জাত নিমের পাতা
ছাত্রলীগ বশীকরণ ফর্মুলা : সংস্কার করে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার সম্ভব
Advertisement
মাহবুব কামাল
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘটিতব্য কোনোকিছু সম্পর্কে আগাম বুঝতে না পারলে তাকে ‘অবুঝ’ বলে রেহাই দেওয়া যায়। কিন্তু ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর যদি তিনি আগে কী বলেছেন, তা অস্বীকার করেন বা তর্ক জুড়ে দেন, সেক্ষেত্রে তিনি স্পষ্টতই শঠ। হ্যাঁ, কোটা সংস্কার আন্দোলন এতটা তীব্র আকার ধারণ করবে, আমি বুঝতে পারিনি। আন্দোলন শুরু হওয়ার দুদিন পর বন্ধু শাহ কামালকে বলেছিলাম, দেখবেন শিগ্গির ছাত্রলীগ মাঠে নামবে এবং এরপর আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে।
দুদিন পর ছাত্রলীগ নেমেওছিল; কিন্তু আন্দোলন নিস্তেজ হয়নি, বরং আরও গতি পেয়েছে। আসলে দুটো মিসিং লিংক ছিল। প্রথমত, মাথায় আসেনি যে আন্দোলনটা শিক্ষার্থীদের চাকরি অর্থাৎ রুটি-রুজির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো ক্ষেত্রে রুটি-রুজির ব্যাপার থাকলে মানুষ বাধা পেলে জীবনটাও দিতে প্রস্তুত থাকে; কারণ রুটি নেই, তো জীবনও নেই। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে লোকসংখ্যার একটি অছাত্র বিধ্বংসী অংশ যে যুক্ত হয়ে পড়বে, সেটাও আগে থেকে বোঝা যায়নি। এ দুই মিসিং লিংকের কারণেই উপরের মন্তব্যটি করেছিলাম। আমাকে বন্ধুরা বুদ্ধিমান মনে করে। ছাই! শিক্ষার্থীদের আন্দোলনটাকে স্কয়ারলি দেখতে পারলাম না, অথচ আমি নাকি বুদ্ধিমান!
আমরা সাংবাদিকরা যেসব শব্দ বেশি লিখে থাকি, সেগুলোর একটি জানমাল। হ্যাঁ, জানমালের ক্ষতির যে বিশাল ক্যানভাস, তাকাতে গেলে চোখ বিদ্রোহ করে বলে, ওদিকে তাকিয়ো না। মালের কথা ওঠাব না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই বলে দিয়েছেন, স্থাপনার ক্ষতিগুলো মেরামত করা যাবে; কিন্তু মৃত্যুর যে ক্ষত, তা সারানো যাবে না। অতঃপর জানের কথাই বলি। এই বেদনার বিউগল কে বাজাতে পারে? একটা জীবনের পেছনে থাকে কত রহস্য, কত খেসারত; অথচ কত সহজেই না সেই রহস্যের যবনিকাপাত হলো, খেসারতের কোনো মূল্য পাওয়ার আগেই নিহতরা বিদায় জানাল জীবিতদের। ইউরোপের অনেক দেশে একটা বিড়ালও গাড়িচাপা পড়লে ড্রাইভারকে কঠিন জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়। বাঙালি মানবসন্তানরা কি বিড়ালেরও অধম? এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, তিনি যেন সেই বিখ্যাত গান ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তারে’র মতো কোনো কারণেই তার কথা থেকে ফিরে না আসেন। অন্তত যেসব মৃত্যু সহজেই এড়ানো যেত, সেসব মৃত্যুর পেছনে দায়ীদের চেহারা দেখতে চায় জাতি।
শিরোনাম বলছে, আমাদের আজকের প্রসঙ্গ ছাত্রলীগ। কত সহজেই বলে দেই দেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও সর্বাপেক্ষা বড় ছাত্র সংগঠন! অথচ এই সংগঠনেরই নেতাকর্মীদের তাড়িয়ে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় তাদের কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঢাললো ক্রোধের আগুন! নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই মুহূর্তে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে কোনো একজন হবেন ভিপি, আরেকজন জিএস। নুরুও একই প্রক্রিয়ায় হয়েছিলেন ভিপি। ছাত্রলীগের জামানত বলে কিছু থাকবে না। তোফায়েল, আসম রব, মাখনের উত্তরসূরিদের এই হাল? সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রক্তচক্ষুর যে অভিভাবকত্ব করেছে তারা, তারই অনিবার্য ফল এটা। আমার এক বন্ধুর বাবা একটা মজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তার বাসার কাজের ছেলেটি ছিল স্বভাবে খুবই নিরীহ প্রকৃতির। গালাগাল, এমনকি চড়-থাপ্পড়ও হজম করত। তো তিনি মানবচরিত্র বোঝার জন্য ঠিক করলেন, কাজের ছেলেটিকে বিদ্রোহী করে তোলা যায় কিনা, সেই চেষ্টা করবেন। এরপর কারণে-অকারণে প্রতিদিনই তিনি তাকে গালাগাল-মারপিট করতে লাগলেন। ঠিকই এক পর্যায়ে সেই কাজের ছেলে মাথা ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, আপনি পাইছেন কী? যান, আর আপনার কাম করুম না। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কতবার যে লিখে, টেলিভিশনে কথা বলে অনুরোধ করেছি-ছাত্রলীগকে সামলান। তিনি যে একেবারেই চেষ্টা করেননি, তা বলা যাবে না। কিন্তু যত ডিগ্রি তাপ দিলে পানি বাষ্প হয়, তত ডিগ্রিতে ওঠেননি তিনি। কারণটা সম্ভবত এমন যে, তিনি হয়তো ভেবেছেন, ছাত্রলীগের প্রতি কঠোর হওয়া মানে সংগঠনটির শক্তি ক্ষয় হওয়া; সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, প্রকারান্তরে সরকারও দুর্বল হয়ে পড়া। এই চিন্তা বা যুক্তির ফ্যালাসিটা হলো, নিজের লোক যদি অন্যায় করে, তাকে শাস্তি দিলে বরং সরকার শক্তিশালীই হয় আর তাকে প্রশ্রয় দিলে হয় দুর্বল। একটা উদাহরণ দিই। ধরা যাক, কোনো এক জেলায় সরকারি কিছু পদে লোক নেওয়া হবে। দলীয়করণের ভিত্তিতে সব পদেই নিয়োগ দেওয়া হলো এই ভেবে যে, তাতে দলের সমর্থন ও শক্তি বাড়বে। ফ্যালাসিটা হলো, এ প্রক্রিয়ায় যত লোক সন্তুষ্ট হয়েছে, অসন্তুষ্ট হয়েছে তার কয়েকগুণ বেশি অর্থাৎ যারা বঞ্চিত হয়েছে। আলটিমেটলি সরকারের সমর্থন বাড়ল, না কমল? ছাত্রলীগের এক সন্ত্রাসীকে শাস্তি দিলে যদি ১০০ ভুক্তভোগী খুশি হয়, সেটা না করার কোনো যুক্তি শত হাতড়ালেও পাওয়া যাবে না। প্রসঙ্গটি একটু বাড়াই। এটা না বোঝার কোনোই কারণ নেই যে, অপশক্তিকে দমন করলে গণতন্ত্রের কোনো ক্ষতি হয় না। গণতন্ত্রের ক্ষতি হয় ভিন্নমত দমন করা হলে। অপশক্তিকে দমন করা গেলে গণতন্ত্র আরও মজবুত হয়। হেনরি মেইনের কথাটা ঊদ্ধৃত করা যায়-‘গণতন্ত্র আদর্শগতভাবে সর্বোত্তম শাসনব্যবস্থা সত্যি, তবে সন্দেহাতীতভাবে এটাই সবচেয়ে জটিল সরকার পদ্ধতি।’ সন্দেহ কী, গণতন্ত্র চর্চার সঙ্গে আইনের শাসনের সমন্বয় ঘটাতে না পারলে গণতন্ত্র দুরূহই থেকে যায়। এ কি কম কঠিন কথা-মানুষের স্বাধীনতা থাকবে, মতপ্রকাশের অধিকার থাকবে, আবার এই স্বাধীনতার সুযোগে যাতে অপশক্তি মাথা তুলতে না পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। এই কঠিন প্রশ্নের সুরাহা করতে না পারলে বোকারাই শুধু সরকারের ধরন (form of government) নিয়ে তর্ক করবে আর বুদ্ধিমানরা বলতে বাধ্য হবে-যে সরকার সবচেয়ে ভালো শাসন করে, সেই সরকারই উত্তম সরকার। পাশ্চাত্যে অবশ্য বলা হয়-যে সরকার কম শাসন করে, সেই সরকারই উৎকৃষ্ট সরকার। আমরা তো আর পাশ্চাত্যবাসীর মতো সুসভ্য নই।
এ পর্যায়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একটি ভ্যালিড প্রশ্ন করে আমরা শিরোনামে চলে যাব। প্রশ্নটা হচ্ছে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ডের বাইরের কোনো এলাকা? যদি না হয়, তাহলে সেখানে অপরাধ, বিশেষত ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য দমন করতে প্রচলিত আইন প্রবেশ করতে পারে না কেন? ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকলে ছাত্রছাত্রীরা সরব হয়ে ওঠে-বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে! ছাত্রলীগকে আইনের বাইরে রাখার এটাই কি কারণ? আমাদের চারদিকে শুধু পবিত্র আর পবিত্র, মহান আর মহান। একটু কিছুতেই নষ্ট হয় মহানত্ব ও পবিত্রতা। আবার দেখুন, মুসলমানদেরই শুধু ধর্মীয় অনুভূতি থাকে এবং সেই অনুভূতিতে আঘাত করা যায় না। সংখ্যালঘুদের কোনো ধর্মীয় অনুভূতি থাকতে নেই!
ধুর, মূল কথায় যেতেই পারছি না। রাজীব গান্ধীর দুটি কথা মনে পড়ছে খুব। সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রশ্নে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, Mosques can be rebuilt; broken temples, broken churches, broken pagodas can be rebuilt but broken hearts can not be rebuilt. আজ অনেকেরই হৃদয় ভেঙে গেছে, এটা কীভাবে মেরামত করা যাবে জানি না। হিন্দি ও উর্দু ভাষার মধ্যে যে কোনো বিরোধ নেই, বরং একটি আরেকটির সম্পূরক, তা বোঝাতে গিয়ে উর্দুভাষীদের এক সভায় তিনি বলেছিলেন, When two flames are put together, they do not quarrel each other, rather they both make a bigger flame. ছাত্রলীগ ও অছাত্রলীগের মধ্যে কেন এই বৈরী সম্পর্ক? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী হওয়ায় তো দু’পক্ষই আলোকিত। দুই আলোকশিখা মিলিত হয়ে একটি বড় আলোকশিখার জন্ম হতে পারত। তা হচ্ছে না। তবে কি পক্ষ দুটির কোনোটাই আলোকশিখা নয়? তারা বহ্নিশিখা?
এবার আমরা একটু বাঁক নেব। বিশ্বব্যাপী ছাত্ররাজনীতির চালচিত্রটা একটু দেখে নিই। পশ্চিমা সমাজে ছাত্র সংগঠন অর্থাৎ student organization বলে কিছু নেই, যা আছে তা হলো student association বা forum। সেখানকার ছাত্রসমাজের কোনো সমস্যা দেখা দিলে এই অ্যাসোসিয়েশন বা ফোরামভুক্ত সদস্যরা তা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করে, জাতীয় রাজনীতিতে তারা কোনো ভূমিকা রাখে না। দুটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে ছাত্ররাজনীতির প্রয়োজন পড়তে পারে। কোনো দেশ যদি ঔপনিবেশিক শক্তি দ্বারা শাসিত হয় কিংবা দেশটাকে শাসন করে সামরিকতন্ত্র, তাহলে সেই ঔপনিবেশিক শক্তি বা সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ রাজনীতি করতে পারে। আবার কোনো দেশের ছাত্রসমাজ যদি মনে করে সমাজে নতুন কোনো ইতিবাচক ট্রেন্ড বা প্রবণতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, তখন তারা রাজনীতি করলে তাতে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ থাকে না। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ইউরোপে অথবা আমেরিকায় অ্যাংরি ইয়াংম্যান আন্দোলনের কথা জানি আমরা। এসব ছিল মূলত যুদ্ধবিরোধী ও পরিবেশবাদী আন্দোলন। আবার ধরুন, কোরিয়ায় যখন ছাত্রসমাজকে জবরদস্তিমূলকভাবে সেনাবাহিনীতে ঢোকানো হচ্ছিল (Conscription), তখন ছাত্রসমাজ সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে রাজনীতি করেছে। আরেকটি প্রেক্ষাপটে অনুন্নত দেশে ছাত্ররাজনীতি হতে পারে। এরূপ সমাজে যদি জনগণকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আর্টিকুলেট (স্পষ্টভাবে উচ্চারণকারী) মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভাব পরিলক্ষিত হয়, সেক্ষেত্রে বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও শিক্ষিত ছাত্রসমাজ সেই শূন্যস্থান পূরণ করে রাজনীতি করতে পারে। আমরা আসামে প্রফুল্ল মাহান্তের নেতৃত্বে এই রাজনীতি দেখেছি।
কিন্তু আমাদের এখানে তো যুদ্ধবিগ্রহ নেই, ঔপনিবেশিক শক্তি নেই, সামরিকতন্ত্র নেই, আছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নেতৃত্বে রাজনৈতিক দল, আছে সুশীল সমাজ। প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে এখানে ছাত্ররাজনীতি কেন? হ্যাঁ, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি অ্যালাও করেছি মূলত ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের গৌরবময় ভূমিকাকে প্রলম্বিত করতে। এর কারণ বহুবিধ। দুটি উল্লেখ করা যায়। এক. ছাত্ররাজনীতিকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির একটি সাপ্লাই লাইন হিসাবে ব্যবহার করা। দুই. দেশটা স্বাধীন হলেও এর ক্রমউন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যদি কোনো অন্যায়কারী অথবা অপশক্তি, ছাত্রসমাজ যেন স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসাবে তা কমব্যাট করতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ছাত্ররাজনীতি কি এসব প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে পারছে? নাকি এই রাজনীতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হচ্ছে? ছাত্রলীগ তো অন্যায় দেখছে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের, দুর্নীতিসহ সমাজের অন্যান্য অন্যায় নিয়ে কথা বলার সময় কি কেউ তাদের বাকযন্ত্র টিপে ধরে? ছাত্রলীগ যদি ছাত্রসমাজের সমস্যাগুলো নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তথা সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করত, তাহলেও তারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা পেতে পারত। কিন্তু তা না করে তারা করছে জাতীয় রাজনীতি। সরকার সর্বোচ্চ আদালতে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করায় বোঝাই যাচ্ছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কোটাবিরোধী অবস্থান নিয়েছিলেন, আর তিনি কোটা রাখার পক্ষপাতী হলেও বা কী, ছাত্রলীগের উচিত ছিল আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করা। তা না করে তারা হয়েছেন প্রতিপক্ষ। সংকট যে এত গভীর হলো, এটাও এর অন্যতম কারণ। যা হোক, আমরা ডিটেইলে যাব না, তাহলে মন খারাপ হয়ে যাবে। শিরোনামে ফিরে যাই আমরা।
ছাত্রলীগকে বশে রাখতে হলে সংগঠনটির ও এর পেরেন্ট অরগানাইজেশন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের করণীয় কী? একটি চীনা প্রবাদ দিয়েই শুরু করি-ভালো লোহা দিয়ে পেরেক হয় না আর ভালো মানুষ দিয়ে হয় না যোদ্ধা। ছাত্রলীগের বর্তমান কার্যক্রম যা, তাতে ভালো ছাত্র এতে মানায় না। ছাত্রলীগকে আসলে ভালো ছাত্রসর্বস্ব করে তুলতে হবে। সংগঠনটির অতীত গৌরবের যে পুঁজি, তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। নতুন পুঁজি সংগ্রহ না করতে পারলে সংগঠনটি টিকিয়ে রাখা যাবে হয়তো কোনোভাবে, একে লাভজনক করা যাবে না। পাঞ্জাবির পকেট থেকে দাদা বেখেয়ালে কত কত শতকিয়া নোট ফেলে দিতেন, এই গল্প শুনিয়ে একশ বছর পর বনেদি হওয়া যাবে না। সুতরাং ’৫২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১-এর গৌরব ইতিহাসের পাতায়ই পড়ে থাক, মনোনিবেশ করতে হবে নতুন ইতিহাস গড়ায়।
হ্যাঁ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একটু মনোযোগী হোন। প্রথমত, ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র ও আদর্শ-লক্ষ্য সংবলিত পুস্তিকা ব্যাপকভাবে সংগঠনের কর্মীদের সরবরাহ করুন এবং কাউকে সংগঠনের প্রাথমিক সদস্যপদ দেওয়ার আগে এ দুই পুস্তিকার ওপর তার একটি মৌখিক পরীক্ষা নিন। জেলা-উপজেলায় ছাত্রলীগ শাখার নিজস্ব লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিন। এসব লাইব্রেরিতে থাকবে রাজনীতি-অর্থনীতি-সমাজনীতির বই ছাড়াও প্রতিদিনের তিন-চারটি সংবাদপত্র। খরচ? স্থানীয় অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তিই পাওয়া যাবে, যারা তাদের নামে লাইব্রেরির নামকরণ করা হলে আর্থিক সহায়তা দিতে এগিয়ে আসবেন। এটা নিশ্চয়ই চাঁদাবাজি হিসাবে গণ্য হবে না।
দ্বিতীয়ত, সংগঠনের অভ্যন্তরে গড়ে তুলতে হবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক সাংগঠনিক প্রক্রিয়া, যা রাজনীতিকে যুক্ত করবে শিল্পের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রলীগের উদ্যোগে স্টাডি-ফোরাম, আবৃত্তি সংঘ, ডিবেটিং সোসাইটি, শিল্পসম্মত সিনেমা দেখার জন্য সিনে ক্লাব থাকতে হবে এবং এগুলোর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের। ভারতের দূরদর্শনে একসময় ইউজিসি প্রোগ্রাম উপভোগ করতাম। বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা একটি ডামি পার্লামেন্ট বানিয়ে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনের অভিনয় দেখানো হতো। স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সবার পারফরমেন্স দেখে মনটা জুড়িয়ে যেত। এটাই তো হওয়ার কথা, ছাত্রাবস্থায় বড়জোর অভিনয় করা চলে, মূল কাজটি করবে সে ছাত্রত্ব হারানোর পর।
আমাদের রাজনীতি, সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি-এসব বিশাল প্রেক্ষাপট উপলব্ধি করার জন্য দরকার একটি শিক্ষিত, যুক্তিশীল, দার্শনিক মানস। যে তরুণ প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র বা নিজের উপকার করতে চাইছে, জীবনের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করলে সে দেখতে পাবে-সবই মিছে।
তৃতীয়ত, টর্চার সেল তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় থাকা গণরুম, ডাবলিং প্রথা উচ্ছেদ করতে হবে অচিরেই। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো ছাত্রলীগারের অন্যায় বা অপরাধ পাওয়ামাত্রই তাকে আনতে হবে কঠোর আইনি প্রক্রিয়ায়।
দারিদ্র্য, বেকারত্ব, আকাঙ্ক্ষিত বস্তু লাভে ব্যর্থতা ইত্যাদির কারণে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে যে চাপ চাপ হতাশা, অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা-তা স্মরণে রেখেও বলতে পারি-যে যুবক টলস্টয়, সমারসেট মমের উপন্যাস পড়তে পারে; মানিক-বিভূতিকে আত্মস্থ করেছে; রবীন্দ্রনাথ, এলিয়ট, শামসুর রাহমানের কবিতা আবৃত্তি করে; রাফায়েল, দ্য ভিঞ্চির চিত্রকর্মের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারে; রোমান পোলানস্কি, সত্যজিতের ছবি দেখে তৃপ্ত হয়; দুঃখবোধে শেক্সপিয়র কিংবা জীবনানন্দের চরণ ধার করে, সে কখনো সন্ত্রাসী হতে পারে না। যার এক হাতে থাকে রাজনীতির বই, অন্য হাতে কবিতার, সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
