ছোট ছোট সতর্কতার বিষয়ে উদাসীনতা নয়
Advertisement
সালাহ্উদ্দিন নাগরী
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। চলতে ফিরতে আমরা বিভিন্ন ধরনের দুর্ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি।
এসব দুর্ঘটনায় সম্পদ বিনষ্ট ও অর্থের অপচয় তো হচ্ছেই, একইসঙ্গে ভুক্তভোগীদের আহত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা আজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুও হচ্ছে। রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে কোনো কোনো পরিবারের চলার পথ। কেন ঘটছে এসব দুর্ঘটনা? সবই কি দৈব দুর্বিপাক? নাকি আমাদের অসতর্ক আচরণ ও ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও এর জন্য দায়ী?
এই তো কিছুদিন আগে এ শহরে এক বয়স্ক ব্যক্তি মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় ফিরতে অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় লিফটের জন্য বাটনে চাপ দিলে দরজা খুলে যায়, কিন্তু লিফট না আসার বিষয়টি খেয়াল না করায় তিনি দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই টুপ করে নিচে পড়ে যান।
এ ঘটনাকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার কারণ নেই। এখন যে হারে হাইরাইজ বিল্ডিং নির্মিত হচ্ছে, লিফটের প্রয়োজন পড়ছে, তাতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে লিফটের যথোপযুক্ত মান রক্ষিত হচ্ছে না। কোনো কোনো সময় আবার লিফট ইন্সটলেশনেও ত্রুটি থেকে যাচ্ছে। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তাই পরিত্রাণের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। লিফটের দরজা খোলার পর দেখেশুনে ভেতরে প্রবেশ করলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
গরমের সময় সিলিং ফ্যানের প্রয়োজনীয়তা বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু আমাদের ভুলে এ ফ্যান বিপদ তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে ফ্যানের মান রক্ষিত না হওয়ায় ব্লেড খুলে পড়ছে, কখনোবা রড ভেঙে যাচ্ছে। সিলিং ফ্যান লাগানোর জন্য ছাদ ঢালাইয়ের সময় ছাদের রডের সঙ্গে হুক লাগিয়ে ফ্যান আটকানোর ব্যবস্থা করা হয় এবং এটাই হলো সঠিক পদ্ধতি। আর এখন ওসব নিয়ম না মেনে বাসাবাড়িতে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের অংশ হিসাবে ড্রিল মেশিন দিয়ে সিলিংয়ের বিভিন্ন জায়গায় ইচ্ছামতো ফুটো করে রয়েল প্লাগ ঢুকিয়ে হুক লাগিয়ে ফ্যান, ঝাড়বাতি এবং বিভিন্ন ধরনের ডেকোরেশন পিস লটকানো হচ্ছে। ফলে কিছুদিনের মাথায় সেই ফ্যান/ঝাড়বাতি বা ঝুলন্ত ডেকোরেশন পিস রয়েল প্লাগসহ উপড়ে গায়ে-হাতে-মাথায় পড়ছে, আহত হচ্ছে, মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। আমরা যদি রয়েল প্ল্যাগের মাধ্যমে ফ্যান বা ভারী কোনো কিছু ঝুলানো বন্ধ করি, তাহলে এ ধরনের দুর্ঘটনা কমে আসবে।
অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসছে। একটু সামর্থ্য বাড়লেই ঘরবাড়িতে অনেকে এয়ারকুলার লাগাচ্ছে। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নিম্নমানের খুচরা যন্ত্রাংশে সংযোজিত এয়ারকুলারে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে এসি বিস্ফোরণের ঘটনাও বাড়ছে। তাই এসি, ফ্রিজ, ফ্যান, ইস্ত্রি, ওভেন, সুইচ, প্লাগ, সকেট ইত্যাদি ইলেকট্রিক্যাল দ্রব্য কেনার সময় মানের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
ঢাকা শহরে অনেকেরই বাসাবাড়ির আশপাশ বর্ষার সময় পানিতে ভরে যায়। বিল্ডিংয়ের নিচতলার গ্যারেজ, পানির মটর, কলাপসিবল গেটের নিচের অংশ পানি ছুঁইছুঁই করে। কিছুদিন আগে খিলগাঁয় এক দম্পতি কোনো বর্ষার এক রাতে বাইরে থেকে ফিরে কলাপসিবল গেটের তালা খুলতেই দুজনে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। বিদ্যুৎ লাইনের কোনো ত্রুটির কারণে মেঝেতে জমে থাকা পানির মাধ্যমে সবকিছু বিদ্যুতায়িত হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাসাবাড়ির নিচতলায় কোনো অবস্থাতেই যেন পানি জমে না থাকে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
বাসাবাড়ি, স্থাপনায় বিদ্যুতের মেইন সুইচটি সাধারণত সিলিং ছুঁইছুঁই উচ্চতায় বসানো হয়ে থাকে। ফলে টুল-চেয়ারে না দাঁড়িয়ে প্রয়োজনে কেউ চট করে তা বন্ধ করতে পারবে না। একজন মানুষ যেন দাঁড়ানো অবস্থায় সহজেই নাগালে পায়, মেইন সুইচটি সে উচ্চতায় লাগালে বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কম হবে।
বাসাবাড়ি, মিল ফ্যাক্টরিতে গ্যাস দুর্ঘটনায় কত মানুষ যে হতাহত হয়েছে তার ইয়াত্তা নেই। তারপরও গ্যাস দুর্ঘটনায় আমাদের করণীয়গুলো আমরা এখনো জানি না। কোনো স্থাপনায় গ্যাসলাইন প্রবেশের মুখে সাধারণত একটি রেগুলেটর বা সুইচ থাকে, যার মাধ্যমে ওই স্থাপনায় সরবরাহ বিচ্ছিন্ন বা চালু রাখা যায়। আমরা কতজন ওই ডিভাইসের অবস্থানটি চিনি? বলতে গেলে ওই স্থাপনায় বসবাসকারীদের দু’একজনের বেশি কেউই চিনে না। কিন্তু যে কোনো স্থাপনায় যে কোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ডে গ্যাস সরবরাহ লাইনটি বন্ধ করতে পারলে অগ্নিনিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। অথচ কোনো যন্ত্রপাতি ছাড়া খালি হাতে রেগুলেটরের ওই নবটি (বোতাম) কোনোভাবেই ঘোরানো সম্ভব নয়। প্রয়োজনের মুহূর্তে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করার প্রক্রিয়াটি সহজ করতে পারলে দুর্ঘটনা ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা কমতে পারে।
বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁয় গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহার বাড়ছে। আর এ সুযোগে এলপিজি গ্যাসের বাজারে ঢুকে পড়েছে অখ্যাত ও নিম্নমানের বহু কোম্পানি। বিক্রি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিম্নমানের পুরোনো সিলিন্ডার। অনেক অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের নিচতলায় গ্যাস সিলিন্ডার রেখে পাইপের মাধ্যমে বিভিন্ন ফ্ল্যাটে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যদি কোনো কারণে ওইসব সিলিন্ডারে বিস্ফোরণ ঘটে, তাহলে পুরো স্থাপনা ও বসবাসকারীদের কঠিন সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
রাস্তার পাশে নির্মীয়মাণ হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে নির্মাণসামগ্রী নিচে পড়ে জানমালের যেন ক্ষতি না হয় সেজন্য বিল্ডিংয়ের সঙ্গে অ্যাঙ্গেল লাগিয়ে নাইলন বা আয়রন নেট দিয়ে উপরের চারপাশ ঘেরাও করে দেওয়া হয়। অধিকাংশ স্থানে বিষয়টি দায়সারা গোছেরই হয়ে থাকে। এই নেট ক্ষুদ্র পাথর টুকরা ছাড়া অন্য কোনো কিছুকে আটকাতে পারে না। নির্মাণসামগ্রী মাথার উপরে পড়ে পথচারী আহত হয়েছে, মৃত্যুও হয়েছে কারও কারও। তাই যে কোনো স্থাপনা নির্মাণে জানমালের যথোপযুক্ত সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।
শহর এলাকায় মানুষ বাসাবাড়ীতে টবে ফল, ফুল, সবজির চাষ করছে। এটি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক, কিন্তু এগুলো যখন বারান্দা/ছাদের রেলিংয়ের উপর রাখা হয়, তখন ভীষণ ভয় লাগে। ওই টবগুলো অসাবধানতাবসত বা ঝড়-বৃষ্টিতে পথচারী বা কারও উপর পড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। যদি বারান্দার রেলিংয়ে টব রাখতেই হয়, তাহলে লোহার খাঁচা বানিয়ে দেয়ালের সঙ্গে ফিক্সড করে সেখানে রাখা যেতে পারে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে এ ধরনের শোভাবর্ধন অনুচিত। অনেক সময় দেখা যায়, রাস্তার পাশের স্থাপনাগুলোর ৩/৪/৫ তলার বারান্দা বা জানালা প্রায় ছুঁয়ে অতিক্রম করছে ৩৩ কেভির নিরাভরণ বৈদ্যুতিক তার। আবার কারও জানালা বা বারান্দা থেকে হাতের নাগালে বসানো হয়েছে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার। এসব বিষয়ে সতর্ক হলে বড় বড় দুর্ঘটনা থেকে মুক্তি মিলতে পারে।
কয়েকদিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মোটরসাইকেলের ২য় সিটে বসা একজন মহিলা একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় পড়ে গেলে তার ওড়না সেই গাড়ির চাকার সঙ্গে পেঁচিয়ে যায়। এরপরও গাড়িটি না থামানোয় প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ গাড়ির চাকায় আটকে থাকার কারণে মহিলার মৃত্যু হয়। রিকশা, অটোরিকশার চাকার সঙ্গে মহিলা যাত্রীর ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস লেগে মৃত্যুর ঘটনাও নেহায়েত কম নয়। কাপড়চোপড় বাইরে ঝুলতে থাকা অবস্থায় গাড়ির দরজা লাগিয়ে দেওয়ার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে, জীবনহানি হচ্ছে। এসব ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
রাজধানীর রাস্তায় বাস ও লেগুনায় যাত্রী ওঠানামার ব্যবস্থা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। রাস্তার মাঝখানে যানবাহনের গতি একটু কমিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হয়। এতে ডান-বাম দিয়ে সাঁই সাঁই করে চলা অন্যান্য গাড়ির ধাক্কায় অনেক যাত্রী জখম হচ্ছে, এমনকি মৃত্যুবরণও করছে। বাস স্টপেজ ছাড়া কোথাও কোনো চালক যেন যানবাহন থামাতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের পরিবহণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতদের একটু সতর্কতা ও যাত্রীবান্ধব সিদ্ধান্ত দুর্ঘটনার ব্যাপকতা কমিয়ে আনতে পারে।
রাজধানীর ৬৫ ভাগেরও বেশি মানুষ বাসে চলাচল করে। এসব বাসের ৯০ শতাংশই সিএনজিচালিত। খবরে জানা যায়, সিএনজিচালিত ৪৪ শতাংশ বাসের গ্যাস সিলিন্ডার মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে প্রায় দেড় লাখ যানবাহন চলাচল করছে। বছরে প্রায় দেড়শ গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। গাড়িতে সিএনজি ব্যবহারে অনেক টাকা সাশ্রয় হলেও ব্যবহাকারীদের অসচেতনতায় নিরাপত্তা ঝুঁকি এড়ানো যাচ্ছে না। প্রতিটি গ্যাস সিলিন্ডার ৫ বছর পরপর রিটেস্ট করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সরকারের নানা প্রচেষ্টার পরও সিএনজিচালিত গাড়ির মালিক-চালকরা রিটেস্টে আগ্রহী হচ্ছে না। ফলে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার সড়কে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। যানবাহনের প্রতিটি যন্ত্রপাতি ‘ফিট’ (যথোপযুক্ত) রাখা আমাদের নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই দরকার। আমরা কি এ ব্যাপারে একটু সতর্ক হতে পারি না?
দেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয় ৭ লাখ মানুষ। আর এতে প্রতিদিন অন্তত ১৬-২০ জন মানুষ মারা যাচ্ছে, বছর শেষে সেই হিসাব ৬-৭ হাজারে গিয়ে ঠেকছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাপে কাটা রোগীর অনেকেরই হাসপাতালে আনার পথে মৃত্যু ঘটে। অথচ বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সাপের কামড় হলো সর্বোচ্চ অবহেলিত ‘ট্রপিক্যাল ডিজিজ’। কোনো কোনো মফস্বল এলাকায় জনগণকে ২৪ ঘণ্টা, এমনকি নিজগৃহেও সাপের আতংক নিয়ে রাতে ঘুমাতে যেতে হয়। রাস্তাঘাটে চলা ফেরা ও ক্ষেত-খামারে ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। গ্রামাঞ্চলে অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য না হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে ওঝার শরণাপন্ন হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিভেনমের ব্যবস্থা করতে পারলে সাপে কাটা মানুষের মৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
ইদানীং ‘বজ পাত’ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অনেককে চিরদিনের জন্য করে দিচ্ছে পঙ্গু এবং অনেকের কেড়ে নিচ্ছে প্রাণ। আমাদের দেশে সাধারণত মার্চ-এপ্রিল থেকে শুরু করে আগস্ট-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঝড়-বৃষ্টির সময় মাঠ-ঘাট, ক্ষেত-খামার, খাল-বিলে কাজ করা মানুষ বজ পাতে মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। এ ব্যাপারে বর্ষাকালে মাঠ-ঘাটে কাজ করা শ্রমজীবী এবং ঘরের বাইরে চলাচলকারীদের একটু সতর্কতা জীবনহানি কমাতে সাহায্য করবে।
বিপদ বলেকয়ে আসে না এবং কোনো কোনো বিপদের মূল্য অত্যন্ত চড়া। তারপরও ছোট ছোট সতর্কতার ব্যাপারে আমরা উদাসীন থাকি। মনে রাখতে হবে, যে কারও ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের বিপদে নিরাপত্তা রক্ষার প্রাথমিক দায়িত্বটি কিন্তু তার নিজের ওপরেই বর্তায়।
সালাহ্উদ্দিন নাগরী : সরকারি চাকরিজীবী
