সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পব্যক্তিত্ব

  আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি

বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিল্পপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব নুরুল ইসলামের জন্ম ঢাকার নবাবগঞ্জে। তিনি ছিলেন একজন স্বপ্রতিষ্ঠিত নবাব। প্রায় শূন্য অবস্থা থেকে নিজ প্রচেষ্টায় তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান যমুনা গ্রুপ গড়ে তুলেছেন।

১৯৭৪ সালে যাত্রা শুরু করে সাড়ে চার দশকের মধ্যে ৪১টি বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে তিনি শিল্প খাতের অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। ব্যতিক্রমী গুণের কারণেই বৈচিত্র্যময় ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে জনাব নুরুল ইসলাম সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন।

বিচক্ষণতা, একাগ্রতা, স্বচ্ছতা, কর্মীবান্ধব নীতি, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা-সর্বোপরি কঠোর পরিশ্রমের কারণেই তিনি এমন সাফল্যের পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন। একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তিনি বিপুলসংখ্যক কর্মীর কর্মসংস্থান করেছেন।

বর্তমানে যমুনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লক্ষাধিক কর্মী কর্মরত রয়েছেন। বস্তুত বহুবিধ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হওয়ার কারণেই তার মতো কর্মবীরের দীর্ঘায়ু কামনা করে দেশের মানুষ।

জনগণের তথ্যচাহিদা পূরণের বিষয়েও সচেতন ছিলেন জনাব নুরুল ইসলাম। দেশের মানুষের সেবার ব্রত নিয়েই যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি; যে দুটি প্রতিষ্ঠান এখন বেশ জনপ্রিয়। একজন ব্যক্তি যখন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন, তখন তিনি লাভালাভের চিন্তা না করে একজন সুনাগরিকের ভূমিকা পালন করে থাকেন।

প্রকৃতপক্ষ একজন মানুষ যদি সততার সঙ্গে সদিচ্ছা নিয়ে পরিশ্রম করেন তাহলে প্রায় শূন্য অবস্থা থেকে কত দ্রুত খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করা সম্ভব, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সদ্যপ্রয়াত শিল্পপতি জনাব নুরুল ইসলাম।

যমুনা গ্রুপের ৪১টি প্রতিষ্ঠানে যে লক্ষাধিক কর্মী কর্মরত রয়েছেন- তাদের দ্বারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের আরও অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছে।

গত শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি বিদেশ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি আমদানি করে দেশে বিশ্বমানের শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন জনাব নুরুল ইসলাম। তার দূরদর্শী চিন্তা, প্রগতিশীল মনোভাব ও নিরলস পরিশ্রমের ফসল আজকের যমুনা গ্রুপ।

টেকসই মানের কারণেই যমুনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পণ্য ভোক্তাদের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। পণ্যের মান রক্ষার প্রতিদান হিসেবে এ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্তি যমুনা গ্রুপের কর্মীদের আরও কর্তব্যপরায়ণ হতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

বস্তুত এসব অর্জনকে জনাব নুরুল ইসলামের নিরন্তর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। এ গ্রুপের এসব অর্জন দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করবে-এটাই স্বাভাবিক।

যমুনা ফিউচার পার্কের নির্মাণশৈলী ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করলেই স্পষ্ট হয়, জনাব নুরুল ইসলাম কী ধরনের চিন্তা করতেন। এ প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে, একইসঙ্গে দেশের সুনামও বৃদ্ধি করেছে।

এ প্রতিষ্ঠানের নামকরণ থেকে জনাব নুরুল ইসলামের ভবিষ্যমুখী আধুনিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়। এ দেশের যেসব ক্রেতা বিদেশে গিয়ে কেনাকাটা করতেন, যমুনা ফিউচার পার্ক প্রতিষ্ঠার পর কেনাকাটার জন্য তাদের এখন আর বিদেশে যেতে হয় না।

এ পার্কের এক অঙ্গনে মানুষ এখন বহুমুখী সেবা পাচ্ছে, যা এতদিন তারা শুধু কল্পনাই করত। এ পার্কে নতুন যুক্ত হওয়া হোলসেল ক্লাব- দেশের সর্ববৃহৎ হাইপারমার্কেট- অল্প সময়ে দেশবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

হোলসেল ক্লাবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনাব নুরুল ইসলাম বলেছিলেন, এক ছাদের নিচে ন্যায্যমূল্যে পণ্য পৌঁছে দেয়া আমাদের অঙ্গীকার। এর মাধ্যমে দেশ-বিদেশের নামিদামি ব্র্যান্ডের ৫ শতাধিক পণ্য গ্রাহকের হাতে তুলে দেয়া হবে। ওইদিন তিনি আরও বলেছিলেন, শুরু থেকে মানুষের সেবা করে যাচ্ছি। যতদিন বেঁচে থাকি সেবা করে যাব।

দিনদিন মানুষের ব্যস্ততা বেড়েই চলেছে। এ সময়ে মানসম্মত নিত্যপণ্য এক ছাদের নিচে পাওয়া, ব্যস্ত মানুষের জন্য সত্যি এক আনন্দের খবর। আজকাল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সময়ের অভাবে অনেকে বই কেনার জন্য পছন্দের বইয়ের দোকানে যেতে পারেন না।

এমন ব্যস্ত মানুষ হোলসেল ক্লাবে গিয়ে কেনাকাটা করে ফেরার সময় বই কেনার সুযোগও পাবেন। শুনেছি হোলসেল ক্লাবের ‘বুক কর্নার’-এ দেশি-বিদেশি স্বনামধন্য গুণিজন ও খ্যাতিমান লেখকের গ্রন্থ কেনার সুব্যবস্থা রয়েছে। আজকাল লক্ষ করা যায়, কেউ কেউ বইয়ের ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় ঝুঁকছেন। এতে পাঠকসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দেশে শিক্ষার বিস্তার দেখে আমরা আশাবাদী হলেও সমাজে সৃজনশীল বইয়ের পাঠক সেভাবে বাড়ছে না।

আজকাল মানসম্মত বইও সুলভ নয়। অথচ একটি ভালো বই একজন পাঠকের সমগ্র জীবনকে প্রভাবিত করে থাকে। সুলভে মানসম্মত বই না পাওয়া গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তরুণ প্রজন্ম। আশা করি, হোলসেল ক্লাবের ‘বুক কর্নার’ মানুষকে বইমুখী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মানুষকে যত বেশি বইমুখী করা যাবে সমাজে উচ্চ মূল্যবোধ ও নৈতিকতার চর্চায় ততবেশি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

শুনেছি, যমুনা ফিউচার পার্কে নির্মাণাধীন রয়েছে আন্তর্জাতিক মানের একটি হোটেল। আশা করা যায়, এসব প্রতিষ্ঠান দেশের পর্যটন খাতের বিকাশেও অবদান রাখবে।

ব্যবস্থাপনায় সুবিধার কথা বিবেচনা করে অনেক উদ্যোক্তা একই অঙ্গনে বা এলাকায় একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেষ্টা করে থাকেন। এদিক থেকেও জনাব নুরুল ইসলাম ছিলেন ব্যতিক্রমী।

একই এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে না তোলেও যে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সফলভাবে পরিচালনা করা যায়, এটিও তিনি প্রমাণ করেছেন। অবকাঠামোগত সুবিধাপ্রাপ্তিসাপেক্ষে তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এটিও তার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চিন্তারই একটি বিশেষ দিক।

জনাব নুরুল ইসলামের সন্তানরা দেশে-বিদেশে শিক্ষাগ্রহণ করে এখন বাবার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে নেয়ার জন্য যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, আশা করা যায়, তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় যমুনা গ্রুপের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।

করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর মানসম্মত হাসপাতালের বিষয়টি বিশেষ আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর বিশ্বের সব দেশের চিকিৎসকের কাছেই এর চিকিৎসার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। বিশ্বমানের হাসপাতালে যে কোনো নতুন গবেষণা বা চিকিৎসার নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা তুলনামূলক সহজ হয়।

দেশে করোনার তাণ্ডব শুরু হওয়ার পর মানুষের চিকিৎসাসেবার সুবিধা বাড়ানোর জন্য বিশ্বমানের একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দৃঢ় মনোভাবের কথা ঘোষণা করেছিলেন জনাব নুরুল ইসলাম। দুঃখের বিষয়, তিনি তার অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে আকস্মিকভাবে অকালে চিরবিদায় নিলেন।

আমি আশা করব, তার উত্তরসূরিরা তার স্বপ্নগুলো বাস্তবায়নে তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। তরুণ উদ্যোক্তারা জনাব নুরুল ইসলামকে অনুকরণ করলে দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে এবং তারা দেশের কল্যাণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। আমি জনাব নুরুল ইসলামের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং তার পরিবারের শোকসন্তপ্ত সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করি।

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক : শিক্ষাবিদ, সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চেয়ারম্যান বাসস

ঘটনাপ্রবাহ : যমুনা গ্রুপ চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম

আরও

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত