Logo
Logo
×
   

বাতায়ন

স্বদেশ ভাবনা

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবসান হওয়াই ভালো

Icon

আবদুল লতিফ মন্ডল

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবসান হওয়াই ভালো

‘চুত্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রশাসন’ শিরোনামে গত ৮ ডিসেম্বর যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন প্রশাসনে কর্মরত বেশির ভাগ কর্মকর্তা।

তাদের সাফ কথা, সত্যিকার অর্থে জনস্বার্থ ছাড়া সচিবসহ কাউকে যেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া না হয়। নিয়োগ দেয়া হলে প্রশাসনে ক্ষোভ-হতাশা আরও বাড়বে। পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত হওয়া ছাড়াও দক্ষ, মেধাবী কর্মকর্তারা সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার কয়েক বছরের মধ্যে তৎকালীন আওয়ামী লীগের শাসনামল থেকে পরবর্তী একাধিক সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে সরকারি আদেশ জারি হলেও কমবেশি সব সরকারের সময়ে অবসর-প্রস্তুতি ছুটিতে যাবেন অথবা অবসর-প্রস্তুতি ছুটিতে গমন করেছেন, অথবা পুরোপুরি অবসর গ্রহণ করেছেন- এমন অনেক সরকারি কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করা হয় এবং ‘এখন সেটি নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে’ (ইত্তেফাক, ২১ অক্টোবর)। বিভিন্ন সরকারের আমলে কেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অব্যাহত থাকে এবং কেন এ ধরনের নিয়োগের অবসান হওয়া দরকার, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত নীতিমালা না থাকলেও সত্তর দশকে ও পরবর্তীতে বেশ কয়েকটি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে। তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের (বর্তমান জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ১৯৭৫ সালের মে মাসের এক আদেশে বলা হয়, যেসব ক্ষেত্রে তুলনীয় যোগ্যতম ও দক্ষতাসম্পন্ন টেকনিক্যাল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পাওয়া দুষ্কর, শুধু সেসব ক্ষেত্রেই চুক্তির ভিত্তিতে অবসর গ্রহণের পরও তাদের নিয়োগ করা যেতে পারে।

অন্যান্য ক্ষেত্রে অর্থাৎ যেখানে তুলনীয় যোগ্যতাসম্পন্ন লোক পাওয়া সম্ভব, সেখানে এ নীতির উদার প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় নয়। ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে এক আদেশে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ব্যাপারে ১৯৭৫ সালের উপর্যুক্ত আদেশটির প্রতি সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, অধিদফতর, সংস্থা ইত্যাদির দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

১৯৮২ সালের মার্চ মাসের এক আদেশে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনঃনিয়োগ বিবেচনার্থে কয়েকটি শর্ত নির্ধারণ করে দেয়।

এগুলো হল- (ক) প্রস্তাবিত পুনঃনিয়োগের পদটি কেবল কারিগরি ধরনের হতে হবে; (খ) পুনঃনিয়োগ প্রস্তাবিত কর্মচারীর চাকরি অত্যাবশ্যক হতে হবে; (গ) শূন্যপদে নিযুক্ত করার মতো কোনো কর্মচারী পাওয়া যাচ্ছে না- এরূপ পরিস্থিতি হতে হবে; এবং (ঘ) পুনঃনিয়োগ কনিষ্ঠদের পদোন্নতিতে কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, পেনশন ইত্যাদি নির্ধারণ করে অর্থ বিভাগ ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে একটি অফিস স্মারক জারি করে। এরপর অর্থ বিভাগ ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাদের বেতন, ভাতা, পেনশন ইত্যাদি নির্ধারণ/পুনঃনির্ধারণ করে আরেকটি অফিস স্মারক জারি করে। এতে অবসর গ্রহণের অব্যবহিত পূর্বে আহরিত বেতন চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত পদের বেতন হিসেবে নির্ধারিত হয়, যা ইতিপূর্বে অনেক কম ছিল।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে উপর্যুক্ত শর্তগুলো খুব একটা মানা হয়নি। বিশেষ করে গত প্রায় তিন দশকে সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয়করণে যে দুটি অস্ত্র ব্যবহৃত হয়েছে, তা হল পদোন্নতি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ।

১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের এক বছর পার না হতেই বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সময় তা কাজে লাগাতে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই বিএনপি সরকার বাংলাদেশ সচিবালয়ের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে সাতশ’র বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়।

ডিউটি পদের অভাবে পদোন্নতিপ্রাপ্ত এসব কর্মকর্তার অনেকে একবছর বা তার বেশি সময় ধরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে থাকেন। অর্থাৎ কোনো রকম কাজ না করে তারা বেতন-ভাতা, যানবাহন ইত্যাদি সুবিধা ভোগ করেন, যা সরকারি অর্থের অপচয় বৈ কিছু নয়।

১৯৯২ সালে বিএনপি প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই ‘গণপদোন্নতি’র যে নজির সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার শূন্যপদ ছাড়া পদোন্নতি এবং প্রশাসনে দলীয়করণের গতিকে জোরদার করে। বিএনপির ভাবধারায় বিশ্বাসী বা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল সিনিয়র কর্মকর্তাদের অবসর প্রস্তুতি ছুটি বাতিল করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের অনেকে জোট সরকারের পূর্ণ মেয়াদে চুক্তিতে নিয়োজিত ছিলেন।

সেনাবাহিনী সমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয়করণে বিএনপির সৃষ্ট রেকর্ড ভঙ্গ করে ফেলে। বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল কর্মকর্তাদের হয় পদোন্নতিবঞ্চিত করা হয়, না হয় ওএসডি করা হয়, না হয় বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। যাদের ওএসডি করা হয়, তাদের অনেকে বছরের পর বছর সে অবস্থায় থেকে অবশেষে অবসরে চলে যান।

অন্যদিকে সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক শূন্যপদ ছাড়াই বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি প্রদান অব্যাহত রাখে। অব্যাহত থাকে আওয়ামী লীগের ভাবধারায় বিশ্বাসী বা আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল সিনিয়র কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান।

‘আওয়ামীপন্থী’ হিসেবে পরিচিত যেসব মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে বিএনপি অবসর প্রদান করেছিল বা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী যারা স্বাভাবিক নিয়মে অবসর গ্রহণ করেছিলেন, তাদের অনেককে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। অনেককে নিয়োগ দেয়া হয় বিভিন্ন কমিশনে। এরপরের ইতিহাস আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র শাসনের ইতিহাস।

একাধিক কারণে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত যুক্তিসঙ্গত হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কারণগুলোর হল- এক. দেশে বেকারের হার, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের হার অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। গত বছরের ১৬ নভেম্বর আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান নিয়ে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ১৯৯৫-৯৬ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের হারের (৪ দশমিক ২ শতাংশ) চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

আর যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর যুবকদের বয়সভিত্তিক বেকারত্বের হার থেকে দেখা যায়, ১৫-১৯, ২০-২৪ এবং ২৫-২৯ বয়সসীমার তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার হচ্ছে যথাক্রমে- ১২ দশমিক ৭, ১২ দশমিক ১ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, সার্বিকভাবে শিক্ষিতদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের বেশি বেকার। আর সার্বিকভাবে এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা প্রথম শ্রেণি পেয়েছেন, তাদের মধ্যে বেকারত্ব সাড়ে ১৯ থেকে সাড়ে ৩৪ শতাংশ।

দুই. সরকার ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সরকারি চাকুরেদের চাকরির বয়সসীমা দুই বছর বৃদ্ধি করেছে। অর্থাৎ সরকারি চাকুরেদের অবসরের বয়সসীমা ৫৭-এর পরিবর্তে ৫৯ বছর করা হয়। এতে চাকরিরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা লাভবান হলেও দু’বছর অবসর গ্রহণ বন্ধ থাকায় কার্যত এ সময়কালে নতুন নিয়োগ বন্ধ থাকে। ফলে লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক-যুবতীর সরকারি চাকরিতে প্রবেশ বন্ধ থাকে। এর প্রতিফলন ঘটেছে শিক্ষিত যুবশক্তির বেকারত্বের হার নজিরবিহীন বৃদ্ধিতে।

তিন. একদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ অন্যদিকে শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি প্রদান- এরূপ বিশৃঙ্খলার ফলাফল হল পদোন্নতিপ্রাপ্ত শত শত কর্মকর্তার ওএসডি বা পদোন্নতি-পূর্ব পদে কর্মরত থাকা (ইন-সিটো)। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধ করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান বহুলাংশে সম্ভব।

চার. কর্তৃপক্ষ একজন চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মকর্তাকে স্বল্পকালীন নোটিশে বিদায় করতে পারে। সাধারণত এ ধরনের নোটিশের মেয়াদ হয় এক মাস। ফলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কর্মকর্তারা তাদের দায়িত্ব পালনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হন। তারা নিরপেক্ষভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে সাহস পান না। এতে জনগণ নিরপেক্ষ সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

পাঁচ. ক্ষমতাসীনদের ভাবধারায় বিশ্বাসী কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে দলীয় সরকার তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চায়। তাছাড়া সারাজীবন নিরপেক্ষভাবে চাকরি করে চাকরির শেষ প্রান্তে এসে অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের আশায় দলীয় কর্মকর্তার মতো আচরণ শুরু করেন। দলীয় সরকার এ সুযোগটি কাজে লাগায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে আবুল মাল আবদুল মুহিত জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীকে লেখা এক চিঠিতে বলেছিলেন, ‘সচরাচর অবসরের পরে চাকরির মেয়াদ বাড়ালে কর্মকর্তাদেরও অসুবিধা হয়।

কারণ তখন তাদের কোনো দলের সদস্য বলে অপবাদ দেয়া হয়।’ তাই এ কথা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায় যে, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয়করণ বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রশাসন সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। সরকারি কর্মকর্তারা স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন না করলে জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বন্ধের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয়করণ অনেকটা কমিয়ে আনা গেলে শুধু প্রশাসন ব্যবস্থা নয়, বরং সারা দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

[email protected]

নিয়োগ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম