সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কল্যাণকর রাষ্ট্র
jugantor
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কল্যাণকর রাষ্ট্র

  ড. মো. নাসির উদ্দিন  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কল্যাণকর রাষ্ট্র

স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামগ্রিক চিন্তা-চেতনায় সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ, অবহেলিত, প্রান্তিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা, জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি সদাজাগ্রত ছিল।

জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’

জাতির পিতা তার এ চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন আমাদের সংবিধানে। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার সংযুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করেন।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় জাতির পিতার সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে দেশে প্রথমবারের মতো বয়স্কভাতা এবং ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীসহ নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী শিক্ষা, উপবৃত্তি, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালুসহ নানাবিধ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

বর্তমান সরকারের সময় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার সঙ্গে সঙ্গে আরও ২৫টির বেশি মন্ত্রণালয় সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বয়স্কভাতা, বর্তমানে উপকারভোগীর সংখ্যা ৪৯ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ২৯৪০ কোটি টাকা; বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২০ লাখ ৫০ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ১২২০ কোটি টাকা; অসচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতা, বর্তমানে উপকারভোগীর সংখ্যা ১৮ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ১৬২০ কোটি টাকা; প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ৯৫.৬৪ কোটি টাকা; হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৬ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা; বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৮১ হাজার ৪২০ জন, আর্থিক বরাদ্দ ৭৫.৯৮ কোটি টাকা; চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার; ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ১৫০ কোটি টাকা; বেসরকারি এতিমখানা ক্যাপিটেশন গ্রান্ট, উপকারভোগী প্রায় ১ লাখ, বরাদ্দ ২৩১ কোটি টাকা; পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রমের আওতায় আয়বর্ধক কর্মসূচি, বর্তমান মূলধনের পরিমাণ প্রায় ৫২১ কোটি টাকা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি।

এছাড়া শিশু-কিশোর, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী এবং বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ ও উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানীভাতা, উৎসবভাতা, বাংলা নববর্ষ এবং মহান বিজয় দিবসভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লাখ, বরাদ্দ ৩৪৭৩ কোটি টাকা।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীনভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ লাখ ৭০ হাজার, বরাদ্দ ৭৩৯.২০ কোটি টাকা; কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল, উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার, বরাদ্দ ২৬৪ কোটি টাকা; ভিজিডি কার্যক্রম, উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪০ হাজার, বরাদ্দ ১৬৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, উপকারভোগীর সংখ্যা ৯ লাখ ৬৭ হাজার, বরাদ্দ ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা (২০১৮-১৯); খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (৫ মাসের জন্য), উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ লাখ পরিবার, বরাদ্দ ৬৩৬ কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ শুরু থেকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বয়স্ক ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১২.১৫ ও ৬০ গুণ। বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫.০৮ ও ৩০.৫ গুণ।

অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১৭.৩১ ও ৬৪.৮ গুণ। প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৭.৬৭ ও ১৬ গুণ।

বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫.৪ ও ৮ গুণ। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৫ গুণ। ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোকে প্যারালাইসিস ও থ্যালাসেমিয়া রোগীর উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১৫ ও ১৫ গুণ। বেসরকারি এতিমখানা ক্যাপিটেশন গ্রান্ট এ উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪ ও ১০ গুণ।

মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানীভাতা পর্যায়ক্রমে ৩০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা; যা বর্তমানে ১২ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে ২ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচের আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯২ লাখ (তারা জীবনব্যাপী ভাতা পাবেন) এবং সব ধরনের উপকারভোগীর সংখ্যা ২ কোটির বেশি।

বিশ্বের ২৩৫ দেশের মধ্যে ১৩৮টি দেশের জনসংখ্যা আমাদের লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচের আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যার (৯২ লাখের) চেয়ে কম (সূত্র : ওয়ার্ল্ডওমিটার)।

বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৪ হাজার ১৭৬.৪৮ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৩.৮১ ও ২.৫৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৫.৬২ ও ২. ৮৪ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৬.৮৩ ও ৩.০১ শতাংশ।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষাকে আইনি বলয়ের আওতায় আনার জন্য বর্তমান সরকারের আমলে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন ২০১১, শিশু আইন ২০১৩, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ আইন ২০১৯।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণ, বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও বিভিন্ন কৌশলগত সংস্কারের ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে কল্যাণকর রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ।

ড. মো. নাসির উদ্দিন : অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল). সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

[email protected]

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কল্যাণকর রাষ্ট্র

 ড. মো. নাসির উদ্দিন 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও কল্যাণকর রাষ্ট্র
ছবি: সংগৃহীত

স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামগ্রিক চিন্তা-চেতনায় সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ, অবহেলিত, প্রান্তিক ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষা, জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি সদাজাগ্রত ছিল।

জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।’

জাতির পিতা তার এ চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন আমাদের সংবিধানে। তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১৫ (ঘ) অনুচ্ছেদে সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার, অর্থাৎ বেকারত্ব, ব্যাধি বা পঙ্গুত্বজনিত কিংবা বৈধব্য, মাতাপিতৃহীনতা বা বার্ধক্যজনিত কিংবা অনুরূপ অন্যান্য পরিস্থিতিজনিত কারণে অভাবগ্রস্ততার ক্ষেত্রে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার সংযুক্ত করে সামাজিক নিরাপত্তাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করেন।

সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় জাতির পিতার সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক উদ্যোগে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতরের মাধ্যমে ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে দেশে প্রথমবারের মতো বয়স্কভাতা এবং ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাভাতা, মুক্তিযোদ্ধা সম্মানীসহ নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র, প্রতিবন্ধী শিক্ষা, উপবৃত্তি, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্থিক সহায়তা, প্রতিবন্ধী মোবাইল থেরাপি ভ্যান চালুসহ নানাবিধ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।

বর্তমান সরকারের সময় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা এবং উপকারভোগীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্র্তৃক গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার সঙ্গে সঙ্গে আরও ২৫টির বেশি মন্ত্রণালয় সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদফতর কর্তৃক পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বয়স্কভাতা, বর্তমানে উপকারভোগীর সংখ্যা ৪৯ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ২৯৪০ কোটি টাকা; বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলাভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২০ লাখ ৫০ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ১২২০ কোটি টাকা; অসচ্ছল প্রতিবন্ধীভাতা, বর্তমানে উপকারভোগীর সংখ্যা ১৮ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ১৬২০ কোটি টাকা; প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তি, উপকারভোগীর সংখ্যা ১ লাখ, আর্থিক বরাদ্দ ৯৫.৬৪ কোটি টাকা; হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৬ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা; বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৮১ হাজার ৪২০ জন, আর্থিক বরাদ্দ ৭৫.৯৮ কোটি টাকা; চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ হাজার; ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোক ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি, উপকারভোগীর সংখ্যা ৩০ হাজার, আর্থিক বরাদ্দ ১৫০ কোটি টাকা; বেসরকারি এতিমখানা ক্যাপিটেশন গ্রান্ট, উপকারভোগী প্রায় ১ লাখ, বরাদ্দ ২৩১ কোটি টাকা; পল্লী সমাজসেবা কার্যক্রমের আওতায় আয়বর্ধক কর্মসূচি, বর্তমান মূলধনের পরিমাণ প্রায় ৫২১ কোটি টাকা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি।

এছাড়া শিশু-কিশোর, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, মানসিক প্রতিবন্ধী এবং বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ ও উন্নয়নে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সম্মানীভাতা, উৎসবভাতা, বাংলা নববর্ষ এবং মহান বিজয় দিবসভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লাখ, বরাদ্দ ৩৪৭৩ কোটি টাকা।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় দরিদ্র মা’র জন্য মাতৃত্বকালীনভাতা, উপকারভোগীর সংখ্যা ৭ লাখ ৭০ হাজার, বরাদ্দ ৭৩৯.২০ কোটি টাকা; কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল, উপকারভোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৭৫ হাজার, বরাদ্দ ২৬৪ কোটি টাকা; ভিজিডি কার্যক্রম, উপকারভোগীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪০ হাজার, বরাদ্দ ১৬৮৫ কোটি ৭ লাখ টাকা।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান, উপকারভোগীর সংখ্যা ৯ লাখ ৬৭ হাজার, বরাদ্দ ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা (২০১৮-১৯); খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি (৫ মাসের জন্য), উপকারভোগীর সংখ্যা ৫০ লাখ পরিবার, বরাদ্দ ৬৩৬ কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর ধারাবাহিকতা পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ শুরু থেকে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বয়স্ক ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১২.১৫ ও ৬০ গুণ। বিধবা, স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫.০৮ ও ৩০.৫ গুণ।

অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১৭.৩১ ও ৬৪.৮ গুণ। প্রতিবন্ধী শিক্ষা উপবৃত্তির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৭.৬৭ ও ১৬ গুণ।

বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫.৪ ও ৮ গুণ। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৫ ও ৫ গুণ। ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, জন্মগত হৃদরোগ, স্ট্রোকে প্যারালাইসিস ও থ্যালাসেমিয়া রোগীর উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ১৫ ও ১৫ গুণ। বেসরকারি এতিমখানা ক্যাপিটেশন গ্রান্ট এ উপকারভোগী এবং আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৪ ও ১০ গুণ।

মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানীভাতা পর্যায়ক্রমে ৩০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা; যা বর্তমানে ১২ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। উপকারভোগীর সংখ্যা ৪০ হাজার থেকে ২ লাখে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচের আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯২ লাখ (তারা জীবনব্যাপী ভাতা পাবেন) এবং সব ধরনের উপকারভোগীর সংখ্যা ২ কোটির বেশি।

বিশ্বের ২৩৫ দেশের মধ্যে ১৩৮টি দেশের জনসংখ্যা আমাদের লাইফ সাইকেল অ্যাপ্রোচের আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যার (৯২ লাখের) চেয়ে কম (সূত্র : ওয়ার্ল্ডওমিটার)।

বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রতি অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৬৪ হাজার ১৭৬.৪৮ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৩.৮১ ও ২.৫৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৫.৬২ ও ২. ৮৪ শতাংশ। ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা যথাক্রমে বাজেট ও জিডিপির ১৬.৮৩ ও ৩.০১ শতাংশ।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষাকে আইনি বলয়ের আওতায় আনার জন্য বর্তমান সরকারের আমলে প্রণয়ন করা হয়েছে জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল, ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন ২০১১, শিশু আইন ২০১৩, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩, নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ এবং বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ আইন ২০১৯।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা সম্প্রসারণ, বাজেট বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আইন প্রণয়ন ও বিভিন্ন কৌশলগত সংস্কারের ফলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে কল্যাণকর রাষ্ট্রের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশ।

ড. মো. নাসির উদ্দিন : অতিরিক্ত সচিব (পিআরএল). সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়

[email protected]