সবার মাথায় একই প্রশ্ন ঘুরে কী করে?

  রুমিন ফারহানা ১৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রুমিন ফারহানা

বাইরের ঝলমলে সংসদ দেখতে অতি দৃষ্টিনন্দন; বিখ্যাত স্থপতি লুই কানের অনবদ্য স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন এটি। বহু মানুষ ঘুরে দেখতে যান সংসদ, এমনকি স্থাপত্যকলার অনেক বিদেশি ছাত্রছাত্রী তাদের পড়ার অংশ হিসেবে একবার হলেও দেখে যান বাংলাদেশের সংসদ।

কিন্তু মুশকিল হল সংসদ তো শুধুই কোনো স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন নয়, এর কাজ আছে। রাষ্ট্রের মূল তিনটি স্তম্ভের একটি হল আইন বিভাগ, যার সূতিকাগার সংসদ। কিন্তু একটি সংসদের ভেতরে ঠিক কী ঘটে তা জানার সবচেয়ে ভালো উপায় হল সংসদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকা, তাতে হাতে-কলমে বোঝা যায় ঠিক কী ঘটে সংসদে।

আমার জীবনে প্রথমবারের মতো সংসদে যোগ দিয়ে তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিকের যে দুস্তর ব্যবধান আমার নজরে এসেছে, মনে হল সেই বিষয়ে কিছু লেখা দরকার। তাত্ত্বিকভাবে একটি সংসদের মূল কাজ হল আইন প্রণয়ন ও সংশোধন করা, নানা বিষয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়ন ও পর্যালোচনা করা, জাতীয় স্বার্থসম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব ও সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

দেশে আইন প্রণয়নের বেশ কয়েকটি ধাপ আছে। আইনের যে কোনো বিল সংসদে আসে মোট তিনবার। আইনের প্রতিটি ধারার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তা রাখা, বাদ দেয়া কিংবা সংশোধন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, পরিবর্তনের দায়িত্ব একজন সংসদ সদস্যের। অথচ আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে হাতেগোনা ২-১টি বিল ছাড়া অধিকাংশ বিলেই দাড়ি, কমা, সেমিকোলন, কিছু ক্ষেত্রে প্রতিশব্দ ব্যবহার ছাড়া আর তেমন কোনো পরিবর্তন আনা হয় না।

আর সে কারণেই যেখানে ভারতের লোকসভায় একটি বিল পাস হতে সময় লাগে গড়ে ১৪১ মিনিট, সেখানে আমাদের সময় লাগে মাত্র ৩১ মিনিট। বলে রাখা ভালো সংসদ সদস্যদের হাত-পা বেঁধে রাখা অনুচ্ছেদ সংবিধানের ৭০ ধারা, এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

অধিবেশন চলা অবস্থায় অনেক সময়ই দেখা যায় কয়েকজন সংসদ সদস্য একত্রে আলাপ করছেন। জরুরি আলাপ নিশ্চয়ই; না হলে সংসদ চলা অবস্থায় আলাপ চলার কথা নয়। কেউ কেউ আলাপের প্রয়োজনে নিজ আসন ছেড়ে অন্য আসনেও গিয়ে বসেন। সংসদে অনেকের বক্তব্যই পূর্ণ থাকে নানা স্তব, স্তুতি আর স্মৃতিচারণে। অথচ সংসদের প্রতি মিনিটের মূল্য ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা।

ব্যয়বহুল এ সংসদের অন্যতম প্রধান কাজ সরকারের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। অথচ প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের যে প্রশ্ন তালিকা প্রথম থেকেই আমার নজর কাড়ছে, তা হল অধিকাংশ প্রশ্নই যে কেবল অতি সাধারণ ও জানা বিষয় নিয়ে করা তাই নয় বরং একই প্রশ্ন অধিকাংশ সাংসদ করেন কেবল নিজ এলাকার নাম বসিয়ে দিয়ে। বাজেট অধিবেশনে যোগ দেয়ার পর এখন চলছে আমার তৃতীয় অধিবেশন।

নিয়ম রক্ষার নিমিত্তে বসা এ সংসদ চলবে মাত্র ৫ দিন। বাজেট অধিবেশন এক মাস চলার পর পরবর্তী সংসদ চলেছে মাত্র ৪ দিন। এরপর ৫ দিনের এ সংসদ। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় ৬০ দিনের বাধ্যবাধকতা না থাকলে সংসদ বসত বছরে ২ বার। প্রথমবার রাষ্ট্রপতি ভাষণের পর আর দ্বিতীয়বার বাজেট অধিবেশনে।

এ ক্ষেত্রে বলে রাখি, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০ দিনের মতো সংসদ অধিবেশন থাকে এবং প্রতিদিন গড়ে ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট সংসদ চলে। মানে বছরে প্রায় ২৬০ ঘণ্টা সংসদ কাজ করে। ভারতে প্রতি বছর সংসদ বসে গড়ে ৯৫ দিন। প্রতিদিন সংসদ কাজ করে গড়ে ৬ ঘণ্টা করে।

অর্থাৎ ভারতে বছরে সংসদের কার্যক্রম চলে গড়ে ৫৭০ ঘণ্টা; যা বাংলাদেশের প্রায় ২.২৫ গুণ। সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনের সঙ্গে আমাদের কোনো তুলনাই চলে না, তবুও ব্রিটেনের ‘হাউজ অব কমন্স’-এর এ সংক্রান্ত তথ্য জেনে নেয়া যাক।

‘হাউজ অব কমন্স’-এর বছরে অধিবেশনে থাকে গড়ে ১৫০ দিন এবং প্রতিদিন কাজ হয় প্রায় ৮ ঘণ্টা। অর্থাৎ সেই দেশে বছরে সংসদে মোট কাজের সময় গড়ে ১২০০ ঘণ্টা; যা আমাদের প্রায় ৪.৫ গুণের বেশি। বাংলাদেশের সংসদ মানগত দিক থেকে এ সংসদ দু’টোর সঙ্গে তুলনীয় হবে, এটা প্রত্যাশা করি না; কিন্তু আমাদের সংসদ পরিমাণগত দিক থেকে হলেও অন্তত ভারতের সংসদের সঙ্গে তুলনীয় হবে, এটুকু প্রত্যাশা কি খুব বাড়াবাড়ি?

সংসদ সদস্যদের করা প্রশ্ন সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের অন্যতম একটি প্রধান উপায়। সংসদ শুরুর আগেই সংসদ সদস্যদের জমা দেয়া প্রশ্নগুলো চলে আসে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের উত্তরদানের জন্য। সেই প্রশ্নগুলো পাবলিক ডকুমেন্ট, যা যে কেউ দেখতে পারে।

প্রশ্ন প্রথম বাছাই হয় মাননীয় স্পিকার দ্বারা, তারপর বাছাইকৃত প্রশ্ন থেকে লটারির মাধ্যমে উত্তরের জন্য প্রশ্ন নেয়া হয়। অদ্ভুত বিষয় হল, অন্য যে কোনো বিষয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি ঐকমত্যে পৌঁছতে না পারলেও প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে দল-মত নির্বিশেষে অধিকাংশ সংসদ সদস্য অদ্ভুতভাবে একই ধারায় চিন্তা করেন! যার প্রতিফলন দেখা যায় কেবল এলাকার নাম পরিবর্তন করে হুবহু একই প্রশ্ন করার মধ্যে।

এবারের অধিবেশনের প্রশ্নগুলো দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নিচে আমি পাঁচটি মন্ত্রণালয়কে করা প্রশ্ন উদাহরণ হিসেবে আনলাম, যাতে দেখা যায় সব দলের সংসদ সদস্য একই প্রশ্ন করে চলেছেন কেবল নিজ নিজ এলাকার নাম বসিয়ে দিয়ে। টেম্পলেটের অপূর্ব এক নমুনা।

(ক) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রায় সব প্রশ্ন এ দুটিতে সীমাবদ্ধ :

১) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী, বর্তমানে ... জেলা আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কত; উক্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা; হইলে তাহা কী?

২) আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী ... জেলা আদালতে সহকারী জজসহ অন্য কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পদ শূন্য রহিয়াছে কিনা; থাকিলে জরুরি ভিত্তিতে শূন্যপদসমূহে দক্ষ জনবল নিয়োগ করা হইবে কিনা।

(খ) পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সর্বাধিক জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন ছিল :

১. পানিসম্পদ মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী, পানি ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ... উপজেলায় কোনো প্রকল্প চালু আছে কিনা; থাকিলে উক্ত প্রকল্পের কার্যসমূহ কী?

২. পানিসম্পদ মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী চলতি অর্থবছরে নদীভাঙন রোধকল্পে ... উপজেলায় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা, হইলে, তাহা কী?

৩. পানিসম্পদ মন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী চলতি অর্থবছরে ... উপজেলায় নদী ও খাল খননের লক্ষ্যে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা; হইলে তাহা কী?

(গ) শিল্প মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রশ্ন ছিল :

১. শিল্পমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী রফতানি আয় বৃদ্ধির/বেকারত্ব দূর করিবার লক্ষ্যে দেশে নতুন কোনো শিল্পকারখানা? স্থাপন করিবার পরিকল্পনা সরকারের আছে কিনা। থাকিলে তাহা কী এবং ... উপজেলায় একটি বিসিক শিল্পনগরী স্থাপন করা হইবে কিনা।

২. শিল্পমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী বর্তমানে ... জেলায় কোনো শিল্প পার্ক আছে কিনা, না থাকিলে একটি শিল্প পার্ক স্থাপন করা হইবে কিনা।

(ঘ) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে অধিকাংশ সংসদ সদস্যের জানার আছে মূলত ৩টি বিষয় :

১. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী চলতি অর্থবছরে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ... জেলার ... উপজেলায় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা, হইলে তাহা কী?

২. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী চলতি অর্থবছরের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় ... জেলার ... উপজেলায় কোনো উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হইয়াছে কিনা, হইলে সেইগুলো কী কী?

৩. দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী ... জেলার ... উপজেলায় গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার কর্মসূচির আওতায় কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিনা, হইলে তাহা কী?

(ঙ) তথ্য মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের কাছে সর্বাধিক জিজ্ঞাস্য প্রশ্ন ছিল- তথ্যমন্ত্রী মহোদয় অনুগ্রহ করিয়া বলিবেন কী বর্তমানে ... জেলায় কোনো দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় কিনা, হইলে প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা কত? উক্ত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন বাবদ কী পরিমাণ অর্থ আয় হয়?

বিষয়টি বোঝানোর জন্য র‌্যান্ডম ভিত্তিতে ৫টি মন্ত্রণালয় বেছে নিয়েছি। অন্য মন্ত্রণালয়গুলোও এর ব্যতিক্রম নয়। এভাবে কেবল এলাকার নাম পরিবর্তন করে একই প্রশ্ন সবাই করে আসলেই সরকারকে ন্যূনতম কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় কিনা সে ভার আমি পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম। আর একই প্রশ্ন দল-মত নির্বিশেষে কী করে অধিকাংশ সংসদ সদস্যের মাথায় আসে সেটিও এক বড় প্রশ্ন।

এর আগের একটি লেখায় বলেছিলাম, স্থানীয় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সঙ্গে যেহেতু এলাকার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সরাসরি জড়িত থাকেন, সেহেতু এটি মূলত দুটি সমস্যা তৈরি করে। প্রথমত, এটি একটি স্বাধীন, নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের ধারণার পরিপন্থী; দ্বিতীয়ত, আইনের এ ধারাটির কারণে সংসদ সদস্যদের এ কাজে অনেক বেশি মনোযোগী থাকতে দেখা যায়।

এসব প্রকল্পে যে দুর্নীতি হয় তার হিস্যা দাবি করতে সংসদ সদস্যদের একটা বড় অংশ পরিপূর্ণ মনোযোগ রাখেন স্থানীয় সরকারের প্রকল্পগুলোর প্রতি। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হয়েছে, সাংসদদের মূল যে কাজ অর্থাৎ আইন প্রণয়ন ও সংশোধন, নীতিনির্ধারণ কিংবা সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে যে পরিমাণ সময়, মেধা, শ্রম বিনিয়োগ করতে হয় সেই পরিমাণ সময় এবং শক্তি অধিকাংশ সাংসদেরই থাকে না। যা হওয়ার তাই হয়েছে।

সংসদে প্রতি মিনিটে ব্যয় ১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৮৬ টাকা হলে গড়ে প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট চলা সংসদের একদিনের ব্যয় ৩ কোটি ১৯ লাখ ১৮ হাজার ৭৭০ টাকা। জনগণের করের এ টাকার কী ব্যবহার আমরা করছি তা জানার পূর্ণ অধিকার আছে জনগণের।

রুমিন ফারহানা : সংসদ সদস্য

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×