ট্রাম্পের অভিশংসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা আছে
Advertisement
পল ক্রুগম্যান
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন বিস্মিত হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়, এটি কোনো সন্ধিক্ষণও নয়। আমরা জানতাম যে, প্রতিনিধি পরিষদ অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেবে।
আমরা আরও জানি, রাজনীতিতে যে কোনো কিছু যেমন নিশ্চিতভাবে জানা যায়, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করবে না; এমনকি এ সিনেট সাক্ষ্য-প্রমাণগুলোকে বিবেচনায় নেয়ার ভানও করবে না। সুতরাং পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে নিরাশ হওয়ার মতো আচরণ করাই হবে স্বাভাবিক।
কিন্তু যেমন মনে করা হচ্ছে, বিষয়টি তেমন নয়। এটি ছিল খুবই আবেগপূর্ণ একটি দিন। আশা ও হতাশায় মিশ্রিত একটি দিন। হতাশার কারণগুলো স্পষ্ট।
যুক্তরাষ্ট্র সচরাচর যেসব বিষয়ের পক্ষ নেয়, আমরা অতি সহজেই সেসব বিষয় হারিয়ে ফেলতে পারতাম। স্বাধীনতার জন্মস্থানটি অনেক ভালো থাকতে পারত এর সব আদর্শ ঝেড়ে ফেলার মাত্র কয়েক মাস আগে। তবে আশারও কিছু কারণ সেখানে আছে।
যতটুকু নির্লজ্জ ও দুর্নীতিগ্রস্ত তারা হতে পারে ততটুকু হয়ে স্বাধীনতার শত্রুরা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশে- হাঙ্গেরি থেকে তুরস্ক পর্যন্ত, যেখানে গণতন্ত্র কার্যকরভাবে ভেঙে পড়েছে।
তবে আমেরিকার গণতন্ত্রের রক্ষকরা মনে হচ্ছে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ ও সংকল্পবদ্ধ তাদের বিদেশি প্রতিপক্ষ থেকে। কিন্তু বড় প্রশ্নটি হচ্ছে, এ ভিন্নতা আমাদের সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট কিনা?
এমন সন্দেহ কখনই ছিল না যে, ট্রাম্প তার ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন। আইনের শাসনকে অবজ্ঞা করার নিজের বার্তা তিনি একেবারে শুরু থেকেই দিয়ে এসেছেন।
পরিত্রাণ পেরিয়ে : রিপাবলিকানরা, অন্য কথায় বলতে গেলে পরিত্রাণ বা মুক্তির পথ পেছনে ফেলে গেছে। তারা হয়ে পড়েছে এমন আরেকটি দল, যারা কিনা নেতার নীতির প্রতি একান্তভাবে নিয়োজিত।
আর অন্যান্য দেশের একই ধরনের দলের মতো রিপাবলিকান পার্টি চাচ্ছে অসদুপায় অবলম্বন করে ভবিষ্যতে নির্বাচনে ভোট কারচুপি ও ভোটারদের নিগ্রহ করতে, যাতে করে স্থায়ীভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যায়। কিন্তু যদি ট্রাম্পের সমর্থকদের বিদেশের ব্যর্থ গণতন্ত্রগুলোর সমর্থকদের মতো বিবেচনা করা হয়, তবে তার বিরোধীদের তেমন বিবেচনা করা হয় না।
হাঙ্গেরির ফিডেস্জ এবং পোল্যান্ডের ল’ অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির মতো একনায়কতান্ত্রিক দলগুলোর উত্থানের ক্ষেত্রে হতাশাজনক বিষয়গুলোর একটি হয়ে পড়েছে তাদের বিরোধীদের অক্ষমতা- অনৈক্য, অসংঘবদ্ধ এবং কার্যকর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে অসমর্থ হওয়া।
এমনকি অজনপ্রিয় স্বৈরশাসকদেরও তারা কিছু করতে পারছে না, কারণ তারা নিজেদের ক্ষমতাকে সংহত করে নিয়েছে।
বিপরীতে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে (ট্রাম্পিজম) দৃঢ়সংকল্প, ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর বিরোধিতা এসেছে প্রথম থেকেই- যা প্রতিধ্বনিত হয়েছে গণজমায়েত এবং ডেমোক্রেটদের নির্বাচনী বিজয় উভয় ক্ষেত্রে। ২০১৭ সালে যেখানে রিপাবলিকান দলের ৩৫ জনের বিপরীতে ডেমোক্রেট গভর্নর ছিলেন ১৫ জন, সেখানে এ সংখ্য এখন রিপাবলিকান ২৬, ডেমোক্রেট ২৪।
অন্যদিকে গত বছর ডেমোক্রেটরা প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে বড় ধরনের জয়লাভ করেছে, যার ওপর ভর করে অভিশংসনের শুনানি ও ভোট আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে।
সাংবিধানিক দায়িত্ব : কংগ্রেসের নতুন ডেমোক্রেটিক সদস্যদের বেশিরভাগ জয়ী হয়ে এসেছেন রিপাবলিকান-ঝোঁকপ্রবণ জেলাগুলো থেকে এবং পর্যবেক্ষকরা আশা করছেন আরও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসবেন।
এর বাইরে দলটি প্রায় সংঘবদ্ধভাবে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সত্য হল, এর বিরোধীরাও তেমনটি করেছে। কিন্তু যখন রিপাবলিকানরা ট্রাম্পকে রক্ষা করতে তাদের বিকৃত আওয়াজ তুলেছে, তখন ডেমোক্রেটরা ঐক্যবদ্ধ, আন্তরিক ও দৃঢ়সংকল্পভাবে এগিয়ে এসেছে তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে। এমনকি রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পড়ার মুখেও তারা অটল থেকেছে।
এখন এর অর্থ অপরিহার্যভাবে এটা প্রমাণ করে না যে, গণতন্ত্র টিকে থাকবে। এমনকি তারা নির্বাচনে হারতে থাকলেও রিপাবলিকানরা আদালত ও অন্যান্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব সুদৃঢ় করছে। কংগ্রেসের ডেমোক্রেটিক নেতারা অপ্রত্যাশিতভাবে, এমনকি কিছুটা বাজেভাবে হলেও প্রভাব বিস্তারকারী। তবে ডেমোক্রেটিক প্রেসিডেন্সিয়াল মাঠ তেমনটি নয়।
আর একটি লক্ষ্যের প্রতি যে ঐক্য আমরা দেখছি, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত তেমনটি সমুন্নত থাকবে না। যদি ডেমোক্রেট দল এলিজাবেথ ওয়ারেন বা বার্নি স্যান্ডার্সের মতো প্রগতিশীল প্রার্থীদের প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন দেয়, তবে কি ধনী ডেমোক্রেটরা তাদের কর হার কম রাখার চেয়ে গণতন্ত্রকে রক্ষা করাকে কম গুরুত্বপূর্ণ বলে সিদ্ধান্ত নেবেন?
যদি দল জো বাইডেনের মতো উদারপন্থী কাউকে মনোনয়ন দেয়, তবে কি স্যান্ডার্সের সমর্থকরা তাদের হতাশা প্রকাশ করবেন- ২০১৬ সালের মতো ভোটের দিন ঘরে বসে থেকে অথবা তৃতীয় কোনো দলের প্রার্থীকে ভোট দেয়ার মাধ্যমে? আমি জোরের সঙ্গে এমন উদ্বেগকে বাতিল করে দিতে চাই; কিন্তু সেটি আমি পারছি না।
এটুকু যোগ করা যায় যে, আগামী বছরের নির্বাচনে ট্রাম্পের পক্ষে কারচুপি করা হবে ভোটারদের নিগ্রহ করা ও ইলেক্টোরাল কলেজকে একদিকে ঝোঁকানোর প্রক্রিয়া তৈরির মধ্য দিয়ে।
এমনকি বড় ধরনের ঝোঁক তৈরি করা হতে পারে সিনেটের একটি রূপরেখার মাধ্যমে, যাতে ছোট ও বেশির ভাগ রক্ষণশীল রাজ্যগুলোতে উদারপন্থী রাজ্যগুলোর চেয়ে বেশি প্রতিনিধি দেয়া যায়। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পিজমের আরেকবার জয়ের সম্ভাবনা তৈরি করা খুবই সম্ভব।
তবে আমরা যা শিখেছি তা হল- একটি বিশেষ গোষ্ঠীর প্রভাব নয়, যারা আমেরিকাকে তার আদর্শগুলো রক্ষার মাধ্যমে সুরক্ষা দেবে, তারা সহজে ছেড়ে দেবে না। খারাপ খবর হচ্ছে, আমাদের খারাপ মানুষগুলো যে কোনো স্থানের চেয়ে খারাপ মানুষের মতোই খারাপ।
আর সুখবর হল, আমাদের ভালো মানুষগুলো মনে হয় প্রথার বিপরীতে গিয়ে সঠিক কাজটি করার জন্য সংকল্পবদ্ধ।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম
পল ক্রুগম্যান : নোবেলজয়ী মার্কিন বুদ্ধিজীবী, সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অর্থনীতির শিক্ষক
