নীতি দুর্নীতি অর্থনীতি

অগ্রাধিকার নির্ধারণে কেন এত ব্যর্থতা?

 ড. আর এম দেবনাথ 
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দুই-তিন দিন আগের কথা। যাচ্ছি প্রেস ক্লাবের লাইব্রেরিতে। শান্তিনগর বাজার-বটতলা রোড ধরে সেগুনবাগিচার ভেতর দিয়ে রিকশায় যাতায়াত। আগে ভাড়া দিতাম ৫০ টাকা। বাজার হয়তো মন্দা, এখন ৪০ টাকায়ও যাওয়া যায়। বটতলার দিকে এগোতেই দেখি বিরাট জটলা। লোকজন এক ব্যক্তিকে নিয়ে রাস্তার পাশে ব্যস্ত। মাথায় পানি ঢালছে, কেউবা বাতাস করছে। কী ব্যাপার? বুঝতে পারলাম ভাঙাচুরা রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় তিনি হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। এতে তার শরীর ও মাথায় চোট লাগে। জ্ঞান আছে। তবে ভীষণ ব্যথায় তিনি অর্থাৎ পথচারী কাতরাচ্ছেন। বিষয়টা বুঝলাম মানুষের ‘গালাগাল’ শুনে। শান্তিনগর বাজার থেকে বটতলা পর্যন্ত রাস্তার অর্ধেক খানাখন্দে ভরা। এ অবস্থা চলছে বছর দেড়েক ধরে। খোঁড়াখুঁড়ি শেষে অর্ধেক কাজ করে ফেলে রাখা হয়েছে। রিকশা তো দূরের কথা, হেঁটে যাওয়াও সম্ভব নয়। রাস্তার যেটুকু কাটাকাটি করা হয়নি, তার অবস্থাও খুব খারাপ। স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা সম্ভব নয়। সবাই বলাবলি করছে, প্রশ্ন করছে, কবে এ রাস্তা মেরামত হবে, কবে চলাচল হবে নির্বিঘ্ন। দোকানদারদের কেউ কেউ বললেন, প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। স্কুলযাত্রী ছেলেমেয়ে ও অভিভাবকরা আছেন পেরেশানিতে। কেউ জানে না এ রাস্তা পুরোপুরি মেরামত কবে হবে, কবে চলাচলযোগ্য হবে।

একই অবস্থা দেখেছি কিছুদিন আগে প্রেস ইনস্টিটিউটসংলগ্ন রাস্তায়, যে রাস্তা ধরে যেতে হয় ভিকারুননিসা স্কুলে অথবা বেইলি রোডে। ওয়ানওয়ে রোড। মাসের পর মাস রাস্তাটি ছিল মেরামতাধীন। কী কষ্ট মানুষের, পথচারীদের, গাড়িওয়ালাদের, রিকশাওয়ালাদের। নিয়মিত মানুষ সহ্য করছে এ অব্যবস্থাপনা। আর প্রশ্ন করছে, কেন এসব হচ্ছে? রাস্তা কাটা হচ্ছে। তারপর ফেলে রাখা হচ্ছে দিনের পর দিন। অথচ এসব ব্যস্ত রাস্তা। বহুদিন পর এ রাস্তাটুকু মেরামত করা হয়েছে।

এখন জানাই মগবাজার চৌরাস্তার অবস্থা। দিনের পর দিন ড্রেনের কাজ, কাটা রাস্তার অব্যবস্থা রয়ে যাচ্ছে। কত অসুবিধা পথচারীদের। শুধু এ কয়টি রাস্তা নয়, ঢাকা নগরীর অলিগলিসহ বড় রাস্তার বেহাল দশা অনেক দিন যাবৎ। মেরামতি কাজের কোনো লক্ষণ নেই। খবরের কাগজে প্রায়ই দেখা যায়, ব্রিজ তৈরির কাজ অর্ধেক অসমাপ্ত রয়ে গেছে অনেক জায়গায়। উপজেলা শহরগুলোর রাস্তাঘাট, নালা-নর্দমার অবস্থা তথৈবচ। অনেক বড় বড় রাস্তার অবস্থাও তাই। কোথাও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজ নেই, কোথাও মেরামতি কাজের কোনো উদ্যোগ নেই। এটা কি পরিকল্পনার অভাব, বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব? এটা কি উদ্যোগের অভাব, নাকি টাকা-পয়সার সংকট? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে যাওয়া বৃথা। কারণ এসব সমস্যা বহু পুরোনো। অনেক কথাবার্তা এর ওপর নিয়মিত হয়। অভিযোগ, এসবের ওপর লেখালেখির কোনো লোক নেই। অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, অতিরিক্ত খরচ, খামখেয়ালিপনাসহ যাবতীয় সমস্যা বহুল আলোচিত। বলা যায়, এসব এখন চর্বিতচর্বণ। তবে ঘটনা হচ্ছে, এর কোনো শেষ নেই। কারও কিছু যায় আসে না। সব গা-সহা হয়ে গেছে। অথচ তা হওয়ার কথা নয়। স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়ে এসেছি। ইতোমধ্যে বহু অভিজ্ঞতা আমাদের সঞ্চিত হয়েছে। তারপরও কেন এ অবস্থা হবে? কেন অগ্রাধিকার নির্ধারণে আমাদের এত অনীহা, এত ব্যর্থতা? কেন খরচের, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান রক্ষায় আমরা আজও ব্যর্থ হচ্ছি? অনেক প্রশ্ন।

ধরা যাক অগ্রাধিকারের প্রশ্নটিকে। সম্পদ কম, রাজস্ব কম, অথচ হাতে অনেক কাজ। কোনটি আমরা আগে করব-এটি এক বিরাট প্রশ্ন। যেমন বড় বড় প্রকল্প প্রথম, নাকি মেরামত কাজ প্রথম? বড় বড় অবকাঠামো আগে, নাকি যা আছে তা চালু রাখা প্রথম কর্তব্য? বিশ্ববিদ্যালয় বেশি দরকার, নাকি প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ? ঘরে ঘরে এমএ ডিগ্রি দেওয়ার বদৌলতে বেকার তৈরি আমাদের অগ্রাধিকার, নাকি কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দরকার? আমাদের শিল্প খাত উপযুক্ত লোক/জনবল পাচ্ছে না-তাদের জন্য জনবল প্রস্তুত করা দরকার, নাকি বিশ্ববিদ্যালয় দরকার? চালু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় লেখাপড়ার মান রক্ষা, গবেষণা আগে, নাকি জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় দরকার? এসব প্রশ্নে আমরা এখনো উদাসীন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ধনী ও অতিধনীদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ওষুধ কোম্পানি ইত্যাদি আগে, নাকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য কবিরাজি, ইউনানি, দেশজ চিকিৎসাব্যবস্থা দরকার? ঢাকা শহর আরও সম্প্রসারণ করা হবে, নাকি বৈদ্যুতিক ট্রেনের মাধ্যমে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-কুমিল্লা, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জকে যুক্ত করা হবে? দেশের সব সুযোগ-সুবিধা শুধু ঢাকাতেই জড়ো করা হবে, নাকি তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে? এসবও বড় প্রশ্ন। বলা বাহুল্য, এসব বর্তমানে প্রচলিত উন্নয়ন ধারণার সঙ্গে যায় না, যে কথা বলা দরকার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নানা উপলক্ষ্যে অগ্রাধিকার নির্ণয়ের দিকে নজর দিতে বলছেন। অথচ সরকারি সংস্থাগুলোয় এ নির্দেশ বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখি না। যেমন সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রয়াত মুহিত সাহেব বারবার বলতেন, রাস্তাঘাটের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দেশের আনাচে-কানাচে রাস্তাঘাট ধরনের অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। তিনি বলতেন, এখন আমাদের দরকার মেইনটেনেন্স, অর্থাৎ মেরামতি কাজ। অর্থাৎ এসব অবকাঠামোর যত্ন নেওয়া দরকার। তাদের ব্যবহারযোগ্য করা দরকার, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো হিসাবে এসবের সদ্ব্যবহার করা দরকার। এর অর্থ কি অন্যান্য প্রকল্প আমরা গ্রহণ করব না? না, এ কথা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে অগ্রাধিকারের কথা। কোনটা আগে, কোনটা পরে তা ঠিক করার কথা হচ্ছে। কারণ কী? কারণ, আমাদের প্রচুর টাকা নেই। আমাদের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। এটা আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দিকে তাকালেই বোঝা যাবে। দেখা যাবে ৭০-৮০-৯০ শতাংশ উন্নয়নের টাকা ঋণের টাকা। আমাদের যে রাজস্ব আয়, তা দিয়ে ‘ঘর-সংসার’ চলে, দৈনন্দিন খরচ চলে। উন্নয়নের টাকার সংস্থান হয় না। উন্নয়নের টাকা আমাদের ধার করতে হয় এবং তা দেশি-বিদেশি ঋণ। এর ওপর সুদ দিতে হয়। সুদের খরচ দিন দিন বাড়ছে। বাজেটের বিরাট অঙ্ক এখন সুদ খরচ। আমাদের প্রতিটি বাজেট ঘাটতি বাজেট। বাজেটের আকার যত বড় হচ্ছে, ততই টাকার অঙ্কে আমাদের বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। এই ঘাটতির টাকা আগামীকাল আমাদের সন্তানদের জোগান দিতে হবে। তা তাদের ওপর বড় বোঝা হবে। এর অর্থ কী? আমরা উন্নয়নের টাকা জোগাড় করতে না পেরে ধার করছি। খারাপ বিষয় নয়। তবে এক্ষেত্রে দরকার সাবধানতা। দরকার অগ্রাধিকার ঠিক রাখা, অগ্রাধিকার নির্মাণ করা। খরচের গুণগত মান কঠোরভাবে রক্ষা করা। অথচ এ কাজটিই হচ্ছে না।

প্রধানমন্ত্রী বারবার বলা সত্ত্বেও, বারবার নির্দেশনা দেওয়ার পরও দেখা যাচ্ছে আমাদের প্রবণতা থেকে যাচ্ছে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের দিকে, বড় বড় প্রকল্পের দিকে, বড় বড় খরচের দিকে। প্রবণতা হচ্ছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ করা এবং তার জন্য প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটানো। যে সংসদ-সদস্যরা এ কাজটি করেন, তারা জানেন যে উপজেলা শহরের অবকাঠামোর অবস্থা ভালো নয়, নিুমানের। এসবের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টাকা নেই। অথচ একে বলা হচ্ছে শহর, বলা হচ্ছে মিউনিসিপ্যালিটি। এক অর্থে শহর, গ্রামীণ শহর। এসবে থাকার কথা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, নতুন নতুন সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা, যেটুকু অবকাঠামো তৈরি আছে, তাও ব্যবহারযোগ্য নয়। উপজেলা শহরবাসী নিদারুণ কষ্টের মধ্যে দিনযাপন করেন। বিদ্যুতের কষ্ট, গ্যাসের কষ্ট, রাস্তাঘাটের কষ্ট, নর্দমা-নালার কষ্ট-উপজেলা শহর বসবাসযোগ্য নয়।

উপজেলার কথা বলি কেন, ঢাকা শহরেরও তো দেখা যায় প্রায় একই অবস্থা। সমগ্র ঢাকা শহরে জরিপ করে দেখলে বোঝা যাবে এ শহরের চারপাশের নদীর জলে হাত দেওয়া যায় না। যে বুড়িগঙ্গার জলে এক সময় সাঁতার কাটা যেত, যে বুড়িগঙ্গার জল পুরোনো ঢাকাবাসী পান করত, সেই জলে এখন হাত দেওয়া যায় না। শহরের খাল-নর্দমা ভরাট করে ফেলা হয়েছে। সেগুনবাগিচা, পুরানা পল্টন ঘুরে দেখলে বোঝা যাবে কী ক্ষতি আমরা পরিবেশের করেছি। কারা দায়ী এর জন্য? শহরকে তো রক্ষণাবেক্ষণ/মেইনটেনেন্স করলামই না, বরং একে তিলে তিলে গলাচিপে মেরে ফেলছি। শহরে খেলাধুলার জায়গা নেই। স্কুলে ছেলেমেয়েদের ‘ড্রিল’ করার পর্যপ্ত জায়গা নেই। বৃক্ষের আচ্ছাদন নেই। যে রক্ষণাবেক্ষণ দরকার, তার ছটাকও আমরা করছি না। এর কারণ কী? অগ্রাধিকার নির্মাণে আমরা ভুল করছি, অবহেলা করছি-তাই নয় কি?

বড় বড় প্রকল্প আমাদের অবশ্যই দরকার। এসবের খরচও ঠিকমতো করা দরকার। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, আমাদের মধ্যে অহেতুক বড় বড় প্রকল্পের প্রতি একটা প্রীতি জমে উঠেছে। বলা হচ্ছে, এতে ‘মধু’ বেশি। যত বেশি খরচ, তত বেশি ‘সুবিধা’। তত বেশি ‘ব্যবসা’। এক টাকার কাজ দুই টাকায়, তিন টাকায় করা গেলে অর্থসম্পদ হয়। তা না হলে বড় বড় প্রকল্পে এত বেশি বেশি খরচ কেন? খরচ যে বেশি হচ্ছে তুলনামূলকভাবে-এ খবর প্রায়ই কাগজে ছাপা হয়। এই ‘মধুর’ লোভেই আমলা-মৌমাছিরা বড় বড় প্রকল্পের দিকে দাঁড়ায়। হতে পারত তা। কিন্তু তা হতে পারত ছোট ছোট কাজ সেরে। বড় বড় প্রকল্পে সুবিধা আছে। কিন্তু ছোট ছোট কাজের উপকারভোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। রক্ষণাবেক্ষণের কাজে উপকৃত হয় অনেক বেশি লোক। শহর, জেলা, উপজেলা চালু থাকে। জনজীবন নির্বিঘ্ন হয়। পরিবেশ ঠিক থাকে। খরচাপাতির উপকারভোগী হয় অনেক লোক। সবচেয়ে বড় কথা, সামাজিক-অর্থনৈতিক উপযোগিতার প্রশ্নে ছোট ছোট কাজের বরকত বেশি। এ অবস্থায় আমাদের আমলা ভাইয়েরা কি ছোট ছোট কাজের দিকে একটু বেশি নজর দেবেন? রাস্তা কাটেন, কিন্তু তা মেরামত করুন স্বল্পতম সময়ে। কেটে তা দিনের পর দিন ফেলে রাখবেন না। মানুষকে কষ্ট দেবেন না।

ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন