Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

প্রতিটি বিদেশি শব্দের জন্য এক টাকা জরিমানা

Advertisement

Icon

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিটি বিদেশি শব্দের জন্য এক টাকা জরিমানা

Advertisement

আনিসুজ্জামান স্যারের একটি গ্রন্থে পড়েছিলাম-মনেপ্রাণে বাঙালি, এমন বিদ্বানরা একটা সমিতি করেছিলেন। তারা নিয়ম করেছিলেন, তাদের সভায় কেউ বাংলা বাক্যে একটা ইংরেজি শব্দ বললে তাকে এক পয়সা জরিমানা দিতে হবে।

গল্পটি গত শতকের। বাংলা ভাষার প্রতি তাদের দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ আমাকে উদ্দীপ্ত করে। যারা বাংলাকে ভালোবাসেন তারা যদি আচার-আচরণ, কথা-বার্তায়, কাজ-কর্মে শুধু বাংলাকে অবলম্বন করতেন, তাহলে এ ভাষার মর্যাদা অনেক বৃদ্ধি পেত। আমাদের সে সুযোগও আছে। কারণ, বর্তমানে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার অনেক সমৃদ্ধ, ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষা মিশ্রণের প্রয়োজন হয় না।

এ কথাও স্বীকার্য, বিশ্বের কোনো ভাষাই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়; বরং এর ওপর রয়েছে অন্যান্য ভাষার প্রভাব। বাংলা ভাষায়ও বহু বিদেশি ভাষার শব্দ আত্মীকৃত হয়েছে। এ ভাষার শব্দভাণ্ডারে যুক্ত হয়েছে অনেক পরিভাষা। বাংলা একাডেমিকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশে পরিভাষার চয়ন ও সংকলন। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা প্রয়োজন, প্রতিবর্ণীকরণ (এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষার বর্ণে লিখন বা লিপ্যন্তরীকরণ) ও পরিভাষা এক নয়। যেসব বিদেশি শব্দের প্রচলিত বাংলা শব্দ, প্রতিশব্দ বা অর্থবোধক শব্দ আছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিবর্ণীকরণ কাম্য নয়। কখনো কখনো প্রতিবর্র্ণীকৃত শব্দ পরিভাষিত শব্দ হিসাবেও গৃহীত হতে পারে। যেমন- ইন্দোনেশিয়ার পরিভাষার ক্ষেত্রে মূল ইংরেজি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ বেশি হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বীকৃত কয়েকটি অভিধান পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়েছে, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের অভিধানে বাংলা ভাষার পঁচাত্তর হাজার শব্দ আছে। এ দেশের গ্রাম্য বা আঞ্চলিক ভাষার শব্দ সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল বাংলা একাডেমি। এতে দেড় লাখের বেশি শব্দ সংগৃহীত হয়েছে। বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক অভিধানে শব্দের সংখ্যা প্রায় এক লাখ পঁচিশ হাজার।

বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শব্দের সংখ্যা তিয়াত্তর হাজার দুশ’ উনআশিটি। রয়েছে শব্দগুলোর অভিধা। তথ্যপ্রযুক্তি বিপ্লবের পর যেসব শব্দ দৈনন্দিন ভাষায় যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধান প্রকাশিত হয়েছে ২০১৬ সালে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধানও রয়েছে ১৫টির অধিক। ধারণা করা যায়, সবমিলিয়ে বাংলা ভাষায় মোট শব্দ সংখ্যা প্রায় চার লাখ।

কোনো মানুষই তার ভাষার সব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না। ইংরেজি ভাষায় সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শব্দ থাকলেও শেকসপিয়ার নাকি তার নাটকগুলোয় ১৫ হাজারের বেশি শব্দ ব্যবহার করেননি। বাংলা ভাষার সমৃদ্ধি ও বিস্তারে এ দেশের অনেক পণ্ডিত উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন, পরিভাষা প্রয়োগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষায় অনেক নতুন শব্দ প্রয়োগ করেছিলেন।

কিছু ইংরেজির অনুবাদ করে, কিছু পুরোনো শব্দ বা ধাতুর ওপর কারুকর্ম করে। কিন্তু বর্তমানে পরিভাষা প্রণয়নের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। বিদেশি ভাষা, বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ-বাক্যকে বাংলা বর্ণমালা দিয়ে লেখার প্রবণতা অনেক বেশি। এ ধারায় অনেক প্রচলিত বাংলা শব্দ বাদ দিয়ে ইংরেজি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ করে বাংলা ভাষায় প্রয়োগ করা হচ্ছে।

এক সময় একটা বিশেষ গোষ্ঠীর বাংলা ভাষায় সংস্কৃত শব্দ ঢোকানোর প্রবণতা ছিল। কেউ কেউ মনে করেন, আরবি, ফারসি শব্দ বাংলার মধ্যে ঢুকিয়ে অন্য গোষ্ঠী সেটার প্রতিশোধ নিয়েছে। অতি সম্প্রতি বাংলা ভাষায় ইংরেজি শব্দ-বাক্য ঢোকানোর প্রবণতা অধিক লক্ষ করা যায়। শব্দশৈলীর ন্যূনতম বিধি ছাড়াই এ ভাষায় ইংরেজি শব্দ-বাক্য যুক্ত হচ্ছে। চলচ্চিত্র-নাটক, গল্প-উপন্যাস, কবিতা-কাব্যগ্রন্থ, প্রবন্ধ-সংকলন-সাময়িকীর শিরোনামেও দেখা যাচ্ছে বাংলা-ইংরেজি শব্দ-বাক্যের আধিক্য ও প্রতিবর্ণীকৃত প্রয়োগ।

উপরন্তু প্রতিবর্ণীকৃত শব্দের সঙ্গে বাংলার আ কার, ই কার, উ কার বসিয়ে যত্রতত্র পরির্বতন করা হচ্ছে শব্দের উচ্চারণ। ফলে ব্যত্যয় ঘটছে অর্থের-একই শব্দের বিভিন্নরূপ প্রয়োগ ঘটছে মাত্রাতিরিক্ত। উপরন্তু শব্দের খণ্ডাংশ ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নতুন শব্দ। সমস্যা থেকে যাচ্ছে বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত কৃতঋণ শব্দের আত্মীকরণের প্রকৃতি, নিয়ম ও বহুবিধ প্রক্রিয়া নিয়েও। ভাষাবিজ্ঞানী ও ব্যাকরণবিদরাও এসব বিষয়ে ঐকমত্য প্রকাশ করছেন না।

বাংলা ভাষায় বিদেশি শব্দ ব্যবহারের বিদ্যমান নিয়মনীতি সমৃদ্ধ নয়। এটি প্রকারান্তরে মাতৃভাষার মধ্যে বিদেশি ভাষা প্রয়োগে উৎসাহ দিচ্ছে। বাংলা ভাষার প্রচলিত শব্দকে বাদ দিয়ে যত্রতত্র বিদেশি শব্দ বাংলা বর্ণ দিয়ে লেখার আইনগত বাধা-বিপত্তিও নেই। যেসব নতুন ভাষা ও শব্দ বাংলাভাষীর সামনে আসছে, সেগুলোর সময়োচিত বাংলা পরিভাষাও ভাষাপ্রেমীর সামনে নেই। বাস্তবে প্রতিবর্ণীকরণের প্রয়োজন আছে কিনা, থাকলে কখন-কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সে বিষয়েও সার্বজনীন নির্দেশনা নেই। যোগ্যতা বা মর্যাদা রক্ষার স্বার্থে বিশেষ কোনো উদ্যোগ না থাকার ফলে বাংলা ভাষায় অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ ও বাক্যের অনুপ্রবেশ একটি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে, যা বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধির অনুকূল নয়।

চীন দেশে আইন আছে, সে দেশের ভাষার মধ্যে কোনো বিদেশি ভাষার শব্দ-বাক্য মিশিয়ে ব্যবহার করা যাবে না। জাপান সরকার ভাষা প্রয়োগে জনসচেতনতার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য তাদের ভাষা চর্চা, সংরক্ষণ ও উৎকর্ষের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশে ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন এবং ২০১২ ও ২০১৪ সালে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন ও শুদ্ধ প্রয়োগের আইন বা হাইকোর্ট-এর রুল জারি হয়েছে। এসব আইন-বিধি বাংলা হরফ দিয়ে বিদেশি শব্দ-বাক্য লেখা প্রতিরোধের জন্য যথাযথ নয়।

শুধু দেশপ্রেম ও জনসচেতনতার ওপর নির্ভর করে বাংলা ভাষা নির্বাসনের বর্তমান মাত্রা ও প্রকৃতিকে থামানো সম্ভব নয়। বাংলার মধ্যে (আত্মীকৃত শব্দের অভিধান ও অন্যান্য অভিধানে স্বীকৃত শব্দ ছাড়া) যত্রতত্র বিদেশি ভাষার শব্দ-বাক্য প্রয়োগ ও বিদেশি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণ ঠেকাতে বিধিনিষেধ আরোপ করা প্রয়োজন। বিদেশি ভাষার ব্যবহার অপরিহার্য হলে তা কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, তার জন্য স্বয়ংসম্পূর্ণ নিয়মবিধি থাকাও বাঞ্ছনীয়।

ভাষার মাসে যদি সরকারি দপ্তরে এমন আদেশ জারি হতো, কেউ বাংলা বাক্যে বিদেশি শব্দ লিখলে তাকে প্রতিটি বিদেশি শব্দের জন্য এক টাকা জরিমানা দিতে হবে, তাহলেও বাংলার মর্যাদা বৃদ্ধি পেত। গৌরবান্বিত হতো ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ ও রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। বাংলা ভাষার রক্ষণাবেক্ষণ, উৎকর্ষ ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য ভাষাবিজ্ঞানীর পাশাপাশি অন্যান্য শ্রেণির অংশগ্রহণ ও অধিক গবেষণা জরুরি।

ড. মুহম্মদ মনিরুল হক : শিক্ষা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ

[email protected]

Advertisement

প্রতিটি বিদেশি শব্দ এক টাকা জরিমানা

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম