নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ

  ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম ও ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিদিনের খাবার
প্রতিদিনের খাবার। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিন খাবার গ্রহণের সময় নানা প্রশ্নে জর্জরিত হচ্ছি আমরা। যা খাচ্ছি তা বিষ নয় তো? ফলমূলে কেমিকেল, মাছে ফরমালিন, মাংসে ক্ষতিকর হরমোন, শাকসবজিতে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ- এ ধরনের অনেক সংশয় ও আতঙ্কের মধ্যেই আমরা বেঁচে আছি।

শুধু অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে নয়, অনেক সময় উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদের কাছ থেকেও আমরা এ ধরনের কথা শুনতে পাই। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এক বিরাট চ্যালেঞ্জ আমাদের। তাই খাদ্যের যেসব ঝুঁকি নিয়ে আমরা সবসময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকি, সেগুলো সম্পর্কে কিছু বিজ্ঞানসম্মত দেশীয় তথ্য তুলে ধরার প্রয়াস আমাদের।

প্রথমেই আমাদের মনে রাখতে হবে, শূন্য ঝুঁকি বলতে কিছু নেই। প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই কমবেশি ঝুঁকি থাকে। তবে কোনো কিছুর ঝুঁকির চেয়ে তার উপকারের পরিমাণ যদি অনেক বেশি হয়, তাহলে আমরা সেই ঝুঁকিকে মেনে নিই। আমাদের আশপাশে এমন কোনো প্রযুক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা সম্পূর্ণভাবে ঝুঁকিমুক্ত বা আপনাকে কখনোই অসুস্থ করবে না।

মোবাইল, ল্যাপটপ, যানবাহন ইত্যাদি সবকিছুতেই ঝুঁকি জড়িত; কিন্তু এদের উপকারের মাত্রা এত বেশি যে এ ঝুঁকি গ্রহণে আমরা কোনো দ্বিধা করি না। তারপরও বিজ্ঞানীরা এসব প্রযুক্তির ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে আনতে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন আর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকরা দিচ্ছেন নতুন নতুন পরামর্শ। খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বেশি বা কম দু’ধরনের খাদ্য গ্রহণই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আমাদের গ্রহণ করতে হবে পরিমিত সুষম খাবার।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য, আমরা অনেকেই পরিমিত ও সুষম খাবারের দিকে খেয়াল করে খাবার গ্রহণ করি না। যারাও বা বোঝেন, তাদের একটি বিরাট অংশের ধারণা হল পুঁথিগত, যার সঙ্গে ব্যবহারিক জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই। পরিমিত সুষম খাবার বিভিন্ন উৎস থেকে নিলে খাদ্যে ঝুঁকির পরিমাণ কমে যাবে।

ধরুন যদি বিভিন্ন ধরনের মৌসুমি ফল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাওয়া হয়, তাহলে এর কোনো একটিতে সামান্য ক্ষতিকর উপাদান থাকলেও একবারে বেশি পরিমাণে সেই ফল না খাওয়ার ফলে অপকারিতা দেখা দেয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে। কারণ Toxicology-তে বলা হয়, সবকিছুই বিষাক্ত বা Toxic এবং এ বিষাক্ততা বা Toxicity নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ওপর। এমনকি জীবনের জন্য অপরিহার্য বিশুদ্ধ পানিও অধিক মাত্রায় গ্রহণ করলে তা Toxic হয়ে যাবে।

আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে সুষম খাবার পরিমিত না খাওয়ার জন্য। আর তাই খাবারে যদি সহনীয় মাত্রার চেয়ে কম পরিমাণে সামান্য পরিমাণ ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রিত থাকে, তবুও তাতে উপকারের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে আমাদের তা নষ্ট করা বা ফেলে দেয়া ঠিক হবে না।

এখন প্রশ্ন হল, খাবারে সহনীয় মাত্রার চেয়ে কম পরিমাণে ক্ষতিকর উপাদান মিশ্রিত আছে কিনা, তা আমরা কীভাবে বুঝব? এর জন্য দরকার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা যায় এ ধরনের গবেষণা, আর সেই গবেষণা হতে হবে স্বীকৃত (Accredited) ল্যাবরেটরিতে।

আশার কথা, দেশে বর্তমানে কৃষি বিষয়ে অনেক ভালো ভালো গবেষণা হয় এবং এ জন্য একজন কৃষিবিদ হিসেবে আমরা আনন্দ ও গর্ব অনুভব করি। আমাদের অনেকেরই ধারণা, যেভাবে আমাদের দেশে কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে আর আমরা যেসব খাবার খাই তাতে প্রচুর পরিমাণে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকাটাই স্বাভাবিক।

আমাদের এ ধারণাটি মোটেই সঠিক নয়। প্রথমত, আমাদের কৃষকরা উন্নত অনেক দেশের চেয়ে জমিতে অনেক কম কীটনাশক ব্যবহার করে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থা প্রকাশিত ‘Pesticide use per hector of cropland’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ইতালির মতো উন্নত অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশে কীটনাশকের ব্যবহার প্রতি হেক্টর ফসলি জমিতে ৪-৫ গুণ কম।

এসব উন্নত দেশ কীটনাশক ব্যবহার করে সঠিক সময়ে, নিয়ন্ত্রিতভাবে এবং কীটনাশক ব্যবহারের পর যাতে এর অবশিষ্টাংশ খাবারে না থাকে সে জন্য প্রি হারভেস্ট ইন্টারভাল এবং পোস্ট হারভেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিসগুলো খুব ভালোভাবে করে, যার কারণে তাদের খাবারের মান অনেক ভালো।

আমাদের দেশে যদিও এ প্র্যাকটিসগুলো কম হয়, তারপরও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের পরিমাণ সাধারণভাবে আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বারি) পেস্টিসাইড রেসিডিও ল্যাব একটি স্বীকৃত ল্যাবরেটরি, যেখানে এ সংক্রান্ত অনেক গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে।

সম্প্রতি আমাদের তত্ত্বাবধানে কিছু ছাত্রের গবেষণায়ও একই চিত্র পাওয়া গেছে। ঢাকা, কুমিল্লা, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর শহরের বিভিন্ন বাজার থেকে আমরা যেসব সবজির নমুনা সংগ্রহ করে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য পরীক্ষা করেছি, তাতে দেখা গেছে এসব সবজির ১০-১৫ শতাংশ নমুনায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের অস্তিত্ব আছে। আর ইউরোপিয়ান কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত সহনীয় মাত্রার ওপরে ধরলে এ হার দাঁড়ায় ৫-৯ শতাংশ।

এর অর্থ দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরিতে ৮০-৮৫ শতাংশ নমুনায় বর্তমান বাজার ব্যবস্থাপনাতেই কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ শনাক্তই করা যাচ্ছে না। আমাদের এ নমুনাগুলো অ্যানালাইসিস করা হয়েছে বাজার থেকে সংগ্রহ করার পর না ধুয়ে। কিন্তু আমাদের দেশের সাধারণ প্র্যাকটিস হল আমরা বাজার থেকে কোনো সবজি কিনলে তা ভালোভাবে ধুয়ে রান্না করে খাই।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভালোভাবে ধুলে ও রান্না করলে কীটনাশকের যদি কোনো অবশিষ্টাংশ সবজিতে থাকে, তার ৬০-৮০ শতাংশ চলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।

ফরমালিন আর কার্বাইড নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে আর এর অনেক বিপরীতমুখী বক্তব্যও আমরা শুনেছি। আমরা এও পত্রিকায় দেখেছি, যে মেশিনটি দিয়ে এটি শনাক্ত করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। যদিও এতে ইতঃপূর্বে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। আমাদের অবশ্যই সচেতন হতে হবে আর আমরা সচেতন বলেই আজ বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

নিরাপদ খাদ্য আইন জাতীয় সংসদে এরই মধ্যে পাস হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আমাদের যে ভয়, তা যেন বিজ্ঞানসম্মত তথ্যের ভিত্তিতে হয় সেদিকে আমাদের বেশি নজর দিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য নিয়ে আরও যেসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা যেতে পারে তার কয়েকটি নিচে উল্লেখ করা হল :

প্রথমত, আমাদের দরকার একটি জাতীয় পর্যায়ের ফুড সেফটি ল্যাব, যেখানে নিরাপদ খাদ্যের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমন্বিত গবেষণা চালানো সম্ভব হবে এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে তার ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে। ওই গবেষণাগারে প্রয়োজন হবে কেমিস্ট, বায়োকেমিস্ট, ফুড টকসিকোলজিস্ট, ফুড মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ইপিডিমিওলজিস্ট, ফুড ইকোনমিস্ট, ফুড লয়ারসহ ডাক্তারদের। যেহেতু নিরাপদ খাদ্যের কলেবরটি অনেক ব্যাপক তাই সমন্বিত গবেষণা ছাড়া এর প্রতিটি বিষয়ের ঝুঁকি মূল্যায়ন সম্ভব নয়।

এখনও অনেক বিষয় আছে যার সঠিক গবেষণার কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। যেমন পোলট্রি শিল্পের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ও ক্রোমিয়ামযুক্ত ফিডমিল, প্রসেস ফুডে এডিটিভ ছাড়াও খাদ্যের বিভিন্ন ধরনের ভেজাল ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে দেশে নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর ও বিএসটিআই একত্রে কাজ করলে তা খুবই কার্যকর হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশীয় খাদ্যের মান আন্তর্জাতিক মানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে আমরা Cordex কর্তৃক নির্ধারিত মানকে স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এর ফলে একদিকে যেমন আমাদের জনগণের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে আমরা আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃষিপণ্য সহজেই বিদেশে রফতানি করতে পারব।

বর্তমানে দেশে Cordex-এর একটি Contact Point বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে থাকলেও আমরা দেশে বিভিন্ন সেক্টর থেকে লোক নিয়ে এখনও একটি দক্ষ ও কার্যকর Cordex team তৈরি করতে পারিনি। এ ব্যাপারে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।

এ ছাড়া আমাদের কৃষি সেক্টরে আরও কিছু বিশেষায়িত অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি দরকার। অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরিগুলোয় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উপায়ে সঠিকভাবে গবেষণা করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বারি) Pesticide Residue Lab-এর মতো রাজধানী ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও একটি অ্যাক্রিডেটেড ল্যাবরেটরি তৈরি করতে পারলে তা নিঃসন্দেহে আমাদের নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে আরও বেশি অবদান রাখবে।

পরিশেষে বলব, অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৪তম অর্থনীতির দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। তখন অর্থনীতির আকারে আমাদের পেছনে থাকবে সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো অনেক দেশ।

নিরাপদ খাদ্য আমাদের এ অর্জনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে, কারণ নিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমেই আমরা পাব অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং সুস্থ, সবল, কর্মঠ ও দক্ষ মানবসম্পদ।

ড. মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম ও ড. তাজুল ইসলাম চৌধুরী তুহিন : শিক্ষক, কৃষি রসায়ন বিভাগ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×