কোরবানির পশুর জোগান ও চামড়ার দাম

  ড. জাহাঙ্গীর আলম ১৩ জুলাই ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

চলছে করোনাকাল। এরই মাঝে আসছে ঈদ। ঈদুল আজহা, কোরবানির ঈদ। এর প্রধান আনুষ্ঠানিকতা হল পশু কোরবানি। বাংলাদেশে মূলত কোরবানি করা হয় গরু, ছাগল ও ভেড়া।

এক হিসাবে দেখা যায়, গত বছর (২০১৯) ১ কোটি ১১ লাখ গবাদি পশুর চাহিদা ছিল কোরবানির বাজারে। তার মূল্য ছিল প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে পশুর চাহিদা বাড়ে কোরবানির জন্য।

সেই হিসাবে এবার কোরবানির জন্য পশুর চাহিদা হওয়ার কথা ১ কোটি ২০ লাখের মতো; কিন্তু এ করোনাকালে মানুষের হাতে নগদ টাকার পরিমাণ কম। অনেকের আয় কমে গেছে। চাকরিচ্যুত হয়েছেন অনেকে। তাতে হ্রাস পেয়েছে ক্রয়ক্ষমতা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানির পশুর হাটে যাওয়া, পশু কেনা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

যে কারণে এবার পশুর চাহিদা কম হতে পারে ২০ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি গবাদি পশুর চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে এবারের কোরবানির ঈদে। তার বিপরীতে এবার পশুর জোগান রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ।

এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার, ছাগল ও ভেড়া ৭৩ লাখ ৫৫ হাজার এবং উট ও দুম্বা ৪ হাজার ৫০০ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে।

এখন থেকে ১৫-২০ বছর আগে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কোরবানির পশুর চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো না। সেক্ষেত্রে আমদানি করা পশুর মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করা হতো। তখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল অনুমোদনহীন সীমান্ত বাণিজ্য। প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ লাখ গরু আমদানি করা হতো ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও ভুটান থেকে।

তার অর্ধেক আমদানি করা হতো কোরবানির ঈদের সময়। এর অধিকাংশই আসত ভারত থেকে। সেই হিসাবে এখন গরুর আমদানি নেই বললেই চলে। গত এক বছরে গরু আমদানি হয়েছে এক লাখেরও কম। তারপরও সীমান্তের ওপার থেকে বেশকিছু গরু আসতে পারে ঈদের সময়।

ইতোমধ্যে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে গরু আসতে শুরু করেছে বলে দেশের একটি দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিদিন অনানুষ্ঠানিকভাবে দেড় থেকে ২০০ গরু আনা হচ্ছে ভারত থেকে।

কয়েক দিনের মধ্যে এ সংখ্যা ২ থেকে ৩ গুণ বেড়ে যাবে বলে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দেশের খামারিরা।

করোনার কারণে দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন দেশের স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষ। তাতে পশুর মূল্য হ্রাস পেতে পারে প্রায় ২৫ শতাংশ। তার ওপর ভারতীয় গরু বাজারে এলে পশুর দাম আরও হ্রাস পেতে পারে।

অবিক্রীত থেকে যেতে পারে দেশে উৎপাদিত অনেক গরু-মহিষ। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আমাদের কৃষক ও খামারিরা।

আমাদের দেশে বর্তমানে মোট গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৫৪ লাখ। এর মধ্যে গরু ২ কোটি ৪২ লাখ, মহিষ ১৫ লাখ, ছাগল ২ কোটি ৬২ লাখ ও ভেড়া ৩৫ লাখ। দেশে মোট মাংসের ৭০ শতাংশের জোগান আসে গবাদি পশু থেকে; ৩০ শতাংশ আসে হাঁস-মুরগি থেকে।

মোট মাংস সরবরাহে গরুর প্রাধান্য থাকলেও এর বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার কম। ছাগল-ভেড়ার প্রবৃদ্ধির হার বেশি। কোরবানিতে গরুই মানুষের বেশি পছন্দ। একটি গরু বা মহিষ ৭ নামে কোরবানি দেয়া যায়; আবার একাও দেয়া যায়। এবার আর্থিক সংকটের কারণে শরিকে কোরবানির সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে।

দেশে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আগে দিনে গড়ে ৪৫ কোটি টাকার গরু কেনাবেচা হতো। সাধারণত মাংস বিক্রির জন্য কসাইদের কাছে চলে যেত এসব গরু; কিন্তু গত মার্চ-এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে দৈনিক গড়ে ১০ কোটি টাকার বেশি গরু কেনাবেচা হয়নি।

ওই অবিক্রীত গরুগুলো এখন কোরবানির হাটে তোলা হতে পারে। এর সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। তাছাড়া মাংসের জন্য গরু প্রতিপালনকারী খামারির সংখ্যা ৫ লাখেরও বেশি। ঈদের আগে তারা গরু মোটাতাজাকরণের কাজ করে থাকেন।

ভালো লাভের আশায় গরু হৃষ্টপুষ্টকরণে তাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। তাতে মাংসের উৎপাদন বেড়েছে। বেড়েছে কোরবানি পশুর জোগানও।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে গরু হৃষ্টপুষ্টকরণের যে প্যাকেজ প্রযুক্তি কৃষকের জন্য উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করা হয়েছে তা ৩ থেকে ৪ মাসের।

মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা থেকে প্রতীয়মান হয়, মোটাতাজাকরণের মাধ্যমে প্রতিদিন একটি উন্নত জাতের গরুর ওজন ৭০০ থেকে ১০০০ গ্রাম এবং দেশি গরুর ওজন ১০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম বৃদ্ধি পায়।

গরু মোটাতাজাকরণের প্রধান খরচ হল খাদ্যমূল্য, ওষুধের দাম ও শ্রমিকের মজুরি। এসব খরচ বাদ দিয়ে একজন কৃষক প্রতিটি গরুতে গড়ে লাভ করেন প্রায় ১৩ হাজার টাকা। কৃষকের জন্য এটি আয়ের বড় উৎস। এবার কৃষকের এ আয় আরও কম হতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনায় খামারিদের উচিত হবে এবার অল্প লাভে গরু বিক্রি করে দেয়া। নতুবা লোকসান গুনতে হতে পারে।

এবার কোরবানির পশুর হাটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে পশুসম্পদ অধিদফতর এবং সিটি কর্পোরেশনগুলো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবু হাটগুলোয় জনসমাগম কম হতে পারে এবং বিক্রির পরিমাণও হ্রাস পাবে, এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গ্রামগুলোয় পারিবারিকভাবে মোটাতাজা করা পশুর কোরবানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। আন্তঃমহল্লা গরু বিক্রি বাড়তে পারে। বড় খামারিরা পশু বিক্রি করবেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ইতোমধ্যে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

পশুর হাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কাজটি বেশ কঠিন। তাছাড়া হাটগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরিচ্ছন্ন থাকে। গরুগুলো নিরাপদ দূরত্বে রাখা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাতে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। সেদিক থেকে ডিজিটাল পশু বিপণন পদ্ধতি অনেক বেশি নিরাপদ।

গত বছর ১ কোটি ৫ লাখ গরু বিক্রি হয়েছিল সারা দেশে। এর প্রায় অর্ধেক বিক্রি হয়েছিল কোরবানির ঈদে। এবার সারা বছরে বিক্রি হওয়া গরুর সংখ্যা সর্বোচ্চ ১ কোটি হতে পারে। আগামী কোরবানিতে প্রায় ৫০ লাখ গরুর চাহিদা সৃষ্টি হতে পারে। ছাগল-ভেড়ার চাহিদা হতে পারে প্রায় পঞ্চাশ লাখ। এসব পশুর চামড়া বিক্রি করা এবং উপযুক্ত দাম পাওয়াও হবে আরেকটি বড় সমস্যা।

সম্প্রতি বাংলাদেশি চামড়ার বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, সম্প্রসারিত হয়েছে রফতানির ভিত্তি। বেড়েছে রফতানি আয়; কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে দ্রুত কমেছে কাঁচা চামড়ার দাম। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, হতদরিদ্র মানুষ, এতিম ও মিসকিন। কোরবানির ঈদের সময় সরবরাহ বৃদ্ধি পায় কাঁচা চামড়ার।

তখন এর দাম কমে যায়। এ সময় খুবই তৎপর থাকে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। বিভিন্ন অজুহাতে তারা চামড়ার দাম কমায়। এর বিক্রয়লব্ধ অর্থের মালিক দরিদ্রজন, এতিম ও মিসকিন। চামড়ার মূল্যহ্রাসে ক্ষতি হয় তাদের।

আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত চামড়া শিল্প। চামড়ার সঙ্গে ট্যানারি, জুতা, ব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারখানার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এসব কারখানায় সরাসরিভাবে নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কর্মী। রফতানি আয়েও এ খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

বছরের পর বছর এ খাতের রফতানি আয় বাড়ছে; কিন্তু চামড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কৃষক, প্রান্তিক মানুষ, এতিম ও মিসকিন বাড়তি রফতানি আয়ের ন্যায়সঙ্গত হিস্যা পাচ্ছেন না। এর কারণ কাঁচা চামড়ার মূল্যহ্রাস। ২০১৩ সালে কোরবানির ঈদের সময় ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার নির্ধারিত দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা ও খাসির চামড়ার দাম ছিল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা।

২০১৪ সালে গরুর চামড়ার দাম ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় এবং খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩০ থেকে ৩৫ টাকা হ্রাস পায়। ২০১৫ সালে এর ইউনিট মূল্য আরও হ্রাস পেয়ে গরুর চামড়ার প্রতি বর্গফুট মূল্য ৫০ থেকে ৫৫ টাকা এবং খাসির চামড়া ২০ থেকে ২১ টাকায় এসে দাঁড়ায়।

গত ২ বছর (২০১৮ ও ২০১৯ সালে) গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ঢাকায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম ১৮ থেকে ২০ টাকায় অপরিবর্তিত থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংগৃহীত চামড়ার নির্ধারিত মূল্য আরও কম। বাস্তবে কোরবানির ঈদের সময় এ কম মূল্যও গ্রামের চামড়া বিক্রেতারা পান না।

গত বছর একটি গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় এবং খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে প্রতিটি ১০০ টাকায়। দুর্গম এলাকায় চামড়ার দাম ছিল খুবই কম। ঈদুল আজহার সময় চামড়া বিক্রির টাকা দান হিসেবে নেয়ার জন্য হতদরিদ্র মানুষ প্রতীক্ষায় থাকে; কিন্তু চামড়ার মূল্য ধসের কারণে তারা আশাহত হন।

এবার করোনাকালে মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সারা দেশের মানুষ যাতে কোরবানির চামড়ার উপযুক্ত দাম পান সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ন্যায়সঙ্গতভাবে চামড়ার মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।

ট্যানারির মালিক, আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে তাদের আর্থিক প্রয়োজন মেটাতে হবে। সহযোগিতা করতে হবে গ্রামের ছোট ব্যবসায়ীদেরও। এখন গাড়িভাড়া ও ট্রাকভাড়া বেশি। কোরবানির সময় তা হ্রাস করতে হবে।

যান চলাচল অব্যাহত রাখতে হবে আসন্ন ঈদের ছুটির দিনগুলোয়। ভবিষ্যতে চামড়ার সরবরাহ বাড়াতে এবং এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে এর উপযুক্ত মূল্য পরিশোধ করতে হবে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের। তাতে সংশ্লিষ্টরা উৎসাহিত হবেন।

চামড়ার উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে। দেশের হতদরিদ্রও তাতে উপকৃত হবেন। সীমান্তপথে চামড়া পাচার বন্ধ হবে। এতে সমৃদ্ধ ও সম্প্রসারিত হবে দেশের চামড়া শিল্প। এসব লক্ষ্য অর্জনে সরকার, শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একসঙ্গে কাজ করা দরকার।

ড. জাহাঙ্গীর আলম : কৃষি অর্থনীতিবিদ

ঘটনাপ্রবাহ : ছড়িয়ে পড়ছে করোনাভাইরাস

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত