প্রয়োজন পরিশুদ্ধ রাজনীতির সঙ্গে সমাজ সংস্কারও

  এ কে এম শাহনাওয়াজ ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতি
রাজনীতি। প্রতীকী ছবি

ধর্ম আর রাজনীতির মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাই আমি। পৃথিবীর সব ধর্মই মানবতার পক্ষে। শান্তির পক্ষে। কিন্তু অনেক সময়েই সুবিধাবাদী আর লোভী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে। নিজেদের লাভ ও লোভের ফসল ঘরে তোলে। অথচ দোষ হয় ধর্মের।

মধ্যযুগের গঠন পর্বে ইউরোপে রোমান পোপ ক্ষমতাসীন হয়ে পড়েছিল। তখন রাজনৈতিক ও অর্থনেতিক ক্ষমতা চলে আসে পোপের হাতে। ইউরোপের কোন রাজ্যের রাজা কে হবেন তা নির্ধারণ করতেন পোপ। পোপের এ রাজনৈতিক ক্ষমতা খর্ব করেন তৎকালীন গল অর্থাৎ বর্তমান ফ্রান্সের রাজা শার্লামেন।

ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার উদগ্র বাসনায় খ্রিস্টান বিশ্বের সঙ্গে ক্রুসেড বাধিয়ে দিলেন পোপ দ্বিতীয় আরবান। ধর্মের নামে যুদ্ধ বলে স্বাভাবিকভাবে এ যুদ্ধের নেতৃত্ব চলে আসে ধর্মনেতা পোপের হাতে। চারটি রক্তক্ষয়ী ক্রুসেড সংঘটিত হয়েছিল। পরিশেষে দেখা যায় ধর্ম ছিল উপলক্ষ মাত্র।

পোপের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার লড়াই ছিল এখানে প্রধান। একইভাবে অর্থের লোভ ধর্মনেতাদের অন্ধ করে দেয়। এখানেও ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করেন তারা। মধ্যযুগের শেষ দিকে এসে পোপ ও পাদ্রিরা এতটা অর্থলোভী হলেন যে চালু করে দিলেন ইনডালজেন্স বা পাপমুক্তির সনদ প্রথা।

রবিবার চার্চে গিয়ে পাদ্রির কাছে পাপ স্বীকারের একটি প্রথা রয়েছে খ্রিস্টান সমাজে। পাপ মোচনের জন্য ধর্মগুরু প্রার্থনা করেন। এবার নতুন প্রথা চালু হল, পাপের গুরুত্ব অনুযায়ী পাদ্রির বাক্সে নির্ধারিত টাকা ট্যাক্স হিসেবে দিতে হবে।

বিনিময়ে পাদ্রি অর্থ পরিশোধের সনদ দিতেন। এটিই ইনডালজেন্স। মৃত্যুর পর কফিনে দিয়ে দেয়া হতো সনদটি। পরকালে যাতে পাপমুক্তি হয়। এভাবে ধর্মের অপব্যাখ্যা চলতে থাকে।

মধ্যযুগের বাংলায় ইসলাম ধর্ম এ দেশে শক্ত ভিত্তি পেয়ে যায়। বিপুলসংখ্যক স্থানীয় মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। তলোয়ারের জোরে বাংলায় ধর্মান্তকরণ হয়নি। সুফিদের ঈশ্বরপ্রেম ও মানবপ্রেমের বাণী সেন রাজাদের সৃষ্ট প্রেমহীন সমাজে দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে।

সাধারণ মানুষ বর্জন করে কট্টর বর্ণবাদী সেন রাজাদের। ক্ষমতায় এসে তুর্কি সুলতানরা সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। জনগণের কল্যাণে তারা নিজেদের মেধা ও শক্তি প্রয়োগ করে। সেন রাজারা এ দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে ক্ষমতা বহাল রাখতে চেয়েছিলেন।

আর এ জন্য ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন ধর্মকে। ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা প্রচার করে সাধারণ মানুষকে অন্ধ করে রাখতে চেয়েছিলেন তারা।

আবার রাজনৈতিক শক্তির অপব্যবহার করে রাজনীতিকরাই বরাবর ফায়দা নিতে চেয়েছেন। সাধারণ মানুষ মনে করেছে রাজনীতি নষ্ট হয়ে গেছে। রাজনীতি নষ্ট হওয়ার বস্তু নয়। নষ্ট রাজনীতিকরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য যখন রাজনীতির শক্তিকে ব্যবহার করতে চান তখন অনেকেই দায় চাপায় রাজনীতির ঘাড়ে।

দীর্ঘকাল পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতিবাজ-অন্যায়কারীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে আমাদের নতুনভাবে আশাবাদী করে তুলেছেন। অনেক দুর্নীতিবাজ ধরা পড়েছে। অনেকের চেহারা উন্মোচিত হয়েছে এবং হচ্ছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন অন্যখানে।

গণমাধ্যমে দেখতে পাচ্ছি, আবার আওয়ামী লীগ নেতাদের মুখে শুনতে পাচ্ছি যে, দলের ভেতর আগাছা-পরগাছা রয়েছে। এবার তা পরিষ্কার করা হবে। আমাদের প্রশ্ন, কাদের ভুলে, দায়িত্বহীনতায় বা কোন গোপন চুক্তিতে আগাছাদের আমদানি ঘটেছে? তাদের খুঁজে সামনে আনা বিশেষ প্রয়োজন। শুদ্ধি অভিযানে এদের শুদ্ধ করা হবে কি না জানা প্রয়োজন।

সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলর গ্রেফতার হয়েছেন চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদক রাখার অপরাধে। ক্যাসিনো-কাণ্ডের পর কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। গ্রেফতার হওয়া এসব কাউন্সিলর বরাবরই এলাকায় মাস্তান হিসেবে পরিচিত। চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে সবাই চেনে।

তাহলে আমাদের প্রশ্ন আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা সব জেনেও এদের নমিনেশন দিয়েছিলেন কীভাবে? সন্ত্রাস-দুর্নীতির জন্য যদি এরা গ্রেফতার হন তবে তা জেনেশুনে আওয়ামী লীগের নেতারা যদি এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে থাকেন, তাদের অন্যায় কিছুমাত্র কম হওয়ার নয়।

শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে যদি সুস্থ সমাজ ও কালিমামুক্ত রাজনীতিতে ফিরতে চাই তাহলে পরিবেশ দূষণমুক্ত না করলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসতে পারে না। অনেক এমপির বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। শুদ্ধি অভিযানের তালিকায় অনেকের নামও রয়েছে। একই প্রশ্ন থাকতেই পারে।

এলাকার মানুষ ভালো করেই জানে এরা কলুষমুক্ত- নাকি নন। কতটা সন্ত্রাসী পোষেন, কতটা দখলবাজ আর কতটা গডফাদার বলে পরিচিত। এসব জেনেও যখন রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাদের এমপি বানিয়ে আনা হয় তখন তো শুদ্ধি অভিযান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যেতে পারে।

তবে প্রশ্নের অবকাশ থাকবে না যদি সরকার আর দল মনে করে যা হয়েছে তা তো হয়েছেই। আর নতুন করে ভুল করতে চাই না। এখন থেকে নিজেরা পরিশুদ্ধ হব আর শুদ্ধ করব চারপাশ, তাহলে এর চেয়ে ভালো কিছু হবে না।

দলতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কম ক্ষতিগ্রস্ত করছে না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, কারও বিরুদ্ধে টাকা নিয়ে চাকরি দেয়া বা চাকরির প্রতিশ্রুতি দেয়ার অভিযোগ। বিভিন্ন ধরনের নৈতিক স্খলনের অভিযোগ। কোনো অভিযোগ আরোপিত, কোনোটি ভিসি পদপ্রত্যাশীদের ষড়যন্ত্র।

তারপরও অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগে ভিসিদের পদত্যাগে বাধ্য করানো হয়। আমরা তো শুনি একজনকে ভিসি বানাতে অনেক গোয়েন্দা রিপোর্ট সরকার পর্যালোচনা করে। আর সর্বোপরি তাকে তো দলীয় হতেই হবে। অর্থাৎ মুক্তচিন্তার বিবেকের জায়গা নেই। ভিসি হতে পাণ্ডিত্যের কোনো ভূমিকাই নেই এ দেশে।

এ সবের যোগফলে যা হওয়ার তা তো হচ্ছেই। যে দেশে রাজনীতির নিয়ন্ত্রক রাজনীতিকরা জ্ঞানের কদর করেন না, সেই দেশকে শুদ্ধি অভিযান কতটা এগিয়ে দিতে পারবে? একজন অবসরপ্রাপ্ত বরেণ্য পণ্ডিত অধ্যাপক ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দুঃখ করে বলছিলেন- বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির জায়গা।

এখানে সর্বোচ্চ নির্বাহী নির্বাচনে রাজনৈতিক পক্ষ বিচার ভয়ানক পরিণতি ডেকে আনে। বর্তমান সরকার প্রসঙ্গে বলছিলেন দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আছেন সর্বাঙ্গে। যথার্থ পণ্ডিত ব্যক্তি। ক্যাম্পাসে সর্বজনের কাছে মান্যবর। তাকে কখনও বিবেচনা করবে না সরকার।

রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা কোথায় না শক্তির প্রভাব খাটান! এই যে প্রায়ই খবর বেরোয় সরকারি হাসপাতালগুলোয় দুর্নীতির রামরাজত্ব চলে। চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দুই টাকারটি বিশ টাকায় কেনা হচ্ছে। ওষুধ কেনা থেকে ক্যান্টিন চালানো সর্বত্রই তো রাজনীতির ছত্রছায়া শুষে নিচ্ছে সব।

আজ তো হঠাৎ নয়, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর দুর্নীতি চলছে। অনেকটা ওপেন সিক্রেটই। এতদিন কিন্তু এসব নজরদারির আওতায় আসেনি। তবুও ভালো শেখ হাসিনা সরকার শুদ্ধ করতে চাইছে সব।

ক্ষুদ্র, বৃহৎ সব অঞ্চলেই যেভাবে রাজনৈতিক শক্তির হাত ধরে অন্যায়, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস পাখা মেলেছে, একে সুস্থতায় ফিরিয়ে আনতে হলে আসলে একটি সামাজিক সংস্কার প্রয়োজন।

আমাদের বিবেচনা সত্যিকার অর্থে সততা ও দৃঢ়তার সঙ্গে শুদ্ধি অভিযান চললে তখন প্রয়োজনীয় সংখ্যক নির্লোভ, দেশপ্রেমিক মানুষ দলের ভেতর খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। ফলে দলের বাইরেও দৃষ্টি ফেলতে হবে।

এভাবে বর্তমান ধারার রাজনীতি-বিমুখ অথচ আদর্শিক বিচারে উন্নত, তেমন যোগ্য মানুষদের নির্মোহভাবে খুঁজে বের করতে হবে। তাদের হাতে তুলে দিতে হবে এগিয়ে চলার মশাল। উনিশ শতকের শুরুতেও বোঝা যায়নি বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সমাজের মানুষ কূপমণ্ডূকতা থেকে বেরোতে পারবে।

ধর্মীয় বলয় তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল। হিন্দু ব্রাহ্মণরা সতর্ক ছিলেন ইংরেজদের ধারেকাছে যাতে হিন্দুরা যেতে না পারে। প্রচার করে ম্লেচ্ছের ধারেকাছে যাতে তারা না যায়। কিন্তু শিক্ষিত সচেতন হিন্দু নেতারা বুঝেছিলেন ইংরেজদের সঙ্গে ইউরোপীয় জ্ঞান এবং আধুনিকতাও ভারতে চলে এসেছে।

এখন যদি ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ না করে নিজেদের গুটিয়ে রাখে তবে এ সম্প্রদায় পিছিয়ে পড়বে। হিন্দুদের চেয়ে আরও দশ পা পিছিয়ে ছিল মুসলমান সমাজ। একে তো অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া, অন্যদিকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তীব্র অভিমান তাদের। শত্রুজ্ঞান করছে।

কারণ প্রায় ছয়শ’ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ইংরেজশক্তি। তাই ইংরেজি শিক্ষা তো দূরের কথা, ওদের ছায়া পর্যন্ত মাড়াবে না মুসলমানরা। আতঙ্কিত শিক্ষিত মুসলিম নেতারা প্রমাদ গুনলেন। এ অবস্থা চললে ধ্বংস হয়ে যাবে এ সম্প্রদায়। তাই সমাজ সংস্কারের বিকল্প নেই।

সুতরাং এক মহান ব্রত নিয়ে প্রথমে হিন্দু সম্প্রদায় থেকে বেরিয়ে এলেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। তাদের চেষ্টায় দীর্ঘদিনের অর্গল ভেঙে এগিয়ে গেল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ।

একটু পরে মুসলিম সমাজ সংস্কারে এগিয়ে এলেন নওয়াব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমীর আলী, হাজী মোহাম্মদ মহসীন। তারা ধীরে ধীরে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিতে থাকলেন আপন সমাজকে।

ওপরের কথাগুলো রূপক উদাহরণ হিসেবে মানতে পারি। আওয়ামী লীগ সরকারে আরও ছোট করে বললে বলতে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুদ্ধি অভিযান নতুন আশাবাদ তৈরি করেছে ঠিকই; কিন্তু দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অচলায়তন ভাঙা অত সহজ নয়।

এ জন্য প্রয়োজন সমাজ সংস্কার আন্দোলন। নেতৃত্বের দৃঢ়তা বজায় থাকলে এ আন্দোলনে জয়ী হওয়া কঠিন হবে না। শুধু প্রয়োজন শুদ্ধি অভিযানের পাশাপাশি কালশিটে পড়া রাজনীতির অঙ্গনকে পরিশুদ্ধ করা।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×