আত্মহত্যার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব
jugantor
আত্মহত্যার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

৩১ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মডেল সাদিয়া কেন আত্মহত্যা করেছেন? আমার-আপনার মনে এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই জেগে উঠেছিল যখন আমরা কিছুদিন আগে তার আত্মহত্যার খবরটি মিডিয়ায় দেখেছিলাম। আমাদের এই ‘খবর-ক্ষুধা’ মেটাতে এগিয়ে এসেছিল অনেকেই। যেমন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা রীতিমতো রিপোর্ট করে এই শিরোনামে- ‘যে কারণে আত্মহত্যা করেছেন মডেল সাদিয়া’।

বাবার সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে আত্মহত্যা করেছেন উঠতি মডেল সাদিয়া ইসলাম নাজ- এই বাক্যটি দিয়ে শুরু হওয়া রিপোর্টটি থেকে খুব বিস্তারিত খুঁটিনাটি জানা যাচ্ছে মামলার এজাহারের সূত্র থেকে। রাত কতটা থেকে কতক্ষণ বাবা-মেয়ের কথা হয়েছে, কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তারপর কীভাবে কী হলো, সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা আছে ওই রিপোর্টে। এটি কি শুধু এই আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ঘটল? না, প্রতিটি আত্মহত্যার পরই আমাদের অবধারিত কৌতূহল থাকে কেন সে আত্মহত্যা করেছে, আর মিডিয়া খুবই আগ্রহীভাবে সেই কৌতূহল মেটায়। আত্মহত্যার কারণ নিয়ে একটি তথ্য জানলে প্রতিবার হয়তো আমাদের এই কৌতূহল হতো না। পৃথিবীর সব আত্মহত্যার কারণ সে ফ একটা। হ্যাঁ, আপনি ভুল পড়েননি। আত্মহত্যার একমাত্র কারণটি নিয়ে কথা বলব আরেকটু পরে।

কলামের এই পর্যায়ে আসুন গুগল করে যে কোনো একটি আত্মহত্যার খবর দেখি। কিছুটা চাঞ্চল্যকর হলে সেই খবরের আরও বেশকিছু ফলোআপ রিপোর্ট পাব। আমরা দেখব আত্মহত্যার ক্ষেত্রে যে মানুষটি আত্মহত্যা করেছে তার নাম, লিঙ্গ, বয়স, পরিবারের পরিচিতি, পড়াশোনা ইত্যাদি সব বিস্তারিত তথ্য সেই রিপোর্টে থাকে। এবং খুব অনিবার্যভাবেই থাকে তার আত্মহত্যার কারণ খোঁজার চেষ্টা। প্রায় সব ক্ষেত্রে রিপোর্টের মধ্যে এমন একটি টোন থাকে, যাতে মনে হয় আত্মহত্যাকারী মানুষটি কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে ছিল যে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

ছোটবেলায় একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহে বাংলা সিনেমা ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সবাই সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকত সেই সিনেমাটি দেখার জন্য। সেখানে কিছু কিছু সিনেমার একটি দৃশ্য থাকত- কোনো মেয়ে (অনেক ক্ষেত্রেই নায়কের বোন) ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং সেই শকে সে আত্মহত্যা করেছে। এ ধরনের ঘটনা এই সমাজে এখনো অনেক ঘটে এবং সেই ধর্ষণকে কারণ দেখিয়ে আত্মহত্যার খবরের শিরোনাম করা হয়। এটি এক ভয়ঙ্কর চর্চা। শুধু সেটিই না, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা আমাদের চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে বরাবরই এসেছে।

আত্মহত্যার খবর কীভাবে মিডিয়ায় পরিবেশিত হওয়া উচিত, সেটি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের সমাজে সেটি অনুপস্থিত। এখন পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে আছে যে আত্মহত্যার সংবাদ মিডিয়াতে যত বেশি পরিমাণে আসে এবং সেটি যদি অসংবেদনশীল ভাষায় লেখা হয়, সেটি আরও বহু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। বিশেষ করে একই রকম পরিস্থিতিতে পড়া মানুষের একইভাবে আত্মহত্যা (কপিক্যাট সুইসাইড) করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

একটি বদ্ধ জায়গায় চারকোল পুড়িয়ে তারপর সেখানে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ের মাধ্যমে আত্মহত্যার একটি চর্চা শুরু হয়েছিল তাইওয়ানে। এই আত্মহত্যার খবরগুলো যখন পত্রিকায় বিস্তারিতভাবে আসতে শুরু করল তখন দেখা গেল, সেদেশের আত্মহত্যার সংখ্যা তো বেড়েছেই, সঙ্গে বহু আত্মহত্যাকারী ব্যবহার করছিলেন চারকোলের ওই পদ্ধতি। পরে একই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে হংকং, চীন ও জাপানেও। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রিয়াসহ নানা দেশে এ ধরনের গবেষণা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে মিডিয়ায় আত্মহত্যার খবর কীভাবে পরিবেশিত হয় তার সঙ্গে আত্মহত্যার সংখ্যার সরাসরি যোগসূত্র আছে।

এদিকে আত্মহত্যার সংবাদটি যদি হয় কোনো সেলিব্রেটির, তাহলে সেটির প্রভাব আরও অনেক বড় হয়। সাম্প্রতিক অতীতে মার্কিন চলচ্চিত্র তারকা রবিন উইলিয়ামসের আত্মহত্যার পর আমেরিকায় আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। চীনা অভিনেত্রী রুয়ান লিংগিউ, জাপানি মিউজিশিয়ান ইউকিকো ওকদা, হিদেতো মাতসিমতো, কোরিয়ান অভিনেত্রী চই জিন শিল, সর্বোপরি মার্কিন অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় বহুল প্রচারের পর আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল।

শুধু বাস্তবের মানুষই নয়, সাহিত্য বা সিনেমায় এ ধরনের প্রবণতার অনেক পুরনো ইতিহাস পাওয়া যায়। গ্যাটে-এর উপন্যাস ‘দ্য সরোজ অব ইয়াং ওয়ার্থার’-এর মূল চরিত্র ওয়ার্থার এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল যে বহু মানুষ সেই চরিত্রের মতো করে পোশাক পরতেন। কিন্তু এটি তৈরি করেছিল একটি বড় বিপদ?ও। প্রেমিকাকে পেতে ব্যর্থ হয়ে ওয়ার্থার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে, যেটি অনেক মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। আমাদের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে নানা কারণে আমরা আত্মহত্যা দেখাই, সেটি বহু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, এই খোঁজ আমরা রাখি কয়জন? প্রেমে ব্যর্থ কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়ে একজন নারীকে যখন আত্মহত্যা করতে দেখা যায়, তখনই সমাজের একজন নারী একই পরিস্থিতিতে পড়লে আত্মহত্যাকে একটি সমাধান হিসাবে ভাবে।

শুরুর দিকে বলেছিলাম আত্মহত্যার কারণ আসলে একটি। কথাটি আসলেই সত্যি। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে মানসিক অসুস্থতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে। এই মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটতে পারে জীবনের কোনো সংকট কিংবা মাদকাসক্তি থেকে। বাকি আর যাই বলা হোক না কেন, কোনোটিই আত্মহত্যার কারণ নয়। এটি বোঝা যায় খুব সহজেই, একই রকম পরিস্থিতিতে কিংবা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে অসংখ্য মানুষ তো আত্মহত্যা করছে না। সুতরাং আত্মহত্যার কারণ হিসাবে নানা বিষয় যখন মিডিয়ায় আসে, গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় তার মধ্যে আসলে সারবস্তু নেই। কিন্তু এভাবেই কারণ উল্লেখ করা এবং সেই কারণকে আত্মহত্যার জন্য এক ধরনের যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা করা একই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যায় প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

অনেকের অবাক লাগবে জেনে, মানসিক অসুস্থতাকে মূল কারণ হিসাবে দেখানো গেলে আত্মহত্যার অনুকরণ করার সম্ভাবনা কমে যায়। বিখ্যাত মিউজিক ব্যান্ড নির্ভানার সদস্য কার্ট কবিনের আত্মহত্যার পর আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়েনি। কারণ সেই ঘটনার রিপোর্টে কবিনের মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ করা হয়েছিল। শুধু আত্মহত্যার কারণ নয়, আত্মহত্যার বহু খবরে আমরা আত্মহত্যাকে এমনভাবে তুলে ধরি যেটিকে এক ধরনের রোমান্টিসাইজ করা হয়। বর্ণনা এমনভাবে করা হয় যাতে পাঠকের সেই মানুষটির প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ যখন দেখে আত্মহত্যার পর হলেও অন্তত কোনো ব্যক্তি মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে, তখন সেটি তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে।

অনেক দেশেই আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ করা নিয়ে জাতীয় মিডিয়া গাইডলাইন আছে। অনেক ক্ষেত্রে সেটি না থাকলেও মিডিয়া নানারকম নর্ম মেনে চলে। নরওয়েতে সাধারণভাবে আত্মহত্যার কোনোরকম খবর প্রকাশ করার ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা আছে। আবার ব্রিটেন, তুরস্কে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ করা হলেও তার সঙ্গে ছবি, ভিডিও না করার ব্যাপারে সরকারি নীতিমালা আছে। আরও বহু দেশ এসব নর্ম মেনে চলে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কী করা উচিত হবে আর কী করা যাবে না, সেটি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গাইডলাইন আছে। কী করা যাবে না, সেটি একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক। আত্মহত্যার সংবাদ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা যাবে না। আত্মহত্যার বর্ণনায় খুঁটিনাটি তথ্য যেমন ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, সেখানে কী দেখা গেছে, আত্মহত্যায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, সুইসাইড নোট থাকলে তাতে কী লেখা আছে- এগুলো বলা যাবে না। আত্মহত্যাকারীর কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক মাধ্যমের লিংক ব্যবহার করা যাবে না। আত্মহত্যার বর্ণনায় এমন কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে না যেটি আত্মহত্যার কারণ হিসাবে সেই ব্যক্তির কঠিন পরিস্থিতিতে অনন্যপায় হওয়াকে নির্দেশ করে, কিংবা আত্মহত্যাকে রোমান্টিসাইজ করে। আত্মহত্যার সংবাদে কোনোরকম সেন্সেশনাল হেডলাইন দেয়া যাবে না।

এবার আমরা বুঝতে পারছি তো, আমাদের মূলধারার মিডিয়াও আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ন্যূনতম নর্ম রক্ষা করছে না। খুব ভালো হয় সরকার এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা তৈরি করলে। সেটি যদি নাও হয়, দেশের মিডিয়া হাউজগুলোর উচিত হবে এই ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গাইডলাইন তৈরি করা। মিডিয়া যদি এই গাইডলাইন অনুসরণ করে তাহলে কী হতে পারে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা হয়েছে অস্ট্রিয়ায়। অস্ট্রিয়ায় একসময় সাবওয়েতে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছিল। সেসব আত্মহত্যার খবর যখন অনেক বেশি পরিমাণে কোনো গাইডলাইন ছাড়া পত্রিকায় আসত, তখন সেটি এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে মিডিয়া গাইডলাইন শক্তভাবে আরোপ করা হয়। তাতে চমকপ্রদ ফল পাওয়া যায়- খুব দ্রুত কমে যায় আত্মহত্যার সংখ্যা। একইভাবে যাদের সাহিত্য কিংবা সিনেমায় আত্মহত্যার ঘটনা থাকে, তাদেরও ভাবার সময় হয়েছে সেটিকে তারা কীভাবে প্রেজেন্ট করবেন। আর সাধারণ মানুষেরও মেনে চলা উচিত মিডিয়ার জন্য যে গাইডলাইন আছে ঠিক সেটিকেই। ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরিচিত মানুষের সঙ্গে আত্মহত্যা নিয়ে খুব খুঁটিনাটি বিষয় এবং মানসিক অসুস্থতা ও ভারসাম্যহীনতা ছাড়া আর কোনো কিছুকে কারণ হিসাবে আলোচনায় আনা বন্ধ করতে হবে। আর অবশ্যই আত্মহত্যাকেই তার একমাত্র অপশন হিসাবে দেখিয়ে তার প্রতি সহানুভূতি দেখানো কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। আমরা অনেকেই জানি না বন্ধু এবং পারিবারিক পর্যায়ে আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের এসব আলোচনা অজান্তে আমাদের কোনো প্রিয়জনকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা আত্মহত্যার পথে। নিশ্চিতভাবেই অনেক দেরি করে ফেলেছি আমরা। কিন্তু এখন অন্তত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আমাদের দায় দেখি, অনুভব করি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেই। এই ক্ষেত্রে প্রথম পথ দেখাক এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকায় থাকা মিডিয়া।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

আত্মহত্যার সংখ্যা কমিয়ে আনা সম্ভব

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
৩১ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মডেল সাদিয়া কেন আত্মহত্যা করেছেন? আমার-আপনার মনে এ প্রশ্ন নিশ্চয়ই জেগে উঠেছিল যখন আমরা কিছুদিন আগে তার আত্মহত্যার খবরটি মিডিয়ায় দেখেছিলাম। আমাদের এই ‘খবর-ক্ষুধা’ মেটাতে এগিয়ে এসেছিল অনেকেই। যেমন দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা রীতিমতো রিপোর্ট করে এই শিরোনামে- ‘যে কারণে আত্মহত্যা করেছেন মডেল সাদিয়া’।

বাবার সঙ্গে মনোমালিন্যের জেরে আত্মহত্যা করেছেন উঠতি মডেল সাদিয়া ইসলাম নাজ- এই বাক্যটি দিয়ে শুরু হওয়া রিপোর্টটি থেকে খুব বিস্তারিত খুঁটিনাটি জানা যাচ্ছে মামলার এজাহারের সূত্র থেকে। রাত কতটা থেকে কতক্ষণ বাবা-মেয়ের কথা হয়েছে, কী বিষয়ে কথা হয়েছে, তারপর কীভাবে কী হলো, সবকিছুর বিস্তারিত বর্ণনা আছে ওই রিপোর্টে। এটি কি শুধু এই আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ঘটল? না, প্রতিটি আত্মহত্যার পরই আমাদের অবধারিত কৌতূহল থাকে কেন সে আত্মহত্যা করেছে, আর মিডিয়া খুবই আগ্রহীভাবে সেই কৌতূহল মেটায়। আত্মহত্যার কারণ নিয়ে একটি তথ্য জানলে প্রতিবার হয়তো আমাদের এই কৌতূহল হতো না। পৃথিবীর সব আত্মহত্যার কারণ সে ফ একটা। হ্যাঁ, আপনি ভুল পড়েননি। আত্মহত্যার একমাত্র কারণটি নিয়ে কথা বলব আরেকটু পরে।

কলামের এই পর্যায়ে আসুন গুগল করে যে কোনো একটি আত্মহত্যার খবর দেখি। কিছুটা চাঞ্চল্যকর হলে সেই খবরের আরও বেশকিছু ফলোআপ রিপোর্ট পাব। আমরা দেখব আত্মহত্যার ক্ষেত্রে যে মানুষটি আত্মহত্যা করেছে তার নাম, লিঙ্গ, বয়স, পরিবারের পরিচিতি, পড়াশোনা ইত্যাদি সব বিস্তারিত তথ্য সেই রিপোর্টে থাকে। এবং খুব অনিবার্যভাবেই থাকে তার আত্মহত্যার কারণ খোঁজার চেষ্টা। প্রায় সব ক্ষেত্রে রিপোর্টের মধ্যে এমন একটি টোন থাকে, যাতে মনে হয় আত্মহত্যাকারী মানুষটি কতটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে ছিল যে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে।

ছোটবেলায় একমাত্র টিভি চ্যানেল বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহে বাংলা সিনেমা ছিল অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সবাই সারা সপ্তাহ অপেক্ষা করে থাকত সেই সিনেমাটি দেখার জন্য। সেখানে কিছু কিছু সিনেমার একটি দৃশ্য থাকত- কোনো মেয়ে (অনেক ক্ষেত্রেই নায়কের বোন) ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং সেই শকে সে আত্মহত্যা করেছে। এ ধরনের ঘটনা এই সমাজে এখনো অনেক ঘটে এবং সেই ধর্ষণকে কারণ দেখিয়ে আত্মহত্যার খবরের শিরোনাম করা হয়। এটি এক ভয়ঙ্কর চর্চা। শুধু সেটিই না, প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা আমাদের চলচ্চিত্রে, সাহিত্যে বরাবরই এসেছে।

আত্মহত্যার খবর কীভাবে মিডিয়ায় পরিবেশিত হওয়া উচিত, সেটি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হওয়ার কথা, কিন্তু আমাদের সমাজে সেটি অনুপস্থিত। এখন পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণে তথ্য-প্রমাণ আমাদের হাতে আছে যে আত্মহত্যার সংবাদ মিডিয়াতে যত বেশি পরিমাণে আসে এবং সেটি যদি অসংবেদনশীল ভাষায় লেখা হয়, সেটি আরও বহু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। বিশেষ করে একই রকম পরিস্থিতিতে পড়া মানুষের একইভাবে আত্মহত্যা (কপিক্যাট সুইসাইড) করার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

একটি বদ্ধ জায়গায় চারকোল পুড়িয়ে তারপর সেখানে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিংয়ের মাধ্যমে আত্মহত্যার একটি চর্চা শুরু হয়েছিল তাইওয়ানে। এই আত্মহত্যার খবরগুলো যখন পত্রিকায় বিস্তারিতভাবে আসতে শুরু করল তখন দেখা গেল, সেদেশের আত্মহত্যার সংখ্যা তো বেড়েছেই, সঙ্গে বহু আত্মহত্যাকারী ব্যবহার করছিলেন চারকোলের ওই পদ্ধতি। পরে একই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে হংকং, চীন ও জাপানেও। আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রিয়াসহ নানা দেশে এ ধরনের গবেষণা করা হয়েছে এবং প্রতিটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে মিডিয়ায় আত্মহত্যার খবর কীভাবে পরিবেশিত হয় তার সঙ্গে আত্মহত্যার সংখ্যার সরাসরি যোগসূত্র আছে।

এদিকে আত্মহত্যার সংবাদটি যদি হয় কোনো সেলিব্রেটির, তাহলে সেটির প্রভাব আরও অনেক বড় হয়। সাম্প্রতিক অতীতে মার্কিন চলচ্চিত্র তারকা রবিন উইলিয়ামসের আত্মহত্যার পর আমেরিকায় আত্মহত্যার প্রবণতা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। চীনা অভিনেত্রী রুয়ান লিংগিউ, জাপানি মিউজিশিয়ান ইউকিকো ওকদা, হিদেতো মাতসিমতো, কোরিয়ান অভিনেত্রী চই জিন শিল, সর্বোপরি মার্কিন অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর আত্মহত্যার খবর মিডিয়ায় বহুল প্রচারের পর আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছিল।

শুধু বাস্তবের মানুষই নয়, সাহিত্য বা সিনেমায় এ ধরনের প্রবণতার অনেক পুরনো ইতিহাস পাওয়া যায়। গ্যাটে-এর উপন্যাস ‘দ্য সরোজ অব ইয়াং ওয়ার্থার’-এর মূল চরিত্র ওয়ার্থার এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিল যে বহু মানুষ সেই চরিত্রের মতো করে পোশাক পরতেন। কিন্তু এটি তৈরি করেছিল একটি বড় বিপদ?ও। প্রেমিকাকে পেতে ব্যর্থ হয়ে ওয়ার্থার শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে, যেটি অনেক মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। আমাদের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যে নানা কারণে আমরা আত্মহত্যা দেখাই, সেটি বহু মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে, এই খোঁজ আমরা রাখি কয়জন? প্রেমে ব্যর্থ কিংবা ধর্ষণের শিকার হয়ে একজন নারীকে যখন আত্মহত্যা করতে দেখা যায়, তখনই সমাজের একজন নারী একই পরিস্থিতিতে পড়লে আত্মহত্যাকে একটি সমাধান হিসাবে ভাবে।

শুরুর দিকে বলেছিলাম আত্মহত্যার কারণ আসলে একটি। কথাটি আসলেই সত্যি। গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে মানসিক অসুস্থতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে। এই মানসিক ভারসাম্যহীনতা ঘটতে পারে জীবনের কোনো সংকট কিংবা মাদকাসক্তি থেকে। বাকি আর যাই বলা হোক না কেন, কোনোটিই আত্মহত্যার কারণ নয়। এটি বোঝা যায় খুব সহজেই, একই রকম পরিস্থিতিতে কিংবা তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতিতে অসংখ্য মানুষ তো আত্মহত্যা করছে না। সুতরাং আত্মহত্যার কারণ হিসাবে নানা বিষয় যখন মিডিয়ায় আসে, গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যায় তার মধ্যে আসলে সারবস্তু নেই। কিন্তু এভাবেই কারণ উল্লেখ করা এবং সেই কারণকে আত্মহত্যার জন্য এক ধরনের যৌক্তিকতা দেয়ার চেষ্টা করা একই পরিস্থিতিতে আত্মহত্যায় প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

অনেকের অবাক লাগবে জেনে, মানসিক অসুস্থতাকে মূল কারণ হিসাবে দেখানো গেলে আত্মহত্যার অনুকরণ করার সম্ভাবনা কমে যায়। বিখ্যাত মিউজিক ব্যান্ড নির্ভানার সদস্য কার্ট কবিনের আত্মহত্যার পর আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়েনি। কারণ সেই ঘটনার রিপোর্টে কবিনের মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ করা হয়েছিল। শুধু আত্মহত্যার কারণ নয়, আত্মহত্যার বহু খবরে আমরা আত্মহত্যাকে এমনভাবে তুলে ধরি যেটিকে এক ধরনের রোমান্টিসাইজ করা হয়। বর্ণনা এমনভাবে করা হয় যাতে পাঠকের সেই মানুষটির প্রতি সহানুভূতি তৈরি হয়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত একজন মানুষ যখন দেখে আত্মহত্যার পর হলেও অন্তত কোনো ব্যক্তি মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে, তখন সেটি তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে।

অনেক দেশেই আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ করা নিয়ে জাতীয় মিডিয়া গাইডলাইন আছে। অনেক ক্ষেত্রে সেটি না থাকলেও মিডিয়া নানারকম নর্ম মেনে চলে। নরওয়েতে সাধারণভাবে আত্মহত্যার কোনোরকম খবর প্রকাশ করার ব্যাপারেই নিষেধাজ্ঞা আছে। আবার ব্রিটেন, তুরস্কে আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশ করা হলেও তার সঙ্গে ছবি, ভিডিও না করার ব্যাপারে সরকারি নীতিমালা আছে। আরও বহু দেশ এসব নর্ম মেনে চলে। আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কী করা উচিত হবে আর কী করা যাবে না, সেটি নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি গাইডলাইন আছে। কী করা যাবে না, সেটি একটু চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক। আত্মহত্যার সংবাদ পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা যাবে না। আত্মহত্যার বর্ণনায় খুঁটিনাটি তথ্য যেমন ঘটনাটি কোথায় ঘটেছে, সেখানে কী দেখা গেছে, আত্মহত্যায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে, সুইসাইড নোট থাকলে তাতে কী লেখা আছে- এগুলো বলা যাবে না। আত্মহত্যাকারীর কোনো ছবি, ভিডিও কিংবা সামাজিক মাধ্যমের লিংক ব্যবহার করা যাবে না। আত্মহত্যার বর্ণনায় এমন কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে না যেটি আত্মহত্যার কারণ হিসাবে সেই ব্যক্তির কঠিন পরিস্থিতিতে অনন্যপায় হওয়াকে নির্দেশ করে, কিংবা আত্মহত্যাকে রোমান্টিসাইজ করে। আত্মহত্যার সংবাদে কোনোরকম সেন্সেশনাল হেডলাইন দেয়া যাবে না।

এবার আমরা বুঝতে পারছি তো, আমাদের মূলধারার মিডিয়াও আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ন্যূনতম নর্ম রক্ষা করছে না। খুব ভালো হয় সরকার এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা তৈরি করলে। সেটি যদি নাও হয়, দেশের মিডিয়া হাউজগুলোর উচিত হবে এই ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গাইডলাইন তৈরি করা। মিডিয়া যদি এই গাইডলাইন অনুসরণ করে তাহলে কী হতে পারে সেটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণা হয়েছে অস্ট্রিয়ায়। অস্ট্রিয়ায় একসময় সাবওয়েতে আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছিল। সেসব আত্মহত্যার খবর যখন অনেক বেশি পরিমাণে কোনো গাইডলাইন ছাড়া পত্রিকায় আসত, তখন সেটি এ ধরনের আত্মহত্যার ঘটনা আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর আত্মহত্যার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে মিডিয়া গাইডলাইন শক্তভাবে আরোপ করা হয়। তাতে চমকপ্রদ ফল পাওয়া যায়- খুব দ্রুত কমে যায় আত্মহত্যার সংখ্যা। একইভাবে যাদের সাহিত্য কিংবা সিনেমায় আত্মহত্যার ঘটনা থাকে, তাদেরও ভাবার সময় হয়েছে সেটিকে তারা কীভাবে প্রেজেন্ট করবেন। আর সাধারণ মানুষেরও মেনে চলা উচিত মিডিয়ার জন্য যে গাইডলাইন আছে ঠিক সেটিকেই। ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরিচিত মানুষের সঙ্গে আত্মহত্যা নিয়ে খুব খুঁটিনাটি বিষয় এবং মানসিক অসুস্থতা ও ভারসাম্যহীনতা ছাড়া আর কোনো কিছুকে কারণ হিসাবে আলোচনায় আনা বন্ধ করতে হবে। আর অবশ্যই আত্মহত্যাকেই তার একমাত্র অপশন হিসাবে দেখিয়ে তার প্রতি সহানুভূতি দেখানো কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে। আমরা অনেকেই জানি না বন্ধু এবং পারিবারিক পর্যায়ে আত্মহত্যা নিয়ে আমাদের এসব আলোচনা অজান্তে আমাদের কোনো প্রিয়জনকে ঠেলে দিচ্ছে কিনা আত্মহত্যার পথে। নিশ্চিতভাবেই অনেক দেরি করে ফেলেছি আমরা। কিন্তু এখন অন্তত আত্মহত্যার ক্ষেত্রে আমাদের দায় দেখি, অনুভব করি এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেই। এই ক্ষেত্রে প্রথম পথ দেখাক এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকায় থাকা মিডিয়া।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন