অর্থ পাচার রোধের পাশাপাশি সরকারের ব্যয়ও কমাতে হবে

 আবু আহমেদ 
১৪ মার্চ ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অর্থ
প্রতীকী ছবি

একটি জাতীয় দৈনিক থেকে জানা যায়, সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড়। ২০২০ সালের এক হিসাবে এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৬ কোটি ২৯ লাখ ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ২৯১ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।

বাংলাদেশ থেকে বিভিন্নভাবে অবৈধ উপায়ে পাচার হওয়া অর্থ সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে জমা হয়। আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরাও ওই দেশটিতে অর্থ জমা রাখেন। তাই দেশটির ব্যাংকে বাংলাদেশিদের বৈধ-অবৈধ উভয় ধরনের অর্থই রয়েছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা না রেখে সুইস ব্যাংকগুলোতে টাকা রাখার কারণ কী? কারণটি হলো, সুইস ব্যাংকগুলো সাধারণত আমানতকারীদের অর্থের উৎস গোপন রাখে। আর এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকরা বিভিন্ন সুইস ব্যাংকে অর্থ জমা রাখেন।

সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের অর্থ পাচার সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে একটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেটি হলো, বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ কর পরিশোধের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনতে দায়মুক্তি দেওয়া।

তার এ সম্ভাব্য উদ্যোগের প্রতিক্রিয়ায় বিশেজ্ঞরা মন্তব্য করেছিলেন, সরকারের এ ধরনের উদ্যোগে বৈদেশিক মুদ্রার মজুত, বিনিময় হার ও রাজস্ব সংগ্রহে কোনো ইতিবাচক প্রভাব পড়বে না। বরং এ ধরনের দায়মুক্তিতে দুর্নীতি ও টাকা পাচার আরও উৎসাহিত হবে।

আসলে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার আশা করা একটি ইলিউশন মাত্র। আর এ ধরনের মিথ্যা আশার মধ্যে থাকাও ঠিক নয়। আমাদের দেশ থেকেই যে শুধু টাকা পাচার হচ্ছে, তা নয়। পাকিস্তান থেকে হচ্ছে, মিসর থেকে হচ্ছে, ভারত থেকে হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেই হচ্ছে। তবে কোনো কোনো দেশ থেকে টাকা পাচার কখনো কখনো বেশি পরিমাণে হয়, আবার কোনো কোনো দেশে একটু কম হয়। পার্থক্য এখানেই।

সাধারণত দেশে যখন কোনো রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয় অথবা সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়, তখন জোরেশোরে টাকা পাচার হয়। দেশের সাধারণ মানুষ চায় রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে একটা শান্তিময় পরিবেশ। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে দেশ থেকে টাকা পাচার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, দেশে শান্তিময় পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কী কী করা দরকার? কী কী করা দরকার, সেটা সরকারের বোঝা উচিত। যারা রাজনীতি করেন, তাদেরও বোঝা উচিত। কারণ দেশটা তো সবার। সুতরাং সবকিছু বুঝেশুনে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একটা অবস্থানে আমাদের পৌঁছাতে হবে। সেটি না হলে অর্থাৎ যখন আমরা নিজেরা কোনো একটা ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসতে পারব না, তখনই তো বিদেশিরা আমাদের এ ব্যাপারগুলো নিয়ে মাথা ঘামাবে।

আর আমাদের দেশের নিজস্ব ব্যাপারগুলোতে বিদেশিদের মাথা ঘামানো কি উচিত হবে? কখনই উচিত হবে না। বিশ্বের যে কোনো একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র স্বৈরতান্ত্রিক হলেও তাকে নিয়ে কেউ বেশি মাথা ঘামায় না। তাই আমাদেরও একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাতারে থাকা উচিত। আর এজন্য চাই একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।

বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন ধরে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রতীক্ষা করছে। সেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গত এক দশকে হয়নি। অনেকে ভোট দিয়েছেন কখন, সেটাই ভুলে গেছেন। এখন একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে। তাহলেই দেশের কল্যাণ হবে এবং দেশের অর্থনীতির জন্য তা ভালো হবে।

আমাদের একটা কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে কেউ বিনিয়োগ করতে চায় না। আর পর্যাপ্ত মাত্রায় বিনিয়োগ না হলে দেশ অর্থনৈতিকভাবে স্থবির হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, দেশে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে বিদেশে অর্থ পাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। কারণ আমাদের টাকার তেমন দাম নেই। দাম রয়েছে মার্কিন ডলারের।

বাংলাদেশ ইচ্ছা করলে যত খুশি টাকা ছাপাতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে তো বিদেশ থেকে পণ্য কেনা যাবে না। যে লোক অর্থ পাচার করছে, তার কাছেও এ টাকার দরকার নেই। এ টাকার দরকার আছে ডলার কেনার জন্য। কিন্তু টাকা তো পাচারকারী বাইরে নেবে না।

অনেক সময় বলা হয়, অর্থ পাচারকারী ১০০ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। আসলে বিষয়টা তা নয়, সে নিয়েছে দেশি টাকা কনভার্ট করে ডলার। আর যখনই দেশের টাকা কনভার্ট করে পাচার হয়ে যায়, তখনই ডলারের চাহিদা বেড়ে এর দাম বৃদ্ধি পায়। ডলারের দাম বাড়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামও বেশি, যেহেতু মূল্যস্ফীতি হচ্ছে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুবই কম। বিনিয়োগের জন্য দেশের শেয়ার বাজার আছে। কিন্তু সেটাও প্রায় অচল। আবার শেয়ার বাজার থেকে বিদেশিরা তাদের তল্পিতল্পা গুটিয়ে সরে যাচ্ছে। তাদের আমরা ধরে রাখতে পারছি না। এটি আমাদের ব্যর্থতা। সুতরাং শেয়ার বাজারের জৌলুস অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একটা ফ্লোর প্রাইস দিয়ে তারা চুপচাপ বসে আছে। এ কারণে ওটা এখন প্রাণহীনই বলা যায়। ওটার দিকে কেউ এখন মনোযোগও দিচ্ছে না।

২০২৩ সাল বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য একটা চ্যালেঞ্জের বছর। বাংলাদেশ সরকার রিজার্ভ ঠিক রাখতে যে ব্যয় সংকোচন নীতি অবলম্বন করেছে, সেটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। যেমন, সরকারের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নতুন প্রকল্প হাতে না নেওয়া, নতুন প্রকল্পে ফাইন্যান্সিং না করা ইত্যাদি। তবে এ সংকোচন নীতিটি দুই বছর আগে নিতে পারলে আরও ভালো হতো। অর্থনৈতিকভাবে আরেকটু এগোতে পারত দেশ। গত দুই বছরে সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে বহু টাকা ঋণ করে বসে আছে।

প্রশ্ন হলো, সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে কেন এত টাকা ঋণ করেছে? চলমান অনেক প্রকল্পই অর্ধেক হওয়ার পর স্থবির হয়ে পড়ে ছিল, সেগুলো সম্পন্ন করতে সরকারকে ঋণ করতে হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অর্ধেক হওয়া প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির পরিমাণ বাড়ছে।

আর এসব প্রকল্পে দুর্নীতি বাড়ার কারণে অর্থনৈতিকভাবে স্বাভাবিক গতি হারাচ্ছে দেশ। এজন্য উচিত ছিল সরকারের আকার না বাড়ানো। ওভার সাইজ গভর্নমেন্ট নিয়ে কেউ বলে না, আমি বলছি। নব্বইয়ের দশকের দিকে বিশ্বব্যাংক সব সময় বাংলাদেশ সরকারের আকার ছোট করার কথা বলত। একবার-দুবার নয়, বহুবার বলেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ কোনো কর্ণপাত করেনি। বিশ্বব্যাংক এখন আর বলে না। আমাদের উচিত এ বিষয়টিকে সামনে আনা। কারণ, বাংলাদেশ সরকারের আকার অনেক বড়। এত বড় সরকার নিয়ে দেশ চালাতে গেলে রাজস্ব যতই সংগৃহীত হোক, সেটা খেয়ে ফেলে। রেভিনিউ বাজেটেও চলে যাচ্ছে ৬৬ পার্সেন্টের মতো। হাতে থেকে যাচ্ছে ৩০ পার্সেন্ট।

প্রতিবছর যখন বাজেট হয়, তখন সংগৃহীত রাজস্ব অধিক সংখ্যায় থাকা সরকারের করণিক, আমলা, অফিসার, সচিব এদের পেছনে চলে যায়। তাই এত বড় আকারের সরকার নিয়ে বাংলাদেশের ভাবা উচিত। পৃথিবীতে আমাদের চেয়েও অনেক বেশি জিডিপির দেশ রয়েছে। তাদের তো আমাদের মতো এত মন্ত্রী-মিনিস্টার নেই। করণিক, সচিব, আমলাও নেই। তারা তো সরকারের আকার ছোট রেখে বেশ চলছে। তাহলে আমরা কেন পারব না?

আমাদের দেশের সব প্রাইমারি শিক্ষা জাতীয়করণ করা হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় শিক্ষকরা না পড়িয়ে বেতন নিচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই কাম্য ছিল না। এ ব্যাপারে মনিটরিং ব্যবস্থাও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। শিক্ষকরা পড়াক বা না পড়াক, বেতন তো দিতে হবে। সরকারের খরচ তো হচ্ছেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও লেখাপড়ার মান নিম্নগামী। কারণ বসে বসে বেতন নেওয়া, রাজনীতি, দলীয়করণ ইত্যাদি বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই চলছে।

স্বাস্থ্য খাতের অবস্থাও অনেকটা একই রকম। বলতে গেলে এখানে হরিলুট হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশ কীভাবে এগোবে? ট্যাক্স কত আর বাড়ানো সম্ভব! মানুষ আর কত দেবে? এজন্য সরকারকে অনুরোধ করব সরকারের আকার ছোট করার জন্য। রাইটে-লেফটে সরকারের আকার যে এত বাড়ছে, পজিশন নেই তারপরও প্রমোশন দেওয়া হচ্ছে-এর তো একটা আর্থিক ক্ষতি আছে।

একটা প্রজাতান্ত্রিক দেশে যতটা প্রয়োজন, তার থেকে তিনগুণ বেশি নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। যুগ্ম সচিবের কথা বলেন, সেখানেও চারগুণ বেশি। যতজন জজ দরকার, আছে তার থেকে তিনগুণ বেশি। যে কারণে আমাদের অর্থনীতিতে আমরা কখনই দক্ষ হতে পারছি না। সমাজব্যবস্থা দক্ষ না হলে, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দক্ষ না হলে দেশে যেটুকু উন্নতি আমরা করতে পেরেছি, সেটিও ধরে রাখা সম্ভব হবে না। ধরেই নিতে হবে, এর থেকে বেশি বোধহয় আমাদের কপালে নেই।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন