ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে পরিচালিত হবে
jugantor
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে পরিচালিত হবে

  মুঈদ রহমান  

০৪ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক মাসেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শূন্য ভিসি পদে নিয়োগ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম। প্রফেসর সালাম ৩০ সেপ্টেম্বর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম ভিসি। ’৭৩-এর অধ্যাদেশভুক্ত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে যে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদায়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় তা নয়। বেশিরভাগ ভিসি পরিবর্তনের সময়ই এখানে এক ধরনের উত্তেজনা, বাদ-প্রতিবাদ বিরাজ করে। এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সদ্য বিদায়ী ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০ আগস্ট ২০২০।

কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ মাস আগেই বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষক-কর্মকর্তা-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিল। উভয়পক্ষই সরকার সমর্থক। এক দল ভিসির অপসারণ দাবি করে বসল আর অপরপক্ষ দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসিকে রাখার পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়ল। উভয়পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে একে অপরের চরিত্র হনন করতেও পিছপা হল না। কেউই নিজেদের শালীনতার সীমায় বেঁধে রাখতে পারেননি। বিদায়ী ভিসিপক্ষের লোকেরা তাকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ ভিসি বলে আখ্যায়িত করেছেন, আর বিরোধীপক্ষ বিদায়ী ভিসিকে বলছেন ‘সর্বকালের নিকৃষ্ট’ ভিসি। আমার মনে হয়েছে, কাল সম্পর্কে উভয়পক্ষের ধারণাটা পরিষ্কার নয়। একজন মানুষকে অতি মূল্যায়ন করতে গেলে তাকে একটি কৃত্রিম ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়, যা যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আবার অবমূল্যায়ন করা হলে আগুনচাপা সৃষ্টি করা হয়, যা যে কোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে। প্রকৃত মূল্যায়নই একজন মানুষকে স্থায়ী ও শক্ত আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

আজকের যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, তা একক কোনো ব্যক্তির হাত ধরে আসেনি। একেকজন ভিসি একেক সময়ে একেক ধরনের অবদান রেখেছেন। যদি আপনি অতীতটা সম্পূর্ণরূপে জানেন তবেই একটি মূল্যায়ন চিত্র আঁকতে সক্ষম হবেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভিসির দায়িত্ব পালন করেছেন প্রথম ভিসি ড. এএনএম মমতাজ উদ্দীন চৌধুরী। তিনি দুই মেয়াদে ৭ বছর ১১ মাস ২৬ দিন (১.১.১৯৮১ থেকে ২৭.১২.১৯৮৮) দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্তির মাত্র ৪ দিন আগে শহীদ মিনার স্থাপন নিয়ে ক্যাম্পাসে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন প্রকল্প অবস্থায় ছিল তখনও তিনি প্রায় দেড় বছর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার অবদানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয় ভিসির দায়িত্ব পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম (২৮.১২.১৯৮৮ থেকে ১৭.৬.১৯৯১)। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই লেকচারার ছিলেন, তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। প্রথম ভিসির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। তাকে বাদ দিয়ে, কাউকে খাটো না করে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরাজ স্যারের মতো এমন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ভিসি হিসেবে আর দ্বিতীয়জন আসেননি- তার অপছন্দের মানুষরাও তা অকপটে স্বীকার করবেন। তার অবদানের কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৯০ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢাকার গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক এই স্থানান্তরের বিরোধিতা করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদের আয়োজন করেন। তিনি এ বিরোধিতা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসেন। কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে মে মাসে ক্লাস চালু করে দিলেন। কোনো ধরনের নিজস্ব অবকাঠামো ছাড়া একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করাকে আপনি কোন বিবেকে ছোট করে দেখবেন? ষাটোর্ধ্ব এ অধ্যাপক পরিবার ছেড়ে কুষ্টিয়ায় থেকে দিন-রাত পরিশ্রমের বিনিময়ে তা সম্ভব করেছিলেন। তারপরও শিক্ষক সমিত গঠন করা নিয়ে তার সঙ্গে শিক্ষকদের মতবিরোধ তৈরি হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছাত্রদলের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যদি সরকার পরিবর্তন না হতো তাহলে সিরাজ স্যারকে পদ থেকে সরানো যেত না। তাই বলে তার অবদানকে ভুলে গেলে চলবে না।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. আবদুল হামিদ (১৮.৬.১৯৯১ থেকে ২১.৩.১৯৯৫)। রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনি ছিলেন আমার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত থাকলেও চিন্তা ও মননে জামায়াতের কাছাকাছি। আর্থিক বিবেচনায় অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ মানুষ ছিলেন। প্রফেসর হামিদ প্রথমদিকে যেসব শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরে কোনো রকমের রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল না। তবে পরে তা ধরে রাখতে পারেননি। আস্তে আস্তে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রবেশ করতে করতে আজ তা ১০০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তারপরও প্রফেসর হামিদের প্রথম দিককার নিয়োগগুলোকে আমি বলব ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সোনালি পর্ব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় সমস্যার সমাধান করেছিলেন। আগেই বলেছি, কুষ্টিয়া শহরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম চলছিল অস্থায়ীভাবে। কিন্তু নতুন বিভাগ খোলার পর শহরে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রফেসর হামিদ স্যারের অক্লান্ত চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় তার বর্তমান মূল ক্যাম্পাসে ফিরতে সমর্থ হয়। এটি মনে রাখার মতো অবদান। আরেকটি অবদান হল তার দ্বারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদ চালু হওয়া। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদানের কোনো বিভাগ ছিল না। রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনি আমার ভিন্নমতের মানুষ হলেও তার কাজের স্বীকৃতি দিতে আমি একটুও কুণ্ঠাবোধ করছি না এবং এটি তার প্রাপ্য।

প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ করে আজ ওই তিনজন ভিসিকে নিয়ে গীত রচনার হেতু কী? সোজা উত্তরে বলব- দুঃখবোধ। সদ্য বিদায়ী দ্বাদশ ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীর মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ মাস আগে থেকে তার সমর্থক (এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিনি নিজে) তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হিসেবে দেখার জন্য এতসব প্রচার-প্রচারণা চালাতে লাগলেন, যা ছিল দৃষ্টিকটু। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান রাখার ক্ষেত্রে তাকে এমন অবস্থানে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা অতীতের সব ভিসির অবদানকে তুচ্ছ করে তুলেছে। আর ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ জাতীয় বিশেষণের ব্যবহার ছিল যত্রতত্র। বিষয়টিতে আমি আহত হয়েছি। কেননা গত ৩০ বছর ধরে একাধিক ভিসির একাধিক স্মরণে রাখার মতো অবদান ছিল, যা অনেকেরই অজানা। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সব সদস্যের তা জানা প্রয়োজন। কারও অবদানকে অস্বীকার করে বড় হওয়া যায় না।

সদ্য বিদায়ী ভিসি সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন কী- এমন প্রশ্নও অবান্তর নয়। সেক্ষেত্রে আমার জবাব হল, ভালো-মন্দ মিলিয়েই তিনি ছিলেন। তার ইতিবাচক কাজগুলোর মধ্যে একটি ছিল- প্রায় ১৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে সমাবর্তন অনুষ্ঠান করা। এত বড় আয়োজনটি ছিল সুনিপুণ। এ কৃতিত্ব তিনি পাবেন। আরেকটি হল অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করা। কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বেলায় তার প্রভাব কেমন তা জানি না, তবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় তা সহায়ক ভূমিকা রেখেছে সন্দেহ নেই। তিনি ৯টি নতুন বিভাগ চালু করেছেন। এ কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ব্যাপারে তিনি একক কৃতিত্বের অধিকারী নাকি পুরো প্রশাসন? আমি একটু পক্ষপাতিত্ব করে কৃতিত্বটা তাকেই দিতে চাচ্ছি। আর যে মেগা প্রকল্প নিয়ে তোলপাড় করা হয়েছে, প্রকৃত অর্থে তার অনেকখানি মলিন। আমরা পেয়েছি মাত্র ৫৩৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে সিলেট পেয়েছে ১২০০ কোটি টাকা, জাহাঙ্গীরনগর পেয়েছে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা আর জগন্নাথ পেয়েছে ২১০০ কোটি টাকা। তারপরও ইতিবাচক দিক বিবেচনা করছি। নেতিবাচক দিক আছে কি? বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ এনেছে, এর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু আমার অন্য একটি পর্যবেক্ষণ আছে : গত ৪ বছর শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে নবীন শিক্ষকরা প্রচণ্ড মানসিক চাপে কাটিয়েছেন। একটি ঘটনা মনে পড়ে। ইউজিসির যে অভিন্ন নীতিমালা ছিল তা প্রবীণদের না হলেও নবীনদের জন্যে ভয়ানক ক্ষতিকর ছিল। শিক্ষক সমিতি এর বিরোধিতায় সভা ডাকলে অনেক নবীন শিক্ষকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এক অপ্রকাশিত ভয়ে সেখানে যেতে পারেননি। এটা তাদের জন্যে একটি কষ্টকর মানসিক চাপ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি শাসন চলে না।

ভিসি পদটি শাসকের নয়, সমন্বয়কের। কোনো ভিসি যখন শাসক হতে চান, তখনই বিপত্তি বাধে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত ভিসির কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী হতে পারে? আমরা মনে করি- এক. গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিগত দিনগুলোতে আমরা একাধিক ভিসির বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযোগ এনেছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেককে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদায়ও নিতে হয়েছে। নতুন ভিসি আসার পর সব অভিযোগ অতলে তলিয়ে গেছে। এটা খুব ভালো সংস্কৃতি নয়, এর সুরাহা হওয়া উচিত। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছে তা আমলে নিয়ে যাচাই করা উচিত। যদি অভিযোগের কোনো সত্যতা না থাকে, তাহলে অভিযোগকারীদের নিন্দা জ্ঞাপন করা প্রয়োজন, আর যদি কোনো সত্যতা থাকে, তাহলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। দুই. বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলবাজি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দলবাজি’কে টপকে ‘উপ-দলবাজি’তে উপনীত হয়েছে। আমরা এর অবসান চাই। রাজনৈতিকভাবে যত মতভিন্নতাই থাকুক, শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সুবিবেচনায় নেয়া এখন সময়ের দাবি। তিন. নবীন শিক্ষকদের মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। তাদের মধ্যে এমন ধারণা প্রোথিত করতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয় হল একটি মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গা, এখানে বিবেক-বিবেচনা দিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশে কোনো বাধা নেই। তাতে করে তাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম হবে।

তবে আফসোসের কথা হল, এত পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুটল আমাদের বরাতে। তবে বাস্তবতা হল, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থকদের একপক্ষের রয়েছে সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা এবং অপরপক্ষের চরম স্বেচ্ছাচারিতা। তাই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হল।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কোন পথে পরিচালিত হবে

 মুঈদ রহমান 
০৪ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

এক মাসেরও বেশি সময় পার হওয়ার পর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শূন্য ভিসি পদে নিয়োগ পেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. শেখ আবদুস সালাম। প্রফেসর সালাম ৩০ সেপ্টেম্বর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

তিনি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩তম ভিসি। ’৭৩-এর অধ্যাদেশভুক্ত চারটি বিশ্ববিদ্যালয় বাদে যে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি পদায়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় তা নয়। বেশিরভাগ ভিসি পরিবর্তনের সময়ই এখানে এক ধরনের উত্তেজনা, বাদ-প্রতিবাদ বিরাজ করে। এবারেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। সদ্য বিদায়ী ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০ আগস্ট ২০২০।

কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ মাস আগেই বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষক-কর্মকর্তা-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন দেখা দিল। উভয়পক্ষই সরকার সমর্থক। এক দল ভিসির অপসারণ দাবি করে বসল আর অপরপক্ষ দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসিকে রাখার পক্ষে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়ল। উভয়পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে একে অপরের চরিত্র হনন করতেও পিছপা হল না। কেউই নিজেদের শালীনতার সীমায় বেঁধে রাখতে পারেননি। বিদায়ী ভিসিপক্ষের লোকেরা তাকে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ ভিসি বলে আখ্যায়িত করেছেন, আর বিরোধীপক্ষ বিদায়ী ভিসিকে বলছেন ‘সর্বকালের নিকৃষ্ট’ ভিসি। আমার মনে হয়েছে, কাল সম্পর্কে উভয়পক্ষের ধারণাটা পরিষ্কার নয়। একজন মানুষকে অতি মূল্যায়ন করতে গেলে তাকে একটি কৃত্রিম ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হয়, যা যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে। আবার অবমূল্যায়ন করা হলে আগুনচাপা সৃষ্টি করা হয়, যা যে কোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে। প্রকৃত মূল্যায়নই একজন মানুষকে স্থায়ী ও শক্ত আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

আজকের যে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, তা একক কোনো ব্যক্তির হাত ধরে আসেনি। একেকজন ভিসি একেক সময়ে একেক ধরনের অবদান রেখেছেন। যদি আপনি অতীতটা সম্পূর্ণরূপে জানেন তবেই একটি মূল্যায়ন চিত্র আঁকতে সক্ষম হবেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভিসির দায়িত্ব পালন করেছেন প্রথম ভিসি ড. এএনএম মমতাজ উদ্দীন চৌধুরী। তিনি দুই মেয়াদে ৭ বছর ১১ মাস ২৬ দিন (১.১.১৯৮১ থেকে ২৭.১২.১৯৮৮) দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয় মেয়াদ পূর্তির মাত্র ৪ দিন আগে শহীদ মিনার স্থাপন নিয়ে ক্যাম্পাসে অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি যখন প্রকল্প অবস্থায় ছিল তখনও তিনি প্রায় দেড় বছর প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার অবদানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয় ভিসির দায়িত্ব পেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম (২৮.১২.১৯৮৮ থেকে ১৭.৬.১৯৯১)। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ-তে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই লেকচারার ছিলেন, তবে ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। প্রথম ভিসির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি। তাকে বাদ দিয়ে, কাউকে খাটো না করে আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সিরাজ স্যারের মতো এমন পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ভিসি হিসেবে আর দ্বিতীয়জন আসেননি- তার অপছন্দের মানুষরাও তা অকপটে স্বীকার করবেন। তার অবদানের কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৯০ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢাকার গাজীপুর থেকে কুষ্টিয়ায় স্থানান্তরের সরকারি সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষক এই স্থানান্তরের বিরোধিতা করে জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদের আয়োজন করেন। তিনি এ বিরোধিতা উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে আসেন। কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে মে মাসে ক্লাস চালু করে দিলেন। কোনো ধরনের নিজস্ব অবকাঠামো ছাড়া একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চালু করাকে আপনি কোন বিবেকে ছোট করে দেখবেন? ষাটোর্ধ্ব এ অধ্যাপক পরিবার ছেড়ে কুষ্টিয়ায় থেকে দিন-রাত পরিশ্রমের বিনিময়ে তা সম্ভব করেছিলেন। তারপরও শিক্ষক সমিত গঠন করা নিয়ে তার সঙ্গে শিক্ষকদের মতবিরোধ তৈরি হয়। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ছাত্রদলের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, যদি সরকার পরিবর্তন না হতো তাহলে সিরাজ স্যারকে পদ থেকে সরানো যেত না। তাই বলে তার অবদানকে ভুলে গেলে চলবে না।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ভিসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর ড. আবদুল হামিদ (১৮.৬.১৯৯১ থেকে ২১.৩.১৯৯৫)। রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনি ছিলেন আমার সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত থাকলেও চিন্তা ও মননে জামায়াতের কাছাকাছি। আর্থিক বিবেচনায় অত্যন্ত সৎ ও স্বচ্ছ মানুষ ছিলেন। প্রফেসর হামিদ প্রথমদিকে যেসব শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন, তাতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বাইরে কোনো রকমের রাজনৈতিক বিবেচনা ছিল না। তবে পরে তা ধরে রাখতে পারেননি। আস্তে আস্তে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রবেশ করতে করতে আজ তা ১০০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তারপরও প্রফেসর হামিদের প্রথম দিককার নিয়োগগুলোকে আমি বলব ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগের সোনালি পর্ব। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বড় সমস্যার সমাধান করেছিলেন। আগেই বলেছি, কুষ্টিয়া শহরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম চলছিল অস্থায়ীভাবে। কিন্তু নতুন বিভাগ খোলার পর শহরে কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রফেসর হামিদ স্যারের অক্লান্ত চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয় তার বর্তমান মূল ক্যাম্পাসে ফিরতে সমর্থ হয়। এটি মনে রাখার মতো অবদান। আরেকটি অবদান হল তার দ্বারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান অনুষদ চালু হওয়া। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিষয়ে পাঠদানের কোনো বিভাগ ছিল না। রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনি আমার ভিন্নমতের মানুষ হলেও তার কাজের স্বীকৃতি দিতে আমি একটুও কুণ্ঠাবোধ করছি না এবং এটি তার প্রাপ্য।

প্রশ্ন উঠতে পারে, হঠাৎ করে আজ ওই তিনজন ভিসিকে নিয়ে গীত রচনার হেতু কী? সোজা উত্তরে বলব- দুঃখবোধ। সদ্য বিদায়ী দ্বাদশ ভিসি প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশীদ আসকারীর মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ মাস আগে থেকে তার সমর্থক (এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিনি নিজে) তাকে দ্বিতীয় মেয়াদে ভিসি হিসেবে দেখার জন্য এতসব প্রচার-প্রচারণা চালাতে লাগলেন, যা ছিল দৃষ্টিকটু। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবদান রাখার ক্ষেত্রে তাকে এমন অবস্থানে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা অতীতের সব ভিসির অবদানকে তুচ্ছ করে তুলেছে। আর ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ’ জাতীয় বিশেষণের ব্যবহার ছিল যত্রতত্র। বিষয়টিতে আমি আহত হয়েছি। কেননা গত ৩০ বছর ধরে একাধিক ভিসির একাধিক স্মরণে রাখার মতো অবদান ছিল, যা অনেকেরই অজানা। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সব সদস্যের তা জানা প্রয়োজন। কারও অবদানকে অস্বীকার করে বড় হওয়া যায় না।

সদ্য বিদায়ী ভিসি সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন কী- এমন প্রশ্নও অবান্তর নয়। সেক্ষেত্রে আমার জবাব হল, ভালো-মন্দ মিলিয়েই তিনি ছিলেন। তার ইতিবাচক কাজগুলোর মধ্যে একটি ছিল- প্রায় ১৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে সমাবর্তন অনুষ্ঠান করা। এত বড় আয়োজনটি ছিল সুনিপুণ। এ কৃতিত্ব তিনি পাবেন। আরেকটি হল অফিসের সময়সূচি পরিবর্তন করা। কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের বেলায় তার প্রভাব কেমন তা জানি না, তবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় তা সহায়ক ভূমিকা রেখেছে সন্দেহ নেই। তিনি ৯টি নতুন বিভাগ চালু করেছেন। এ কৃতিত্ব তারই প্রাপ্য। তবে প্রশ্ন উঠতে পারে, এ ব্যাপারে তিনি একক কৃতিত্বের অধিকারী নাকি পুরো প্রশাসন? আমি একটু পক্ষপাতিত্ব করে কৃতিত্বটা তাকেই দিতে চাচ্ছি। আর যে মেগা প্রকল্প নিয়ে তোলপাড় করা হয়েছে, প্রকৃত অর্থে তার অনেকখানি মলিন। আমরা পেয়েছি মাত্র ৫৩৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে সিলেট পেয়েছে ১২০০ কোটি টাকা, জাহাঙ্গীরনগর পেয়েছে প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা আর জগন্নাথ পেয়েছে ২১০০ কোটি টাকা। তারপরও ইতিবাচক দিক বিবেচনা করছি। নেতিবাচক দিক আছে কি? বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা তার বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি আর নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ এনেছে, এর সত্যতা তদন্তসাপেক্ষ। কিন্তু আমার অন্য একটি পর্যবেক্ষণ আছে : গত ৪ বছর শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে নবীন শিক্ষকরা প্রচণ্ড মানসিক চাপে কাটিয়েছেন। একটি ঘটনা মনে পড়ে। ইউজিসির যে অভিন্ন নীতিমালা ছিল তা প্রবীণদের না হলেও নবীনদের জন্যে ভয়ানক ক্ষতিকর ছিল। শিক্ষক সমিতি এর বিরোধিতায় সভা ডাকলে অনেক নবীন শিক্ষকের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এক অপ্রকাশিত ভয়ে সেখানে যেতে পারেননি। এটা তাদের জন্যে একটি কষ্টকর মানসিক চাপ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি শাসন চলে না।

ভিসি পদটি শাসকের নয়, সমন্বয়কের। কোনো ভিসি যখন শাসক হতে চান, তখনই বিপত্তি বাধে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত ভিসির কাছে আমাদের প্রত্যাশা কী হতে পারে? আমরা মনে করি- এক. গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিগত দিনগুলোতে আমরা একাধিক ভিসির বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযোগ এনেছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেককে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বিদায়ও নিতে হয়েছে। নতুন ভিসি আসার পর সব অভিযোগ অতলে তলিয়ে গেছে। এটা খুব ভালো সংস্কৃতি নয়, এর সুরাহা হওয়া উচিত। আমরা মনে করি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ যে অভিযোগগুলো উত্থাপন করেছে তা আমলে নিয়ে যাচাই করা উচিত। যদি অভিযোগের কোনো সত্যতা না থাকে, তাহলে অভিযোগকারীদের নিন্দা জ্ঞাপন করা প্রয়োজন, আর যদি কোনো সত্যতা থাকে, তাহলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। দুই. বর্তমান সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলবাজি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ‘দলবাজি’কে টপকে ‘উপ-দলবাজি’তে উপনীত হয়েছে। আমরা এর অবসান চাই। রাজনৈতিকভাবে যত মতভিন্নতাই থাকুক, শিক্ষার মানোন্নয়নের স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে সুবিবেচনায় নেয়া এখন সময়ের দাবি। তিন. নবীন শিক্ষকদের মানসিক শক্তি ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। তাদের মধ্যে এমন ধারণা প্রোথিত করতে হবে যে, বিশ্ববিদ্যালয় হল একটি মুক্তবুদ্ধি চর্চার জায়গা, এখানে বিবেক-বিবেচনা দিয়ে স্বাধীন মতপ্রকাশে কোনো বাধা নেই। তাতে করে তাদের মানসিক বিকাশের পথ সুগম হবে।

তবে আফসোসের কথা হল, এত পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জুটল আমাদের বরাতে। তবে বাস্তবতা হল, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থকদের একপক্ষের রয়েছে সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা এবং অপরপক্ষের চরম স্বেচ্ছাচারিতা। তাই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে হল।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন