করোনায় মানবিক পৃথিবী
jugantor
করোনায় মানবিক পৃথিবী

  খান মাহবুব  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মানবজাতির জন্য ‘যম দুয়ারে খাড়া’- এ কথাটিরই প্রতিধ্বনি করছে যেন। বছরকাল আগে চীনের উহান প্রদেশ ছিল অকুস্থল, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। সারা বিশ্বকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দাবিয়ে বেড়িয়েছে। বিশ্বব্যবস্থাকে শাসন করেছে, শোষণ করেছে। শুধু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের প্রাণ সংহার করেই থেমে থাকেনি; বরং বিশ্বব্যবস্থার সামাজিক অর্থনীতির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। করোনার প্রভাবে প্রতিদিন অচেনা হয়ে উঠেছে চেনা এ গ্রহ।

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রীয় ব্যবস্থার স্বপ্নকল্পকে যখন পেরেস্রইকা ও গ্লাসনস্তের মতো সংস্কারের মলম লাগিয়েও সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করা যায়নি, তখন অনেকাংশে পুঁজিবাদ জেঁকে বসে গোটা বিশ্বব্যবস্থায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সুরেলা পরশ লাগিয়েই নতুন বিশ্বব্যবস্থা ধাবমান হয়। মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে নিরুপদ্রব বেঁচে থাকার কারণে পুঁজিবাদ এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে এগোতে থাকে। কিন্তু করোনা ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে উল্কার গতিতে পৃথিবীতে পতিত হয়ে হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে কতটা ভঙ্গুর ব্যবস্থায় বিশ্ব চলছিল।

করোনা বিশ্বব্যবস্থার ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে একযোগে আঘাত করে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড ইউনিয়নের মতে, ২০২০ সালে বিশ্ববাণিজ্য ১৩-৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে তুলতে ৮০টি দেশ আইএমএফের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। সহায়তাপ্রত্যাশী দেশগুলো প্রধানত করোনাভাইরাস ও অর্থনৈতিক অধোগমন ঠেকাতে অর্থের জোগান চেয়েছে। এই তো গেল আর্থিক দিক; কিন্তু করোনার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত কতটা ভয়াবহ, সেটি অনুমান করা দুরূহ।

আমাদের দীর্ঘদিনের আচার, আনুষ্ঠানিকতা, প্রথা, রীতি ইত্যাদি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছি আমরা। সামাজিক দূরত্বের অজুহাতে আমাদের আড্ডা, সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান আজ স্মৃতিতে স্থান নিয়েছে। সশরীরে যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাতের রেওয়াজ ক্রমে বিলীয়মান হতে চলেছে। মূলত সামাজিক দূরত্ব আমাদের নিয়ে যাচ্ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। করোনা মানুষকে বিছিন্ন রাখার বিধান জারি করেছে। এখন হাত মেলানো, কোলাকুলি, ঘা ঘেঁষে বসা, দাঁড়িয়ে আড্ডা এসব চিরায়ত ব্যাপারগুলোয় বারণ।

পরিস্থিতি এমন হয়েছে, এখন বেঁচে থাকাই বড় প্রশ্ন। প্রতিনিয়ত আর্থিক সামর্থ্য কমতে থাকায় বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপকরণের তালিকা মানুষ কাটছাঁট করছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তিন কামরার ফ্ল্যাটের পরিবর্তে গ্রহণ করছে দুই কামরার ফ্ল্যাট। আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা আরও সঙ্গীন। উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে শহরে এসে করোনার সময় আয়ের উৎস হারিয়ে কেউ নগর ছাড়ছেন, কেউ দিকভ্রান্ত।

শ্রমজীবী মানুষের চিরন্তন লড়াইয়ের মনোবলটুকু নষ্ট করে দিচ্ছে করোনা। সংগঠিত ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন, তারা প্রাণটুকু নিয়ে এখনও টিকে আছেন। কিন্তু অসংগঠিত সেক্টরে কাজ করা মানুষগুলোর জীবনকে এখন আর বেঁচে থাকা বলে না। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে সরকার ঘোষিত করোনার প্রণোদনা প্যাকেজ উদ্দীপক। তবে শিল্প সেক্টরে ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কতটুকু শ্রমজীবী পর্যায়ের মানুষ পান, সেটি দেখার বিষয়।

দেশে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৮২ লাখ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মতে, ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকলীন কাজ হারিয়েছিলেন কম-বেশি ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। শুধু কাজ হারিয়েছেন যারা, তাদের অবস্থাই নতজানু নয়; কাজে থেকেও অনেকের অনিয়মিত ও আংশিক বেতন হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চ শ্রেণির মানুষ সবাই এখন করোনার নেতিবাচক অর্থনীতির শিকলবন্দি। উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব করোনার প্রভাবে ভীত। ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালের মতে, মার্কিন মুল্লুকে করোনার ভয়ে মার্চে মুদি দোকানে বিক্রি বেড়েছিল ৭৭ শতাংশ। পক্ষান্তরে রেস্টুরেন্টে বিকিকিনি কমেছিল ৬৬ শতাংশ। এ চিত্রের তারতম্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম-বেশি হলেও সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে একটা সাদৃশ্য বিদ্যমান।

মূলত মানুষের আয়ের সঙ্গে জীবনযাপনের একটা সংযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে করোনায় আনন্দের উৎসবগুলোর চেহারা পাল্টে দিয়েছে। নববর্ষ ও ঈদ বর্ণিল রূপ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে হাজির হয়েছে। করোনায় ঈদের নামে ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বন্দি দিন। করোনার কারণে ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ পালন করতে পারেননি বিশ্ববাসী। পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমায় মহান প্রভুর নৈকট্য লাভের বিশ্বাসে কার্যকর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। করোনার তাণ্ডবে প্রতিষেধক নিয়ে মানুষের নির্ঘুম রাত কাটছে; কিন্তু করোনার কারণ তলিয়ে দেখার ফুরসত কম।

প্রকৃতির ওপর যারপরনাই অত্যাচারে করোনা প্রকৃতিরই প্রতিদান। পৃথিবীতে সনাতনী পদ্ধতিতে ৩৪০ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব; কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ৭৮০ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থানে মানুষ্য তৎপরতা ব্যাপ্ত। ফলে বন সংহার, কৃত্রিম সার, অতিরিক্ত সেচ, কীটনাশক প্রয়োগে উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতি এখন দীর্ঘদিনের রীতিশুদ্ধ আচরণ করছে না। জীবজন্তুর বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে কাম্যমাত্রার দূরত্ব রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জীবজন্তুর ভাইরাসবাহিত রোগ মানবদেহে প্রবেশ করছে। করোনা এসব কারণেই সৃষ্ট।

পুঁজিবাদ মুনাফা বোঝে, চাহিদা ও জোগান বোঝে; কিন্তু মানবিক পৃথিবী গড়ার তাড়া পুঁজিবাদের দার্শনিক ভিতে খুব বেশি নেই। পুঁজিবাদ খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদার সমতলে জোগান বৃদ্ধি করে; কিন্তু সেক্ষেত্রে মানবিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কতটুকু থাকে? উৎপাদনমুখী বিশ্বে এখন ১০টি টমেটোর পুষ্টিগুণ ১৯৫০ সালে একটি টমেটোর সমান। এ হচ্ছে বাস্তবতা।

করোনা নিয়ে অনেক ধরনের অনুমান-অনুমিতির দোলাচলে মানুষ দুলছে। অনেকে মনে করেন, করোনা কি শুধুই একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস; নাকি এটি জীবাণু অস্ত্র। ভার্চুয়াল জগতে ব্যাপকভাবে প্রবেশে বাধ্য করছে করোনা। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জুম, স্কাইপি, গুগল ক্লাসরুম সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টিকে থাকার বাহন হয়েছে। এক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্য নবদিশা লাভ করেছে, যার সবক’টি আমাদের জন্য ইতিবাচক নয়।

লকডাউনের মাধ্যমে শারীরিক সুরক্ষা, ত্রাণের মাধ্যমে খাদ্যসংস্থান- এসব সাময়িক টোটকা। করোনা-পরবর্তী নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের টিকে থাকতে হলে নতুন উদ্ভাবন প্রয়োজন। গ্রামমুখো অধিকাংশ মানুষই সহসাই নগরে ফিরতে পারবেন না। তাই কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃজন জরুরি। বহির্বিশ্বে জনশক্তি বাস্তবায়নে আসতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন শাখায় প্রায় পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী আছে। করোনার তাণ্ডব মোকাবেলা করে ছাত্রদের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

করোনায় মৃত স্বজনকে চিরবিদায় জানাতেও যাওয়া যাচ্ছে না। প্রিয়জনকে মাটিতে শুইয়ে দেয়ার আগে শেষ স্পর্শটুকু করা যাচ্ছে না। বাঙালির বহমান সংস্কৃতির একটা অংশ প্রিয়জনকে স্পর্শ করে ভালোবাসা, স্নেহ প্রকাশ করা। মনের ব্যাকুলতার প্রকাশ, যা আমাদের মজ্জাগত সেটি থেকে নিবৃত্ত থাকতে হচ্ছে। স্পর্শ মানুষকে শুধু প্রশান্তি দেয় না, বিজ্ঞানীদের মতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক শারীরিক স্পর্শের প্রয়োজন রয়েছে। স্পর্শ মানুষের শরীরে ডোপামিন, সেরোটোমিন, অক্সিটোমিন নামের হরমোন নিঃসরণ বাড়ায় এবং করটিজল নিঃসরণ কমায়, যার ফলে ইতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি করে।

করোনার সংহারে মানুষ বিচলিত-বিহ্বল ও উদ্ভ্রান্ত। এখন পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আশার একটু আলো নিয়ে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় উঁকি দিছে মাত্র। অনুমান করা যায়, করোনার সঙ্গে বসবাস দীর্ঘস্থায়ী হবে। এ বাস্তবতায় আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের রোডম্যাপ রচনা করতে হবে প্রচলিত ধারায় নয়, ভিন্ন আঙ্গিকে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভেঙে পড়া অর্থনীতি যতবার সমাজের গায়ে অভিঘাত হেনেছে, সমাজে পরিবর্তন এসেছে- তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইতিবাচক। দুর্যোগে মনোবল ঠিক রাখতে পারলেই ঘুরে দাঁড়ানো যায়। তাই, করোনা মহামারীতে আমরা যদি সামগ্রিকভাবে সবল শক্তিকে একমুখী করে চালাতে পারি, তবে ভোরের আলো বিলম্বে হলেও একসময় জ্যোতি ছড়াবে।

করোনা যতই ‘বিচ্ছেদ-বিয়োগ’ সৃষ্টি করুক না কেন; এটি সাময়িক। রবি ঠাকুরের ভাষায়-

‘তোমার অসীম প্রাণময় লয়ে

যত দূরে আমি যাই

কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু

কোথা বিচ্ছেদ নাই।’

খান মাহবুব : গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

করোনায় মানবিক পৃথিবী

 খান মাহবুব 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

করোনাভাইরাসের উপস্থিতি মানবজাতির জন্য ‘যম দুয়ারে খাড়া’- এ কথাটিরই প্রতিধ্বনি করছে যেন। বছরকাল আগে চীনের উহান প্রদেশ ছিল অকুস্থল, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকায়নি। সারা বিশ্বকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দাবিয়ে বেড়িয়েছে। বিশ্বব্যবস্থাকে শাসন করেছে, শোষণ করেছে। শুধু বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের প্রাণ সংহার করেই থেমে থাকেনি; বরং বিশ্বব্যবস্থার সামাজিক অর্থনীতির খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে। করোনার প্রভাবে প্রতিদিন অচেনা হয়ে উঠেছে চেনা এ গ্রহ।

সোভিয়েত সমাজতন্ত্রীয় ব্যবস্থার স্বপ্নকল্পকে যখন পেরেস্রইকা ও গ্লাসনস্তের মতো সংস্কারের মলম লাগিয়েও সমাজতন্ত্রকে রক্ষা করা যায়নি, তখন অনেকাংশে পুঁজিবাদ জেঁকে বসে গোটা বিশ্বব্যবস্থায়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সুরেলা পরশ লাগিয়েই নতুন বিশ্বব্যবস্থা ধাবমান হয়। মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে নিরুপদ্রব বেঁচে থাকার কারণে পুঁজিবাদ এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে এগোতে থাকে। কিন্তু করোনা ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়ে উল্কার গতিতে পৃথিবীতে পতিত হয়ে হাড়ে হাড়ে প্রমাণ করে দিচ্ছে কতটা ভঙ্গুর ব্যবস্থায় বিশ্ব চলছিল।

করোনা বিশ্বব্যবস্থার ব্যাষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতিকে একযোগে আঘাত করে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড ইউনিয়নের মতে, ২০২০ সালে বিশ্ববাণিজ্য ১৩-৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে তুলতে ৮০টি দেশ আইএমএফের কাছে আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। সহায়তাপ্রত্যাশী দেশগুলো প্রধানত করোনাভাইরাস ও অর্থনৈতিক অধোগমন ঠেকাতে অর্থের জোগান চেয়েছে। এই তো গেল আর্থিক দিক; কিন্তু করোনার সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত কতটা ভয়াবহ, সেটি অনুমান করা দুরূহ।

আমাদের দীর্ঘদিনের আচার, আনুষ্ঠানিকতা, প্রথা, রীতি ইত্যাদি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছি আমরা। সামাজিক দূরত্বের অজুহাতে আমাদের আড্ডা, সভা-সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান আজ স্মৃতিতে স্থান নিয়েছে। সশরীরে যোগাযোগ, দেখা-সাক্ষাতের রেওয়াজ ক্রমে বিলীয়মান হতে চলেছে। মূলত সামাজিক দূরত্ব আমাদের নিয়ে যাচ্ছে সামাজিক বিচ্ছিন্নতায়। করোনা মানুষকে বিছিন্ন রাখার বিধান জারি করেছে। এখন হাত মেলানো, কোলাকুলি, ঘা ঘেঁষে বসা, দাঁড়িয়ে আড্ডা এসব চিরায়ত ব্যাপারগুলোয় বারণ।

পরিস্থিতি এমন হয়েছে, এখন বেঁচে থাকাই বড় প্রশ্ন। প্রতিনিয়ত আর্থিক সামর্থ্য কমতে থাকায় বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপকরণের তালিকা মানুষ কাটছাঁট করছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তিন কামরার ফ্ল্যাটের পরিবর্তে গ্রহণ করছে দুই কামরার ফ্ল্যাট। আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অবস্থা আরও সঙ্গীন। উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে শহরে এসে করোনার সময় আয়ের উৎস হারিয়ে কেউ নগর ছাড়ছেন, কেউ দিকভ্রান্ত।

শ্রমজীবী মানুষের চিরন্তন লড়াইয়ের মনোবলটুকু নষ্ট করে দিচ্ছে করোনা। সংগঠিত ক্ষেত্রে যারা কাজ করেন, তারা প্রাণটুকু নিয়ে এখনও টিকে আছেন। কিন্তু অসংগঠিত সেক্টরে কাজ করা মানুষগুলোর জীবনকে এখন আর বেঁচে থাকা বলে না। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে সরকার ঘোষিত করোনার প্রণোদনা প্যাকেজ উদ্দীপক। তবে শিল্প সেক্টরে ৭২ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের কতটুকু শ্রমজীবী পর্যায়ের মানুষ পান, সেটি দেখার বিষয়।

দেশে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৮২ লাখ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির মতে, ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকলীন কাজ হারিয়েছিলেন কম-বেশি ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। শুধু কাজ হারিয়েছেন যারা, তাদের অবস্থাই নতজানু নয়; কাজে থেকেও অনেকের অনিয়মিত ও আংশিক বেতন হয়েছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চ শ্রেণির মানুষ সবাই এখন করোনার নেতিবাচক অর্থনীতির শিকলবন্দি। উন্নত বিশ্ব এবং উন্নয়নশীল বিশ্ব করোনার প্রভাবে ভীত। ওয়ার্ল্ড স্ট্রিট জার্নালের মতে, মার্কিন মুল্লুকে করোনার ভয়ে মার্চে মুদি দোকানে বিক্রি বেড়েছিল ৭৭ শতাংশ। পক্ষান্তরে রেস্টুরেন্টে বিকিকিনি কমেছিল ৬৬ শতাংশ। এ চিত্রের তারতম্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কম-বেশি হলেও সামগ্রিক চিত্রের মধ্যে একটা সাদৃশ্য বিদ্যমান।

মূলত মানুষের আয়ের সঙ্গে জীবনযাপনের একটা সংযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে করোনায় আনন্দের উৎসবগুলোর চেহারা পাল্টে দিয়েছে। নববর্ষ ও ঈদ বর্ণিল রূপ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে হাজির হয়েছে। করোনায় ঈদের নামে ক্যালেন্ডারে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বন্দি দিন। করোনার কারণে ইসলাম ধর্মের অন্যতম স্তম্ভ পবিত্র হজ পালন করতে পারেননি বিশ্ববাসী। পশু কোরবানির মাধ্যমে ত্যাগের মহিমায় মহান প্রভুর নৈকট্য লাভের বিশ্বাসে কার্যকর দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হয়নি। করোনার তাণ্ডবে প্রতিষেধক নিয়ে মানুষের নির্ঘুম রাত কাটছে; কিন্তু করোনার কারণ তলিয়ে দেখার ফুরসত কম।

প্রকৃতির ওপর যারপরনাই অত্যাচারে করোনা প্রকৃতিরই প্রতিদান। পৃথিবীতে সনাতনী পদ্ধতিতে ৩৪০ কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন সম্ভব; কিন্তু বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ৭৮০ কোটি মানুষের খাদ্যের সংস্থানে মানুষ্য তৎপরতা ব্যাপ্ত। ফলে বন সংহার, কৃত্রিম সার, অতিরিক্ত সেচ, কীটনাশক প্রয়োগে উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই; কিন্তু পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতি এখন দীর্ঘদিনের রীতিশুদ্ধ আচরণ করছে না। জীবজন্তুর বিচরণ ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে মানুষ ও জীবজন্তুর মধ্যে কাম্যমাত্রার দূরত্ব রক্ষা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে জীবজন্তুর ভাইরাসবাহিত রোগ মানবদেহে প্রবেশ করছে। করোনা এসব কারণেই সৃষ্ট।

পুঁজিবাদ মুনাফা বোঝে, চাহিদা ও জোগান বোঝে; কিন্তু মানবিক পৃথিবী গড়ার তাড়া পুঁজিবাদের দার্শনিক ভিতে খুব বেশি নেই। পুঁজিবাদ খাদ্যসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদার সমতলে জোগান বৃদ্ধি করে; কিন্তু সেক্ষেত্রে মানবিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতা কতটুকু থাকে? উৎপাদনমুখী বিশ্বে এখন ১০টি টমেটোর পুষ্টিগুণ ১৯৫০ সালে একটি টমেটোর সমান। এ হচ্ছে বাস্তবতা।

করোনা নিয়ে অনেক ধরনের অনুমান-অনুমিতির দোলাচলে মানুষ দুলছে। অনেকে মনে করেন, করোনা কি শুধুই একটি প্রাণঘাতী ভাইরাস; নাকি এটি জীবাণু অস্ত্র। ভার্চুয়াল জগতে ব্যাপকভাবে প্রবেশে বাধ্য করছে করোনা। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর জুম, স্কাইপি, গুগল ক্লাসরুম সাম্প্রতিক সময়ে যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে টিকে থাকার বাহন হয়েছে। এক্ষেত্রেও সাম্রাজ্যবাদী বাণিজ্য নবদিশা লাভ করেছে, যার সবক’টি আমাদের জন্য ইতিবাচক নয়।

লকডাউনের মাধ্যমে শারীরিক সুরক্ষা, ত্রাণের মাধ্যমে খাদ্যসংস্থান- এসব সাময়িক টোটকা। করোনা-পরবর্তী নতুন বিশ্বব্যবস্থায় আমাদের টিকে থাকতে হলে নতুন উদ্ভাবন প্রয়োজন। গ্রামমুখো অধিকাংশ মানুষই সহসাই নগরে ফিরতে পারবেন না। তাই কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃজন জরুরি। বহির্বিশ্বে জনশক্তি বাস্তবায়নে আসতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার। বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভিন্ন শাখায় প্রায় পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী আছে। করোনার তাণ্ডব মোকাবেলা করে ছাত্রদের ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

করোনায় মৃত স্বজনকে চিরবিদায় জানাতেও যাওয়া যাচ্ছে না। প্রিয়জনকে মাটিতে শুইয়ে দেয়ার আগে শেষ স্পর্শটুকু করা যাচ্ছে না। বাঙালির বহমান সংস্কৃতির একটা অংশ প্রিয়জনকে স্পর্শ করে ভালোবাসা, স্নেহ প্রকাশ করা। মনের ব্যাকুলতার প্রকাশ, যা আমাদের মজ্জাগত সেটি থেকে নিবৃত্ত থাকতে হচ্ছে। স্পর্শ মানুষকে শুধু প্রশান্তি দেয় না, বিজ্ঞানীদের মতে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক শারীরিক স্পর্শের প্রয়োজন রয়েছে। স্পর্শ মানুষের শরীরে ডোপামিন, সেরোটোমিন, অক্সিটোমিন নামের হরমোন নিঃসরণ বাড়ায় এবং করটিজল নিঃসরণ কমায়, যার ফলে ইতিবাচক অনুভূতির সৃষ্টি করে।

করোনার সংহারে মানুষ বিচলিত-বিহ্বল ও উদ্ভ্রান্ত। এখন পর্যন্ত করোনার প্রতিষেধক আশার একটু আলো নিয়ে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় উঁকি দিছে মাত্র। অনুমান করা যায়, করোনার সঙ্গে বসবাস দীর্ঘস্থায়ী হবে। এ বাস্তবতায় আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের রোডম্যাপ রচনা করতে হবে প্রচলিত ধারায় নয়, ভিন্ন আঙ্গিকে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ভেঙে পড়া অর্থনীতি যতবার সমাজের গায়ে অভিঘাত হেনেছে, সমাজে পরিবর্তন এসেছে- তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইতিবাচক। দুর্যোগে মনোবল ঠিক রাখতে পারলেই ঘুরে দাঁড়ানো যায়। তাই, করোনা মহামারীতে আমরা যদি সামগ্রিকভাবে সবল শক্তিকে একমুখী করে চালাতে পারি, তবে ভোরের আলো বিলম্বে হলেও একসময় জ্যোতি ছড়াবে।

করোনা যতই ‘বিচ্ছেদ-বিয়োগ’ সৃষ্টি করুক না কেন; এটি সাময়িক। রবি ঠাকুরের ভাষায়-

‘তোমার অসীম প্রাণময় লয়ে

যত দূরে আমি যাই

কোথাও দুঃখ কোথাও মৃত্যু

কোথা বিচ্ছেদ নাই।’

খান মাহবুব : গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়