আর বলা হয়েছে, আর্যরা মোটেই আক্রমণকারী বা অভিযানকারী নয়।

সম্ভবত এতে এই ইঙ্গিত আছে যে, তারা বহিরাগতও নয়। ভারতের spirituality বা আধ্যাত্মিকতার জয়গান করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সব আমার বিষয় নয়; আশা করি, দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসবিদরা যদি এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা মনে করেন সেসবের উত্তর দেবেন।

আমি শুধু কতগুলো ব্যাপারের উল্লেখ করে এই প্রশ্ন করব যে-এক. আর্যদের ভাষা তো ভারতে এসে পৌঁছেছিল, একেবারে আসাম পর্যন্ত তা ছড়িয়ে গেছে। তাতে ভারতে এর আগের ভাষাগুলো ভারতীয়রা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আগে সারা ভারতে দ্রাবিড়গোষ্ঠীর ভাষা অনেকটা ছড়িয়ে ছিল, পাকিস্তানে এক দ্রাবিড় ভাষা ব্রাহুই এখনো টিকে আছে, তা তার প্রমাণ।

আমাদের তখনকার ভাষা আর্যরা ভুলিয়ে ছাড়ে, আমেরিকায় যেমন কালো মানুষদের ভাষা শাসকদের ভুলিয়ে ছেড়েছে, এমনকি আদি আমেরিকানদের ভাষাও। আরেকটা ভাষা এসে আগের ভাষা ভুলিয়ে দেয় তখনই, যখন তার সঙ্গে একটা আধিপত্য বা গায়ের জোর থাকে। আর্যরা শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি না হলে তা হতে পারত না। দু-নম্বর কথা, রামায়ণ আর মহাভারত তো আর্য প্রভাব বিস্তারেরই গল্প, তাতে তো যুদ্ধ করেছে আর্যরা, অনার্যদের বিরুদ্ধে এবং জিতেছে। তাতে তাদের আক্রমণকারী বলব, না বলব না? তিন নম্বর, ভারতে বৈদিক সভ্যতা, আর পরবর্তী পৌরাণিক সভ্যতা মূলত ব্রাহ্মণশাসিত সভ্যতা, যা বীভৎস জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি করেছে এবং অব্রাহ্মণ আর দলিতদের ওপর শয়ে শয়ে বছর ধরে অশেষ অত্যাচার করেছে। তার কুৎসিত প্রভাব থেকে আজও ভারত মুক্ত হয়নি। তার এত মহিমাখ্যাপন করার কী আছে? সে ইতিহাস কোন্ পদের ইতিহাস, যা শুধু একচোখো হরিণের মতো (কল্পিত?) ভালোটাই দেখে, খারাপটা দেখে না?

প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল অর্জন নিশ্চয়ই ছিল, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তা স্বীকৃতও হয়েছে। শূন্যের আবিষ্কার, জ্যামিতি, চিকিৎসাবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও নভোপদার্থবিদ্যা, রসায়ন, দর্শন (যার ছ’টি প্রস্থানের মধ্যে অন্তত তিনটি সাংখ্য, বৌদ্ধ আর বাহ্যস্পত্য-ছিল নাস্তিকতার দর্শন), ভাষাবিজ্ঞান (রমেশচন্দ্র মজুমদারের প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানসংক্রান্ত আলোচনায় যা অনুপস্থিত) ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানবসভ্যতায় তার দান কম নয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এও তো স্বীকার করতে হবে যে, সামান্যসংখ্যক উচ্চবর্ণ ছাড়া ভারতের অধিকাংশ মানুষ ছিল নিরক্ষর এবং বিপুল দারিদ্র্য আর অপমানে লাঞ্ছিত। তা থেকে তো আমরা আজও বেরোতে পারিনি, স্বাধীনতার এ প্লাটিনাম জয়ন্তীতেও। এখন দুই বাহু তুলে ‘অতীত অতীত’ বলে উদ্দাম ধুনুচি-নৃত্য করলেই শুধু হবে?

ভারতের শাসকগোষ্ঠীর বিদ্যাচর্চার ইতিহাস খুব উজ্জ্বল নয়। তারা রাবণের লঙ্কায় এয়ারপোর্ট বসিয়েছে, আর সেখানে নানা রকমের এরোপ্লেন পেয়েছে, গণেশের হাতির মাথায় প্লাস্টিক সার্জারি, গান্ধারীর একশ ছেলেতে স্টেমসেল প্রযুক্তি, ময়ূরের চোখের জল খেয়ে ময়ূরীর গর্ভধারণ, গোমূত্রে ক্যান্সারের প্রতিষেধক কত কিছু পেয়েছে!

তারা বিবেকানন্দকে সিপাহি বিদ্রোহের প্রেরণা বলেছে (সিপাহি বিদ্রোহের পাঁচ বছর পরে যার জন্ম), চৈতন্য আর শংকরাচার্যকে সমসাময়িক বলেছে। আরও বলেছে, রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান শান্তিনিকেতন এবং বিদ্যাসাগর ‘সহজ পাঠ’ লিখেছিলেন। জ্ঞানের এ প্রবল কর্দমস্রোতে আমরা ভারতবাসীরা মুহ্যমান হয়ে আছি।

পবিত্র সরকার : খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

ক্যালেন্ডারে জ্ঞানবিপ্লব!

 পবিত্র সরকার 
১৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভারতের খড়গপুর আইআইটি (ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলোজি) প্রকাশিত একটি ক্যালেন্ডার নিয়ে খুব হইচই হচ্ছে, তাতে নাকি প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাস পুনর্লিখনের এক অসম সাহসিক প্রয়াস দেখা গেছে।

আপনারা হয়তো জানেন, ভারতে আইআইটিগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়েও দামি, দেশে প্রযুক্তিবিদ্যার শেষ কথা। সেখান থেকে যারা পাশ করে, তাদের অর্ধেক আমেরিকায় চাকরি নিয়ে চলে যায়। অবশ্য তাদের মানববিদ্যার বিভাগ আছে, কিন্তু খানিকটা বড়লোকের গরিব আত্মীয়ের মতো।

এমনই একটি আইআইটি ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে কিছু যুগান্তকারী কথা বলছে, তা-ও আর কোথাও নয়, ক্যালেন্ডারে! আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ, ইতিহাসে পণ্ডিত তো দূরের কথা, ভালো ছাত্রও কোনোকালে ছিলাম না; তবু ভাবলাম, ব্যাপারটা তো দেখতে হয়! একে আইআইটি, তারা কিনা ঢেলে সাজাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস! বইয়ে না, জার্নালে না-ক্যালেন্ডারে, যা বছর গেলে লোকে ফেলে দেবে, না হয় বাচ্চারা বইয়ের মলাট দেবে, অতিমারির পর বই বলে যদি কিছু থাকে। দেখে যে প্রশ্নগুলো মনে এলো, তা এরকম-

প্রথমত, আমি জানতাম না, আইআইটি এ রকম জ্ঞানগর্ভ ক্যালেন্ডার বের করে। ক্যালেন্ডার বের করার মধ্যে অপরাধের কিছুই নেই, অনেক প্রতিষ্ঠানই মনের ফুর্তিতে ক্যালেন্ডার, ডায়েরি ইত্যাদি বের করে। তাতে কর্মী আর গ্রাহকদের উপকার হয়। কিন্তু আইআইটির সুদীর্ঘ ইতিহাসে এ রকম জ্ঞানগর্ভ ক্যালেন্ডার আগে তারা বের করেছে কিনা জানি না।

হয়তো করেছে, কিন্তু ক্যালেন্ডার ছাপিয়ে ভারতীয় চিন্তাজগতে ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধাব, এ রকম লক্ষ্য নিয়ে বোধহয় আগে কোনো ক্যালেন্ডার মুখ দেখায়নি। দেখালে মিডিয়া তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, এখন যেমন পড়েছে।

দুই নম্বর, আইআইটির কর্তারা যে ভেবেছেন-তাদের প্রচারিত এতসব দামিদামি পৃথিবী কাঁপানো সংবাদ প্রচারের জন্য ক্যালেন্ডারই শ্রেষ্ঠ উপায়, কোনো গবেষণা পত্রিকা নয়, বইও নয়; সেটি আমার একটু আশ্চর্য লাগল। কারণ পৃথিবীতে যুগান্তকারী এবং ভূমিকম্প জাগানো কথা বলতে হলে জ্ঞানী লোকেরা কোনো আন্তর্জাতিক ‘জার্নাল’ বেছে নেন।

যেমন ডাক্তারিতে ‘ল্যানসেট’, পদার্থবিজ্ঞানে ‘ফিজিক্যাল রিভিউ’, ভাষাবিজ্ঞানে আমেরিকার ‘ল্যাঙ্গুয়েজ’, ‘লিঙ্গুইস্টিক এনকুয়ারি’ ইত্যাদি। পাঠকরা আরও কত নাম দিতে পারবেন। ভারতেও কত নামি অ্যাকাডেমিক জার্নাল আছে। এ ক্যালেন্ডার কর্তারা সেসবের মধ্যে না ঢুকে একটা ক্যালেন্ডারের বারো-তেরোটা পাতা বেছে নিলেন এ জ্ঞানের পৃথিবী উলটে দেওয়া মতামতগুলো প্রচারের জন্য, এটি কীরকম অদ্ভুত মনে হচ্ছে। এ লেখায় উৎসনির্দেশ নেই, পাদটীকা নেই, ব্যাখ্যা নেই-শুধু কতগুলো কথা আপ্তবাক্যের মতো বলে যাওয়া। ‘আমরা বলছি, কাজেই ব্যাটারা, তোদের এগুলো সত্যি বলে মানতে হবে, না মানিস তো তোদের চৌদ্দপুরুষ নরকে পচবে’-ভাবখানা এই রকম! ক্যালেন্ডারে এ রকম বিদ্যাবিপ্লবের পদ্ধতি খুবই নতুন, জানি না পৃথিবীর বিদ্বজ্জনসমাজ এটাকে নাচতে-নাচতে মেনে নেবে কিনা।

তিন নম্বর প্রশ্ন : আইআইটি গোষ্ঠীর সবাই কি জানতেন যে এ রকম একটা বৈপ্লবিক ক্যালেন্ডার তৈরি হতে যাচ্ছে তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে, এবং এটি তাদের সম্মিলিত সর্বসম্মত গবেষণার এক শ্রেষ্ঠ উৎপাদন? এতে উৎকীর্ণ কথাগুলো তাদের দুনিয়ার সবার কাছে ‘বুদ্ধু’ প্রমাণ করবে না, এ ব্যাপারে কি তারা নিশ্চিত আর আত্মবিশ্বাসী আছেন?

আমি আশা করব, আইআইটির কর্তৃপক্ষ বা তাদের মুখপাত্র এ বিষয়ে তাদের মত খোলাসা করে হতচ্ছাড়া আর মূর্খ পাবলিককে জানাবেন, বলবেন যে, ‘ওই ক্যালেন্ডারই আমাদের বাণী’; এবং ভারতের সব আইআইটি এই মত পোষণ করে। এরপর থেকে স্কুল-কলেজে বইপত্র তুলে দেওয়া হবে, শুধু ক্যালেন্ডার পাঠ্য হবে, সেই ব্যবস্থা তারা করতে চলেছেন?

তা এই ক্যালেন্ডারে আছে কী? অধৈর্য পাঠককে শান্ত করার জন্য এবার বলি। এতে বলা হচ্ছে, মহেন্জোদারো আর বৈদিক সভ্যতা দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছে পরপর, তাদের মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ নেই। আর জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে ভারতের বিপুল শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা হয়েছে (‘জংলি পশ্চিমারা আমাদের ধারেকাছে পৌঁছতে পারে না’)। আর বলা হয়েছে, আর্যরা মোটেই আক্রমণকারী বা অভিযানকারী নয়।

সম্ভবত এতে এই ইঙ্গিত আছে যে, তারা বহিরাগতও নয়। ভারতের spirituality বা আধ্যাত্মিকতার জয়গান করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সব আমার বিষয় নয়; আশা করি, দক্ষিণ এশীয় ইতিহাসবিদরা যদি এগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা মনে করেন সেসবের উত্তর দেবেন।

আমি শুধু কতগুলো ব্যাপারের উল্লেখ করে এই প্রশ্ন করব যে-এক. আর্যদের ভাষা তো ভারতে এসে পৌঁছেছিল, একেবারে আসাম পর্যন্ত তা ছড়িয়ে গেছে। তাতে ভারতে এর আগের ভাষাগুলো ভারতীয়রা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আগে সারা ভারতে দ্রাবিড়গোষ্ঠীর ভাষা অনেকটা ছড়িয়ে ছিল, পাকিস্তানে এক দ্রাবিড় ভাষা ব্রাহুই এখনো টিকে আছে, তা তার প্রমাণ।

আমাদের তখনকার ভাষা আর্যরা ভুলিয়ে ছাড়ে, আমেরিকায় যেমন কালো মানুষদের ভাষা শাসকদের ভুলিয়ে ছেড়েছে, এমনকি আদি আমেরিকানদের ভাষাও। আরেকটা ভাষা এসে আগের ভাষা ভুলিয়ে দেয় তখনই, যখন তার সঙ্গে একটা আধিপত্য বা গায়ের জোর থাকে। আর্যরা শক্তিশালী বহিরাগত শক্তি না হলে তা হতে পারত না। দু-নম্বর কথা, রামায়ণ আর মহাভারত তো আর্য প্রভাব বিস্তারেরই গল্প, তাতে তো যুদ্ধ করেছে আর্যরা, অনার্যদের বিরুদ্ধে এবং জিতেছে। তাতে তাদের আক্রমণকারী বলব, না বলব না? তিন নম্বর, ভারতে বৈদিক সভ্যতা, আর পরবর্তী পৌরাণিক সভ্যতা মূলত ব্রাহ্মণশাসিত সভ্যতা, যা বীভৎস জাতিভেদ প্রথা সৃষ্টি করেছে এবং অব্রাহ্মণ আর দলিতদের ওপর শয়ে শয়ে বছর ধরে অশেষ অত্যাচার করেছে। তার কুৎসিত প্রভাব থেকে আজও ভারত মুক্ত হয়নি। তার এত মহিমাখ্যাপন করার কী আছে? সে ইতিহাস কোন্ পদের ইতিহাস, যা শুধু একচোখো হরিণের মতো (কল্পিত?) ভালোটাই দেখে, খারাপটা দেখে না?

প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে উজ্জ্বল অর্জন নিশ্চয়ই ছিল, বিজ্ঞানের ইতিহাসে তা স্বীকৃতও হয়েছে। শূন্যের আবিষ্কার, জ্যামিতি, চিকিৎসাবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা ও নভোপদার্থবিদ্যা, রসায়ন, দর্শন (যার ছ’টি প্রস্থানের মধ্যে অন্তত তিনটি সাংখ্য, বৌদ্ধ আর বাহ্যস্পত্য-ছিল নাস্তিকতার দর্শন), ভাষাবিজ্ঞান (রমেশচন্দ্র মজুমদারের প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানসংক্রান্ত আলোচনায় যা অনুপস্থিত) ইত্যাদি ক্ষেত্রে মানবসভ্যতায় তার দান কম নয়। কিন্তু এর পাশাপাশি এও তো স্বীকার করতে হবে যে, সামান্যসংখ্যক উচ্চবর্ণ ছাড়া ভারতের অধিকাংশ মানুষ ছিল নিরক্ষর এবং বিপুল দারিদ্র্য আর অপমানে লাঞ্ছিত। তা থেকে তো আমরা আজও বেরোতে পারিনি, স্বাধীনতার এ প্লাটিনাম জয়ন্তীতেও। এখন দুই বাহু তুলে ‘অতীত অতীত’ বলে উদ্দাম ধুনুচি-নৃত্য করলেই শুধু হবে?

ভারতের শাসকগোষ্ঠীর বিদ্যাচর্চার ইতিহাস খুব উজ্জ্বল নয়। তারা রাবণের লঙ্কায় এয়ারপোর্ট বসিয়েছে, আর সেখানে নানা রকমের এরোপ্লেন পেয়েছে, গণেশের হাতির মাথায় প্লাস্টিক সার্জারি, গান্ধারীর একশ ছেলেতে স্টেমসেল প্রযুক্তি, ময়ূরের চোখের জল খেয়ে ময়ূরীর গর্ভধারণ, গোমূত্রে ক্যান্সারের প্রতিষেধক কত কিছু পেয়েছে!

তারা বিবেকানন্দকে সিপাহি বিদ্রোহের প্রেরণা বলেছে (সিপাহি বিদ্রোহের পাঁচ বছর পরে যার জন্ম), চৈতন্য আর শংকরাচার্যকে সমসাময়িক বলেছে। আরও বলেছে, রবীন্দ্রনাথের জন্মস্থান শান্তিনিকেতন এবং বিদ্যাসাগর ‘সহজ পাঠ’ লিখেছিলেন। জ্ঞানের এ প্রবল কর্দমস্রোতে আমরা ভারতবাসীরা মুহ্যমান হয়ে আছি।

পবিত্র সরকার : খ্যাতনামা ভারতীয় লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন