শতফুল ফুটতে দাও
ইতিহাসের অন্তর্নিহিত শক্তি উপেক্ষিত সত্যকেও মূলধারায় নিয়ে আসে
Advertisement
ড. মাহবুব উল্লাহ্
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্বকীয় ভূমিকা গ্রহণযোগ্য করতে যেসব দোহাই পাড়া হয় তার মধ্যে ইতিহাস বিকৃতি অন্যতম। ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অবস্থানকে পূত-পবিত্র করার চেষ্টা চালায়।
ইতিহাস বিকৃতি প্রমাণ করার জন্য যে গবেষণা হওয়া উচিত, সেই গবেষণার ফলাফল হাতে না পেয়ে যখন ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলা হয়, তখন আমাদের জাতীয় পরিচয় প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং নব-প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। যে ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি তা কী করে বিকৃত করা হচ্ছে বুঝে ওঠা কঠিন। ইতিহাসের দোহাই দিয়ে কাউকে দেবতার তুল্য করা এবং অন্যজনকে অশুর তুল্য করার চেষ্টা জাতিকে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
যারা ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলেন, তারা কি ইতিহাস বিকৃতির কোনো সংজ্ঞা দিয়েছেন? ইতিহাস নিয়ে একটি মূল্যবান মন্তব্য হচ্ছে, History is written by the victors. এর অর্থ হলো, ইতিহাস রচিত হয় বিজয়ীদের দ্বারা। বিজয়ীরা যখন ইতিহাস রচনা করে, তখন তারা নিজেদের সব থেকে শুদ্ধ বলে আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়। ইতিহাস শুধু বিজয়ীরা রচনা করবে এবং বিজিতদের ন্যারেটিভটি জানার চেষ্টা করা হবে না, এমন অবস্থায় সঠিক ইতিহাস রচিত হচ্ছে দাবি করা যায় না।
১৯৭১-এ বাংলাদেশের জনগণ যে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং মরণপণ যুদ্ধ করেছিল, সে সম্পর্কে অন্তত তিনটি ন্যারেটিভ বা বয়ান চালু আছে। এ বয়ানগুলো রচিত হচ্ছে উপমহাদেশের তিনটি রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে।
রাষ্ট্রগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান। অতি সংক্ষেপে বাংলাদেশ পক্ষের বয়ান হলো, বাংলাদেশের বীর জনগণ মুক্তিযুদ্ধ করে পাকিস্তানের শাসন, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি অর্জন করেছে।
পাকিস্তানের বয়ানটি হলো, তার চির শত্রু ভারত ষড়যন্ত্র ও যুদ্ধ করে পাকিস্তানের অঙ্গহানি ঘটিয়েছে। ভারতীয় বয়ানের মূল কথা হলো, ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভয়াবহ দুর্দিনে তাদের জনগণের হয়ে যুদ্ধ করেছে এবং একটি মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। আমি অনেক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীকে বলতে শুনেছি, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটি ভারত করেছে এবং বাংলাদেশের বাঙালিরা তেমন কিছু করেনি। ভারত তার মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে। নিজস্ব বয়ান তুলে ধরতে ভারত ও পাকিস্তান যত কিছু করেছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণাগ্রন্থ রচিত হয়নি। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা বেশকিছু গ্রন্থ রচনা করেছে, যেগুলো আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশকরা প্রকাশ করেছেন। তাদের রচিত বইগুলো পড়লে মনে হবে লেখক কত আন্তরিকতার সঙ্গে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করতে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এক সমরনায়ক অন্য সমরনায়কদের ভুল-ত্রুটি ও ব্যর্থতা তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।
যাই হোক, বাংলাদেশ তার অভ্যুদয়ের ৫০ বছর পূর্তি বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করেছে। এ উৎসব জাতিকে কতটা যথাযোগ্য নির্দেশনা দিয়েছে তা নিয়ে কারও যদি দুঃখ হয়, তাহলে এটাকে অন্যায় দুঃখ প্রকাশ বলা যায় না। বাংলাদেশের ইতিহাস বিকৃতির রাজনীতি তখনই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে, যখন সত্যানুসন্ধানী গবেষণার মাধ্যমে সরল সত্যগুলো উদ্ঘাটিত হবে। তবে বাংলাদেশে খাঁটি সত্যানুসন্ধানী গবেষণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ হারিয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারে আমি ড. আকবর আলি খানের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তিনি আমাকে জানিয়েছেন, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হওয়ার পর তিনি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ক্যাবিনেট পেপার্সগুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশের ইতিহাসের এ গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলো খুঁজে পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছে কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এগুলো সরিয়ে ফেলেছে। আমরা হয়তো আর কখনো এগুলোর সন্ধান পাব না। এটা একটা ট্র্যাজেডি।
ইতিহাস বিকৃতির অন্য একটি উৎস হলো ইতিহাসের কোনো উপাদানের প্রতি অবহেলা কিংবা বিস্মৃত হওয়া। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনাও ঘটেছে। অবহেলা অথবা বিস্মৃতির কারণে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভকে যখন অস্তিত্বহীন ভাবা হয়, তখন ইতিহাস বিশ্লেষণ ভ্রান্ত উপসংহারের জন্ম দিতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যখন উৎপাদনের প্রাচীন হাতিয়ার গৃহনির্মাণসামগ্রী, প্রার্থনাগার, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি আবিষ্কার হয়, তখন আমরা আবিষ্কৃত ইতিহাসের কথা বলি।
এ আবিষ্কারের কিছুদিন পর যদি কোনো শিলালিপি বা দেয়ালগাত্রে খোদিত ছবি আবিষ্কৃত হয়, তখন নতুন ব্যাখ্যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের বৈশিষ্ট্য এমন, যাতে করে এ ধরনের নমনীয় ইতিহাস রচনার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ইনকা সভ্যতার ক্ষেত্রে এখনো নতুন নতুন আলামত আবিষ্কৃত হচ্ছে এবং নতুন নতুন বয়ানও দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। তবে এসব ক্ষেত্রে যে বিকৃত হয়, তা যুক্তি গ্রাহ্যতার সীমানা ছাড়িয়ে যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন ভুলে যাওয়া মানুষ অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। তার সম্পর্কে অনেক বছর ধরে বলতে গেলে কোনো আলোচনাই হয় না। একজন মানুষ আমাদের ইতিহাসে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন, সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট মহলের কোনো সচেতনতা লক্ষ করা যায় না। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। কোন্ স্বার্থপরতার কারণে এ অবহেলা তা অনুসন্ধান করে বের করে আনা দরকার। এ মানুষটি হলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। এদেশের কোনো দৈনিকে তার সম্পর্কে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে বলে মনে করতে পারছি না। তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত। এবারের শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করে বণিক বার্তার বিশেষ আয়োজনটি করা হয়েছে শামসুল হককে নিয়ে। পণ্ডিতপ্রবর বদরুদ্দীন উমর এ উপলক্ষ্যে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। এ সাক্ষাৎকারের শিরোনাম হলো ‘বিস্মৃত শামসুল হক’। সাক্ষাৎকারটি ইন্ট্রো হিসাবে লেখা হয়েছে ‘দেশভাগ ও তার পরবর্তী সময়ে পূর্ববঙ্গের রাজনীতিতে উজ্জ্বল এক চরিত্র শামসুল হক। ছাত্রজীবনেই জড়িয়ে পড়েছিলেন রাজনীতিতে। ১৯৪৬ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে পূর্ব বাংলায় মসলিম লীগের সাফল্যে বড় ভূমিকা ছিল তার। দেশভাগের পর সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন ভাষা আন্দোলনে। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে আয়োজিত এক সভায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ পুনর্গঠিত হলে তিনি তার সদস্য হন। সে বছর ২৪ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বৈঠকে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন। ১৯৪৯ সালের এপ্রিলে টাঙ্গাইলের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগ নেতা করটিয়ার জমিদার পরিবারের সন্তান খুররম খান পন্নীকে পরাজিত করেন শামসুল হক। এর মাধ্যমে সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হলে তিনি দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু আমতলায় ছাত্ররা তা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলে শামসুল হক তাতে একাত্মতা প্রকাশ করেন। পরদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে ২১-এর শহিদদের জন্য যে গায়েবি জানাজা অনুষ্ঠিত হয় তাতে শামসুল হক ভূমিকা রাখেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে শামসুল হকসহ আরও অনেক নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। মার্চের প্রথম সপ্তাহে তিনি গ্রেফতার হন। কারাগারে বন্দি অবস্থায় শামসুল হকের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। তার শেষজীবন ছিল ট্র্যাজিক, স্বজনহীন। ১৯৬৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।’
বদরুদ্দীন উমর তার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলের বিখ্যাত জমিদার পরিবারের সন্তান খুররম খান পন্নী ছিলেন মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হলো। খুররম খান পন্নীর সভায় সাধারণ মানুষ তেমন যেত না। বদরুদ্দীন উমর আরও জানিয়েছেন, শামসুল হকের মিটিংয়ে প্রচুর জনসমাগম হতো। মুসলিম লীগ অনেক টাকাপয়সা খরচ করেছিল। অন্যদিকে শামসুল হকের কোনো টাকা নেই। লোকজনের কাছ থেকে টাকা তুলে ওই নির্বাচনে ব্যয় করা হয়েছিল। এ দায়িত্ব ছিল কুমিল্লার খন্দকার মোশতাক আহমেদের ওপর। সাকুল্যে খরচ হয়েছিল ১ হাজার ২০০ টাকা। সবাই নিজেদের পয়সায় গাড়ি ভাড়া করে সেখানে যেত, প্রচারণা চালাত। শামসুল হকের নিজের এক পাইপয়সাও ছিল না। মুসলিম লীগের প্রতি মানুষ ছিল চূড়ান্ত বিতশ্রদ্ধ। এরই একটি প্রতিফলন নির্বাচনে ঘটেছে। শামসুল হক তখন বিপুল ভোট পেয়েছিলেন। খুররম খান পন্নীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। শামসুল হক জিতেছিলেন। কিন্তু নুরুল আমিন সরকার তাকে অ্যাসেম্বলিতে বসতে দেয়নি।
বদরুদ্দীন উমরের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি মিটিং হয়েছিল। আবুল হাশেম সাহেব সেখানে সভাপতি ছিলেন। রাতভর অনেক আলোচনা হয়েছিল। অধিকাংশের ভোটে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা কমিটির পক্ষ থেকে ছাত্রদের এ সিদ্ধান্ত জানানোর দায়িত্ব দেওয়া হলো শামসুল হককে। শামসুল হক আমতলায় গিয়ে সর্বদলীয় কমিটির অবস্থা ব্যাখ্যা করলেন। তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। আমতলার সে মিটিংয়ে বদরুদ্দীন উমরও উপস্থিত ছিলেন। ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিল। তখন শামসুল হক বললেন, যেহেতু সর্বসম্মতিক্রমে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয়েছে সুতরাং আমিও এর সঙ্গে একমত। তারপর তিনি জেলে গেলেন। জেলে থাকা অবস্থাতেই তিনি মনোরোগে আক্রান্ত হলেন। জেল থেকে মুক্তি পেয়েও তিনি সুস্থ হলেন না। তিনি হয়ে গেলেন একজন ঠিকানাবিহীন মানুষ। এর-ওর কাছ থেকে তিনি কিছু চেয়েচিন্তে খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তার পরিধেয় বস্ত্র ছিল ছিন্ন ও ময়লা। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন তা জানার চেষ্টা করা হয়নি। আপনজনেরা তাকে অবহেলার নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছেন। জানা যায়, ১৯৬৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কোথায় তার মৃত্যু হয়েছিল এবং কোথায় তার কাফন-দাফন হয়েছিল, সেসব ঘিরে ধোয়াশা আজও বিদ্যমান। এতগুলো বছর পর একটি দৈনিক যখন ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস উপলক্ষ্যে বিষয়টিকে মূল উপজীব্য করে, তখন মনে হয় ইতিহাসের গতিপ্রবাহে কোনো সত্যকে উপেক্ষা করা হলেও ইতিহাস তার অন্তর্নিহিত শক্তির কারণে এ সত্যকে হারিয়ে যেতে দেয় না। মতলবি ইতিহাসে কাউকে ছোট করা কিংবা বড় করার চেষ্টা করা হলেও অনাগত দিনে সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায় এবং মতলবি ইতিহাস পরিত্যক্ত বলে বিবেচিত হয়।
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ
