রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে হবে
jugantor
দেশপ্রেমের চশমা
রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে হবে

  মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার  

১৮ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে রাজপথের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুরু হয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সর্বসম্মতভাবে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে সরকার ভুল করেছে।

দলটির উচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ত্রুটিবিচ্যুতি সংস্কার করে স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। কিন্তু দলীয় স্বার্থে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রায় সব স্টেকহোল্ডারের পরামর্শ উপেক্ষা করে বাতিল করায় নির্বাচনি ব্যবস্থা আস্থা হারিয়েছে। বলা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর একটিও সুষ্ঠু হয়নি।

এর ফলে দেশে ও বিদেশে সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই ভোট না দিতে পারা জনগণ এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চা এবং অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উঠছে।

অন্যদিকে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও দেশে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারদলীয় লোকজনও দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে খুন, গুম, ধর্ষণ, হামলা, গায়েবি মামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়ন।

র‌্যাবের ওপর মার্কিন স্যাংশনের পর গুম কমলেও সার্বিক সামাজিক নৈরাজ্য অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এ পটভূমিতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনটি কীভাবে হবে, সে পদ্ধতি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

সরকারি দল দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার পক্ষে। এর আগে একাধিকবার ক্ষমতাসীন দলের সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচন করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে আবার সরকারি দল ভোটদান প্রক্রিয়ায় ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চায়। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনও তা-ই চায়। কমিশনের কথাবার্তায়ও নাগরিক সমাজের আস্থা নেই।

নির্বাচন কমিশনাররা দায়িত্বে এসে বলেন, অধিকাংশ দল না চাইলে তারা ইভিএমে নির্বাচন করবেন না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করলেও কমিশন ওই মতামতের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেনি।

বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কারও অঘোষিত নির্দেশনায় কমিশন অনধিক ১৫০ আসনে সবার পরামর্শ উপেক্ষা করে এককভাবে ইভিএমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। চলমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যেও ৩ লাখ টাকা করে একেকটি ইভিএমের দাম ধরে মোট আট হাজার কোটি টাকা ইভিএম ক্রয়ে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক উল্লেখিত মতবিরোধ নিরসনে জাতিসংঘ এবং বন্ধুপ্রতিম শক্তিধর কতিপয় দেশ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারদলীয় মন্ত্রী ও নেতাকর্মীরা ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরবেন না বলে অব্যাহতভাবে বলে যাচ্ছেন।

তাদের বক্তব্য স্পষ্ট-তারা সংবিধান থেকে নড়বেন না। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তথা সংসদ না ভেঙে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোও এ ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা কিছুতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কারণ, ইতঃপূর্বে তারা একাধিকবার দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। দেখেছে কীভাবে এবং কত সহজে প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হয় ক্ষমতাসীনরা।

বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনি এজেন্টরা ভোটকেন্দ্র থেকে কীভাবে বিতাড়িত হন। কীভাবে প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে দিনের ভোট ‘রাতের বেলায়’ অনুষ্ঠিত হয়। এসব সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝতে পেরেছে, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার অর্থ হলো ওই নির্বাচনে সুনিশ্চিত পরাজয় মেনে নেওয়া। রাজনৈতিক দল নির্বাচন করে জনগণের রায় নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করতে। সে কাজটি করতে না পারলে তারা কেন অকারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? বিরোধী দলগুলোকে এত বোকা বিবেচনা করা ঠিক হবে না যে, তারা জেনেশুনে বিষপান করবে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, বড় দলগুলোর রাজপথে শোডাউন তত বাড়বে। প্রথমদিকে অন্যতম বড় বিরোধী দল বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু এখন যুগপৎ ভেতর ও বাইরের চাপে দলটিকে শর্তসাপেক্ষে সভা-সমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে সরকার।

এটি ভালো লক্ষণ। উল্লেখ্য, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিএনপিকে বলে থাকেন ‘হাঁটুভাঙা’, ‘দেশবিরোধী’, ‘অগ্নিসন্ত্রাসী’ ‘মাজাভাঙা’, ‘নখ-দন্তহীন বাঘ’, ‘গণবিচ্ছিন্ন’ ‘জনধিকৃত’, ‘জাতীয়তাবাদী চামচা দল’। তাহলে এমন একটি ‘দুর্বল’ দলকে সভা-সমাবেশ করতে দিতে এত গড়িমসি ও ছলচাতুরী কেন? যেখানেই দলটি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পেয়ে তারিখ ঠিক করে, সেখানেই পরিবহণ ধর্মঘটসহ বিভিন্ন উপায়ে জনসমাবেশে আগত দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের বাধা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে দলটির বিভাগীয় পর্যায়ের কয়েকটি জনসভায় বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করা সত্ত্বেও ব্যাপক জনসমাগম হয়েছে।

সরকারি দলও রাজপথে বাধাহীনভাবে সমাবেশ করা শুরু করেছে। সরকারি দলের জনসমাবেশে অংশগ্রহণে অবশ্য নাগরিকদের কোনো রকম বাধা পেতে হচ্ছে না। দুই বড় দলের বড় বড় শোডাউনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। এসব সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে থাকছে পারস্পরিক আক্রমণ।

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে নেতাদের মাঝে শুরু হয়েছে বিবৃতি যুদ্ধ। প্রতিটি জনসভায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া উভয় দলের নেতাদের বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। সরকারি দল নিজেদের অধীনে ইভিএমে নির্বাচন চায়। তারা বলছেন, এ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিটি সভায় দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিলে তারা সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না।

তাদের ইভিএমে কোনো আগ্রহ নেই। এ কারণে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর দলটি ইসি আহূত কোনো সংলাপে অংশগ্রহণ করেনি। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে উভয় বড় দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন নিকটবর্তী হলে বিরোধী দল তাদের দাবি আদায়ে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে এবং সরকারি দল তাতে বাধা দিলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে।

এ সংঘর্ষ এড়ানোর একমাত্র পথ হলো আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান করা। এ ব্যাপারে বিরোধী দলের আপত্তি না থাকলেও সরকারি কোনো উদ্যোগ এখনো লক্ষ করা যায়নি।

আলোচনা না করেও সরকারি দল চাইলে সম্ভাব্য বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার বাজানো রেকর্ড পুনরায় বাজানো থেকে ফিরে আসতে হবে। ‘আমরা সংবিধান থেকে নড়ব না’ বলে বলে ১৯৯৬ সালে বেগম জিয়াও প্রথমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন দিতে চাননি।

পরে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাপাকে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলে। একপর্যায়ে একটি বাজে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত স্বল্পায়ুর সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ করিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে তিনি বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

রাজপথের অনিবার্য় রক্তপাত এড়াতে সরকারের হাতে কয়েকটি উপায় আছে। প্রথমত, সরকার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ করার বিষয়টি ফয়সালা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সরকার জাতীয় সংসদে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি বিল উত্থাপন ও পাশ করে বিরোধীদলীয় আন্দোলন নিষ্প্রভ করে দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে। এটি করতে সরকারি দলের অসুবিধা হবে না।

সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আবার সরকার চাইলে স্যার স্টিফেন নিনিয়ান বা অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মতো কোনো তৃতীয়পক্ষের মধ্যস্থতায় সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নিতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে সরকারের তেমন কোনো ইচ্ছা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, সংবিধান অপরিবর্তনীয় আসমানি কিতাব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা গণতন্ত্র ও স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে সংসদে নতুন ‘নির্বাচনকালীন সরকার বিল’ পাশ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তবে কোনো কিছু না করে প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে একগুঁয়েমি করে দলীয় সরকারের অধীনে আবারও সংসদ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করলে রাজপথে রক্তপাত অনিবার্য হয়ে উঠবে। দেশে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে।

আর বিদেশে ভূলুণ্ঠিত হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি। উল্লেখ্য, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রতিপক্ষের সঙ্গেও যুদ্ধের ময়দানে আলোচনা হয়। আমাদের বড় দলগুলোর দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের উচিত আলোচনা করে উদ্ভূত নির্বাচনি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা। নাগরিক সমাজও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচনি সংকটের সমাধান চায়। তারা বারবার হোঁচট খেলেও এখনো আশাবাদী।

তারা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দলের চেয়ে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের যোগ্যতা রাখেন। কেউই দশম বা একাদশ সংসদ নির্বাচনের মতো আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ নির্বাচন চান না। চান না রাজপথে নৈরাজ্য ও অনিবার্য রক্তপাত।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

দেশপ্রেমের চশমা

রাজনৈতিক সংঘাত এড়াতে হবে

 মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার 
১৮ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে রাজপথের রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। শুরু হয়েছে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ।

সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সর্বসম্মতভাবে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে সরকার ভুল করেছে।

দলটির উচিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ত্রুটিবিচ্যুতি সংস্কার করে স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে এ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। কিন্তু দলীয় স্বার্থে দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রায় সব স্টেকহোল্ডারের পরামর্শ উপেক্ষা করে বাতিল করায় নির্বাচনি ব্যবস্থা আস্থা হারিয়েছে। বলা যায়, দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর একটিও সুষ্ঠু হয়নি।

এর ফলে দেশে ও বিদেশে সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাই ভোট না দিতে পারা জনগণ এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রচর্চা এবং অংশগ্রহণমূলক ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উঠছে।

অন্যদিকে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করলেও দেশে দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে সরকারদলীয় লোকজনও দেশের টাকা বিদেশে পাচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সমাজে বৃদ্ধি পেয়েছে খুন, গুম, ধর্ষণ, হামলা, গায়েবি মামলা ও রাজনৈতিক নিপীড়ন।

র‌্যাবের ওপর মার্কিন স্যাংশনের পর গুম কমলেও সার্বিক সামাজিক নৈরাজ্য অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়ম-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এ পটভূমিতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিকটবর্তী হওয়ায় রাজনীতিতে উত্তাপ বাড়ছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচনটি কীভাবে হবে, সে পদ্ধতি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।

সরকারি দল দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার পক্ষে। এর আগে একাধিকবার ক্ষমতাসীন দলের সরকারের অধীনে স্বচ্ছ নির্বাচন করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এর সঙ্গে আবার সরকারি দল ভোটদান প্রক্রিয়ায় ব্যয়বহুল ও বিতর্কিত ইভিএম ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ চায়। নবগঠিত নির্বাচন কমিশনও তা-ই চায়। কমিশনের কথাবার্তায়ও নাগরিক সমাজের আস্থা নেই।

নির্বাচন কমিশনাররা দায়িত্বে এসে বলেন, অধিকাংশ দল না চাইলে তারা ইভিএমে নির্বাচন করবেন না। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধিতা করলেও কমিশন ওই মতামতের প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেনি।

বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কারও অঘোষিত নির্দেশনায় কমিশন অনধিক ১৫০ আসনে সবার পরামর্শ উপেক্ষা করে এককভাবে ইভিএমে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। চলমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যেও ৩ লাখ টাকা করে একেকটি ইভিএমের দাম ধরে মোট আট হাজার কোটি টাকা ইভিএম ক্রয়ে ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে নির্বাচনকেন্দ্রিক উল্লেখিত মতবিরোধ নিরসনে জাতিসংঘ এবং বন্ধুপ্রতিম শক্তিধর কতিপয় দেশ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতে চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সরকারদলীয় মন্ত্রী ও নেতাকর্মীরা ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত থেকে সরবেন না বলে অব্যাহতভাবে বলে যাচ্ছেন।

তাদের বক্তব্য স্পষ্ট-তারা সংবিধান থেকে নড়বেন না। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও এমপিরা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তথা সংসদ না ভেঙে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোও এ ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা কিছুতেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। কারণ, ইতঃপূর্বে তারা একাধিকবার দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। দেখেছে কীভাবে এবং কত সহজে প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে নির্বাচনে জয়ী হয় ক্ষমতাসীনরা।

বিরোধী দলগুলোর নির্বাচনি এজেন্টরা ভোটকেন্দ্র থেকে কীভাবে বিতাড়িত হন। কীভাবে প্রশাসনযন্ত্র ব্যবহার করে দিনের ভোট ‘রাতের বেলায়’ অনুষ্ঠিত হয়। এসব সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝতে পেরেছে, দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন করার অর্থ হলো ওই নির্বাচনে সুনিশ্চিত পরাজয় মেনে নেওয়া। রাজনৈতিক দল নির্বাচন করে জনগণের রায় নিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করতে। সে কাজটি করতে না পারলে তারা কেন অকারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? বিরোধী দলগুলোকে এত বোকা বিবেচনা করা ঠিক হবে না যে, তারা জেনেশুনে বিষপান করবে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, বড় দলগুলোর রাজপথে শোডাউন তত বাড়বে। প্রথমদিকে অন্যতম বড় বিরোধী দল বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছিল না। কিন্তু এখন যুগপৎ ভেতর ও বাইরের চাপে দলটিকে শর্তসাপেক্ষে সভা-সমাবেশের অনুমতি দিচ্ছে সরকার।

এটি ভালো লক্ষণ। উল্লেখ্য, সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিএনপিকে বলে থাকেন ‘হাঁটুভাঙা’, ‘দেশবিরোধী’, ‘অগ্নিসন্ত্রাসী’ ‘মাজাভাঙা’, ‘নখ-দন্তহীন বাঘ’, ‘গণবিচ্ছিন্ন’ ‘জনধিকৃত’, ‘জাতীয়তাবাদী চামচা দল’। তাহলে এমন একটি ‘দুর্বল’ দলকে সভা-সমাবেশ করতে দিতে এত গড়িমসি ও ছলচাতুরী কেন? যেখানেই দলটি সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পেয়ে তারিখ ঠিক করে, সেখানেই পরিবহণ ধর্মঘটসহ বিভিন্ন উপায়ে জনসমাবেশে আগত দলীয় নেতাকর্মী-সমর্থকদের বাধা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে দলটির বিভাগীয় পর্যায়ের কয়েকটি জনসভায় বাধা-বিপত্তি সৃষ্টি করা সত্ত্বেও ব্যাপক জনসমাগম হয়েছে।

সরকারি দলও রাজপথে বাধাহীনভাবে সমাবেশ করা শুরু করেছে। সরকারি দলের জনসমাবেশে অংশগ্রহণে অবশ্য নাগরিকদের কোনো রকম বাধা পেতে হচ্ছে না। দুই বড় দলের বড় বড় শোডাউনে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। এসব সমাবেশে নেতাদের বক্তব্যে থাকছে পারস্পরিক আক্রমণ।

আসন্ন নির্বাচন ঘিরে ইতোমধ্যে নেতাদের মাঝে শুরু হয়েছে বিবৃতি যুদ্ধ। প্রতিটি জনসভায় কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া উভয় দলের নেতাদের বক্তব্য প্রায় অভিন্ন। সরকারি দল নিজেদের অধীনে ইভিএমে নির্বাচন চায়। তারা বলছেন, এ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে। অন্যদিকে বিএনপির প্রতিটি সভায় দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন না দিলে তারা সে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না।

তাদের ইভিএমে কোনো আগ্রহ নেই। এ কারণে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার পর দলটি ইসি আহূত কোনো সংলাপে অংশগ্রহণ করেনি। ফলে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে উভয় বড় দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্বাচন নিকটবর্তী হলে বিরোধী দল তাদের দাবি আদায়ে রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে এবং সরকারি দল তাতে বাধা দিলে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে পারে।

এ সংঘর্ষ এড়ানোর একমাত্র পথ হলো আলোচনার টেবিলে সমস্যার সমাধান করা। এ ব্যাপারে বিরোধী দলের আপত্তি না থাকলেও সরকারি কোনো উদ্যোগ এখনো লক্ষ করা যায়নি।

আলোচনা না করেও সরকারি দল চাইলে সম্ভাব্য বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি করতে পারে। সেক্ষেত্রে সরকারকে ১৯৯৬ সালে বেগম খালেদা জিয়ার বাজানো রেকর্ড পুনরায় বাজানো থেকে ফিরে আসতে হবে। ‘আমরা সংবিধান থেকে নড়ব না’ বলে বলে ১৯৯৬ সালে বেগম জিয়াও প্রথমে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন দিতে চাননি।

পরে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাপাকে নিয়ে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলে। একপর্যায়ে একটি বাজে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত স্বল্পায়ুর সংসদে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পাশ করিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে তিনি বিরোধীদলীয় দাবি মেনে নিতে বাধ্য হন।

রাজপথের অনিবার্য় রক্তপাত এড়াতে সরকারের হাতে কয়েকটি উপায় আছে। প্রথমত, সরকার বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য ও স্বচ্ছ করার বিষয়টি ফয়সালা করতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই সরকার জাতীয় সংসদে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের একটি বিল উত্থাপন ও পাশ করে বিরোধীদলীয় আন্দোলন নিষ্প্রভ করে দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে। এটি করতে সরকারি দলের অসুবিধা হবে না।

সংসদে তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। আবার সরকার চাইলে স্যার স্টিফেন নিনিয়ান বা অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মতো কোনো তৃতীয়পক্ষের মধ্যস্থতায় সমাধান খোঁজার উদ্যোগ নিতে পারে। অবস্থাদৃষ্টে সরকারের তেমন কোনো ইচ্ছা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না।

সরকারকে মনে রাখতে হবে, সংবিধান অপরিবর্তনীয় আসমানি কিতাব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তথা গণতন্ত্র ও স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে সংসদে নতুন ‘নির্বাচনকালীন সরকার বিল’ পাশ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। তবে কোনো কিছু না করে প্রশাসন ও পোশাকধারী বাহিনী ব্যবহার করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে একগুঁয়েমি করে দলীয় সরকারের অধীনে আবারও সংসদ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রহণ করলে রাজপথে রক্তপাত অনিবার্য হয়ে উঠবে। দেশে নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়বে।

আর বিদেশে ভূলুণ্ঠিত হবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি। উল্লেখ্য, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রতিপক্ষের সঙ্গেও যুদ্ধের ময়দানে আলোচনা হয়। আমাদের বড় দলগুলোর দেশপ্রেমিক নেতৃত্বের উচিত আলোচনা করে উদ্ভূত নির্বাচনি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করা। নাগরিক সমাজও শান্তিপূর্ণ উপায়ে নির্বাচনি সংকটের সমাধান চায়। তারা বারবার হোঁচট খেলেও এখনো আশাবাদী।

তারা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দলের চেয়ে দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানের যোগ্যতা রাখেন। কেউই দশম বা একাদশ সংসদ নির্বাচনের মতো আরেকটি প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ নির্বাচন চান না। চান না রাজপথে নৈরাজ্য ও অনিবার্য রক্তপাত।

ড. মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

akhtermy@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন