অনলাইন গেমের ক্ষতি থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচান
jugantor
অনলাইন গেমের ক্ষতি থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচান

  কে এম মাসুম বিল্লাহ  

১২ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভিডিও গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। বর্তমানে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এ আসক্তিকে সম্প্রতি ‘মানসিক রোগের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন ভিডিও গেম নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। অনেক দেশই শিশুদের ভিডিও গেমসের ওপর মনিটরিং করছে।

যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শিশুদের অতিরিক্ত ভিডিও গেমস আসক্তি নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞরাও অনেকদিন থেকে চিন্তিত। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভিডিও গেম শিশুদের সামাজিকীকরণে বাধা দেয় এবং এর ফলে মেধা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বর্তমানে অনেক শিশুর আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভিডিও গেম খেলতে বাধা দিলে অনেক শিশু চিৎকার চেঁচামেচি করে, উচ্চস্বরে কথা বলে, রাগ দেখানো এবং অন্যান্য কাজে খুব বেশি মনোযোগ দিতে চায় না। গেম খেলতে না দেওয়া কিংবা এমবি কেনার টাকা না দেওয়ায় আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে দেশে।

অধিকাংশ ভিডিও গেমের কনটেন্ট যুদ্ধ, সংঘাত রক্তপাত নিয়ে, যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়। বর্তমানে শুধু শহর এলাকায় নয়, ভিডিও গেমসের দিকে ঝুঁকছে গ্রামের শিশু-কিশোররাও। ইদানীং মফস্বলের শিশু-কিশোররাও একত্রে বসে দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও ভিডিও গেমের দিকে ঝুঁকে পড়া শঙ্কার বৈকি! গ্রামের রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে কিংবা মহল্লার সব জায়গায় একই চিত্র! ঘরে কিংবা বাইরে তাদের আচরণেও যার প্রভাব স্পষ্ট। এতে করে সচেতন সব মহলই উদ্বিগ্ন শিশু-কিশোরদের নিয়ে।

মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা ‘পাবজি’র মতো ভিডিওতে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এ গেমটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত হিংস্রতার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে পাবজি গেমটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গেমটি বন্ধ করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালেও। হিংস্রতার কারণে এ গেমকে নিষিদ্ধ করেছে ইরাক ও জর্ডানের মতো দেশ। টেকনোলজির দেশ চীনেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে গেমটি। যদিও নেপালে পরবর্তীকালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশেও এটি নিষিদ্ধ করার পর আবারও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে হয়তো। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, জার্মানি এবং চীনে ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আলাদা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এমন পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়তো আমাদেরও দরকার হবে।

অনলাইন গেমের আসক্তি বাড়ায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মানসিকতা কমে যাচ্ছে; পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাও হচ্ছে না তাদের। ইলেকট্রনিক ডিভাইসঘটিত অনলাইন গেমের এ আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল মাদক’! আর ভিডিও গেমে আসক্তির জন্য সৃষ্ট মানসিক সমস্যাকে বলা হচ্ছে গেমিং ডিজঅর্ডার। কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দ্রুত নজর দিতে হবে। তা না হলে হুমকির মুখে পড়বে শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ; সংকটে পড়বে নতুন প্রজন্ম। সরকারের উচিত, এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। অভিভাবকদের দরকার বাড়তি সচেতনতা। সামাজিকভাবে একটা আন্দোলন হোক, সমাজের সব সচেতন মানুষ এতে ভূমিকা রাখুক, শিশু-কিশোররা ভিডিও গেমসের আসক্তি থেকে বের হয়ে খেলার মাঠে ফিরুক কিংবা নানা রকম বইয়ের জগতে নিজেদের আবিষ্কার করুক-এটাই হোক আমাদের চাওয়া।

ব্যাংক কর্মকর্তা, দুমকি, পটুয়াখালী

অনলাইন গেমের ক্ষতি থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচান

 কে এম মাসুম বিল্লাহ 
১২ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভিডিও গেমের প্রতি শিশু-কিশোরদের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। বর্তমানে এর প্রভাব খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে এ আসক্তিকে সম্প্রতি ‘মানসিক রোগের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন ভিডিও গেম নিয়ে যথেষ্ট সচেতন। অনেক দেশই শিশুদের ভিডিও গেমসের ওপর মনিটরিং করছে।

যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। শিশুদের অতিরিক্ত ভিডিও গেমস আসক্তি নিয়ে দেশের বিশেষজ্ঞরাও অনেকদিন থেকে চিন্তিত। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ভিডিও গেম শিশুদের সামাজিকীকরণে বাধা দেয় এবং এর ফলে মেধা বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ ছাড়া বর্তমানে অনেক শিশুর আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। ভিডিও গেম খেলতে বাধা দিলে অনেক শিশু চিৎকার চেঁচামেচি করে, উচ্চস্বরে কথা বলে, রাগ দেখানো এবং অন্যান্য কাজে খুব বেশি মনোযোগ দিতে চায় না। গেম খেলতে না দেওয়া কিংবা এমবি কেনার টাকা না দেওয়ায় আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে দেশে।

অধিকাংশ ভিডিও গেমের কনটেন্ট যুদ্ধ, সংঘাত রক্তপাত নিয়ে, যা কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের অন্তরায়। বর্তমানে শুধু শহর এলাকায় নয়, ভিডিও গেমসের দিকে ঝুঁকছে গ্রামের শিশু-কিশোররাও। ইদানীং মফস্বলের শিশু-কিশোররাও একত্রে বসে দলবেঁধে ভিডিও গেম খেলছে। খেলার মাঠ থাকা সত্ত্বেও ভিডিও গেমের দিকে ঝুঁকে পড়া শঙ্কার বৈকি! গ্রামের রাস্তাঘাটে, চায়ের দোকানে কিংবা মহল্লার সব জায়গায় একই চিত্র! ঘরে কিংবা বাইরে তাদের আচরণেও যার প্রভাব স্পষ্ট। এতে করে সচেতন সব মহলই উদ্বিগ্ন শিশু-কিশোরদের নিয়ে।

মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা ‘পাবজি’র মতো ভিডিওতে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। মোবাইল ফোনের সহজলভ্যতা এবং হাতের নাগালের মধ্যে থাকা ইন্টারনেটের কারণেই এ গেমটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। এসব গেমে আসক্তির কারণে কিশোররা পারিবারিক, সামাজিক অবস্থান থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে।

অতিরিক্ত হিংস্রতার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে পাবজি গেমটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। গেমটি বন্ধ করা হয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও নেপালেও। হিংস্রতার কারণে এ গেমকে নিষিদ্ধ করেছে ইরাক ও জর্ডানের মতো দেশ। টেকনোলজির দেশ চীনেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে গেমটি। যদিও নেপালে পরবর্তীকালে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ বাংলাদেশেও এটি নিষিদ্ধ করার পর আবারও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে হয়তো। উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন ব্রিটেন, জার্মানি এবং চীনে ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আলাদা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। নিকট ভবিষ্যতে এমন পুনর্বাসন কেন্দ্র হয়তো আমাদেরও দরকার হবে।

অনলাইন গেমের আসক্তি বাড়ায় শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার মানসিকতা কমে যাচ্ছে; পাশাপাশি সাংস্কৃতিক চর্চাও হচ্ছে না তাদের। ইলেকট্রনিক ডিভাইসঘটিত অনলাইন গেমের এ আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল মাদক’! আর ভিডিও গেমে আসক্তির জন্য সৃষ্ট মানসিক সমস্যাকে বলা হচ্ছে গেমিং ডিজঅর্ডার। কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দ্রুত নজর দিতে হবে। তা না হলে হুমকির মুখে পড়বে শিশু-কিশোরদের মেধা বিকাশ; সংকটে পড়বে নতুন প্রজন্ম। সরকারের উচিত, এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। অভিভাবকদের দরকার বাড়তি সচেতনতা। সামাজিকভাবে একটা আন্দোলন হোক, সমাজের সব সচেতন মানুষ এতে ভূমিকা রাখুক, শিশু-কিশোররা ভিডিও গেমসের আসক্তি থেকে বের হয়ে খেলার মাঠে ফিরুক কিংবা নানা রকম বইয়ের জগতে নিজেদের আবিষ্কার করুক-এটাই হোক আমাদের চাওয়া।

ব্যাংক কর্মকর্তা, দুমকি, পটুয়াখালী

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন