মন্দা মোকাবিলায় মিতব্যয়িতার নীতি গ্রহণ জরুরি
jugantor
মন্দা মোকাবিলায় মিতব্যয়িতার নীতি গ্রহণ জরুরি

  নাদিম মাহমুদ  

২৩ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব অর্থনীতি যেন এক ঝোপের গাছ। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের অস্থিরতা মুহূর্তেই অসাড় করে তোলে বিশ্বের গোটা অর্থনীতিকে। বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো বিশ্বের অন্যতম খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহকারী দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতি অস্থির করে তুলেছে পণ্য ও জ্বালানির বাজার।

অন্যদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদের হার বাড়ানোয় শক্তিশালী করেছে ডলারের ক্রয়ক্ষমতা, যার বিপরীতে কমেছে অন্যান দেশের ম্দ্রুার মান। অনেক দেশকেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে।

এতে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, কমছে উৎপাদন ও চাহিদার হার, যা কি না মন্দার শঙ্কায় বিশ্ববাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

কোনো দেশে পরপর দুই প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকুচিত হলে তাকে মন্দা বলা হয়। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, কোনো দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেকারত্বের হার ১.৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেলে তাকে মন্দা হিসাবে গণ্য করা যায়। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বিজনেস ইকোনমিকসের ৭২ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন-২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মন্দা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং ২০ শতাংশ মনে করেন-বিশ্ব অর্থনীতি ইতোমধ্যে তার দোরগোড়ায়।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেন, বেশির ভাগ দেশই মন্দার দিকে যাচ্ছে; এমনকি বিশ্ব ১৯৭০ সালের চরম মন্দা-স্ট্যাগফ্লেশনও দেখতে পারে। আইএমএফ-এর প্রধান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা জানিয়েছেন-বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অনিশ্চিত।

তাই বলা বাহুল্য, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা এখন আর সংশয় নয়-এ যেন এক নিশ্চিত দুর্যোগেরই আগাম বার্তা। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপ্রতিরোধ্য হলেও তা মোকাবিলা করার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি যেমন ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করতে সাহায্য করে; তদ্রুপ এ অর্থনেতিক দুর্যোগে সচেতনতামূলক পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করে আমরা তা হ্রাস করতে পারি। মন্দায় যেহেতু রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর পৌষ মাস; অন্যদিকে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সর্বনাশ-তাই এক্ষেত্রে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ গ্রহণ করতে পারে ‘মিতব্যয়িতার’ নীতি।

বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে-‘মিতব্যয়ী কখনো দরিদ্র হয় না।’ এ কথার কার্যকারিতা সর্বযুগে প্রমাণিত; তাই আমরা আমদানিনির্ভর ও বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবহারে হতে পারি মিতব্যয়ী, করতে পারি অপচয় প্রতিরোধ; যা কিনা সংকটকালে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, যেহেতু মন্দায় উৎপাদন প্রক্রিয়া মন্থর রূপ লাভ করে, তাই আমরা দেশজ উৎপাদনকে গতিশীল রাখতে পূর্বপ্রস্তুতি হিসাবে ‘উৎপাদনশীলতার নীতি’ অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারি। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দেশের কোনো আবাদযোগ্য জমি যেন অনাবাদি পড়ে না রয়’ বলে যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা উচিত।

এক্ষেত্রে চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তরুণদের উচিত উদ্যোক্তা হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া মন্দায় যেহেতু আর্থিক সংকট থাকে চরমে, তাই একটি দেশের অর্থ সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে অর্থ পাচারজনিত সমস্যা। এটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক হারে বিস্তৃত। অর্থ পাচার রোধে সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। এভাবে পূর্বপ্রস্তুতি ও গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে আশা করা যায়-দেশকে মন্দার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা সহজ হবে।

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

মন্দা মোকাবিলায় মিতব্যয়িতার নীতি গ্রহণ জরুরি

 নাদিম মাহমুদ 
২৩ নভেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব অর্থনীতি যেন এক ঝোপের গাছ। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের অস্থিরতা মুহূর্তেই অসাড় করে তোলে বিশ্বের গোটা অর্থনীতিকে। বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ পরবর্তী বিপর্যয় সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মতো বিশ্বের অন্যতম খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহকারী দেশের এমন সংকটময় পরিস্থিতি অস্থির করে তুলেছে পণ্য ও জ্বালানির বাজার।

অন্যদিকে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি সুদের হার বাড়ানোয় শক্তিশালী করেছে ডলারের ক্রয়ক্ষমতা, যার বিপরীতে কমেছে অন্যান দেশের ম্দ্রুার মান। অনেক দেশকেই বাধ্য হয়ে বেশি দামে পণ্য আমদানি করতে হচ্ছে।

এতে দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, কমছে উৎপাদন ও চাহিদার হার, যা কি না মন্দার শঙ্কায় বিশ্ববাসীকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

কোনো দেশে পরপর দুই প্রান্তিকে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) সংকুচিত হলে তাকে মন্দা বলা হয়। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, কোনো দেশে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেকারত্বের হার ১.৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে গেলে তাকে মন্দা হিসাবে গণ্য করা যায়। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব বিজনেস ইকোনমিকসের ৭২ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন-২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে মন্দা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং ২০ শতাংশ মনে করেন-বিশ্ব অর্থনীতি ইতোমধ্যে তার দোরগোড়ায়।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ডেভিড ম্যালপাস বলেন, বেশির ভাগ দেশই মন্দার দিকে যাচ্ছে; এমনকি বিশ্ব ১৯৭০ সালের চরম মন্দা-স্ট্যাগফ্লেশনও দেখতে পারে। আইএমএফ-এর প্রধান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিভা জানিয়েছেন-বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন ও অনিশ্চিত।

তাই বলা বাহুল্য, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা এখন আর সংশয় নয়-এ যেন এক নিশ্চিত দুর্যোগেরই আগাম বার্তা। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ অপ্রতিরোধ্য হলেও তা মোকাবিলা করার জন্য পূর্বপ্রস্তুতি যেমন ক্ষতির পরিমাণ হ্রাস করতে সাহায্য করে; তদ্রুপ এ অর্থনেতিক দুর্যোগে সচেতনতামূলক পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করে আমরা তা হ্রাস করতে পারি। মন্দায় যেহেতু রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর পৌষ মাস; অন্যদিকে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সর্বনাশ-তাই এক্ষেত্রে আমাদের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশ গ্রহণ করতে পারে ‘মিতব্যয়িতার’ নীতি।

বাংলায় একটা প্রবাদ রয়েছে-‘মিতব্যয়ী কখনো দরিদ্র হয় না।’ এ কথার কার্যকারিতা সর্বযুগে প্রমাণিত; তাই আমরা আমদানিনির্ভর ও বিলাসবহুল পণ্যসামগ্রী, বিশেষ করে জ্বালানি ব্যবহারে হতে পারি মিতব্যয়ী, করতে পারি অপচয় প্রতিরোধ; যা কিনা সংকটকালে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে গতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, যেহেতু মন্দায় উৎপাদন প্রক্রিয়া মন্থর রূপ লাভ করে, তাই আমরা দেশজ উৎপাদনকে গতিশীল রাখতে পূর্বপ্রস্তুতি হিসাবে ‘উৎপাদনশীলতার নীতি’ অর্থাৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারি। এক্ষেত্রে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘দেশের কোনো আবাদযোগ্য জমি যেন অনাবাদি পড়ে না রয়’ বলে যে আহ্বান জানিয়েছেন, তাতে সাড়া দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা উচিত।

এক্ষেত্রে চাকরিনির্ভর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে তরুণদের উচিত উদ্যোক্তা হওয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এছাড়া মন্দায় যেহেতু আর্থিক সংকট থাকে চরমে, তাই একটি দেশের অর্থ সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে অর্থ পাচারজনিত সমস্যা। এটি আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে ব্যাপক হারে বিস্তৃত। অর্থ পাচার রোধে সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে কঠোর পদক্ষেপ। এভাবে পূর্বপ্রস্তুতি ও গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে আশা করা যায়-দেশকে মন্দার আগ্রাসন থেকে রক্ষা করা সহজ হবে।

শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন