পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ার সম্ভাবনা ও শঙ্কা
jugantor
পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ার সম্ভাবনা ও শঙ্কা

  কার্ল বিল্ডট  

২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে যে যুদ্ধ বাধিয়েছেন এবং সে যুদ্ধের কারণে বিশ্বে রাশিয়ার ভাবমূর্তি যে মাত্রায় ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাতে করে এ আশঙ্কা অনেকের মনেই জাগবে যে, দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? সেক্ষেত্রে নিকট ভবিষ্যতে উদ্ভূত সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে প্রথম শঙ্কাটি হচ্ছে, পুতিন মারা গেলে ক্ষমতা দখলে এগিয়ে আসবে ক্রেমলিন হার্ডলাইনার বলে পরিচিতদের মধ্যে নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিকোলাই পাত্রুশেভের মতো ব্যক্তিরা। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হচ্ছে, নির্বাচন যদি হয়, সেক্ষেত্রে আলেক্সেই নাভালনির মতো পুতিনবিরোধী শক্তি আসতে পারে ক্ষমতায়। তবে বাস্তবে যেটাই ঘটুক, আমি অত্যন্ত একটি বিষয়ে নিশ্চিত, পুতিন যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, সে যুদ্ধ শেষ করে যেতে পারবেন না তিনি।

হতে পারে, বহু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিক্ষেত্রে বর্তমানে পুতিনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তবে এ ক্ষমতার বিন্যাস উলম্ব। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে উপর থেকে কীভাবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তার ওপর। এ পুরো কাঠামোটায় নিঃসন্দেহে ফাটল ধরবে, পুতিন যদি না থাকেন। পুতিন না থাকলে এখন যেসব স্বার্থ ও গোষ্ঠী মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে তখন। অন্য কোনো কারণে না হলেও এদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে অন্তত পুতিনের গোছানো বিন্যাস এলোমেলো হতে বাধ্য। কারণ পুতিনের ক্ষমতা কাঠামোর যে সবচেয়ে শক্তিশালী দিক অর্থাৎ একেবারে উপর থেকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, সেটিই আবার তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অবশ্য সংকটপূর্ণ সময় রুশ ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই ঘটেছে এটি। পুতিনের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আবারও ঘটবে। তবে ঠিক কোন রাজনৈতিক শক্তি পুতিনের পতনের পর রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।

ইউক্রেন বিষয়ে আমার অনুমান হচ্ছে, ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী হবে না রুশ অ্যাডভেঞ্চার। ক্রেমলিনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে শুরু থেকেই তেমন উৎসাহী ছিলেন না। ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রেমলিন নিরাপত্তা পরিষদের যে ভিডিও আমরা দেখেছি, তাতে করে বিষয়টি পরিষ্কার। এটি ঠিক, দীর্ঘ প্রায় এক বছর রুশ প্রচার দপ্তর থেকে বিরতিহীনভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে, তারপরও রুশ জনসাধারণের মাঝে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে সমর্থন যৎসামান্য। এক মতামত জরিপে দেখলাম, অধিকাংশ রুশ নাগরিকই বর্তমানে ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পক্ষে। ফলে পুতিনের পর যিনি বা যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা প্রথমেই চাইবে ইউক্রেনের সঙ্গে বিবাদ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে। অবশ্য এটিও বাস্তবতা যে, যদি কেউ তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়ও, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ সহসা পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া সহজ হবে না। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে আরও কঠিন। কারণ, ক্রেমলিনের ভেতর বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা পুতিনের চেয়েও কট্টর। পুতিন যদি ইউরোপ দখল করতে চান, তারা চান পুরো বিশ্বকে রাশিয়ার পদাবনত করতে। পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ায় এদের প্রকৃত ভূমিকা কী হয়, সেটি দেখার বিষয়। তবে আমি ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার শান্তির ব্যাপারে আশাবাদী মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, রুশ জনগণ চায় না যুদ্ধটা আর অগ্রসর হোক। দ্বিতীয়ত, উলম্ব শক্তিব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এখনকার ক্রেমলিনকে যতই শক্তিশালী দেখাক, পুতিন মারা গেলে ক্রেমলিনের বর্তমান সুবিধাভোগীরা নিজেদের সামলাতেই কূল পাবে না, ইউক্রেনের দিকে নজর দেওয়া পরের কথা। তাছাড়া রাশিয়ার ইতিহাস বলে, সংকটের সময় অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের প্রতি ঝোঁকে জনগণ। জাররা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের শেষ সময়ে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার প্রতি আগ্রহ দেখানো হয়েছিল জনসাধারণের পক্ষ থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ও দেখা গেছে একই আগ্রহ। আমার মনে হয়, পুতিনের পতনের পরও এই গণ চাহিদায় হেরফের হবে না।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে এটি বলা দরকার, পুতিনের বিরোধিতা করে গণতন্ত্রমনা রুশ রাজনীতিকরা এখনই জেল থেকে বেরিয়ে পুতিন সরকারকে ফেলে দিয়ে বিপ্লব শুরু করে দেবেন, তেমন শক্তিশালী তারা হয়ে উঠতে পারেননি কখনো। অবশ্য এ-ও ঠিক, তাদের প্রভাব অবহেলা করা যাবে না। এমনকি পুতিনের শক্ত দমন-নিপীড়ন সত্ত্বেও নাভালনির সমর্থকরা প্রায় ৩০ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন গত জাতীয় নির্বাচনে। রুশ তরুণ ও মফস্বলের বাসিন্দাদের মধ্যে নাভালনির জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। লাখ লাখ মানুষ অনুসরণ করে নাভালনির ইউটিউব চ্যানেল। তাদের রাজনৈতিক খবর সংগ্রহের প্রাথমিক মিডিয়া এটি। চ্যানেলটির অনুসরণকারীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। স্বাধীন রুশ সম্প্রচার মাধ্যমের প্রভাব বিচারে বর্তমানে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী।

পুতিন মারা গেলে যেটি ঘটার শঙ্কা সবচেয়ে কম, সেটি হচ্ছে রুশ ফেডারেশন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা। যদিও পুতিন মাঝেমধ্যে এর প্রতি ইঙ্গিত করেন; তার কারণ, আমার মনে হয় পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র দেশগুলোকে চাঙা রাখা। কার্যত রুশ ফেডারেশন ভেঙে যাক, সেটি খোদ পশ্চিমারাও চায় না। চেচনিয়া যখন ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, অনেকেই ধারণা করেছিলেন, রাশিয়াকে দমিয়ে রাখতে এবার চেচনিয়াকে স্বীকৃতি দেবে পশ্চিমারা। চেচনিয়া ইস্যু এখনো জাগরূক। অথচ পশ্চিমারা চেচেন স্বাধীনতাকে বৈধতা দেয়নি এখনো। আবার দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়ার তথাকথিত স্বাধীনতার বৈধতা ঘোষণাও একইভাবে ভিত্তিহীন। ২০২০ সালে ভ্লাদিভস্তকে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রতিবাদের কথা মনে আছে? অনেকে ওই বিক্ষোভে বেলারুশ ও ইউক্রেনের পতাকা দেখে ভেবেছিলেন রাশিয়ায় গণতন্ত্রের ভিত্তি বুঝি রচিত হলো। কিন্তু ওই প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের মনে এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি ছিল না যে, চীনের নিকটবর্তী ওই দুই অঞ্চলের গণতন্ত্র অর্জন বা রক্ষা ভূরাজনৈতিক কারণেও কঠিন।

সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন ক্রেমলিন ক্ষমতা বলয়ের অন্তর্গত একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। ২০২৪ সালে দেশটিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন থেকেই চিন্তাভাবনা করা হবে, এটি স্বাভাবিক। পুতিন তো আর অমর নন। তাছাড়া চূড়ান্ত বিচারে রাশিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হবে রুশদের দ্বারাই। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে যেসব সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হবে, সেগুলোও একান্তই তাদের। তবে এর মানে অবশ্যই এই নয় যে, পশ্চিমারা রুশ রাজনীতির অভ্যন্তরে বহিস্থ প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকবে। বরং আমি মনে করি, পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই রুশ ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে সেখানকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরদার করতে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : জায়েদ ইবনে আবুল ফজল

কার্ল বিল্ডট : সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ার সম্ভাবনা ও শঙ্কা

 কার্ল বিল্ডট 
২৪ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে যে যুদ্ধ বাধিয়েছেন এবং সে যুদ্ধের কারণে বিশ্বে রাশিয়ার ভাবমূর্তি যে মাত্রায় ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাতে করে এ আশঙ্কা অনেকের মনেই জাগবে যে, দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কী? সেক্ষেত্রে নিকট ভবিষ্যতে উদ্ভূত সম্ভাব্য পরিস্থিতির মধ্যে প্রথম শঙ্কাটি হচ্ছে, পুতিন মারা গেলে ক্ষমতা দখলে এগিয়ে আসবে ক্রেমলিন হার্ডলাইনার বলে পরিচিতদের মধ্যে নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিকোলাই পাত্রুশেভের মতো ব্যক্তিরা। দ্বিতীয় সম্ভাবনা হচ্ছে, নির্বাচন যদি হয়, সেক্ষেত্রে আলেক্সেই নাভালনির মতো পুতিনবিরোধী শক্তি আসতে পারে ক্ষমতায়। তবে বাস্তবে যেটাই ঘটুক, আমি অত্যন্ত একটি বিষয়ে নিশ্চিত, পুতিন যে যুদ্ধ শুরু করেছেন, সে যুদ্ধ শেষ করে যেতে পারবেন না তিনি।

হতে পারে, বহু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিক্ষেত্রে বর্তমানে পুতিনের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে। তবে এ ক্ষমতার বিন্যাস উলম্ব। এটি পুরোপুরি নির্ভর করে উপর থেকে কীভাবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে তার ওপর। এ পুরো কাঠামোটায় নিঃসন্দেহে ফাটল ধরবে, পুতিন যদি না থাকেন। পুতিন না থাকলে এখন যেসব স্বার্থ ও গোষ্ঠী মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে তখন। অন্য কোনো কারণে না হলেও এদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বে অন্তত পুতিনের গোছানো বিন্যাস এলোমেলো হতে বাধ্য। কারণ পুতিনের ক্ষমতা কাঠামোর যে সবচেয়ে শক্তিশালী দিক অর্থাৎ একেবারে উপর থেকে শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ, সেটিই আবার তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। অবশ্য সংকটপূর্ণ সময় রুশ ইতিহাসে নতুন কিছু নয়। প্রায় নিয়মিত বিরতিতেই ঘটেছে এটি। পুতিনের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আবারও ঘটবে। তবে ঠিক কোন রাজনৈতিক শক্তি পুতিনের পতনের পর রাশিয়ায় ক্ষমতা দখল করবে, সেটি এখন দেখার বিষয়।

ইউক্রেন বিষয়ে আমার অনুমান হচ্ছে, ইউক্রেনে দীর্ঘস্থায়ী হবে না রুশ অ্যাডভেঞ্চার। ক্রেমলিনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বিষয়ে শুরু থেকেই তেমন উৎসাহী ছিলেন না। ২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ক্রেমলিন নিরাপত্তা পরিষদের যে ভিডিও আমরা দেখেছি, তাতে করে বিষয়টি পরিষ্কার। এটি ঠিক, দীর্ঘ প্রায় এক বছর রুশ প্রচার দপ্তর থেকে বিরতিহীনভাবে প্রচারণা চালানো হয়েছে, তারপরও রুশ জনসাধারণের মাঝে ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যাপারে সমর্থন যৎসামান্য। এক মতামত জরিপে দেখলাম, অধিকাংশ রুশ নাগরিকই বর্তমানে ইউক্রেনের সঙ্গে শান্তি আলোচনার পক্ষে। ফলে পুতিনের পর যিনি বা যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা প্রথমেই চাইবে ইউক্রেনের সঙ্গে বিবাদ দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে। অবশ্য এটিও বাস্তবতা যে, যদি কেউ তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়ও, ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ সহসা পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া সহজ হবে না। যুদ্ধ-পূর্ববর্তী স্থিতাবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে আরও কঠিন। কারণ, ক্রেমলিনের ভেতর বেশকিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি রয়েছেন, যারা পুতিনের চেয়েও কট্টর। পুতিন যদি ইউরোপ দখল করতে চান, তারা চান পুরো বিশ্বকে রাশিয়ার পদাবনত করতে। পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ায় এদের প্রকৃত ভূমিকা কী হয়, সেটি দেখার বিষয়। তবে আমি ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার শান্তির ব্যাপারে আশাবাদী মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, রুশ জনগণ চায় না যুদ্ধটা আর অগ্রসর হোক। দ্বিতীয়ত, উলম্ব শক্তিব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এখনকার ক্রেমলিনকে যতই শক্তিশালী দেখাক, পুতিন মারা গেলে ক্রেমলিনের বর্তমান সুবিধাভোগীরা নিজেদের সামলাতেই কূল পাবে না, ইউক্রেনের দিকে নজর দেওয়া পরের কথা। তাছাড়া রাশিয়ার ইতিহাস বলে, সংকটের সময় অধিকতর প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের প্রতি ঝোঁকে জনগণ। জাররা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তাদের শেষ সময়ে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচনার প্রতি আগ্রহ দেখানো হয়েছিল জনসাধারণের পক্ষ থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সময়ও দেখা গেছে একই আগ্রহ। আমার মনে হয়, পুতিনের পতনের পরও এই গণ চাহিদায় হেরফের হবে না।

গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কথা যদি বলতে হয়, তাহলে এটি বলা দরকার, পুতিনের বিরোধিতা করে গণতন্ত্রমনা রুশ রাজনীতিকরা এখনই জেল থেকে বেরিয়ে পুতিন সরকারকে ফেলে দিয়ে বিপ্লব শুরু করে দেবেন, তেমন শক্তিশালী তারা হয়ে উঠতে পারেননি কখনো। অবশ্য এ-ও ঠিক, তাদের প্রভাব অবহেলা করা যাবে না। এমনকি পুতিনের শক্ত দমন-নিপীড়ন সত্ত্বেও নাভালনির সমর্থকরা প্রায় ৩০ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন গত জাতীয় নির্বাচনে। রুশ তরুণ ও মফস্বলের বাসিন্দাদের মধ্যে নাভালনির জনপ্রিয়তা ক্রমবর্ধমান। লাখ লাখ মানুষ অনুসরণ করে নাভালনির ইউটিউব চ্যানেল। তাদের রাজনৈতিক খবর সংগ্রহের প্রাথমিক মিডিয়া এটি। চ্যানেলটির অনুসরণকারীর সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। স্বাধীন রুশ সম্প্রচার মাধ্যমের প্রভাব বিচারে বর্তমানে এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী।

পুতিন মারা গেলে যেটি ঘটার শঙ্কা সবচেয়ে কম, সেটি হচ্ছে রুশ ফেডারেশন ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা। যদিও পুতিন মাঝেমধ্যে এর প্রতি ইঙ্গিত করেন; তার কারণ, আমার মনে হয় পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মিত্র দেশগুলোকে চাঙা রাখা। কার্যত রুশ ফেডারেশন ভেঙে যাক, সেটি খোদ পশ্চিমারাও চায় না। চেচনিয়া যখন ১৯৯১ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল, অনেকেই ধারণা করেছিলেন, রাশিয়াকে দমিয়ে রাখতে এবার চেচনিয়াকে স্বীকৃতি দেবে পশ্চিমারা। চেচনিয়া ইস্যু এখনো জাগরূক। অথচ পশ্চিমারা চেচেন স্বাধীনতাকে বৈধতা দেয়নি এখনো। আবার দূরপ্রাচ্য ও সাইবেরিয়ার তথাকথিত স্বাধীনতার বৈধতা ঘোষণাও একইভাবে ভিত্তিহীন। ২০২০ সালে ভ্লাদিভস্তকে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রতিবাদের কথা মনে আছে? অনেকে ওই বিক্ষোভে বেলারুশ ও ইউক্রেনের পতাকা দেখে ভেবেছিলেন রাশিয়ায় গণতন্ত্রের ভিত্তি বুঝি রচিত হলো। কিন্তু ওই প্রতিবাদে অংশগ্রহণকারীদের মনে এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি ছিল না যে, চীনের নিকটবর্তী ওই দুই অঞ্চলের গণতন্ত্র অর্জন বা রক্ষা ভূরাজনৈতিক কারণেও কঠিন।

সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় এমনটি মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে, পুতিন-পরবর্তী রাশিয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এরই মধ্যে চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন ক্রেমলিন ক্ষমতা বলয়ের অন্তর্গত একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। ২০২৪ সালে দেশটিতে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন থেকেই চিন্তাভাবনা করা হবে, এটি স্বাভাবিক। পুতিন তো আর অমর নন। তাছাড়া চূড়ান্ত বিচারে রাশিয়ার ভাগ্য নির্ধারিত হবে রুশদের দ্বারাই। ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলে যেসব সুবিধা-অসুবিধা তৈরি হবে, সেগুলোও একান্তই তাদের। তবে এর মানে অবশ্যই এই নয় যে, পশ্চিমারা রুশ রাজনীতির অভ্যন্তরে বহিস্থ প্রভাব বিস্তার থেকে বিরত থাকবে। বরং আমি মনে করি, পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই রুশ ক্ষমতা কাঠামোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখে সেখানকার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরদার করতে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে ভাষান্তর : জায়েদ ইবনে আবুল ফজল

কার্ল বিল্ডট : সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন