Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

‘ভালো’ নির্বাচন করা খুব কঠিন কাজ

Advertisement

Icon

বোরহানউদ্দীন ইউসুফ

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘ভালো’ নির্বাচন করা খুব কঠিন কাজ

Advertisement

একটি ‘ভালো’ নির্বাচন সব সরকার এবং বিরোধী পক্ষ চায়। ভালো নির্বাচন না হলে সরকার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে এ ভয় থাকে। বিরোধীদের ভয় ভালো নির্বাচন না হলে বিজয় হাতছাড়া হয়ে যাবে। তবু ‘ভালো’ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হয়। ভালো নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট কোনো নির্ধারক নেই। ‘ভালো’ নির্বাচনের জন্য ভালো পরিবেশ প্রধান শর্ত। ভালো নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর অংশগ্রহণে হতে হবে; বয়কটের নির্বাচন ‘ভালো’ নির্বাচন নয়। ভালো নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা জরুরি। প্রশাসন নিরপেক্ষ ও উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যে কোনো সরকারের মেয়াদ শেষে একটি ‘ভালো’ জাতীয় নির্বাচন সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিগত দুটি জাতীয় নির্বাচন কোনো বিবেচনাতেই ‘ভালো’ নির্বাচন ছিল না; এটি শুধু বিরোধীদল নয়, সরকারও স্বীকার করে।

বিশেষ কোনো ‘চমক’ ছাড়া অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য বা ‘ভালো’ নির্বাচনের এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। সর্বশেষ অবস্থান অনুযায়ী, সরকার ‘নিজের সংশোধিত’ সাংবিধানিক পথে এবং বিরোধীদল ‘ধ্বংসাত্মক’ আন্দোলন ও প্রতিরোধের পথেই অগ্রসর হচ্ছে। ইতোমধ্যে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে রেওয়াজ অনুযায়ী সাক্ষাৎ করেছেন। ১২তম জাতীয় নির্বাচনের তফশিল ঘোষিত হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশ তালা মেরে পাহারা বসিয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধানের অনুপস্থিতিতে দলের কাণ্ডারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ ‘টার্গেটকৃত’ প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতা কারাগারে। আলোচনা ও সংলাপের কোনো সদিচ্ছা বা উদ্যোগ নেই। আন্দোলন দমন করে সরকার নিজস্ব রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচনের পথে অগ্রসর হচ্ছে। বিদ্যমান অবস্থা ও কাঠামোতে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে না। তার মানে ‘ভালো’ নির্বাচনের পথে নেই বাংলাদেশ।

সংসদীয় সরকারের সৌন্দর্য হলো ‘আস্থা’ হারালেই ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াবে সরকার। কিন্তু আমাদের বাস্তবতা হলো ‘আস্থা’ নয় ‘রাস্তা’ হারালেও সেটাকেই সঠিক প্রমাণে সচেষ্ট থাকবে। এটা ‘যেন’ আমাদের জাতিগত সমস্যা; এযাবৎ এর বিপরীত নজির সৃষ্টি করতে পারেনি কোনো ক্ষমতাসীন দল। সংসদীয় সরকারের কার্যকারিতা নিয়েও রয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিজ্ঞতা।

‘ভালো’ নির্বাচনে কেন সরকার একমত হচ্ছে না? বলা হচ্ছে, সরকারের সংবিধানের বাইরে যাওয়ার রাস্তা নেই। বাস্তবে এ সরকারই নিজের সুবিধার জন্য ও বিরোধী মত উপেক্ষা করে সংবিধান পরিবর্তন করেছিল। তাই জাস্ট পরিবর্তনের আগের জায়গায় রেখে অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে নির্বাচনের দায়িত্ব দিক। এত রাজনৈতিক সহিংসতা ও আন্দোলনের পরও এটি করছেন না, অভিজ্ঞরা মনে করেন-এতে অস্তিত্বের সংকটে পড়বে ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি। নেতাকর্মীদের ভাষায় সারা দেশে ‘রক্তারক্তি’ হয়ে যাবে। এ আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ একটি ‘ভালো’ নির্বাচনের মাধ্যমে পছন্দের সরকার গঠনের সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে! এটি কখনোই সুস্থ মানসিকতার পরিচায়ক নয়। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি ‘ভালো’ নির্বাচন নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার ওপর। এজন্য তাকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়াকে আস্থায় নিতে হবে। তিনি যদি মনে করেন, তার জন্য খালেদা জিয়ার চেয়ে রওশন এরশাদ বেশি ‘সহনীয় ও সুবিধাজনক’, তাহলে সমাধান হবে সাময়িক। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরোপীয় ইউনিয়ন শক্ত অবস্থান নিয়েছে। সরকারের পরম শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে পরিচিত দেশগুলো কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হোক এটি সাধারণ প্রত্যাশায় পরিণত হয়েছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত বিগত চারটি জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে তুলনামূলক স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এ চারটি নির্বাচনের প্রতিটিতেই ক্ষমতাসীন দল পরাজিত হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভোটের হাওয়া যে কোনো বিবেচনায় ছিল বিএনপির অনুকূলে। শীর্ষ নেত্রীদ্বয়ের বিরুদ্ধে ১/১১ সময়কালে মামলা-হয়রানির সমীকরণে ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিজেদের মামলাজট থেকে মুক্ত করে; কিন্তু বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তা হয় ভিন্ন-মামলাগুলো রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের অভিযোগ আছে; যা তাদের প্রতি ভোটারের বাড়তি সহমর্মিতা তৈরি করে। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে কোনোভাবেই ঠেকানোর রাস্তা খোলা ছিল না বলেই মনে করে সংশ্লিষ্টরা। এমনকি বিশ্লেষকরা মনে করেন, সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিলের পর আওয়ামী লীগের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে কারচুপি করেও বিজয় ঠেকানো কঠিন হতো। সে নির্বাচন এমনই নিরঙ্কুশ বয়কটের নির্বাচন ছিল, ১৫৪ আসনে কোনো ভোটই হয়নি। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি ঘোষণার হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সুশীলসমাজ ও সাধারণের মধ্যে একটা পারসেপশন ছিল, স্টেকহোল্ডারদের মতামতের ভিত্তিতে কোনো একটা ‘গঠনমূলক ফর্মুলা’ বের করে গ্রহণযোগ্য ‘ভালো’ নির্বাচনের পথে যাবে সরকার। ঘটনা ঘটে ঠিক উলটো! প্রতিপক্ষ দমন এবং রাজনৈতিক ‘থ্রেট’ হিসাবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে ‘আদালতের কাঁধে বন্দুক’ রাখার অভিযোগ করে বিএনপি। তাই এখানে হারজিতের লড়াই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেন দেশ-জনগণ-গণতন্ত্র বিবেচ্য নয়। ২০১৪ সালে নির্বাচন প্রতিরোধের নামে বিরোধীদল প্রায় ৫৫০টি ভোট কেন্দ্র জ্বালিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক সময়েও পড়ছে লাশ, পুড়ছে বাস! পরস্পরকে আতঙ্কিত করার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রশাসন ব্যবহার করে গুম-খুনের শক্ত অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে। সরকারি নেতারা বলেন, আন্দোলনে হারিনি-ক্ষমতা ছাড়ব কেন! কেউ হার মানতে নারাজ। এ হারার ও ভয়ের পরিস্থিতিতে হেরে যাচ্ছে দেশ ও গণতন্ত্র।

‘ভালো’ নির্বাচনের জন্য কী করতে হবে? প্রধান বিরোধী পক্ষের দাবি একতরফাভাবে বাতিল করা সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনরায় বহাল করা। এটি হচ্ছে সহজ ও স্বাভাবিক পথ। ‘ভালো’ নির্বাচনের জন্য এর বাইরে বিকল্প পথ হলো সমঝোতার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন। এর বাইরে কিছু চিন্তা করতে হলে উভয় পক্ষকে বসতে হবে উদার মানসিকতা নিয়ে। তবে এ ক্ষেত্রে উভয়ের মনোনীত ‘শক্তিশালী মধ্যস্থতাকারী’ কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। তখন বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাবের অভাব হবে না। যখন-ই মনে হবে ‘ভালো’ নির্বাচনে ক্ষমতা হাতছাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে-নানা অজুহাতে ‘দুষ্টবুদ্ধি’ তখন মাথায় ভর করে। তাই কাঙ্ক্ষিত ‘ভালো’ নির্বাচনের পথ কঠিন। তবে বর্তমান প্রজন্মের কথা ভেবে রাজনীতিকদের ‘ভালো’ নির্বাচনের সহজ পথ বের করতেই হবে, সময়ের প্রয়োজনে।

বোরহানউদ্দীন ইউসুফ : প্রধান সমন্বয়কারী, কাউন্সিল ফর ন্যাশনাল এজেন্ডা (সিএনএ), ফেমা’র সাবেক দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক

[email protected]

Advertisement

নির্বাচন

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম