ট্রাম্পের ভারত সফরের তাৎপর্য

  মহেশ সাচদেব ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত খুব বেশি বিদেশ সফরে যান না এবং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর ব্যতিক্রম নন।

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম তিন বছরে আন্তর্জাতিক সফরের জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউস ত্যাগ করেছেন মাত্র ১৮ বার, আর এর মধ্যে কেবল একটি দেশ সফরের ঘটনা ছিল মাত্র পাঁচটি।

কাজেই তার জন্য এয়ারফোর্স ওয়ানে (মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বহনকারী বিশেষ বিমান) চড়ে বসা, বিশ্বের অর্ধেক পথ ঘোরা এবং ভারতে ৩৬ ঘণ্টা কাটানো স্পষ্টতই একটি দৃষ্টি আকর্ষক ঘটনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুই দফা যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণ দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে দেয়ার সফলতায় সিক্ত।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী মোদির রাজ্য গুজরাটের সবচেয়ে বড় শহর আহমেদাবাদ সফর করেন, আগ্রায় ‘আসল’ তাজমহল (এটিকে ট্রাম্প গ্রুপের সাবেক মালিকানাধীন আটলান্টার ইপোনিমাস ক্যাসিনোর সঙ্গে তুলনা করা হয়) দেখেন এবং ২৫ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লি অবতরণ করেন।

ট্রাম্পের সফর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্দো-মার্কিন সম্পর্কের বড় ধরনের কিছু বিষয়কে বৈধতা দেয়। দুই দেশের মধ্যে সেবা ও পণ্যের বাণিজ্য ২০১৮ সালে ছিল ১৪২ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে ভারতের পক্ষে উদ্বৃত্ত ছিল ২৫ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্র ছিল ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার এবং ভারত ছিল যুক্তরাষ্ট্রের অষ্টম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও ভারতের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, যেখানে ক্রমবর্ধিত সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) পরিমাণ ৪৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ (এফপিআই) ১৬৪ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। ভারতের আইটি কোম্পানিগুলো মাত্র এক লাখ আমেরিকানের কর্মসংস্থান করেছে। বিপরীতে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রায় ৪০ লাখ মানুষ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। তারা চিহ্নিত নৃ-তাত্ত্বিক গ্রুপ হিসেবে সর্বোচ্চ মানের জীবনযাপন করেন এবং মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভোট ব্লকও বটে।

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র- উভয় দেশই জোর গলায় বলেছে যে, ট্রাম্পের এ সফরে তারা নিজেদের ক্রম প্রসারমাণ অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরবে। ভারত ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রুড নেভাল হেলিকপ্টার কিনেছে এবং ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরির চুক্তি করেছে এবং একটি সীমিত বাণিজ্য চুক্তিও করেছে।

অন্যদিকে মতভিন্নতা ও ঘাটতি ছিল কৃষি খাতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং ভারতের অর্থনীতিতে বিপরীতমুখী বাতাসের কারণে আপাতত বড় ধরনের বোধগম্য বাণিজ্য চুক্তি স্থগিতই থেকেছে।

সমসাময়িক অনেক ভূ-রাজনৈতিক বিষয় মোদি-ট্রাম্প বৈঠকে উঠে এসেছে। উল্লেখ্য, ভারতের উদ্বেগের একটি বিষয় হল, আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কারণে আল-কায়দা ও এ ধরনের জঙ্গিগোষ্ঠী তাদের নিরাপদ স্বর্গরাজ্য করে ফেলতে পারে দেশটিকে। ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপের’ মার্কিন নীতি মারাত্মকভাবে অস্বস্তিতে ফেলেছে ভারতকে।

দেশটি চায় না তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় অঞ্চলে অস্থিরতা বজায় থাকুক। সাম্প্রতিক সময়ে চীনবিরোধী রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরে তর্জন-গর্জন করছে ট্রাম্প প্রশাসন, যার সঙ্গে ভারতের নিজের সম্পর্কও মাঝে মাঝে কণ্টকাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ভারত নিজেও সম্ভবত চীনের করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রাদুর্ভাবের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য স্বল্প মূল্যের পণ্য উৎপাদনের কেন্দ্র হতে চায়।

উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে রেমিটেন্স

ট্রাম্পের ভারত সফরে সম্ভবত গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য, যার কিনা উভয় দেশের সঙ্গে স্বতন্ত্র সম্পর্ক রয়েছে। পরিহাসের বিষয় হল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চায় ওই অঞ্চলে তার অবস্থান কমিয়ে আনতে, সেখানে ভারতীয়রা ভারসাম্য আনার যুক্তি তুলে ধরে। ভারত তার প্রয়োজনীয় তেলের প্রায় ২ দশমিক ৬৮ এমবিপিডি (তেলের পরিমাপ) পেয়ে থাকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, যার দাম প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৮০ লাখ ভারতীয় উপসাগরীয় অঞ্চলে বসবাস করেন এবং এটি ভারতের গুরুত্বপূর্ণ রেমিটেন্স উৎস।

এরই মধ্যে ভারত ও উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিনিময় তাৎপর্যপূর্ণ একটি অবস্থানে রয়েছে এবং এটি আরও বড় হতে যাচ্ছে; কারণ সৌদি আরব ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন তাদের যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন করতে যাচ্ছে এবং ইরানের অর্থনীতি শেষপর্যন্ত পুনঃসংযোগ ঘটাতে যাচ্ছে। এ পটভূমিতে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প-মোদি বেঠকের প্রভাব নিয়ে কিছু মন্তব্য করা যায়।

ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বৃহৎ সম্পর্কের এককেন্দ্রমুখিতা মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পারস্পরিক যোগাযোগকে সহজ করতে পারে ভূকৌশলগত অঞ্চলটিকে স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে। ভারত জোরালোভাবে ‘অ্যাক্ট ওয়েস্ট’ বা পশ্চিমমুখী কর্মতৎপরতায় জড়িত হওয়ার নীতি গ্রহণ করায় উপসাগরীয় নৌপথগুলোতে তার উপস্থিতি বেড়েছে।

ভারত যেখানে একলা কাজ করে যাচ্ছে, সেখানে এক্ষেত্রে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বড় ধরনের স্বস্তির পর্যায় তৈরি করে দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে মানুষে মানুষে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক-যোগাযোগ উপসাগরকেন্দ্রিক পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ নতুন বাণিজ্য উন্মোচন করাতে পারে। যেমন- এমিরাটস ও ইতিহাদ এয়ারলাইন্স ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিমান চলাচলের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল।

তবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ বৈঠকের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের যে ক্ষেত্রটিতে অপ্রত্যাশিতভাবে পড়তে পারে তা হল- তেল ব্যবসা।

ভারত হচ্ছে বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ অর্থনীতি এবং তৃতীয় বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক। দেশটি তার প্রয়োজনের দুই-তৃতীয়াংশ তেলই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আমদানি করে থাকে, প্রধানত সৌদি আরব, ইরাক, আরব আমিরাত, ইরান ও কুয়েত থেকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য উদ্বৃত্তি কমিয়ে আনতে সম্প্রতি ভারত যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে অশোধিত তেল (শেল অয়েল) আমদানি শুরু করেছে। কেবলই ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এ সরবরাহ ২০১৯ সালে ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ৮১ হাজার বিপিডিতে পৌঁছেছে, যার মাধ্যমে ভারতের চাহিদার ৪ শতাংশ পূরণ হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের শেল অয়েল রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন অফার দিচ্ছে ভারতের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য। দুই দেশের যৌথ বৈঠকে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আগামী বছর এ সরবরাহ ভারতের বৈশ্বিক আমদানির এক-দশমাংশ হতে পারে। ভারতে যুক্তরাষ্ট্রের এই তেল সরবরাহ আসছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহের বিপরীতে, যার কারণে ভারতের নিশ্চল তেল মার্কেটে উপসাগরীয় অঞ্চলের সরবরাহ অংশ ৫ শতাংশ কমে ২০১৯ সালে ৬০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

এটি গত চার বছরের মধ্যে সর্বনিু। যদি এ অবস্থা বজায় থাকে তাহলে মধ্যপ্রাচ্য ও প্রতিবেশী ভারতের মধ্যে দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য ধারায় পরিবর্তন আসতে পারে।

গালফ নিউজ থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

মহেশ সাচদেব : অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক, আরব বিশেষজ্ঞ, নয়াদিল্লির ইকো-ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিসের প্রধান

ঘটনাপ্রবাহ : ট্রাম্পের ভারত সফর

আরও
আরও খবর
 

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত