রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দূরত্ব কমাতে হবে
jugantor
শতফুল ফুটতে দাও
রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দূরত্ব কমাতে হবে

  ড. মাহবুব উল্লাহ্  

২৩ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বাজেট পেশের আগে এবং পরে বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় এসব আলোচনা খুবই মামুলি ধরনের। আমাদের দেশে কিছু থিংকট্যাংক আছে যেগুলো আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে খুবই সম্পদশালী, কিন্তু এগুলোকে কখনো দেখি না একটি ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে ফেলে আলোচনাটিকে নির্দিষ্ট খাতে বা পার্সপেক্টিভ অনুযায়ী মন্তব্যগুলোকে বিন্যস্ত করতে।

আজকের আলোচনায় আমি ২০২২-২৩ আর্থিক বছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করেছেন, তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আমি চেষ্টা করব বাজেট তথা গণঅর্থায়নের ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করতে। যে বিশ্লেষণ নির্দিষ্ট জাতীয় বাজেটকে মূল্যায়ন করতে সহায়ক হবে।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বেশকিছু তত্ত্ব আছে। তবে আমরা মোটা দাগে বলতে পারি, যখন একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী আত্মরক্ষার প্রয়োজনবোধ করে এবং অভিন্ন রাজস্ব চাহিদা পূরণ করতে চায় তখনই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা এসে যায়। রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে যে দুটি প্রয়োজন কাজ করে তার ওপর ভিত্তি করেই পৃথক সত্তা হিসাবে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে।

এই রাষ্ট্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আইনি সত্তা হিসাবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানে চিন্তাভাবনাগুলো যতদূর এগিয়েছে, তার মধ্যে আর্থিক সমাজতত্ত্বের কোনো তত্ত্ব আমরা খুঁজে পাই না এবং গণঅর্থায়নের সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তিও খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজতত্ত্ব আমাদের দেখিয়ে দেয় কিভাবে সামাজিক অবস্থা গণচাহিদা নির্মাণ করে এবং প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়। সমাজ বিবর্তিত হচ্ছে এবং বিবর্তনের ফলে গণব্যয় এবং গণরাজস্বের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়।

আমরা যদি দীর্ঘকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেই, তাহলে দেখতে পাব সমাজবদ্ধ মানুষের ব্যয় এবং গণরাজস্বের মধ্যে সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা যায় না। এই দুয়ের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে যদি কেউ বলে দেয় কিভাবে এবং কোথা থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়েছে, তাহলে আমি বলতে পারব এই রাজস্ব কিভাবে ব্যয়িত হওয়া উচিত।

আবার এ বিষয়টিকে উলটো করে বলা যায়, আপনি কীভাবে আপনার অর্থ ব্যয় করবেন, তাহলে বলা যাবে কীভাবে ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায় করা হবে। এজন্য জানা প্রয়োজন আপনার সমাজের চেহারাটা কী? এবং এর ওপরই নির্ভর করে প্রশাসনিক কাঠামোটি কেমন হবে। খরচ ও রাজস্বের মধ্যে যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আমরা দেখতে পাই, সেখানে আমরা বুঝতে পারব ব্যয় এবং রাজস্ব গণঅর্থায়ন সংক্রান্ত সমস্যার প্রাথমিক বিষয়টি এ রকম। আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে সেটা রাষ্ট্র বা সমাজসংস্থা তার ভিত্তিতে সব সময় কাজ করে না। ব্যয় হ্রাস করার ব্যাপারটি অনেক সময় বিবেচনায় আসে না।

ব্যয় হ্রাস করার প্রশ্নটি কখন উঠবে? এটা তখনই উঠবে যখন ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আয় কম হয়। আবার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করে প্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো মেটানো সম্ভব। আমরা যদি আমাদের চিন্তা-ভাবনা এই সীমিত বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে যে কার্যকর সম্পর্ক বিদ্যমান সেটা সমাজ কাঠামোর মধ্যে খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই।

রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বা গণঅর্থায়ন সব সময় জাতি ও সমাজের বিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের করকে কেন্দ্র করে যে লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে, সেটা শ্রেণিসংগ্রামের আদি রূপ। রাজস্ব বা করকে কেন্দ্র করে মানবজাতি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। আমরা যদি ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে খুঁড়ে বের করি, তাহলে বুঝতে পারব মহান ধর্মীয় বিপ্লবগুলো কর বা রাজস্বকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছে। অপরদিকে দেখা যাবে অনেক বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে গেছে, কারণ বিপ্লবে বিজয়ী শ্রেণি সঠিকভাবে রাজস্ব নীতি বা কর আদায়ের ধরন সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেনি।

গণঅর্থায়নের বিজ্ঞানটি প্রধানত রাষ্ট্রের অর্থায়নকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কাকে দিয়ে কাদের দিয়ে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে? সে প্রশ্নটি করা হয় না। বাস্তবে ব্যাপারটি কী? মানবসমাজে বহু আগে শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছিল। এই শ্রেণি বিভাজনকে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছিল। বহিঃশত্রুর হাত থেকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে রক্ষা করার জন্য এবং একটি শ্রেণির কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে ভিন্ন একটি শ্রেণির জন্য সেই রাজস্ব ব্যয় করা-এটাই হচ্ছে করভিত্তিক ব্যবস্থার পরিণতি। তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, তখন আমরা প্রত্যক্ষ করলাম জনজীবন পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তাকে বিবেচনায় নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

বস্তুত বেশকিছু ক্ষেত্রে বিগত কয়েক শতাব্দীতে যে পরিবর্তন হয়েছে তাতে করে অতীতের রাজস্ব ব্যবস্থাকে ঘৃণার চোখে দেখার অবকাশ নেই। অথবা যেসব অর্জন হয়েছে সেগুলোর জন্যও বড়াই করা সাজে না। এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, দৃশ্যমান ছবির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে আদিম সমাজে গণভিত্তিক সমাজ অনেক শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আদিম সমাজের তুলনায় সমসাময়িক সমাজে গণভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে মানুষের চাহিদা পূরণের ব্যাপারটি সংকুচিত হয়ে গেছে। দেখা যাবে রাষ্ট্র বিশাল ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে গেছে। অতীত সমাজের মূলে বিশাল ঋণ নেওয়া হতো না। প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে প্রায়ই আমরা দেখতে পাই, রাষ্ট্রের হাতে বিশাল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। মধ্যযুগে রাজকুমাররা বিশাল সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক ছিলেন। রাজকুমারদের মালিকানায় এত বেশি সম্পদ ছিল যে সেগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে খুদে রাজকুমারদের ওপর নির্ভর করতে হতো।

ব্রিটিশ শাসনের সময় আমরা দেখেছি বঙ্গদেশে জমিদারের নিচে ছিল তালুকদার, তালুকদারের নিচে ছিল জোতদার। এছাড়া ছিল পত্তনিদার, দার পত্তনিদার এবং সে পত্তনিদার। বঙ্গদেশের দক্ষিণাঞ্চল প্রায় পুরোটাই ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এখানকার জমি হাওলাদারদের বন্দোবস্ত দেওয়া হতো, হাওলাদার বন্দোবস্ত দিত পত্তনিদারকে। অর্থনৈতিক ইতিহাসের পণ্ডিতরা অনুসন্ধান করে দেখেছেন দক্ষিণ বাংলায় ভূমিস্বত্ব ৩৬টি স্তরে বিভাজিত ছিল। যারা ভূমিস্বত্বের মালিক ছিল তাদের খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইউরোপে যে ব্যবস্থা ছিল তাতে আমরা দেখি রাজকুমার, অভিজাত শ্রেণি এবং চার্চ ভূমি সম্পদের মালিক ছিল। সেখানেই শুধু কথা শেষ হয়ে যায় না। মধ্যযুগের ইউরোপে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকত। ফলে অনেক অর্থের প্রয়োজন হতো। এই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ইউরোপের ভূ-স্বামীরা দেউলিয়া হয়ে পড়ত। মধ্যযুগের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রাষ্ট্রের সম্পদ আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিঃশেষিত হওয়ার ফলে আমরা দেখতে পাই, সমসাময়িক গণঅর্থায়ন মধ্যযুগ অথবা তারও আগের অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সমজাতীয় বলে তুলনা করা যায় না। এ বিশ্লেষণ বর্তমান যুগের জন্যও প্রযোজ্য। গত ১০-২০ বছরে গ্রিসের মতো রাষ্ট্রকে দেউলিয়া হতে দেখেছি এবং এখন শ্রীলংকা রাষ্ট্রীয়ভাবে দেউলিয়ার কাতারে আছে।

রাষ্ট্রকে আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার তুলনায় মধ্যযুগের ইউরোপ অথবা তারও আগের ইউরোপের অবস্থা বর্তমানকালের নিঃশেষিত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো ছিল। অতীতে গণঅর্থায়ন ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অধিকতর বুদ্ধিদীপ্ত ছিল। সে কারণে পুরো ব্যবস্থা অনেক বেশি সৎ ছিল।

বর্তমানকালে আমরা কর সুবিচার (Tax Justice) সম্পর্কে অনেক কিছু বলি। অতীতে মধ্যযুগে কর সুবিচার নিয়ে কোনো আলোচনা হতো না এবং এই আলোচনা তখন প্রাসঙ্গিক ছিল না। তবে গত ২-৩ শতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের যে উত্থান ঘটেছে, তার ফলে কর সুবিচারের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

বাংলাদেশের বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থসংস্থানের জন্য রাষ্ট্র দেশ কিংবা দেশের বাইরে থেকে ঋণ নেয়। এ ঋণের সমস্যা হলো-বর্তমান প্রজন্মের ভোগ মেটানোর জন্য এই ঋণ করা হচ্ছে, কিন্তু এই ঋণ পরিশোধের চাপ পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈষম্য সৃষ্টি হবে। দাবি করা হয় রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি নয়। এ সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য প্রয়োজন জিডিপির হিসাবটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির Disaggregated হিসাবটি জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করলে এ সংক্রান্ত অনাস্থা অনেকাংশেই হ্রাস পাবে। সরকারের উচিত ঋণ করার সহজ পথে না এগিয়ে ঋণ যাতে করতে না হয় তার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দূরত্ব হ্রাস করে আনার চিন্তাভাবনা করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যয় বরাদ্দকে যৌক্তিক করতে হবে। বাজেট নামক হাতিয়ারটি ব্যবহার করে গরিব মানুষের সম্পদ ধনীদের আরও ধনী করার জন্য ব্যয় পরিহার করতে হবে। কারণ সাম্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার মধ্যেই ছিল।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

শতফুল ফুটতে দাও

রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দূরত্ব কমাতে হবে

 ড. মাহবুব উল্লাহ্ 
২৩ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে বাজেট পেশের আগে এবং পরে বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় এসব আলোচনা খুবই মামুলি ধরনের। আমাদের দেশে কিছু থিংকট্যাংক আছে যেগুলো আর্থিক সক্ষমতার দিক থেকে খুবই সম্পদশালী, কিন্তু এগুলোকে কখনো দেখি না একটি ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে ফেলে আলোচনাটিকে নির্দিষ্ট খাতে বা পার্সপেক্টিভ অনুযায়ী মন্তব্যগুলোকে বিন্যস্ত করতে।

আজকের আলোচনায় আমি ২০২২-২৩ আর্থিক বছরের জন্য অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করেছেন, তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ও খুঁটিনাটি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। আমি চেষ্টা করব বাজেট তথা গণঅর্থায়নের ওপর একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করতে। যে বিশ্লেষণ নির্দিষ্ট জাতীয় বাজেটকে মূল্যায়ন করতে সহায়ক হবে।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি সম্পর্কে বেশকিছু তত্ত্ব আছে। তবে আমরা মোটা দাগে বলতে পারি, যখন একটি সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী আত্মরক্ষার প্রয়োজনবোধ করে এবং অভিন্ন রাজস্ব চাহিদা পূরণ করতে চায় তখনই রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা এসে যায়। রাষ্ট্রের উৎপত্তির পেছনে যে দুটি প্রয়োজন কাজ করে তার ওপর ভিত্তি করেই পৃথক সত্তা হিসাবে রাষ্ট্রের উৎপত্তি ঘটে।

এই রাষ্ট্র জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আইনি সত্তা হিসাবে নিজেকে দাঁড় করিয়ে দেয়। সমাজবিজ্ঞানে চিন্তাভাবনাগুলো যতদূর এগিয়েছে, তার মধ্যে আর্থিক সমাজতত্ত্বের কোনো তত্ত্ব আমরা খুঁজে পাই না এবং গণঅর্থায়নের সমাজতাত্ত্বিক ভিত্তিও খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজতত্ত্ব আমাদের দেখিয়ে দেয় কিভাবে সামাজিক অবস্থা গণচাহিদা নির্মাণ করে এবং প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এই চাহিদাগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়। সমাজ বিবর্তিত হচ্ছে এবং বিবর্তনের ফলে গণব্যয় এবং গণরাজস্বের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায়।

আমরা যদি দীর্ঘকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় নেই, তাহলে দেখতে পাব সমাজবদ্ধ মানুষের ব্যয় এবং গণরাজস্বের মধ্যে সম্পর্ক আলাদাভাবে বিবেচনা করা যায় না। এই দুয়ের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে যদি কেউ বলে দেয় কিভাবে এবং কোথা থেকে রাজস্ব সংগ্রহ করা হয়েছে, তাহলে আমি বলতে পারব এই রাজস্ব কিভাবে ব্যয়িত হওয়া উচিত।

আবার এ বিষয়টিকে উলটো করে বলা যায়, আপনি কীভাবে আপনার অর্থ ব্যয় করবেন, তাহলে বলা যাবে কীভাবে ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায় করা হবে। এজন্য জানা প্রয়োজন আপনার সমাজের চেহারাটা কী? এবং এর ওপরই নির্ভর করে প্রশাসনিক কাঠামোটি কেমন হবে। খরচ ও রাজস্বের মধ্যে যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা আমরা দেখতে পাই, সেখানে আমরা বুঝতে পারব ব্যয় এবং রাজস্ব গণঅর্থায়ন সংক্রান্ত সমস্যার প্রাথমিক বিষয়টি এ রকম। আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে যে সম্পর্ক আছে সেটা রাষ্ট্র বা সমাজসংস্থা তার ভিত্তিতে সব সময় কাজ করে না। ব্যয় হ্রাস করার ব্যাপারটি অনেক সময় বিবেচনায় আসে না।

ব্যয় হ্রাস করার প্রশ্নটি কখন উঠবে? এটা তখনই উঠবে যখন ব্যয়ের বিপরীতে রাজস্ব আয় কম হয়। আবার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করে প্রয়োজনীয় ব্যয়গুলো মেটানো সম্ভব। আমরা যদি আমাদের চিন্তা-ভাবনা এই সীমিত বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ করি, তাহলে আয় এবং ব্যয়ের মধ্যে যে কার্যকর সম্পর্ক বিদ্যমান সেটা সমাজ কাঠামোর মধ্যে খোঁজার কোনো প্রয়োজন নেই।

রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বা গণঅর্থায়ন সব সময় জাতি ও সমাজের বিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের করকে কেন্দ্র করে যে লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে, সেটা শ্রেণিসংগ্রামের আদি রূপ। রাজস্ব বা করকে কেন্দ্র করে মানবজাতি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। আমরা যদি ইতিহাসের ঘটনাগুলোকে খুঁড়ে বের করি, তাহলে বুঝতে পারব মহান ধর্মীয় বিপ্লবগুলো কর বা রাজস্বকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়েছে। অপরদিকে দেখা যাবে অনেক বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে গেছে, কারণ বিপ্লবে বিজয়ী শ্রেণি সঠিকভাবে রাজস্ব নীতি বা কর আদায়ের ধরন সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারেনি।

গণঅর্থায়নের বিজ্ঞানটি প্রধানত রাষ্ট্রের অর্থায়নকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, কাকে দিয়ে কাদের দিয়ে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে? সে প্রশ্নটি করা হয় না। বাস্তবে ব্যাপারটি কী? মানবসমাজে বহু আগে শ্রেণি বিভাজনের সৃষ্টি হয়েছিল। এই শ্রেণি বিভাজনকে ভিত্তি করেই রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়েছিল। বহিঃশত্রুর হাত থেকে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে রক্ষা করার জন্য এবং একটি শ্রেণির কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করে ভিন্ন একটি শ্রেণির জন্য সেই রাজস্ব ব্যয় করা-এটাই হচ্ছে করভিত্তিক ব্যবস্থার পরিণতি। তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, তখন আমরা প্রত্যক্ষ করলাম জনজীবন পরিবর্তিত হয়ে গেছে, তাকে বিবেচনায় নিয়ে দেখলে বোঝা যাবে কোনো মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

বস্তুত বেশকিছু ক্ষেত্রে বিগত কয়েক শতাব্দীতে যে পরিবর্তন হয়েছে তাতে করে অতীতের রাজস্ব ব্যবস্থাকে ঘৃণার চোখে দেখার অবকাশ নেই। অথবা যেসব অর্জন হয়েছে সেগুলোর জন্যও বড়াই করা সাজে না। এর দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, দৃশ্যমান ছবির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে আদিম সমাজে গণভিত্তিক সমাজ অনেক শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

আদিম সমাজের তুলনায় সমসাময়িক সমাজে গণভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে মানুষের চাহিদা পূরণের ব্যাপারটি সংকুচিত হয়ে গেছে। দেখা যাবে রাষ্ট্র বিশাল ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে গেছে। অতীত সমাজের মূলে বিশাল ঋণ নেওয়া হতো না। প্রাচীনকালে ও মধ্যযুগে প্রায়ই আমরা দেখতে পাই, রাষ্ট্রের হাতে বিশাল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। মধ্যযুগে রাজকুমাররা বিশাল সম্পদ ও সম্পত্তির মালিক ছিলেন। রাজকুমারদের মালিকানায় এত বেশি সম্পদ ছিল যে সেগুলো পরিচালনা করতে গিয়ে খুদে রাজকুমারদের ওপর নির্ভর করতে হতো।

ব্রিটিশ শাসনের সময় আমরা দেখেছি বঙ্গদেশে জমিদারের নিচে ছিল তালুকদার, তালুকদারের নিচে ছিল জোতদার। এছাড়া ছিল পত্তনিদার, দার পত্তনিদার এবং সে পত্তনিদার। বঙ্গদেশের দক্ষিণাঞ্চল প্রায় পুরোটাই ছিল জঙ্গলাকীর্ণ। এখানকার জমি হাওলাদারদের বন্দোবস্ত দেওয়া হতো, হাওলাদার বন্দোবস্ত দিত পত্তনিদারকে। অর্থনৈতিক ইতিহাসের পণ্ডিতরা অনুসন্ধান করে দেখেছেন দক্ষিণ বাংলায় ভূমিস্বত্ব ৩৬টি স্তরে বিভাজিত ছিল। যারা ভূমিস্বত্বের মালিক ছিল তাদের খাজনার দাবি মেটাতে গিয়ে চাষিরা সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইউরোপে যে ব্যবস্থা ছিল তাতে আমরা দেখি রাজকুমার, অভিজাত শ্রেণি এবং চার্চ ভূমি সম্পদের মালিক ছিল। সেখানেই শুধু কথা শেষ হয়ে যায় না। মধ্যযুগের ইউরোপে যুদ্ধ বিগ্রহ লেগে থাকত। ফলে অনেক অর্থের প্রয়োজন হতো। এই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে ইউরোপের ভূ-স্বামীরা দেউলিয়া হয়ে পড়ত। মধ্যযুগের রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রাষ্ট্রের সম্পদ আত্তীকরণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রগুলো ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিঃশেষিত হওয়ার ফলে আমরা দেখতে পাই, সমসাময়িক গণঅর্থায়ন মধ্যযুগ অথবা তারও আগের অর্থায়ন ব্যবস্থার সঙ্গে সমজাতীয় বলে তুলনা করা যায় না। এ বিশ্লেষণ বর্তমান যুগের জন্যও প্রযোজ্য। গত ১০-২০ বছরে গ্রিসের মতো রাষ্ট্রকে দেউলিয়া হতে দেখেছি এবং এখন শ্রীলংকা রাষ্ট্রীয়ভাবে দেউলিয়ার কাতারে আছে।

রাষ্ট্রকে আত্মসাৎ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার তুলনায় মধ্যযুগের ইউরোপ অথবা তারও আগের ইউরোপের অবস্থা বর্তমানকালের নিঃশেষিত রাষ্ট্রগুলোর তুলনায় কিছুটা হলেও ভালো ছিল। অতীতে গণঅর্থায়ন ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে অধিকতর বুদ্ধিদীপ্ত ছিল। সে কারণে পুরো ব্যবস্থা অনেক বেশি সৎ ছিল।

বর্তমানকালে আমরা কর সুবিচার (Tax Justice) সম্পর্কে অনেক কিছু বলি। অতীতে মধ্যযুগে কর সুবিচার নিয়ে কোনো আলোচনা হতো না এবং এই আলোচনা তখন প্রাসঙ্গিক ছিল না। তবে গত ২-৩ শতাব্দী ধরে গণতন্ত্রের যে উত্থান ঘটেছে, তার ফলে কর সুবিচারের প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হয়েছে।

বাংলাদেশের বাজেটে বড় অঙ্কের অর্থসংস্থানের জন্য রাষ্ট্র দেশ কিংবা দেশের বাইরে থেকে ঋণ নেয়। এ ঋণের সমস্যা হলো-বর্তমান প্রজন্মের ভোগ মেটানোর জন্য এই ঋণ করা হচ্ছে, কিন্তু এই ঋণ পরিশোধের চাপ পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর। এর ফলে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বৈষম্য সৃষ্টি হবে। দাবি করা হয় রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির ৫ বা সাড়ে ৫ শতাংশের বেশি নয়। এ সম্পর্কে ভালোভাবে জানার জন্য প্রয়োজন জিডিপির হিসাবটা কতটুকু গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জিডিপির Disaggregated হিসাবটি জনগণের অবগতির জন্য প্রকাশ করলে এ সংক্রান্ত অনাস্থা অনেকাংশেই হ্রাস পাবে। সরকারের উচিত ঋণ করার সহজ পথে না এগিয়ে ঋণ যাতে করতে না হয় তার জন্য রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের দূরত্ব হ্রাস করে আনার চিন্তাভাবনা করতে হবে। একইসঙ্গে ব্যয় বরাদ্দকে যৌক্তিক করতে হবে। বাজেট নামক হাতিয়ারটি ব্যবহার করে গরিব মানুষের সম্পদ ধনীদের আরও ধনী করার জন্য ব্যয় পরিহার করতে হবে। কারণ সাম্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণার মধ্যেই ছিল।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০২২-২০২৩