Logo
Logo
×

Advertisement

বাতায়ন

অথঃ লুঙ্গি সমাচার

Advertisement

Icon

পবিত্র সরকার

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২০, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অথঃ লুঙ্গি সমাচার

Advertisement

ইদানীং লুঙ্গি নিয়ে ভারতে নানারকম কথাবার্তা হয়ে গেল। ভারতের একজন রাজনৈতিক নেতা কিছু লোককে এনআরসি, সিএএ, এনপিআর ইত্যাদির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দেশের নানা যানবাহনে আগুন দিতে দেখেছেন, আর বলেছেন ‘পোশাক’ দেখলেই চেনা যায় কারা এসব করছে। সংবাদমাধ্যমের অধিকাংশ মনে করছে, এ পোশাকের একটা নাকি ছিল লুঙ্গি। সবাই জানেন, এ শব্দটা বর্মি ভাষায় অনেক আগে থেকেই প্রচলিত। কাজেই ডিকশনারির শব্দগুলোর যদি কোনো ‘এনআরসি’ হয় তা হলে এগুলোকে ভারতীয় ভাষাগুলো থেকে বিদায় করা হবে কিনা জানি না। সে চেষ্টা আগে হয়নি তা নয়; কিন্তু তার কথা এবারে বলব না।

এবারে লুঙ্গি সম্বন্ধে একটু জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা যাক। ইংরেজিতে ‘সারং’ (sarong) বলে আর একটা কথা পেয়েছি লুঙ্গির প্রতিশব্দ হিসেবে, ওটা মালয় ভাষার শব্দ। তার সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই, আমাদের বাংলা ভাষা লুঙ্গি নিয়েই খুশি আছে। বছর পনেরো-ষোলো আগে আমরা যখন মিয়ানমারে গিয়েছিলাম, তখন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা জানান ‘লুঙ্গি’ শব্দটা অনেক আগে থেকেই তাদের ভাষায় প্রচলিত। আমরা বলেছিলাম, লুঙ্গির জোড় শব্দ ‘ফুঙ্গি’ও তো বর্মি ভাষায় অনেক আগে থেকেই প্রচলিত; যার অর্থ বর্মি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। তো সেটা তো আমরা হরহামেশা ব্যবহার করি না। কিন্তু ফুঙ্গিরা লুঙ্গি পরেন সে আমি জানি; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিনস সব জায়গারই জাতীয় পোশাক লুঙ্গি। আর শুধু কোনো এক সম্প্রদায়ের নয়, সবারই।

রেল ইত্যাদি পোড়ানো সম্বন্ধে এক নেতার মন্তব্যের কথা আগেই বলেছি। জানি না মুর্শিদাবাদে তারই দলের কোনো কর্মীও ওই পোশাক পরে রেলগাড়িতে আগুন লাগিয়েছিল কিনা। তারা হয়তো ভেবেছিল, লুঙ্গি পরে দেশের সম্পত্তি নষ্ট করার মধ্যে কোনো অপরাধ নেই।

লুঙ্গি পরা যে অপরাধ, এ কথা শুনে আমি কিছুটা হতবাক হয়ে আছি। আতঙ্কিত হব কিনা জানি না। কারণ, গাঁয়ের ছেলে বলেই হয়তো, কৈশোর থেকে আমি লুঙ্গি পরে আসছি, আমার বাড়িতেও পুরুষ সদস্যরা একসময় তাই পরতেন। হ্যাঁ, বাইরে অবশ্যই ধুতি, প্যান্ট ইত্যাদি পরা চলত; কিন্তু বাড়িতে ও রকম আরামের পোশাক এবং শয্যাবস্ত্র পুরুষের জন্য আর আছে নাকি। বিশেষত গরমকালে! পশ্চিমবঙ্গের খবরের কাগজে জ্যোতি বসুর লুঙ্গি পরা ছবি দিয়েছে, সত্যজিৎ রায়ের নাচার হয়ে লুঙ্গি পরার কথাও জানিয়েছে (ব্রাহ্মদের কি লুঙ্গি সম্বন্ধে একটু ছুঁচিবাই ছিল?), এমনকি বাড়িতে ঝাড়খণ্ডের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন লুঙ্গি পরে থাকেন তা-ও জানিয়েছেন। জ্যোতিবাবুর ব্যাপারে হয়তো বামপন্থা বিষয়ে শাসকগোষ্ঠীর বিদ্বেষ আরও তীব্র হবে, আর হেমন্ত সোরেনের প্রতিও, যে হেমন্তের ঝাড়খণ্ডে অন্যান্য দল নির্বাচনে ‘ঝাড় খেয়েছে’- তার প্রতিও তাদের অনুরাগ জন্মাবে না। ভিআইপি না হওয়ার জন্য আমাদের কথা খবরের কাগজে উঠবে না, তার আশাও করি না। ‘লুঙ্গি ডান্স’ করলে হয়তো আশা করা যেত। সেটা আর এ জন্মে হবে বলে মনে হয় না। এ থেকে মনে পড়ল, শিখ সার্দারজিদের জাতীয় পোশাকও লুঙ্গি, তা পরে তারা দিব্যি ভাংরা নাচ নাচেন, ‘উঁ উঁয়াহুঁ, উঁ উঁয়াহুঁ’ করে কোমর দুলিয়ে। এটা সবার চোখে পড়েছে কিনা জানি না।

হ্যাঁ, আমি জানি, লুঙ্গি সম্বন্ধে একটা সংস্কার অনেকের ছিল, তাদের কীভাবে চিহ্নিত করব জানি না। বনেদি হিন্দু তারা? ব্রাহ্ম? কিন্তু আমি প্রচুর বনেদি হিন্দুকে ওই পোশাক পরতে দেখেছি। ব্রাহ্মদের সম্বন্ধে আমার অবশ্য বিশেষ কোনো অভিজ্ঞতা নেই, হয়তো বন্ধুবর প্রসাদরঞ্জন রায় সে খবর বেশি দিতে পারবেন। যৌবনে একটি ব্রাহ্ম মেয়ের সঙ্গে আমার হালকা প্রেম হয়েছিল, সেটা তেমন পাকবার সুযোগ পায়নি, পেলে হয়তো আপনাদের আরেকটু বেশি খবর দিতে পারতাম। সে এখন অন্যের সংসারে সুখী গৃহিণী, বয়স্ক সন্তানের মা; ষাট বছর পিছিয়ে গিয়ে তাকে তো বলতে পারি না যে, ব্রাহ্মদের পোশাকের ব্যাপারে তুমি কিছু খবর আমাকে দাও! আমার সৌজন্য আটকায়। পাজামা সম্বন্ধেও অনেক পরিবারের আপত্তি ছিল, জানি না এখন সেটা আছে কি না, কারণ চুস্ত-পাজামা তো এখন জাতীয় পোশাক। এটা যে মোগলাই পোশাক, তা কি আমাদের মহামান্য নেতারা জানেন? ‘লুঙ্গি’ ‘শব্দের মতো এই পোশাকেরও এনআরসি হবে না তো? খুব ভয়ে ভয়ে আছি। তবে সাহেবরা শয্যা পোশাক হিসেবে পাজামা পরে বলে তা হয়তো জাতে উঠে গেছে। গরমকালে তো বাজারেও দেখি বাবুরা ঘুমের পোশাক পরে এসেছেন, যেমন লুঙ্গি পরেও আসেন অনেকে।

এবার দক্ষিণ ভারতীয়দের পোশাক সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। আমি সেই ১৯৫৯ সাল থেকে দক্ষিণ ভারতে গিয়েছি কয়েকবার, সেখানে তো সবাইকে লুঙ্গি পরতে দেখেছি এক সময়! ১৯৬০-এ ত্রিবান্দ্রামে (এখন তিরুবনন্তপুরমে) দেখেছিলাম নাম্বুদিরিপাদ আর তার দলবল নিয়ে বিশাল মিছিল করছেন, তাদের অনেকেরই লুঙ্গি দক্ষিণি ধরনে ভাঁজ করে হাঁটুর ওপরে তুলে কোমরে বাঁধা। নাম্বুদিরিপাদের মতো ব্রাহ্মণও তো এটা করেছিলেন, তাই না? পশ্চিমবঙ্গে ধুতি-পাঞ্জাবির বিশেষ কদরের কথা সবাই জানেন। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস পরিষদীয় দলের নেতা আবদুল মান্নান ভাই সব ধরনের পোশাক পরেন এখনও।

তবে খবরের কাগজ একটা অতি প্রকাশ্য আর সর্বজ্ঞাত ঘটনার উল্লেখ করেনি। সেটা কী? না, প্রায় সব ভারতীয় (পড়ুন ‘হিন্দু’) সন্ন্যাসীই লুঙ্গি পরেন। না, না, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও। কবে থেকে পরে আসছেন আমি জানি না, এ নিয়ে আমি গবেষণা করিনি। বৈদিক যুগ থেকে তারা এটা করছেন কিনা তা ভারতীয় পোশাকের ঐতিহাসিক বিবরণ যারা জানেন তারাই বলতে পারবেন। এখনকার মঠ সংঘ সব প্রতিষ্ঠানের সন্ন্যাসীরাই, বাবারা, গুরুজিরা, আর মহারাজরা তাই করে চলেছেন। তবে কেউ কেউ বলতে পারে, আরে গাধা, ওরা তো গেরুয়া লুঙ্গি পরেন, অন্য রঙের, বাটিকের বা চেক চেক ডিজাইনের লুঙ্গি পরেন না। গেরুয়া লুঙ্গি হলে কোনো দোষ নেই। এ ব্যাপারটা আমাদের কাছে স্পষ্ট করা হোক। স্বামী বিবেকানন্দ আমাকে ক্ষমা করুন, যদি তার প্রতি কোনো অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে থাকি; কিন্তু লাঠি হাতে তার প্রথম সন্ন্যাসের যে মূর্তি আমরা দেখি, তাতে তো ওই পোশাকই পরে থাকতে দেখি তাকে, তাতে তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা বিন্দুমাত্র কমে না।

লুঙ্গির অন্যান্য উপকারিতাও আছে, যা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। যখন পাওয়ার কাট্ বা লোডশেডিংয়ের রমরমা ছিল আমাদের দেশে, সেই দিনগুলোতে একদিন বাইরে থেকে ফিরেছি, আলোহীন ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে। তারপর বড় মেয়েকে বলেছি, ‘আলনা থেকে আমার লুঙ্গিটা এনে দে তো মা!’ কী বলব, অত্যাশ্চর্য ঘটনা, অমনি বাড়িতে আলো ফিরে এলো। ওই ঘটনার কথা আমার বারবার মনে পড়ে। আপনাদের এ কথা বিশ্বাস না হয়, এসে দেখে যেতে পারেন, সেই লুঙ্গিটা এখনও বাড়িতে আছে। যদিও সেটার ব্যবহার এখন ঘর মোছার ন্যাকড়া হিসেবে।

পবিত্র সরকার : সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

Advertisement

অথঃ লুঙ্গি সমাচার ইদানীং লুঙ্গি নিয়ে ভারতে নানারকম কথাবার্তা

Advertisement

আরও পড়ুন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

চল্লিশের পরে মানসিক স্বাস্থ্য এবং এর যত্ন

সাক্ষাৎকার উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

উচ্চ মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ বিশৃঙ্খল পরিবহণব্যবস্থা: ড. মোস্তফা কে. মুজেরী

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

বাংলাদেশের রোহিঙ্গা নীতি : নতুন করে ভাবতে হবে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

শক্তিপূজার উৎস সন্ধানে

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম