আর্থিক খাতের আরেকটি দুর্বলতা
jugantor
আর্থিক খাতের আরেকটি দুর্বলতা

  মুঈদ রহমান  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গেল সপ্তাহের আমার লেখাটা ছিল ঋণখেলাপি ও ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে। সেটাই আমাদের আর্থিক খাতের একমাত্র দুর্বল জায়গা নয়। এ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হল কালো টাকা। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছরে আমরা এর সুরাহা তো করতেই পারিনি, বরং দিনকে দিন এর পরিধি ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। আমাদের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে কত তা নির্ধারণ করা যায়নি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে কালো টাকা নিয়ে একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, ২০১০ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা কিনা এযাবৎকালে সর্বোচ্চ। তবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বছরওয়ারি গড় কালো টাকার পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের জরিপ অনুযায়ী কালো টাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭ শতাংশ। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জরিপকে সমর্থন করে। অথচ ১৯৭৩ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ। আমরা যদি আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জরিপ এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্যকে আমলে নেই তাহলে বলতে পারি, দেশে কালো টাকার পরিমাণ কমবেশি ৩৬ শতাংশ। সে অনুযায়ী এদেশে বর্তমানে কালো টাকার পরিমাণ ১০ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা আমাদের চলতি বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ! গড়ে যদি ১০ শতাংশ হারে কর দেয়া হতো, তাহলেও সরকার কালো টাকা থেকে আয় করতে পারত কমপক্ষে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে আমরা আরও চারটি পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারি।

কালো টাকা কী- এমন প্রশ্ন কেউ না করলেও ধারণার স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মতে, ‘আইনে কালো টাকা হল অপ্রদর্শিত আয়। যে আয়ের কর দেয়া হয়নি সেই আয় বৈধ ও অবৈধ দুটোই হতে পারে। কিন্তু এনবিআর আয়কর নেয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায় না। এখানে আয় বৈধ, না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই। তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয় তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়। এটি আয়কর দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।’ আয় করলেই কর দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বর্তমানে পুরুষের বেলায় বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি আয় হলে ওই বাড়তি আয়ের একটি অংশ কর হিসেবে দিতে হবে। তা না হলে বাড়তি আয়টুকু কালো হয়ে যাবে।

কী কী উপায়ে টাকা কালো হয়ে যায় বিবিসিকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তা পরিষ্কার করেছেন। কালো টাকা হওয়ার প্রক্রিয়াগত কয়েকটি ধাপের কথা উল্লেখ করতে পারি- এক. চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা এনজিওসহ অনেক পেশায় চাকরির বাইরেও আয় করার সুযোগ আছে। যেমন চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। এখন এ আয় যদি তিনি আয়কর রিটার্নে না দেখান, তাহলে তা কালো হয়ে যাবে। দুই. বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ কালো টাকা এবং এটি মোট কালো টাকার একটি বড় অংশ। গবেষকরা মনে করেন, বছরে বাংলাদেশ থেকে গড়ে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তিন. সেবা খাত, ক্রয় খাতে কেউ যদি ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন, তাহলে সেটি তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এভাবে অনেকে নগদ অর্থ উপার্জন করেন, যেগুলো বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে বা অর্থনীতিতে আসে না। এ অর্থই কালো টাকা। চার. দেশের আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ নেই এমন একাধিক উপায়েও মানুষ আয় করে। যেমন- কালোবাজারি, চোরাকারবারি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত আয় বৈধ নয়। এ ধরনের আয়ের পথ বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ, তাই তা কালো টাকা। পাঁচ. ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা তৈরি হয় ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। আমদানি কিংবা রফতানির ক্ষেত্রে দামের হেরফের করে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির মতে, ২০১৫ সালে আমদানি-রফতানিতে কারসাজির মাধ্যমে ৬ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ছয়. শহরাঞ্চলে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সরকার নির্ধারিত একটি মূল্য স্থির করা থাকে। কিন্তু বিক্রি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে। তাই প্রচুর পরিমাণ টাকা কালো তালিকায় চলে যায়। অর্থনীতিতে কালো টাকার উপস্থিতি মানে সরকার আয়বঞ্চিত থাকছে। অন্যদিকে যারা সৎ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী তারা কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না।

তাহলে কালো টাকা উদ্ধারে আমাদের সরকারগুলো কী করছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে- কিছুই না। বর্তমানসহ বিগত সরকারগুলো আইনগত কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে অপসরফা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। প্রতিটি সরকারই জাতীয় বাজেট ঘোষণায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছে। কিন্তু কোনোদিনই ভালো ফল পাওয়া যায়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬ বার সুযোগ দেয়ার পর জরিমানা দিয়ে সাদা হয়েছে মাত্র ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে। সে সময়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে ৩২ হাজার ব্যক্তি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাদা করে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে কোনো লাভ নেই।

এসব জানা সত্ত্বেও চলতি বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতি বছরই বাজেটের আগে আগে আবাসন ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাট বিক্রির প্রত্যাশায় কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দাবি করেন। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮ জন, ২০১৭-১৮ সালে ৯০ জন এবং ২০১৮-১৯ সালে ৮৫ জন অর্থাৎ ৩ বছরে ২২৩ জন কালো টাকায় ফ্ল্যাট কিনে সাদা করেছেন। আয়ের উৎস জানার প্রয়োজন মনে করছে না সরকার। কেউ যদি ইয়াবা বিক্রি করে কিংবা অস্ত্র ব্যবসা করে ১০০ কোটি টাকা অবৈধ আয় করে থাকেন, তাহলে তিনি ১০ শতাংশ কর দিয়ে তা ব্যাংকে জমা রাখতে পারবেন, তা সাদা হয়ে যাবে। অধিক মুনাফার আশায় সে টাকা তিনি শেয়ার বাজারেও বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতটা অনৈতিক সুযোগ দেয়ার পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে? তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যারা বৈধ উপায়ে, সরকারকে নিয়মিত আয়কর দিয়ে উপার্জন করি তারা কোন পাপের ফসল! আমাদের ৪০ লাখ টিন নম্বরধারী থাকলেও আয়কর দেন মাত্র ২০ লাখ। তারপরও যদি কোনো অনৈতিক সুবিধার সুযোগ থাকে, তাহলে ভালো মানুষকে সৎ পথে কতদিন ধরে রাখা যাবে?

২০০৯ সালের ১২ জুন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কালো টাকা সাদা করার অনুচিত সুযোগ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘রাজনীতির কাছে নৈতিকতার পরাজয়। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সমঝোতা। কেননা রাজনীতি হল আপসের সবচেয়ে নিপুণ কৌশল। রাজনীতিতে সব ধরনের মানুষ ও সব ধরনের স্বার্থকে সমন্বয় করে চলতে হয়।’ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যদি এ দর্শনকে ধারণ করে তাহলে বলতে হবে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। অসম সমঝোতা কাম্য নয়। আর সব ধরনের মানুষকে টেনে আনা অনুচিত। এ দেশের কোনো কৃষক বা শ্রমিক কালো টাকার মালিক নন, আর তারা দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িত নন। তাই কোটি কোটি শ্রমজীবীর সঙ্গে গুটিকয় সুযোগ সন্ধানীকে মিলিয়ে ফেলাটা অন্যায়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যে ভাষণ দেন তার আকার স্ট্যান্ডার্ড বইয়ের ১২ পৃষ্ঠার কম নয়। ওই পরিপূর্ণ ভাষণটিতে সে সময়কার দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বিষয়গুলোর একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে, করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না, করাপশন আমার মজদুর করে না, করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ, যারা আজকে স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন করাপশন দেখবেন, আর দেখবেন সেখানে রাস্তা করতে গেলে করাপশন করে। ফুড কিনতে যান করাপশন, মিনিস্ট্রিতে যান করাপশন, বিদেশে যান করাপশন। তারা কারা?’ (‘ওঙ্কারসমগ্র’, পৃষ্ঠা : ৩৩৮)।

কারা অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের আমরা পেয়ে গেছি। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারছি না, বারবার আপসের চেষ্টা করছি। এটা কি আমাদের নৈতিক পরাজয় নয়? সরকারের উপর মহল থেকে আমরা অনেক বড় বড় বুলি অহরহই শুনে থাকি; কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা বা ইচ্ছা কতখানি? আইন কি তাহলে সবার ওপর কার্যকর নয়?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

আর্থিক খাতের আরেকটি দুর্বলতা

 মুঈদ রহমান 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গেল সপ্তাহের আমার লেখাটা ছিল ঋণখেলাপি ও ব্যাংক ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে। সেটাই আমাদের আর্থিক খাতের একমাত্র দুর্বল জায়গা নয়। এ খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হল কালো টাকা। স্বাধীনতার পর থেকে গত ৫০ বছরে আমরা এর সুরাহা তো করতেই পারিনি, বরং দিনকে দিন এর পরিধি ও ব্যাপ্তি বেড়েছে। আমাদের অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে কত তা নির্ধারণ করা যায়নি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় ২০১১ সালে কালো টাকা নিয়ে একটি জরিপ চালায়। তাতে দেখা যায়, ২০১০ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ৬২ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যা কিনা এযাবৎকালে সর্বোচ্চ। তবে ১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বছরওয়ারি গড় কালো টাকার পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের ২০০৫ সালের জরিপ অনুযায়ী কালো টাকার পরিমাণ ছিল মোট জিডিপির ৩৭ শতাংশ। এটা অর্থ মন্ত্রণালয়ের জরিপকে সমর্থন করে। অথচ ১৯৭৩ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির মাত্র ৭ শতাংশ। আমরা যদি আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয়ের জরিপ এবং বিশ্বব্যাংকের তথ্যকে আমলে নেই তাহলে বলতে পারি, দেশে কালো টাকার পরিমাণ কমবেশি ৩৬ শতাংশ। সে অনুযায়ী এদেশে বর্তমানে কালো টাকার পরিমাণ ১০ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা আমাদের চলতি বাজেটের প্রায় দ্বিগুণ! গড়ে যদি ১০ শতাংশ হারে কর দেয়া হতো, তাহলেও সরকার কালো টাকা থেকে আয় করতে পারত কমপক্ষে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে আমরা আরও চারটি পদ্মা সেতু তৈরি করতে পারি।

কালো টাকা কী- এমন প্রশ্ন কেউ না করলেও ধারণার স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদের মতে, ‘আইনে কালো টাকা হল অপ্রদর্শিত আয়। যে আয়ের কর দেয়া হয়নি সেই আয় বৈধ ও অবৈধ দুটোই হতে পারে। কিন্তু এনবিআর আয়কর নেয়ার সময় আয়ের উৎস জানতে চায় না। এখানে আয় বৈধ, না অবৈধ সেটা আলাদা করার সুযোগ নেই। তবে খরচের খাত যখন দেখানো হয় তখন তার আয়ের উৎস বলতে হয়। এটি আয়কর দেয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।’ আয় করলেই কর দিতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বর্তমানে পুরুষের বেলায় বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি এবং নারীর ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি আয় হলে ওই বাড়তি আয়ের একটি অংশ কর হিসেবে দিতে হবে। তা না হলে বাড়তি আয়টুকু কালো হয়ে যাবে।

কী কী উপায়ে টাকা কালো হয়ে যায় বিবিসিকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান তা পরিষ্কার করেছেন। কালো টাকা হওয়ার প্রক্রিয়াগত কয়েকটি ধাপের কথা উল্লেখ করতে পারি- এক. চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা এনজিওসহ অনেক পেশায় চাকরির বাইরেও আয় করার সুযোগ আছে। যেমন চিকিৎসকরা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। এখন এ আয় যদি তিনি আয়কর রিটার্নে না দেখান, তাহলে তা কালো হয়ে যাবে। দুই. বিদেশে পাচার হয়ে যাওয়া অর্থ কালো টাকা এবং এটি মোট কালো টাকার একটি বড় অংশ। গবেষকরা মনে করেন, বছরে বাংলাদেশ থেকে গড়ে ২ বিলিয়ন (২০০ কোটি) ডলার বিদেশে পাচার হয়ে যায়। তিন. সেবা খাত, ক্রয় খাতে কেউ যদি ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন, তাহলে সেটি তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এভাবে অনেকে নগদ অর্থ উপার্জন করেন, যেগুলো বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে বা অর্থনীতিতে আসে না। এ অর্থই কালো টাকা। চার. দেশের আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ নেই এমন একাধিক উপায়েও মানুষ আয় করে। যেমন- কালোবাজারি, চোরাকারবারি, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা থেকে অর্জিত আয় বৈধ নয়। এ ধরনের আয়ের পথ বাংলাদেশের আইনে নিষিদ্ধ, তাই তা কালো টাকা। পাঁচ. ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কালো টাকা তৈরি হয় ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। আমদানি কিংবা রফতানির ক্ষেত্রে দামের হেরফের করে বিদেশে অর্থ পাচার করা হয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির মতে, ২০১৫ সালে আমদানি-রফতানিতে কারসাজির মাধ্যমে ৬ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) বিদেশে পাচার হয়ে গেছে। ছয়. শহরাঞ্চলে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের সরকার নির্ধারিত একটি মূল্য স্থির করা থাকে। কিন্তু বিক্রি হয় তার চেয়ে অনেক বেশি দামে। তাই প্রচুর পরিমাণ টাকা কালো তালিকায় চলে যায়। অর্থনীতিতে কালো টাকার উপস্থিতি মানে সরকার আয়বঞ্চিত থাকছে। অন্যদিকে যারা সৎ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী তারা কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পেরে উঠছেন না।

তাহলে কালো টাকা উদ্ধারে আমাদের সরকারগুলো কী করছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে- কিছুই না। বর্তমানসহ বিগত সরকারগুলো আইনগত কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে অপসরফা করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে। প্রতিটি সরকারই জাতীয় বাজেট ঘোষণায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রেখেছে। কিন্তু কোনোদিনই ভালো ফল পাওয়া যায়নি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৬ বার সুযোগ দেয়ার পর জরিমানা দিয়ে সাদা হয়েছে মাত্র ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আবার ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই সবচেয়ে বেশি টাকা সাদা হয়েছে। সে সময়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়ে ৩২ হাজার ব্যক্তি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাদা করে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে যে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়ে কোনো লাভ নেই।

এসব জানা সত্ত্বেও চলতি বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার বিধান রাখা হয়েছে। প্রতি বছরই বাজেটের আগে আগে আবাসন ব্যবসায়ীরা ফ্ল্যাট বিক্রির প্রত্যাশায় কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দাবি করেন। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৮ জন, ২০১৭-১৮ সালে ৯০ জন এবং ২০১৮-১৯ সালে ৮৫ জন অর্থাৎ ৩ বছরে ২২৩ জন কালো টাকায় ফ্ল্যাট কিনে সাদা করেছেন। আয়ের উৎস জানার প্রয়োজন মনে করছে না সরকার। কেউ যদি ইয়াবা বিক্রি করে কিংবা অস্ত্র ব্যবসা করে ১০০ কোটি টাকা অবৈধ আয় করে থাকেন, তাহলে তিনি ১০ শতাংশ কর দিয়ে তা ব্যাংকে জমা রাখতে পারবেন, তা সাদা হয়ে যাবে। অধিক মুনাফার আশায় সে টাকা তিনি শেয়ার বাজারেও বিনিয়োগ করতে পারবেন। এতটা অনৈতিক সুযোগ দেয়ার পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে? তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষ যারা বৈধ উপায়ে, সরকারকে নিয়মিত আয়কর দিয়ে উপার্জন করি তারা কোন পাপের ফসল! আমাদের ৪০ লাখ টিন নম্বরধারী থাকলেও আয়কর দেন মাত্র ২০ লাখ। তারপরও যদি কোনো অনৈতিক সুবিধার সুযোগ থাকে, তাহলে ভালো মানুষকে সৎ পথে কতদিন ধরে রাখা যাবে?

২০০৯ সালের ১২ জুন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কালো টাকা সাদা করার অনুচিত সুযোগ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘রাজনীতির কাছে নৈতিকতার পরাজয়। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। তারপরও এ সুযোগ দেয়া হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে সর্বোচ্চ সমঝোতা। কেননা রাজনীতি হল আপসের সবচেয়ে নিপুণ কৌশল। রাজনীতিতে সব ধরনের মানুষ ও সব ধরনের স্বার্থকে সমন্বয় করে চলতে হয়।’ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার যদি এ দর্শনকে ধারণ করে তাহলে বলতে হবে জল অনেক দূর গড়িয়েছে। অসম সমঝোতা কাম্য নয়। আর সব ধরনের মানুষকে টেনে আনা অনুচিত। এ দেশের কোনো কৃষক বা শ্রমিক কালো টাকার মালিক নন, আর তারা দুর্নীতির সঙ্গেও জড়িত নন। তাই কোটি কোটি শ্রমজীবীর সঙ্গে গুটিকয় সুযোগ সন্ধানীকে মিলিয়ে ফেলাটা অন্যায়। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে যে ভাষণ দেন তার আকার স্ট্যান্ডার্ড বইয়ের ১২ পৃষ্ঠার কম নয়। ওই পরিপূর্ণ ভাষণটিতে সে সময়কার দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামাজিক বিষয়গুলোর একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দুর্নীতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ বাংলার মাটি থেকে করাপশন উৎখাত করতে হবে, করাপশন আমার বাংলার কৃষক করে না, করাপশন আমার মজদুর করে না, করাপশন করি আমরা শিক্ষিত সমাজ, যারা আজকে স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছি। আজ যেখানে যাবেন করাপশন দেখবেন, আর দেখবেন সেখানে রাস্তা করতে গেলে করাপশন করে। ফুড কিনতে যান করাপশন, মিনিস্ট্রিতে যান করাপশন, বিদেশে যান করাপশন। তারা কারা?’ (‘ওঙ্কারসমগ্র’, পৃষ্ঠা : ৩৩৮)।

কারা অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের আমরা পেয়ে গেছি। কিন্তু ব্যবস্থা নিতে পারছি না, বারবার আপসের চেষ্টা করছি। এটা কি আমাদের নৈতিক পরাজয় নয়? সরকারের উপর মহল থেকে আমরা অনেক বড় বড় বুলি অহরহই শুনে থাকি; কিন্তু ন্যায় প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা বা ইচ্ছা কতখানি? আইন কি তাহলে সবার ওপর কার্যকর নয়?

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়