এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন তিনি
jugantor
শ্রদ্ধাঞ্জলি
এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন তিনি

  ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন তিনি

এ ধূলিময় জগতে আমরা সবাই ধুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছি, আবার ধুলোতেই মিলিয়ে যাব। বস্তুজগতের এই তো স্বাভাবিক নিয়ম। সৃষ্টির সেই অনাদিকাল থেকে সময়ের মহাস্রোতে কত রথী-মহারথী শূন্যে মিলিয়ে গেছে, কত রথী-মহারথী রঙিন ফানুসের মতো দপ করে জ্বলে উঠে অস্তমিতকালের অতলগহ্বরে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব কেইবা রেখেছে!

তারপরও জীবন-মৃত্যুর এ যাওয়া-আসার অমোঘ সত্যের অন্তরালে কিছু জীবন আপন কর্মে উদ্ভাসিত হয়ে দ্যুতি ছড়ায়, আলোকস্পর্শী পথনির্দেশ করে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে।

তখন তারা মৃত্যুকে জয় করে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান নিয়ে হয়ে ওঠেন চিরঞ্জীব। এমনই এক আলোকস্পর্শী পথনির্দেশক হিসেবে এ দেশের জাতীয় জীবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম, সিএসসি। সর্বোন্নত রাষ্ট্র আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেও, সেদেশের নাগরিক হয়েও ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে।

নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মোহ ত্যাগ করে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি ভঙ্গুর দেশে শিক্ষা, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ ও আর্তপীড়িত মানুষের সেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে বাংলার বন্ধু হয়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাণিবিজ্ঞানী, উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম সংগঠক।

গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস তার বিখ্যাত ‘ইডিপাস’ নাটকে বলেছেন- একজন মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্ত সুখী বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার সুখকে সমাধি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। ফাদার টিম সত্যিই তার সুখকে, তার সাফল্যকে সমাধি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

ফাদার টিম ১৯২৩ সালের ২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মিশিগান সিটিতে। কিন্তু তার সাফল্যগাথার সবকিছুই সূচিত হয়েছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে এশিয়ার নোবেল পুরস্কার বলে খ্যাত ‘ম্যাগসেসে’ পুরস্কার লাভ করেন।

একই বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের জন্য ‘আবু সাঈদ চৌধুরী’ পুরস্কার লাভ করেন। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ২০১২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ পদক লাভ করেন। তবে এসব পুরস্কার আর সম্মাননা দিয়ে ফাদার টিমকে বিচার করা যাবে না। কারণ এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য ফাদার টিম তার অন্তরের অন্তস্থল থেকে নীরবে-নিভৃতে অসংখ্য কাজ করে গেছেন।

ফাদার টিম ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ানার নটর ডেমের সেক্রেড হার্ট চার্চে যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৯৫২ সালে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অফ আমেরিকা থেকে ‘প্যারাসিটলজি’র (পরজীবী) ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজে (তৎকালীন সেন্ট গ্রেগরি কলেজ) বিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫৩-৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪-৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তানের খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ‘কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে’ ধান ও পাট গবেষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ’৬৪ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে সাউথ এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (SEATO) রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৮-৭০ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এ সময় তিনি আড়াই মাসের মতো এন্টার্টিকা মহাদেশে গবেষণা করেন। ১৯৭০-৭২ সালে তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

ফাদার টিম ১৯৫৩ সালে নটর ডেম কলেজে দেশের প্রথম ডিবেটিং ক্লাব, ১৯৫৫ সালে সায়েন্স ক্লাব ও ১৯৬৬ সালে অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজের সূচনা করেন। এক কথায়, ফাদার টিম তার আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাচেতনা দ্বারা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেন।

ফাদার টিমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ ৪২ বছরের। ১৯৭৮ সালে আমি যখন ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই তখন থেকেই ফাদার টিমের সঙ্গে মেশার সুযোগ ঘটে। ফাদার টিম কলেজে জীববিজ্ঞান পড়াতেন। বনানীর জাতীয় উচ্চ মিশনারিতে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। একজন আদর্শবান ও মহৎ শিক্ষকের সব গুণ প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে। যেমন তার পাণ্ডিত্য, তেমন ছিল তার গবেষণা, সময়জ্ঞান, একাগ্রচিত্তে কাজ করার মানসিকতা, অতি সাধারণ জীবনযাপন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলা আর ছাত্রদের আপন করে নেয়ার ক্ষমতা।

কিন্তু ফাদার টিমের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি বিমোহিত করেছে তা হল এ দেশের মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। ফাদার টিম সত্যিই এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন তার অন্তরের অন্তস্থল থেকে। এ কারণে দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে তিনি ছুটে গেছেন সবার আগে।

১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ অবস্থায় ফাদার টিম নটর ডেম কলেজের কিছু ছাত্রকে নিয়ে ছুটে যান মনপুরা দ্বীপে। ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ তার কোমল হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণার (সে সময় তিনি পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণা করছিলেন) চেয়ে মানুষের মূল্য অনেক বেশি।

এ কারণে তিনি কলেজ থেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে ঝড়ে বিধ্বস্ত আর্তপীড়িত মানুষের পুনর্গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ফাদার টিম পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, বর্বরতা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী চিত্র বহির্বিশ্বে তুলে ধরেন এবং এর বিরুদ্ধে বিশেষ করে আমেরিকায় জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে।

ফাদার টিম গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের অর্থনীতি যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক থাকা সত্ত্বেও শুধু সামান্য পুঁজির অভাবে তারা যেন কিছুই করতে পারছে না। এ অবস্থায় হতদরিদ্র মানুষের সামনে আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হলেন ফাদার টিম।

তিনি হতদরিদ্র মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Association of Development Agencies in Bangladesh (ADAB). এই ADAB-এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রথম এনজিওর যাত্রা শুরু হয়। এজন্য ফাদার টিমকে বাংলাদেশে এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

এছাড়া তিনি ১৯৭৩ সালে CORR-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ১৯৭৪-৭৬ সালে কারিতাসের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এসব সংস্থার মাধ্যমেও তিনি দেশের হতদরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে কাজ করেছেন। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা ভেবে ১৯৬৪ সালে তিনি হস্তশিল্প সংস্থা ‘জাগরণী’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ফাদার টিম সবসময় বাংলার মানুষের জন্য, মানবতার জন্য কাজ করেছেন। তাই তিনি এ দেশের হতদরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি মানুষের মানবাধিকারের বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। এজন্য তিনি ১৯৮৭ সালে Coordinating Council for Human Rights in Bangladesh প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালে ‘দক্ষিণ এশিয়া মানবাধিকার ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি এর কনভেনারের দায়িত্ব পালন করেন। ফাদার টিম ১৯৭৪ থেকে ’৯৪ সাল পর্যন্ত Justic and Peace Council-এর নির্বাহী সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

ফাদার টিম সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। কোনো কিছুর প্রত্যাশা ব্যতিরেকে এ দেশের মানুষের জন্য তিনি তার সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করে গেছেন। আর যখন কিছুই করার ছিল না, ঠিক তখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে ২০১৬ সালে ফিরে গেছেন নিজের দেশ আমেরিকায়।

২০২০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ইন্ডিয়ানায় হলিক্রস হাউসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ফাদার টিম। তার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে এ দেশের সুধী মহলে। দেশের প্রায় সব পত্রিকা ‘বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু’ সম্বোধন করে ফাদার টিমের মৃত্যুর খবর ঢালাওভাবে প্রচার করে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস এক শোকবার্তায় লিখেছেন- ‘ফাদার টিম, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আপনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আপনি তাদের ভালোবেসেছেন। তারাও আপনাকে ভালোবেসে যাবে। তারা আপনাকে সবসময় স্মরণ করবে। বিদায় ফাদার টিম! আপনার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল।’ কবি যেমনটি বলেছেন-

এমনি জীবন করিবে গঠন

মরিয়াও হাসিবে তুমি

কাঁদিবে ভুবন

কবিতার এ চরণাংশের প্রতিটি শব্দকেই যেন ফাদার টিম স্পর্শ করতে পেরেছেন। ওপারে ভালো থাকুন, চির শান্তিতে থাকুন ফাদার টিম।

ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি : অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা

শ্রদ্ধাঞ্জলি

এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন তিনি

 ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন তিনি
ফাইল ছবি

এ ধূলিময় জগতে আমরা সবাই ধুলো থেকে সৃষ্টি হয়েছি, আবার ধুলোতেই মিলিয়ে যাব। বস্তুজগতের এই তো স্বাভাবিক নিয়ম। সৃষ্টির সেই অনাদিকাল থেকে সময়ের মহাস্রোতে কত রথী-মহারথী শূন্যে মিলিয়ে গেছে, কত রথী-মহারথী রঙিন ফানুসের মতো দপ করে জ্বলে উঠে অস্তমিতকালের অতলগহ্বরে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব কেইবা রেখেছে!

তারপরও জীবন-মৃত্যুর এ যাওয়া-আসার অমোঘ সত্যের অন্তরালে কিছু জীবন আপন কর্মে উদ্ভাসিত হয়ে দ্যুতি ছড়ায়, আলোকস্পর্শী পথনির্দেশ করে ব্যক্তি, সমাজ ও জাতীয় জীবনে।

তখন তারা মৃত্যুকে জয় করে মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় স্থান নিয়ে হয়ে ওঠেন চিরঞ্জীব। এমনই এক আলোকস্পর্শী পথনির্দেশক হিসেবে এ দেশের জাতীয় জীবনে আবির্ভূত হয়েছিলেন ফাদার রিচার্ড উইলিয়াম টিম, সিএসসি। সর্বোন্নত রাষ্ট্র আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেও, সেদেশের নাগরিক হয়েও ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে।

নিজের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের মোহ ত্যাগ করে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি ভঙ্গুর দেশে শিক্ষা, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ ও আর্তপীড়িত মানুষের সেবায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে বাংলার বন্ধু হয়ে উঠেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষাবিদ, গবেষক, প্রাণিবিজ্ঞানী, উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী এবং দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম সংগঠক।

গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিস তার বিখ্যাত ‘ইডিপাস’ নাটকে বলেছেন- একজন মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্ত সুখী বলা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার সুখকে সমাধি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারে। ফাদার টিম সত্যিই তার সুখকে, তার সাফল্যকে সমাধি পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন।

ফাদার টিম ১৯২৩ সালের ২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের মিশিগান সিটিতে। কিন্তু তার সাফল্যগাথার সবকিছুই সূচিত হয়েছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের উন্নয়নে অবদান রাখার জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে এশিয়ার নোবেল পুরস্কার বলে খ্যাত ‘ম্যাগসেসে’ পুরস্কার লাভ করেন।

একই বছর বাংলাদেশের মানবাধিকার ও সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের জন্য ‘আবু সাঈদ চৌধুরী’ পুরস্কার লাভ করেন। ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ২০১২ সালে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ পদক লাভ করেন। তবে এসব পুরস্কার আর সম্মাননা দিয়ে ফাদার টিমকে বিচার করা যাবে না। কারণ এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য ফাদার টিম তার অন্তরের অন্তস্থল থেকে নীরবে-নিভৃতে অসংখ্য কাজ করে গেছেন।

ফাদার টিম ১৯৪৯ সালে ইন্ডিয়ানার নটর ডেমের সেক্রেড হার্ট চার্চে যাজক হিসেবে অভিষিক্ত হন। ১৯৫২ সালে ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অফ আমেরিকা থেকে ‘প্যারাসিটলজি’র (পরজীবী) ওপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ঢাকার নটর ডেম কলেজে (তৎকালীন সেন্ট গ্রেগরি কলেজ) বিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৫৩-৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে লেকচারার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪-৭০ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তানের খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ঢাকার তেজগাঁওয়ে অবস্থিত ‘কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে’ ধান ও পাট গবেষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ’৬৪ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে সাউথ এশিয়া ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (SEATO) রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

১৯৬৮-৭০ সালে তিনি ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এ সময় তিনি আড়াই মাসের মতো এন্টার্টিকা মহাদেশে গবেষণা করেন। ১৯৭০-৭২ সালে তিনি ঢাকার নটর ডেম কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

ফাদার টিম ১৯৫৩ সালে নটর ডেম কলেজে দেশের প্রথম ডিবেটিং ক্লাব, ১৯৫৫ সালে সায়েন্স ক্লাব ও ১৯৬৬ সালে অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব প্রতিষ্ঠা করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজের সূচনা করেন। এক কথায়, ফাদার টিম তার আধুনিক ও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাচেতনা দ্বারা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেন।

ফাদার টিমের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ ৪২ বছরের। ১৯৭৮ সালে আমি যখন ঢাকার নটর ডেম কলেজে ভর্তি হই তখন থেকেই ফাদার টিমের সঙ্গে মেশার সুযোগ ঘটে। ফাদার টিম কলেজে জীববিজ্ঞান পড়াতেন। বনানীর জাতীয় উচ্চ মিশনারিতে তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। একজন আদর্শবান ও মহৎ শিক্ষকের সব গুণ প্রত্যক্ষ করেছি তার মধ্যে। যেমন তার পাণ্ডিত্য, তেমন ছিল তার গবেষণা, সময়জ্ঞান, একাগ্রচিত্তে কাজ করার মানসিকতা, অতি সাধারণ জীবনযাপন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে চলা আর ছাত্রদের আপন করে নেয়ার ক্ষমতা।

কিন্তু ফাদার টিমের যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি বিমোহিত করেছে তা হল এ দেশের মানুষের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। ফাদার টিম সত্যিই এ দেশের মানুষকে ভালোবেসেছেন তার অন্তরের অন্তস্থল থেকে। এ কারণে দেশের যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে তিনি ছুটে গেছেন সবার আগে।

১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এ অবস্থায় ফাদার টিম নটর ডেম কলেজের কিছু ছাত্রকে নিয়ে ছুটে যান মনপুরা দ্বীপে। ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষের আর্তনাদ তার কোমল হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণার (সে সময় তিনি পোকা-মাকড় নিয়ে গবেষণা করছিলেন) চেয়ে মানুষের মূল্য অনেক বেশি।

এ কারণে তিনি কলেজ থেকে ছয় মাসের ছুটি নিয়ে ঝড়ে বিধ্বস্ত আর্তপীড়িত মানুষের পুনর্গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ফাদার টিম পাকিস্তানের গণহত্যার বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ, বর্বরতা, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী চিত্র বহির্বিশ্বে তুলে ধরেন এবং এর বিরুদ্ধে বিশেষ করে আমেরিকায় জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করে।

ফাদার টিম গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন, সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের অর্থনীতি যেন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা অনেক থাকা সত্ত্বেও শুধু সামান্য পুঁজির অভাবে তারা যেন কিছুই করতে পারছে না। এ অবস্থায় হতদরিদ্র মানুষের সামনে আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হলেন ফাদার টিম।

তিনি হতদরিদ্র মানুষকে সহজ শর্তে ঋণ দেয়ার জন্য ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Association of Development Agencies in Bangladesh (ADAB). এই ADAB-এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে প্রথম এনজিওর যাত্রা শুরু হয়। এজন্য ফাদার টিমকে বাংলাদেশে এনজিওর প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়।

এছাড়া তিনি ১৯৭৩ সালে CORR-এর নির্বাহী পরিচালক এবং ১৯৭৪-৭৬ সালে কারিতাসের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। এসব সংস্থার মাধ্যমেও তিনি দেশের হতদরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে কাজ করেছেন। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির কথা ভেবে ১৯৬৪ সালে তিনি হস্তশিল্প সংস্থা ‘জাগরণী’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ফাদার টিম সবসময় বাংলার মানুষের জন্য, মানবতার জন্য কাজ করেছেন। তাই তিনি এ দেশের হতদরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির পাশাপাশি মানুষের মানবাধিকারের বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। এজন্য তিনি ১৯৮৭ সালে Coordinating Council for Human Rights in Bangladesh প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯০ সালে ‘দক্ষিণ এশিয়া মানবাধিকার ফোরাম’ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি এর কনভেনারের দায়িত্ব পালন করেন। ফাদার টিম ১৯৭৪ থেকে ’৯৪ সাল পর্যন্ত Justic and Peace Council-এর নির্বাহী সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।

ফাদার টিম সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের মানুষের জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। কোনো কিছুর প্রত্যাশা ব্যতিরেকে এ দেশের মানুষের জন্য তিনি তার সাধ্যমতো সবকিছু করার চেষ্টা করে গেছেন। আর যখন কিছুই করার ছিল না, ঠিক তখন বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে ২০১৬ সালে ফিরে গেছেন নিজের দেশ আমেরিকায়।

২০২০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ইন্ডিয়ানায় হলিক্রস হাউসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ফাদার টিম। তার মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে আসে এ দেশের সুধী মহলে। দেশের প্রায় সব পত্রিকা ‘বাংলাদেশের প্রকৃত বন্ধু’ সম্বোধন করে ফাদার টিমের মৃত্যুর খবর ঢালাওভাবে প্রচার করে। নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস এক শোকবার্তায় লিখেছেন- ‘ফাদার টিম, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আপনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। আপনি তাদের ভালোবেসেছেন। তারাও আপনাকে ভালোবেসে যাবে। তারা আপনাকে সবসময় স্মরণ করবে। বিদায় ফাদার টিম! আপনার মৃত্যুতে বাংলাদেশ একজন অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল।’ কবি যেমনটি বলেছেন-

এমনি জীবন করিবে গঠন

মরিয়াও হাসিবে তুমি

কাঁদিবে ভুবন

কবিতার এ চরণাংশের প্রতিটি শব্দকেই যেন ফাদার টিম স্পর্শ করতে পেরেছেন। ওপারে ভালো থাকুন, চির শান্তিতে থাকুন ফাদার টিম।

ড. ফাদার হেমন্ত পিউস রোজারিও, সিএসসি : অধ্যক্ষ, নটর ডেম কলেজ, ঢাকা