মিঠে কড়া সংলাপ

পুঁজিবাজার কি নিঃশেষ হয়ে যাবে?

  ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন ১১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের পুঁজিবাজারের সর্বশেষ অবস্থা কী এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের মর্মবেদনা, তাদের আর্তনাদ ইত্যাদি বিষয়গুলো সরকারদলীয় হাইকমান্ড প্রকৃতভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ গত ১০-১২ বছর ধরে টানা দুর্গতি পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে নিয়ে গেলেও বিষয়টি নিয়ে কাউকে তেমন সিরিয়াস ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।

মাঝে মধ্যে যা বলা বা করা হয়েছে, তা গালভরা বুলি মাত্র! যদিও গত ডিসেম্বরে দলীয় কাউন্সিল ও অনুষ্ঠান ইত্যাদি কারণে সরকারি দলের হাইকমান্ডসহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করেছেন, সে অবস্থায় এ দিকটায় তেমন নজর দেয়া সম্ভব না হওয়াটাও স্বাভাবিক।

কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম স্তম্ভ এবং অন্যতম একটি নিয়ামক শক্তি পুঁজিবাজার যে অন্তিম শয়ানে চলে যাবে, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। যদিও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিপূর্বে বারবার তৎপরতা দেখিয়েছেন; কিন্তু তাতে করেও বিশেষ কোনো ফল লাভ হয়নি। কারণ, যাদের হাতে পুঁজিবাজারের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয়েছে, তারা গোড়ায় গলদ করে বসে আছেন।

আর এসব গলদের দায়িত্বভার গ্রহণ করে তারা সরেও দাঁড়াচ্ছেন না বা তাদের সরিয়েও দেয়া হচ্ছে না। ফলে ডিএসই ও এসইসির দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকর্তারা এক ধরনের ইনডেমনিটি ভোগ করে বছরের পর বছর চেয়ার দখল করে বসে আছেন। প্লেসমেন্ট শেয়ার, অধিক প্রিমিয়ামসহ শেয়ার ছাড়ার অনুমোদন ইত্যাদি বাণিজ্যের সুযোগ করে দিয়ে ওইসব কর্মকর্তা পুঁজিবাজার থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছেন।

আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ায় ব্যাংকিং সেক্টরের ধস এবং সেখানকার অরাজকতাও পুঁজিবাজারকে গ্রাস করেছে। এর ফলে অর্থমন্ত্রী ‘মিটিং-সিটিং’ করেও বাজারটিকে ধরে রাখতে পারছেন না। বাজারটিকে রক্ষা করা তার পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ ইতিমধ্যেই লুটেরারা যেমন তফসিলি ব্যাংক থেকে টাকা লুটে নিয়েছে, আবার পুঁজিবাজারেও কারসাজির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়েছে। ফলে ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে এক ধরনের দেউলিয়া অবস্থা বিরাজ করছে।

দেশি-বিদেশি কোনো বিনিয়োগকারীই এখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে সাহস করছেন না। তারা মনে করছেন, সেখানে বিনিয়োগ করলেই কারসাজির মাধ্যমে তাদের টাকা লুটে নেয়া হবে। আবার ব্যাংকিং সেক্টরেও এক ধরনের আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংকের টাকা একশ্রেণির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেভাবে লুটপাট করা হয়েছে, এর ফলে সেখানেও চরম বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

ফলস্বরূপ দেশের পুঁজিবাজার রক্তশূন্য হয়ে পড়েছে। দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের এমন একটি প্রতিষ্ঠানের দুর্দশা দেখে অভিজ্ঞ মহল প্রমাদগোনা শুরু করেছেন। তারা বলছেন, পুঁজিবাজারকে এমনভাবে বিপদগ্রস্ত ও বিপর্যস্ত রেখে দেশের অর্থনীতি সঠিক এবং সুষ্ঠু ধারায় পরিচালিত হচ্ছে, এমন কথা বলা সত্যের অপলাপ মাত্র।

এ অবস্থায় পুঁজিবাজারকে বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে উদ্ধার করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হস্তক্ষেপ তথা পদক্ষেপ গ্রহণই একমাত্র উপায় বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। তিনি যদি সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে কঠোরভাবে তা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন এবং সে নির্দেশ যদি বাস্তবায়িত হয়, শুধু তখনই পুঁজিবাজারে সুবাতাস ফিরে আসবে, পুঁজিবাজার গতিশীল হবে।

ইতিমধ্যে তফসিলি ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে যেসব আর্থিক অনিয়ম-দুর্নীতি করে আর্থিক খাতের সর্বনাশ ডেকে আনা হয়েছে, সেখান থেকে ফিরতে হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি কমিশন গঠন করা যৌক্তিক বলে অনেকে মনে করছেন। অন্যথায় বছরের পর বছর ধরে এ অবস্থা চলতে দিলে ব্যাংক ও পুঁজিবাজার- এ দুটি আর্থিক খাতই যে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে, সে কথাটি বলাই বাহুল্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এ বিষয়ে কমিশন গঠন বা উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হল এই কারণে যে, অর্থমন্ত্রী মহোদয় বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও পুঁজিবাজারে সুষ্ঠু ধারা ফিরিয়ে আনতে পারেননি। আবার ব্যাংক সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে; এমনও নয়। এ অবস্থায় দেশের মানুষ যাতে ভাবতে শুরু না করে যে, সরিষাতেই ভূত আছে; সেজন্যই একটি শক্তিশালী কমিশন গঠনের মাধ্যমে লুটেরাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে অশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

অন্যথায় ব্যাংকগুলোর ভেতরের অবস্থা যেভাবে খারাপ হয়েছে এবং সেসব ঠেকানো যেমন সম্ভব হয়নি, সেভাবে পুঁজিবাজারের অন্তিম দশাও কিন্তু ঠেকানো যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

এ মুহূর্তে দেশের লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে সর্বস্বান্ত হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত যারা ধুঁকেধুঁকে টিকেছিলেন, তাদেরও মরণদশা ঘনিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে তারা তাদের ক্ষোভ-হতাশা জানাতে গিয়ে পুলিশি হামলা ও মামলারও শিকার হয়েছেন। সুতরাং তারা তাদের সর্বস্ব হারিয়ে ফেললেও নীরবে সহ্য করা ছাড়া আর করার কিছুই নেই। কারণ পুঁজিবাজারে সর্বস্ব হারানো ব্যক্তিদের ক্ষোভ দমনেও পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষ পুলিশি ব্যবস্থা গ্রহণের নীতি অবলম্বন করেছে।

এ অবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই বিনিয়োগকারীদের শেষ ভরসার স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। একমাত্র তিনিই লাখ লাখ বিনিয়োগকারীকে বিপর্যয়ের কিনারা থেকে রক্ষা করতে পারেন। আগেই বলা হয়েছে, এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ইদানীং যেসব কথা বলছেন বা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন, সেসবেও কোনো কাজ হয়নি বা হচ্ছে না। অবশ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিপূর্বে কিছু নির্দেশনা প্রদান করেছিলেন।

এখন দেখা উচিত তার সে নির্দেশনা যথাযথভাবে পালিত হয়েছে কিনা বা অতি কৌশলে তা পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে কিনা। কেউ যেন কোনো নির্দেশনা প্রভাবিত না করতে পারে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নতুন দিক-নির্দেশনা দেবেন, সেটাই কাম্য; অন্যথায় পুঁজিবাজারকে কিন্তু বাঁচানো যাবে না বা যাচ্ছে না।

এসব না ভেবে, এসব না করে, যদি মনে করা হয় পুঁজিবাজার একটি অনিরাময়যোগ্য রোগে আক্রান্ত, অতঃপর এভাবেই ব্যাপারটি নিঃশেষ হয়ে যাবে তাহলে আলাদা কথা। সেক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে যেসব বিনিয়োগকারী এখনও ধুঁকেধুঁকে টিকে আছেন, তাদের বিনিয়োগের বাদবাকি অংশটুকুও লুটেরা শ্রেণিকে লুটে নেয়ার সুযোগ দেয়া ছাড়া আর করারই বা কী আছে?

কেউ কেউ তো ইতিমধ্যেই শত শত, হাজার হাজার কোটি টাকা এখান থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। বাদবাকি যেটুকু আছে, সেটুকু নিলেই বা তাতে দোষের কী? কারণ এসব লুটেরার অনেকেই তো হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়ে বিদেশে পাচার করছেন; সেখানে বাড়ি-গাড়ি, সহায়-সম্পদ গড়ে তুলছেন। আবার কেউ কেউ পুঁজিবাজার থেকে টাকা লুটে নিয়ে সটকে পড়ে এ দেশেই বহাল তবিয়তে আছেন। এসব টাকায় তারা এখন শত শত কোটি টাকার মালিক।

প্লেসমেন্ট শেয়ার, একাধিক কোম্পানির মালিক হিসেবে এক কোম্পানির শেয়ার অন্য কোম্পানিতে স্থানান্তর করা, অধিক প্রিমিয়াম আদায় করে বাজারে শেয়ার ছাড়া ইত্যাদি কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ওইসব ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানও তো বিশাল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে দিব্যি ভালো আছেন। যদিও ডিএসই এবং এসইসি’র সার্ভিলেন্স সিস্টেমে তাদের এসব অপকর্মের সব তথ্যই থাকার কথা, সবকিছুই ধরা পড়ার কথা; কিন্তু কখনও কোথাও কিছু ধরা পড়ল বা ধরা হল, এমনটি তো দেখা গেল না!

প্রশ্ন হল, এতকাল সবকিছুই যদি ঠিকঠাক চলে থাকে তাহলে পুঁজিবাজারের এ দৈন্যদশা কেন? কেনই বা লাখ লাখ বিনিয়োগকারীর পুঁজি হারানোর আর্তনাদ। আজ হয়তো সরকার এসব বিনিয়োগকারীর হাহাকার-আর্তনাদ শুনতে এবং বুঝতে পারছেন না; কিন্তু সময় হলে এসবকিছুই কিন্তু সুদে-আসলে শুনতে এবং বুঝতে পারবে- এ কথাটি এখনই বলে রাখা হল। আর তখন কিন্তু বারবার পুনঃনিয়োগ পাওয়া ওইসব সরকারি কর্মকর্তা কোনোই কাজে আসবে না!

পাদটিকা : লেখাটি আর দীর্ঘায়িত না করে বলতে চাই, বছরের পর বছর শুধু গালভরা বুলি না আউড়িয়ে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট সরকারি আমলাদের উচিত হবে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে চেয়ার থেকে সরে দাঁড়ানো। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাব, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে হলে, পুঁজিবাজারকে বিকশিত করতে হলে ডিএসই, এসইসির ব্যর্থ ব্যক্তিদের অপসারণ করে, তাদের স্থলে এমনসব নতুন ব্যক্তিদের পদায়ন করা প্রয়োজন, যারা প্রকৃত অর্থেই পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে পারবেন।

কারণ পুরনো ব্যক্তিরা ইতিমধ্যে প্রমাণ করেছেন- তাদের দ্বারা পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করা, পুঁজিবাজারকে গতিশীল করা সম্ভব নয়। অতএব জরাগ্রস্ত ওইসব পুরনো লোকগুলোকে বদল করাই হবে এখন সময়ের কাজ। অন্যথায় দেশের পুঁজিবাজার বলতে অবশিষ্ট যা আছে, সেটুকুও নিঃশেষ হতে সময় লাগবে বলে মনে হয় না।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত