সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে ধর্মীয় উৎসব

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পূজা
পূজামণ্ডপ। ছবি: যুগান্তর

মাস দুই আগে আমরা ঈদুল আজহা পালন করলাম। এখন শারদীয় ঢাকের বাদ্য চারদিকে। আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দুর্গাপূজার বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত নানা অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র ও সংবাদে পূজার আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। সংবাদপত্রগুলোও যথেষ্ট জায়গা ছেড়ে দেয় পূজার সংবাদ আর নিবন্ধের জন্য।

কয়েক বছর আগে আমার এক কলকাতার লেখক-বন্ধু এসেছিলেন দুর্গাপূজার সময়। এসব দেখে-শুনে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সত্যি মানতেই হবে, এ দেশের মানুষ মনেপ্রাণে অসাম্প্রদায়িক। আমাদের মিডিয়া এতটা মনোযোগ দেয় না মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসবের সময়।’

আমার লেখক-গবেষক মুসলমান ছাত্রী শিকোয়া নাজনীন (এখন প্রবাসী) একবার পূজার সময় টেলিফোন করে আমাকে ‘শুভ বিজয়া’ জানাল। আমি একটু অবাক হলাম। ঠিক অবাক বলা যাবে না, একটু বৈচিত্র্যের ছোঁয়া পেলাম। ভালোও লাগল। এর মধ্যে দু’জন হিন্দু বন্ধু এসএমএস করে ‘শুভ বিজয়া’ জানিয়েছিলেন।

ঈদের দিন আমি আমার অনেক হিন্দু বন্ধুকেও ‘ঈদ মোবারক’ জানিয়েছি। ওরাও ‘ঈদ মোবারক’ জানিয়ে এসএমএস করেছে। শিকোয়ার ‘শুভ বিজয়া’ জানানোয় বৈচিত্র্য এ জন্য যে, একজন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ আরেকজন মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত আমাকে এই প্রথম বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়েছে।

ঈদ, পুজো, খ্রিস্টানদের বড়দিন বা বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা- যে কোনো পার্বণ উপলক্ষে আমরা যদি ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে পরস্পরের জন্য শুভ কামনা করতে পারি তবে তো জয় হবে মানবতারই।

‘শুভ বিজয়া’ জানানোর পর শিকোয়া আরেকটি প্রশ্ন রেখেছিল। বলেছে, স্যার, দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুদের মধ্যে কেমন যূথবদ্ধ আনন্দ করতে দেখি, মণ্ডপে মণ্ডপে দলবেঁধে সবাই যাচ্ছে, এক সঙ্গে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। আমরা ঈদে তো এতটা উচ্ছ্বাস দেখতে পাই না। আমি বললাম, দুই ধর্ম সম্প্রদায়ের আনন্দ যার যার সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা থেকেই হয়ে থাকে। মুসলমানদের ঈদ আনন্দ তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই জড়িয়ে আছে। এখানে কোনো প্রতীকী স্থাপনা নেই।

ফলে পার্থিব ও অপার্থিব আনন্দ ফল্গুধারার মতো ছড়িয়ে থাকে। তবুও অধুনা ঈদ আনন্দে অনেক রূপান্তর ঘটেছে। বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। শিকোয়া শহরের গণ্ডিতে বড় হওয়া মেয়ে। মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলের ঈদ উৎসবের স্বরূপ ওর কাছে স্পষ্ট নয়। আমি ওকে বললাম, উনিশ শতকের ঢাকার ঈদ উৎসব এখনও টিকে থাকলে পূজার উৎসবের পাশাপাশি তুলনামূলক আলোচনা করতে পারতে। সে যুগে অনেক আনন্দঘন ঈদ উৎসব পালন করত ঢাকাবাসী।

ঈদের দিন জমকালো আনন্দ মিছিল বের হতো। অবশ্য কয়েক বছর ধরে ঢাকায় ঈদ আনন্দ মিছিল হচ্ছে। উনিশ শতকে আরমানিটোলা, ধূপখোলা বা রমনার মাঠে ঈদ উৎসবের অংশ হিসেবে কত্থক নাচের আয়োজন হতো। কোথাও হতো হিজড়া নাচ। ঘুড়ি ওড়ানো আর নৌকা বাইচের জমকালো আয়োজন থাকত।

আর এসব অনুষ্ঠানে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও আনন্দ ভাগ করে নিত। আমাদের ছেলেবেলার কথা স্মরণে আনতে পারি; নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস ছিল। এদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভারত চলে গেছেন। যেভাবে অনেক মুসলমান ভারত থেকে এসে স্থায়ী হয়েছেন বাংলাদেশে।

এসব বাড়িতে আমার বোনদের বান্ধবী অনেক দিদি ছিলেন। আদর-স্নেহ পেয়ে তাদের দূর সম্পর্কের মনে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হল, আমরা ছোটরা যেমন কর গুনে ঈদের অপেক্ষা করতাম, একইভাবে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা আর সরস্বতী পূজার জন্যও দিন গুনতাম। মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা, ঢাকির জাদুকরী হাতে মনমাতানো ঢাকের বাদ্যে মাতোয়ারা হওয়া আর প্রসাদ খাওয়ার লোভ তো ছিলই।

শুধু ঈদ নয়, মহররমের মিছিলেও ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ছিল। ইরাক-ইরানসহ অনেক আরব দেশে শিয়া-সুন্নির মধ্যকার দ্বন্দ্ব হানাহানির পর্যায়ে চলে যায়। এদিক থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আঠারো শতক থেকে ঢাকায় মহররম পালিত হচ্ছে। শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে সুন্নি মুসলমানের অংশগ্রহণ এ দেশে স্বাভাবিকই ছিল।

আঠারো-উনিশ শতকের নথিতে দেখা যায়, একটি সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেও শরিক হতো মহররমের তাজিয়া মিছিলে। বিশ্বাস ছিল কারবালার স্মৃতিতে দুলদুলের প্রতীক ঘোড়ার পায়ে দুধ ঢেলে মনোবাঞ্ছা করলে তা পূরণ হয়। অনেক হিন্দু মহিলা ইচ্ছেপূরণের আশায় দুলদুলের পায়ে দুধ ঢালতেন।

মুসলমান পীরের সমাধিতে হিন্দুর যাওয়া, প্রার্থনা করা এ দেশে একটি সাধারণ চিত্র। গ্রাম-গঞ্জের নানা জায়গায় এখনও ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার নদীতে কলার ভেলায় রঙিন কাগজের ঘর বানিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানো হয়। এই ‘ভেলা ভাসানো’ উৎসবে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে।

সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে আছে এমন মুসলমান বাওয়ালি, কাঠুরে বা জেলে বনের রক্ষাকর্ত্রী দেবী কল্পনায় বনবিবি আর ব্যাঘ্র দেবতা গাজীর নাম জপ করে। অন্যদিকে হিন্দু বাওয়ালি, কাঠুরে ও জেলে একই অধিকর্ত্রী দেবী হিসেবে বনদুর্গা আর ব্যাঘ্র দেবতা হিসেবে দক্ষিণ রায়ের নাম জপ করে।

এসব বাস্তবতা এ দেশের দীর্ঘকাল লালিত সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাই প্রকাশ করছে। সমাজ, ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি আমার লেখায় বহুবার বলার চেষ্টা করেছি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে এ দেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া খুব স্বচ্ছন্দে ডানা মেলতে পারবে না।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মানসিক গড়ন সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে না। তারপরও এ সত্য মানতে হবে, যারা ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার গাম্ভীর্য আর সৌন্দর্যে না দেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারা কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করে।

অন্য দল অতটা বুঝে নয়, বরং সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ও কূপমণ্ডূকতার কারণে ধার্মিক না হয়ে এক ধরনের ধর্মান্ধ হয়ে যায়। ধর্মচর্চার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন না করে অনালোকিত ও সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ধর্মনেতার বয়ান শুনে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়।

প্রথম শ্রেণির ধর্ম-বণিকদের চেনা যায়, ফলে এদের প্রতিহত করাও সম্ভব। কিন্তু অতি ধীরে হলেও দ্বিতীয় শ্রেণির সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষের সমাজ কলুষিত করার ক্ষমতা বেশি বলে আমি মনে করি। প্রথমে তারা নিজ পরিবারকে প্রভাবিত করে, পরে প্রতিবেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।

মানুষকে সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা করতে হয় জানার জগৎ শাণিত করে। আমি গবেষণার কাজে বেশ কিছুকাল কলকাতায় ছিলাম। লক্ষ করেছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যের খোঁজ আমরা যতটা রাখি ওপারের মানুষ আমাদের সম্পর্কে তেমনটা রাখতে পারেন না। এর অনেক কারণ আছে।

কলকাতায় কোনো বই বা জার্নাল প্রকাশিত হলে কলেজ স্ট্রিটের দোকানে আসার আগেই বাংলাদেশের বুক স্টলে চলে আসে। কালেভদ্রে বাংলাদেশের বইয়ের দেখা মেলে কলকাতার বইয়ের দোকানে। কলকাতার সব টিভি চ্যানেল আমাদের ড্রইং রুমে। আমাদের কোনো চ্যানেল দেখার সুযোগ নেই পশ্চিমবঙ্গে।

সম্প্রতি নাকি বিটিভি দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। মন্দের ভালো। একপেশে সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে এ দেশে বিটিভির দর্শক তেমন বেশি নয়। আমার এক সংস্কৃতি কর্মী ছাত্র যথার্থই মন্তব্য করেছিল গত রমজানের ঈদের পর। বলল, এই যে রোজা আর ঈদ গেল, এ নিয়ে কলকাতার বেশিরভাগ টিভি চ্যানেল তেমন কোনো অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন মনে করল না।

কোনো এক বছর ভারতের জি বাংলার মিরাক্কেল অনুষ্ঠানের কথা বলল। বাংলাদেশেও অনুষ্ঠানটি দর্শক-প্রিয়। বলল, ‘স্বাভাবিকভাবেই নানা পূজার সময় এই স্টুডিওতে নানা প্রস্তুতি থাকে। পোশাকে, সজ্জায় আর উপস্থাপনে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে যায়। অথচ সেবার ঈদের দিনে মিরাক্কেলের সম্প্রচার ছিল। কিন্তু এ সম্পর্কে একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি পুরো অনুষ্ঠানে।’

ওর মতে, ‘আমাদের দেশের কোনো টিভি চ্যানেলই এমন নীরব থাকত না।’ আমাদের চ্যানেল ওপারের মানুষ দেখতে না পাওয়ায় পূজা নিয়ে এ দেশে যে এত আয়োজন হচ্ছে তার খোঁজ তারা পাচ্ছেন না। পেলে হয়তো কলকাতার চ্যানেলেও এর একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়ত।

তবে এ সত্যটি খাটো করে দেখলে চলবে না যে, হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখতে হলে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের সহজ সম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজন আছে। তা সম্ভব দুই দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনাচরণ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখার মধ্য দিয়ে। না হলে সুযোগসন্ধানীরা উভয় দেশের মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সন্দেহের বিষ ছড়িয়ে দেবে। তাই এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে দুই পক্ষের দায়িত্বশীলদেরই।

আমার বরাবরই মনে হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে এ দেশের ধর্ম-বণিক রাজনীতিকদের অপতৎপরতা আর জঙ্গিবাদ কখনও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না।

এ জন্য অনালোকিত জনগোষ্ঠীকে আলোয় আনতে হবে আবহমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে। বিজ্ঞানমনস্কভাবে ধর্মচর্চা এবং বাঙালির হাজার বছরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পাঠ্যক্রমে যুক্ত করতে হবে। আর এ ঐতিহ্যের সৌন্দর্য সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে মিডিয়াকে। আলোর প্রক্ষেপণ ছাড়া কি অন্ধকার দূরীভূত হয়!

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×