Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

মিঠে কড়া সংলাপ

মূল্যবৃদ্ধি কি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে?

Advertisement

Icon

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মূল্যবৃদ্ধি কি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে?

Advertisement

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অসহনীয় এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে সারা দেশের মানুষের যাপিতজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের লোকজন নিদারুণ দুঃখ-কষ্টে একেকটি দিন পার করে চলেছেন; তাদের পরিবারের সদস্যদের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ প্রতিদিনই ভোগ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ যে পণ্য যে দরে কিনতে পারা যাচ্ছে, পরদিন বাজারে গেলে সেই একই পণ্য বেশি দাম দিয়ে ক্রেতাদের কিনতে হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে বিক্রেতাদের বক্তব্য হলো-‘এসব দ্রব্য আগের দিনের তুলনায় আজ বাড়তি দামে তাদের কিনে আনতে হয়েছে’। যদিও তাদের এসব কথা বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কোনো কারণ নেই। কিন্তু এসব নিয়ে তাদের সঙ্গে যুক্তিতর্ক করারও সুযোগ নেই বা এসব করেও কোনো লাভ নেই। কারণ, এ ক্ষেত্রে বিক্রেতা বা ব্যবসায়ীদের কথা বা বক্তব্যই ফাইনাল। ক্রেতা বা ভোক্তা সাধারণ ব্যবসায়ীদের চাহিদামতো মূল্য পরিশোধ না করলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাওয়া যায় না; কখনো কখনো এসব দ্রব্য বাজার থেকে উধাও হয়ে যায়; ফলে ক্রেতাসাধারণের ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। আর বর্তমান বাজারব্যবস্থায় এভাবেই একশ্রেণির সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী দেশের মানুষের পকেট কেটে চলেছে; বাজার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই অতি মুনাফা হিসাবে শত শত কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে।

আমাদের দেশের অতি মুনাফালোভী একশ্রেণির ব্যবসায়ী ব্যবসার নামে যা করে চলেছেন, তাকে ব্যবসা বলা চলে না। কারণ, ব্যবসার নামে তারা দেশের মানুষকে জিম্মি করে টাকা রোজগার করে থাকেন! সাধারণ বা স্বাভাবিক মুনাফা অপেক্ষা দুই-তিনগুণ মুনাফা না করা পর্যন্ত তারা ক্ষান্ত হন না। যে কোনো ধরনের অতি মুনাফা লাভ করাই তাদের উদ্দেশ্য হওয়ায় শাকসবজি থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, ডিম, চাল, ডাল, তেল, ওষুধপত্র, ইত্যাদি ক্রয়ের সব ক্ষেত্রেই ভোক্তা সাধারণকে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। এ শ্রেণির ব্যবসায়ীর অতি মুনাফালোভী চরিত্রের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো দ্রব্যই এখন আর স্বাভাবিক বা ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারা যায় না; বাজারে গেলেই ক্রেতাসাধারণকে ঠকতে হয়।

ব্যবসায়ীদের দ্রব্য মূল্যবৃদ্ধির যুক্তি হিসাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে উদাহরণ হিসাবে দেখানো এখন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ দেশে উৎপাদিত চাল, ডাল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, মাংস ইত্যাদি ক্ষেত্রে তা ধোপে টেকে না। কারণ, দেশের কৃষক কর্তৃক উৎপাদিত কৃষিপণ্যের জন্য কৃষক যে মূল্য পান আর ভোক্তারা সেই একই পণ্য যে মূল্যে ক্রয় করেন, সে ক্ষেত্রে তফাতটা এত বেশি যে, তাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজিটা পরিষ্কার বোঝা যায়। আর এ মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরাই দেশীয় কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে কলকাঠি নেড়ে এসব কৃষিপণ্যের মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিয়ে ফেলেছেন; সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে প্রায়ই তারা এসব ভোগ্যপণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে শত শত কোটি টাকা লুটে নিচ্ছেন! ফলে সাধারণ মানুষের ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাচ্ছে! এ অবস্থায় সরকারও এসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে মাঝেমধ্যে সরকারের মন্ত্রীদেরও এমনটি বলতে শোনা যাচ্ছে, সিন্ডিকেট সৃষ্টিকারী এসব ব্যবসায়ী সরকারের চেয়েও শক্তিশালী।

আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য বা দ্রব্যসামগ্রীর অন্যতম একটি পণ্য হলো শাকসবজি। আর সেই শাকসবজিও এখন আমাদের অগ্নিমূল্যে কিনতে হচ্ছে। গতকাল বাজারে গিয়ে এক মুঠো বা আধা কেজি লালশাকের মূল্য ত্রিশ টাকায় বিক্রি করতে দেখে আরও একদফা অবাক হলাম। কারণ, শাকের মূল্য ষাট টাকা কেজি হলে সাধারণ মানুষ কী খাবেন? এদিকে পটল, বেগুন ৮০/৯০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না; করলাও ১০০ টাকার ওপরে। ইদানীং আলুর দামও চড়া; একটা পাতাকপি ৮০ টাকা। শীতের আগাম সবজি হিসাবে ফুলকপির কথা না হয় বাদই দিলাম; কারণ একটা ফুলকপির দাম ১২০ টাকা। ধরে নিলাম ঢাকা শহরে এসবকিছুর দাম কিছুটা বেশি হলেও মফস্বলে কম; কিন্তু মফস্বলেই বা কতটা কম?

নিত্যনৈমিত্তিক ভোগ্যপণ্য ছাড়াও দেশের মানুষকে তাদের মৌলিক চাহিদার অন্যতম চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে; বিশেষ করে প্রাইভেট হাসপাতালগুলো লাগামহীন অর্থ আদায় করে চলেছে। তাছাড়া ওষুধ ক্রয় করতে গিয়েও তারা প্রতারিত হচ্ছেন! প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর ডাক্তারের ফিস, হাসপাতাল বেড, অপারেশন ফিস ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোনো সুষ্ঠু নীতিমালা না থাকায় নিরীহ দরিদ্র জনসাধারণ হাসপাতাল ব্যবসায়ী এবং একশ্রেণির ডাক্তারের লোভ-লালসার শিকারে পরিণত হয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছেন। আবার ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে গিয়েও জনসাধারণকে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে। কারণ, এসব প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি ইত্যাদি স্থানে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বললেই চলে। মাছবাজার, সবজিবাজারের মতো ক্লিনিক, ফার্মেসি মালিকরাও নিজেদের ইচ্ছামতো দরদাম হাঁকিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায় করে থাকেন। বিশেষ করে ওষুধ বিক্রেতারা তো এসব ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে আছেন।

উল্লেখ্য, চিকিৎসাক্ষেত্রে দেশীয় ওষুধের পাশাপাশি কিছু কিছু বিদেশি ওষুধেরও প্রয়োজন হয়। কারণ, সব রোগের ওষুধ এখনো আমাদের দেশে উৎপাদন করা সম্ভব হয় না। সে ক্ষেত্রে আমদানির অনুমতিসহ আমদানি অনুমোদনবিহীন অনেক ওষুধও দেশের ফার্মেসিগুলোতে পাওয়া যায়। আর দেশি ওষুধের পাশাপাশি দু-একটি বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যাদের জীবনযাপন করতে হয়, বিভিন্ন ফার্মেসি তাদের কাছ থেকে যে কী পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন, কল্পনাকেও তা হার মানায়। যেমন ডায়াবেটিস টেস্ট স্ট্রিপ কিনতে গেলে প্রায়ই দেখা যায়, নিত্যনতুনভাবে দাম বাড়িয়ে টাকা আদায় করা হয়ে থাকে; আর প্রতিবারই দাম বাড়িয়ে ডলারের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখানো হয়। কিন্তু বছরের বারো মাসে বারো বার মূল্যবৃদ্ধির এ প্রবণতাও তো ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে মিল খায় না। তাছাড়া অন্যান্য বিদেশি ওষুধের মূল্য যে অনুপাতে দিনের পর দিন বৃদ্ধি করে ছয় মাস-এক বছরে দ্বিগুণ করে ফেলা হয়েছে, ডলারের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সে ঘটনাও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আসল কথা হলো, ওষুধ ব্যবসায়ীরাও আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছেন। বিশেষ করে ফার্মেসি মালিকরা এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

এ অবস্থায় দেশের সাধারণ মানুষকে এসব সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীর হাত থেকে রক্ষা করতে হলে প্রথম এবং প্রধান কাজ হিসাবে সরকারকে এ শ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ীমুক্ত একটি সরকার হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ, উপদেষ্টা ইত্যাদি পদে যদি কোনো অসৎ বা সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী থেকে থাকেন, তাহলে কিন্তু কোনোদিন, কস্মিনকালেও ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক এবং অসম্ভব মূল্যবৃদ্ধির পাগলা ঘোড়ায় লাগাম টানা সম্ভব হবে না। আর সে অবস্থায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে পিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষকেও স্বস্তিতে, শান্তিতে রাখা যাবে না। কারণ, রাস্তাঘাট, হাটবাজার ইত্যাদি স্থানের চাঁদাবাজি বন্ধসহ বিভিন্ন সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ফার্মেসি ইত্যাদির অনিয়ম-দুর্নীতি একমাত্র সরকারই বন্ধ করতে পারে।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

 

Advertisement

মূল্যবৃদ্ধি

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম