রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বাস্তবতায় বাংলাদেশের করণীয়
ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী
প্রকাশ: ০৪ মার্চ ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাশিয়া কর্তৃক ইউক্রেনে সর্বাত্মক আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব এখন এক নতুন মেরুকরণের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতির বিবেচনায় এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী ‘এলায়েন্স সিস্টেম’ গড়ে ওঠার চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এ প্রবন্ধটি যখন লিখছি, তখন ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে রুশ বাহিনী ঢুকে পড়েছে এবং সর্বাত্মক আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করছে রাশিয়া কত দ্রুত কিয়েভ দখলে নিতে পারে তার ওপর। যদি কিয়েভের পতন দ্রুত হয়, তাহলে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যে লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন তা সাফল্যের মুখ দেখবে বলেই মনে হচ্ছে এবং এতে একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয়তো এড়ানো সম্ভব হবে।
কিন্তু কিয়েভ দখল বিলম্বিত হলে বিশ্বরাজনীতি ভিন্ন মাত্রা লাভ করতে পারে। এতে পশ্চিমা শক্তিগুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময় পাবে এবং পুতিনকেও তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করতে হতে পারে। কেননা পুতিনের পেছনে ফিরে আসার রাস্তা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
পশ্চিমা শক্তিগুলো যদিও প্রত্যক্ষ যুদ্ধ এখনো শুরু করেনি, কিন্তু রাশিয়া ও পুতিনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মধ্য দিয়ে ইতোমধ্যেই তারা এক ধরনের যুদ্ধই শুরু করেছে বলা যায়। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে ফ্রান্স ইতোমধ্যেই সাগরে পণ্যবাহী রুশ জাহাজ আটকে দিয়েছে।
বিশ্ব বর্তমানে দুটি বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ ও ব্রিটেন; অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, বেলারুশ, উত্তর কোরিয়া, ইরান, কিউবা ইত্যাদি দেশ। ভারত যদিও নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছে, তবে ঐতিহাসিক কারণেই দেশটি শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার পক্ষেই থাকবে। পাকিস্তানও তা-ই করবে।
আরব ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশ, মধ্য এশিয়া ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলো পরিস্থিতি বুঝে যে কোনো সময় যে কোনো দিকে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে। এ সবই নির্ভর করছে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ রুশ আক্রমণের মুখে কতক্ষণ টিকে থাকে তার ওপর।
রাশিয়ার আকস্মিক এ উত্থান মার্কিন নীতিতে ক্ষুব্ধ ছোট ছোট রাষ্ট্রগুলোকে উৎসাহী করে তুলেছে। রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করার পর ন্যাটো কৃষ্ণসাগর এলাকা থেকে তার যুদ্ধজাহাজ সরিয়ে নেয়। তাছাড়া ন্যাটো কর্তৃক ইউক্রেনকে প্রদত্ত প্রতিশ্রুত প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তাদানে অস্বীকৃতি সেই বলয়ের দুর্বলতা স্পষ্ট করে তুলেছে এবং এর ফলে পাশ্চাত্যের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থাহীনতা প্রবল হচ্ছে।
একটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কার সামনে দাঁড়িয়ে রাশিয়ান জোটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কতটুকু যৌক্তিক হবে, তা তাদের ভাবিয়ে তুলেছে। ব্রাজিল ইতোমধ্যেই ইউক্রেনকে ‘গর্দভ’ সম্বোধন করেছে।
একটি প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হলে ক্রিমিয়া ও বেলারুশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকায় ন্যাটোর স্থল সৈন্যের পক্ষে রাশিয়া আক্রমণ করা সম্ভব হবে বলেও মনে হয় না। যদি কিয়েভের দ্রুত পতন ঘটে আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তিগুলো একটি বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকিতে না যায়, তাহলে এটি নিশ্চিত যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার কাঠামোতে ব্যাপক রদবদল হতে যাচ্ছে। ফলে বিশ্ব আবার একটি স্নায়ুযুদ্ধের যুগে প্রবেশ করতে চলেছে। সে ক্ষেত্রে বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভরকেন্দ্র ইউরোপ থেকে ইউরেশিয়ায় চলে আসতে পারে এবং বিশ্বে মার্কিন আধিপত্যের যুগের অবসানের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
এর ফলে রাশিয়ার প্রভাবে চীন-ভারত-পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ শুরু হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এ যুদ্ধের খুবই নেতিবাচক একটি সম্ভাব্য প্রভাব এই যে, এ সমস্যাকে কেন্দ্র করে বিশ্ব যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তার অবশ্যম্ভাবী ফল হিসাবে দেশে দেশে গণতন্ত্র সংকুচিত হয়ে কর্তৃত্ববাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রাশিয়া ইউক্রেনকে দিয়ে তার অভিযান শুরু করলেও মস্কো এতেই থেমে থাকবে বলে মনে হয় না। কারণ প্রেসিডেন্ট পুতিন ইতোমধ্যেই প্রমাণ করেছেন, তিনি রাশিয়ার আগের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া পুতিন তার পূর্ববর্তী পারমাণবিক ডকট্রিন থেকে সরে এসে ‘পারমাণবিক রেড অ্যালার্ট’ জারি করায় তার অনমনীয়তা প্রকাশ পেয়েছে। সেক্ষেত্রে রাশিয়া বাল্টিক অঞ্চলের সাবেক সোভিয়েতভুক্ত রাষ্ট্রগুলোতে (যেমন-লিথুয়ানিয়া, লাতভিয়া, এস্তোনিয়া) ন্যাটোর প্রভাব শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত রাখবে বলেই মনে হয়। জাপান ও জার্মানি যদিও পাশ্চাত্যের শক্তিবলয়ে অবস্থান করছে, কিন্তু তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি ভুলে গেছে বলে মনে হয় না।
রাশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ। ইউরোপের প্রয়োজনীয় জ্বালানির, বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের বৃহত্তম জোগানদার হলো রাশিয়া। সুতরাং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কতটুকু কার্যকর হবে তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে রাশিয়া হয়তো তার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। তবে এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বব্যাপী খুব গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বিশ্বের শেয়ার মার্কেটগুলো ফ্লাকচ্যুয়েট করা শুরু করেছে। তাছাড়া কিয়েভের পতন না হলেও ইউক্রেন মূলত রাশিয়ার দখলে চলে যাওয়ায় ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, কারণ ইউক্রেন মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের রুটির বড় জোগানদার।
রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বিশ্বরাজনীতির মনোযোগ সরে যাওয়ায় বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সুদূরপরাহত হয়ে পড়তে পারে। এজন্য কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের সমন্বয় করে এগোতে হবে। মিয়ানমার কীভাবে তার কূটনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে পালটা কূটনৈতিক নীতি-কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সেজন্য শুধু ব্যুরোক্রেটদের ওপর নির্ভর না করে এ বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে বিশেষ কৌশল নির্ধারণী কমিশন গঠন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক লবিস্ট গ্রুপগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া অসঙ্গত হবে না।
ইউক্রেন-রাশিয়া দ্বন্দ্ব থেকে বিশ্ব তথা বাংলাদেশের মতো দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর শেখার আছে অনেক কিছু। এ থেকে গুরুত্বপূর্ণ যে পাঠ আশু নেওয়া প্রয়োজন তা হলো, ‘আমরা আমাদের বন্ধু পরিবর্তন করতে পারি যে কোনো সময়, কিন্তু প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারি না।’ পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এটি সবসময় মনে রাখা প্রয়োজন।
এ যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বে জ্বালানি সংকট তীব্র হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে যেতে পারে। সেজন্য সময় থাকতেই পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুতের বিষয়টি ভাবতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশের অন্যতম বড় সমস্যা এ দেশের মানুষের হুজুগপ্রবণতা। এ প্রবণতার সুযোগ নিয়ে বৈশ্বিক পরিস্থিতি সামনে রেখে একদিকে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সবসময় সিন্ডিকেট করে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দ্রব্যেমূল্যের বৃদ্ধি ঘটায়; অপরদিকে জনগণও আতঙ্কিত হয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুত করে, যা সরকারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
১৯৭৪ সাল থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালে পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকট, কোভিড-১৯ শুরুর সময়ের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুতের হিড়িক এবং বর্তমানে ভোজ্যতেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে যতটা না বাস্তব কারণ রয়েছে, তার চেয়ে জনসচেতনতার অভাব ও সরকারের পূর্বপ্রস্তুতির অভাবের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অসহায়ত্বও ক্রিয়াশীল অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে। এসব বিষয় মাথায় রেখে বাংলাদেশ এখনই কৌশল নির্ধারণে তৎপর না হলে তা হবে এক ঐতিহাসিক উদাসীনতা।
ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী : অধ্যাপক ও সভাপতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
