দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন
jugantor
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন

  ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু  

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি জার্মানির বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বার্ষিক দুর্নীতির ধারণাসূচক-২০২০ প্রকাশ করেছে। টিআইর ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৬ স্কোর পেয়েছে, যা ২০১৯-এর সমান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর বাড়েনি; বরং সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে হিসাব করলে দুর্নীতির র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৯-এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে (দ্বাদশ স্থানে), যা হতাশাব্যঞ্জক।

সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্তের অবস্থান থেকে গণনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান গতবারের মতো ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম। সূচকের নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান শুধু দুই ধাপ নিচে নেমেছে, তা-ই নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরের মতো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, শুধু যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্তানের ওপর।

আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্নে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্কোর বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর অনেক পেছনেই রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং অনেক আগে থেকেই তা চলে আসছে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেকের বড় ধরনের দুর্নীতির বিষয় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে।

এর আগে রিজেন্ট সাহেদের ‘কারবার’, স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ‘মিঠু চক্রের’ বিপুল দুর্নীতি, যুবলীগের ক্যাসিনো সম্রাট-খালেদের তেলেসমাতি, নরসিংদীর পাপিয়া-কাণ্ড, ফরিদপুরের দুই ভাইয়ের দিনকে রাত রাতকে দিন করার ক্ষমতাবাজির বিষয়সহ বালিশ-কাণ্ড, নারিকেল গাছ-কাণ্ড, কয়লা-কাণ্ড, লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ-কাণ্ডসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয় দেখতে দেখতে দেশের জনগণ আজ যেন বিষিয়ে উঠেছেন।

এর আগে বিগত বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফলাফল প্রকাশ করেছিল, তাতে পরপর টানা পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং তখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত সরকারকে তখন দেশ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করার চেয়ে টিআইকে দোষারোপ করতে এবং টিআই কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ পাঠাতে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। বাস্তব অবস্থা এই যে, এ দেশে দুর্নীতি কখনোই থেমে থাকেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কি অসম্ভব? এ কথা অনস্বীকার্য, আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে এবং দিনে দিনে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ব্যবহার কোথায় হচ্ছে এবং কারা ভোগ করছে, তা সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না ইত্যাদি বিষয় জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট সবার ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি থাকায় এর সুফল জনগণ সঠিকভাবে পাচ্ছেন না। তবে দুর্নীতি না থাকলে আমাদের দেশ অনেক আগেই মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশ হয়ে উঠত, সে কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের সবার প্রিয় এ দেশে যত সমস্যা জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতি তার মধ্যে অন্যতম। জনসংখ্যাধিক্য ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশটির একদিকে যেমন বিরাজ করছে সম্পদের অভাব, তেমনি অপরদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজ করছে দুর্নীতির কালো ছায়া।

দুর্নীতি নামক সমাজের সর্বগ্রাসী এই কালোব্যাধিটি যে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে দিনে দিনে রাঘববোয়ালের মতো গ্রাস করেই চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে আশার কথা এই যে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের চেয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় তথা বর্তমান সরকারের আমালে টিআই-এর জরিপে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকাংশে নিচের দিকে।

অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত ভালো পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার তখন দেশে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে ‘আস্থাহীন দেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

শুধু তাই নয়, দুর্নীতি নামক এই কালোব্যাধির কারণে একদিকে যেমন জিডিপি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফলতা পায়নি; তেমনি অপরদিকে জীবনযাত্রার মানও হয়েছিল নিম্নগামী। দুর্নীতির কারণে তখন বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছিল নাটকীয়ভাবে।

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, বন ও পরিবেশ, জেলা-উপজেলা, কর্মকর্তাভিত্তিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির মহোৎসব চলতে দেখা গেছে। তবে এ অবস্থার যে এখন উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি (অর্থাৎ, দুর্নীতিকারী যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে, তার কোনো ছাড় নেই) ঘোষণা করেছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর থাকলে আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সঠিকভাবে অব্যাহত থাকলে নিশ্চয় এই দেশ থেকে দুর্নীতি নামক কালোব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ইতঃপূর্বে আইডিবি, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা দুর্নীতি হ্রাস করার উপায় হিসাবে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। টিআইবিও বিভিন্ন সময়ে সভা, সেমিনার ও রিপোর্টের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ বর্তমান সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচনা করা যেতে পারে।

যেমন: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো; দুদককে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং অবাধ গণমাধ্যম ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যথাযথ ব্যবস্থা করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং দুর্নীতি বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।

পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদেরকে শুধু ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করাসহ তাদেরকে সামাজিকভাবে বর্জন করার ব্যবস্থা করা দরকার।

দুর্নীতি রোধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার, সুশীল সমাজ গঠন, ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও তা দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও আবশ্যক। এ ছাড়া গণমাধ্যমকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন করা এবং সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো জরুরি।

সর্বোপরি, দুর্নীতি থেকে এ দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে সর্বত্র প্রয়োজন ‘সততা’র একটি আবহ, দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিমণ্ডল। এ কথা সবারই স্মরণে রাখা দরকার, এ দেশটি আমার, আপনার, সবার।

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্ত ও লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যেসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ দেশটির জন্ম হয়েছিল, সেসব উদ্দেশ্য সফল করার পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে হলে এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত এ দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে হলে দেশ থেকে ‘দুর্নীতি’ নামক এই কালো, ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী ব্যাধিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

তাই আসুন, আমরা সবাই সম্মিলিত কণ্ঠে দুর্নীতিকে ‘না’ বলি, দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করি আর দুর্নীতিবাজদের কঠোর হস্তে দমন করি। আর নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে তুলে ধরতে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে; যে দেশের স্বপ্ন আমি, আপনি সবাই দেখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য

kekbabu@yahoo.com

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন

 ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু 
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি জার্মানির বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) বার্ষিক দুর্নীতির ধারণাসূচক-২০২০ প্রকাশ করেছে। টিআইর ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ ১০০-এর মধ্যে ২৬ স্কোর পেয়েছে, যা ২০১৯-এর সমান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর বাড়েনি; বরং সর্বনিম্ন অবস্থানের দিক থেকে হিসাব করলে দুর্নীতির র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ২০১৯-এর তুলনায় দুই ধাপ নিচে (দ্বাদশ স্থানে), যা হতাশাব্যঞ্জক।

সর্বোচ্চ স্কোরপ্রাপ্তের অবস্থান থেকে গণনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান গতবারের মতো ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৬তম। সূচকের নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান শুধু দুই ধাপ নিচে নেমেছে, তা-ই নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরের মতো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, শুধু যুদ্ধবিধস্ত আফগানিস্তানের ওপর।

আর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্নে। অন্যদিকে বাংলাদেশের স্কোর বৈশ্বিক গড় ৪৩-এর অনেক পেছনেই রয়ে গেছে। বলা বাহুল্য, এদেশে দুর্নীতি নতুন কোনো বিষয় নয়; বরং অনেক আগে থেকেই তা চলে আসছে।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেকের বড় ধরনের দুর্নীতির বিষয় প্রকাশিত হলে তা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমসহ সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম হয়ে ওঠে।

এর আগে রিজেন্ট সাহেদের ‘কারবার’, স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটায় ‘মিঠু চক্রের’ বিপুল দুর্নীতি, যুবলীগের ক্যাসিনো সম্রাট-খালেদের তেলেসমাতি, নরসিংদীর পাপিয়া-কাণ্ড, ফরিদপুরের দুই ভাইয়ের দিনকে রাত রাতকে দিন করার ক্ষমতাবাজির বিষয়সহ বালিশ-কাণ্ড, নারিকেল গাছ-কাণ্ড, কয়লা-কাণ্ড, লোহার রডের পরিবর্তে বাঁশ-কাণ্ডসহ নানা বিষয়ে বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির বিষয় দেখতে দেখতে দেশের জনগণ আজ যেন বিষিয়ে উঠেছেন।

এর আগে বিগত বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) ২০০১ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্নীতির ওপর জরিপ চালিয়ে যে ফলাফল প্রকাশ করেছিল, তাতে পরপর টানা পাঁচ বছরেই বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বিবেচিত হয়েছিল এবং তখন বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত সরকারকে তখন দেশ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করার চেয়ে টিআইকে দোষারোপ করতে এবং টিআই কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবাদ পাঠাতে অতিমাত্রায় ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। বাস্তব অবস্থা এই যে, এ দেশে দুর্নীতি কখনোই থেমে থাকেনি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়া কি অসম্ভব? এ কথা অনস্বীকার্য, আমাদের দেশে অর্থনৈতিক উন্নতি হচ্ছে এবং দিনে দিনে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির ব্যবহার কোথায় হচ্ছে এবং কারা ভোগ করছে, তা সঠিকভাবে বণ্টন হচ্ছে কি না ইত্যাদি বিষয় জনগণের বৃহত্তর স্বার্থেই সংশ্লিষ্ট সবার ভালোভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করলেও সমাজের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি থাকায় এর সুফল জনগণ সঠিকভাবে পাচ্ছেন না। তবে দুর্নীতি না থাকলে আমাদের দেশ অনেক আগেই মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশ হয়ে উঠত, সে কথা বলা যায় নিঃসন্দেহে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের সবার প্রিয় এ দেশে যত সমস্যা জাতীয় উন্নয়ন-অগ্রগতি, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দাঁড়াচ্ছে, দুর্নীতি তার মধ্যে অন্যতম। জনসংখ্যাধিক্য ও ক্ষুদ্র আয়তনের এ দেশটির একদিকে যেমন বিরাজ করছে সম্পদের অভাব, তেমনি অপরদিকে সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিরাজ করছে দুর্নীতির কালো ছায়া।

দুর্নীতি নামক সমাজের সর্বগ্রাসী এই কালোব্যাধিটি যে তার কালো থাবা বিস্তার করে সমাজকে দিনে দিনে রাঘববোয়ালের মতো গ্রাস করেই চলেছে, তা সহজেই অনুমেয়। তবে আশার কথা এই যে, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলের চেয়ে পরবর্তী বছরগুলোয় তথা বর্তমান সরকারের আমালে টিআই-এর জরিপে দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকাংশে নিচের দিকে।

অর্থাৎ, অপেক্ষাকৃত ভালো পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বারবার দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসাবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে অবস্থান করায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার তখন দেশে সীমাহীন দুর্নীতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে ‘আস্থাহীন দেশ’ হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

শুধু তাই নয়, দুর্নীতি নামক এই কালোব্যাধির কারণে একদিকে যেমন জিডিপি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি, দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফলতা পায়নি; তেমনি অপরদিকে জীবনযাত্রার মানও হয়েছিল নিম্নগামী। দুর্নীতির কারণে তখন বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছিল নাটকীয়ভাবে।

বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, বন ও পরিবেশ, জেলা-উপজেলা, কর্মকর্তাভিত্তিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়ক্ষেত্রসহ সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত দুর্নীতির মহোৎসব চলতে দেখা গেছে। তবে এ অবস্থার যে এখন উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে তা নয়।

বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি (অর্থাৎ, দুর্নীতিকারী যে-ই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে, তার কোনো ছাড় নেই) ঘোষণা করেছেন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি ঘোষণা দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর থাকলে আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযান সঠিকভাবে অব্যাহত থাকলে নিশ্চয় এই দেশ থেকে দুর্নীতি নামক কালোব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

ইতঃপূর্বে আইডিবি, এডিবিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা দুর্নীতি হ্রাস করার উপায় হিসাবে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। টিআইবিও বিভিন্ন সময়ে সভা, সেমিনার ও রিপোর্টের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে নানাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছু সুপারিশ বর্তমান সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিবেচনা করা যেতে পারে।

যেমন: দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখানো; দুদককে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং অবাধ গণমাধ্যম ও সক্রিয় নাগরিক সমাজ বিকাশে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

তা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে সব কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যথাযথ ব্যবস্থা করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও আয়বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া এবং দুর্নীতি বিষয়ক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি।

পাশাপাশি দুর্নীতিবাজদের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদেরকে শুধু ‘দুর্নীতিবাজ’ হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করাসহ তাদেরকে সামাজিকভাবে বর্জন করার ব্যবস্থা করা দরকার।

দুর্নীতি রোধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সংস্কার, সুশীল সমাজ গঠন, ব্যাপক গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও তা দূর করতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করাও আবশ্যক। এ ছাড়া গণমাধ্যমকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলীয় সম্পৃক্ততা বিচ্ছিন্ন করা এবং সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটানো জরুরি।

সর্বোপরি, দুর্নীতি থেকে এ দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে সর্বত্র প্রয়োজন ‘সততা’র একটি আবহ, দরকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিমণ্ডল। এ কথা সবারই স্মরণে রাখা দরকার, এ দেশটি আমার, আপনার, সবার।

১৯৭১ সালে এক সাগর রক্ত ও লাখো মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে যেসব উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এ দেশটির জন্ম হয়েছিল, সেসব উদ্দেশ্য সফল করার পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল পেতে হলে এবং নানা সমস্যায় জর্জরিত এ দেশের বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে বাঁচাতে হলে দেশ থেকে ‘দুর্নীতি’ নামক এই কালো, ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী ব্যাধিকে যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

তাই আসুন, আমরা সবাই সম্মিলিত কণ্ঠে দুর্নীতিকে ‘না’ বলি, দুর্নীতিবাজদের ঘৃণা করি আর দুর্নীতিবাজদের কঠোর হস্তে দমন করি। আর নিজ নিজ অবস্থান থেকে চেষ্টা করি বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে তুলে ধরতে।

দুর্নীতি প্রতিরোধে বর্তমান সরকারসহ সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও দুর্নীতি প্রতিরোধকল্পে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের সবার প্রিয় বাংলাদেশকে একটি দুর্নীতিমুক্ত দেশ হিসাবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে; যে দেশের স্বপ্ন আমি, আপনি সবাই দেখি।

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু : বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি; সহযোগী সদস্য, সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব গ্লোবাল হিউম্যান মুভমেন্ট, ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য

kekbabu@yahoo.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন