হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটা কেন জরুরি
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটা কেন জরুরি

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

০৭ এপ্রিল ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তরে গত ৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়ের বিস্তীর্ণ মাঠে চলতি সপ্তাহে পূর্ণোদ্যমে শুরু হবে বোরো ধান কাটার কাজ। কিন্তু হাসি নেই বোরো চাষির মুখে। কারণ গত বছরের মতো এবারও মৌসুমি কৃষিশ্রমিক ও পরিবহণ সংকট দেখা দিয়েছে।

তাই ধান কেটে কীভাবে ঘরে তোলা হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা। প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার বোরো চাষিদের দুশ্চিন্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ ক্ষেত্রে হাওরাঞ্চলে অবস্থিত দেশের অন্য ছয়টি জেলা-নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বোরো চাষিদেরও দুশ্চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে।

কারণ আকস্মিক বন্যায় এসব জেলার বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরের অভাব নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে ২০০০, ২০০২, ২০০৪, ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ফসলের ক্ষতির বর্ণনা রয়েছে।

তাই আগাম বন্যার কবল থেকে কষ্টের বোরো ফসল রক্ষা ও ঘরে তোলা নিয়ে এ জেলাগুলোর চাষিদের অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা জানেন, বন্যার আগে বোরো ফসল ঘরে তুলতে না পারলে তাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যসূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সারা দেশে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে, যা গত মৌসুমের তুলনায় ৭৮ হাজার হেক্টরের কিছুটা বেশি। তবে এ বছর দেশের হাওড়াঞ্চলে অবস্থিত সাতটি জেলায় কত হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা জানা যায়নি। গত বছর হাওড়াঞ্চলের সাত জেলায় ৯ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়, যা ছিল দেশে বোরোর মোট আবাদি জমির (৪১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর) প্রায় ২৩ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশে বোরো আবাদের মোট জমির পরিমাণ ৭৮ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেলেও হাওড়াঞ্চলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমবেশি ৯ লাখ হেক্টর হওয়ায় এ বছরও সেখানে বোরো আবাদি জমি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। চলতি মৌসুমে সরকার দেশে ২ কোটি ৫ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলে জনা যায়, যা গত মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) চেয়ে ১ লাখ টন বেশি। গত মৌসুমে একাধিক কারণে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-এক. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বোরো চাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কম পরিমাণ জমিতে বোরো চাষ। দুই. করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পল্লি এলাকায় হাটবাজারে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কৃষকদের সময়মতো সার প্রাপ্তিতে অসুবিধা।

তিন. ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় এবং উপকূলীয় নয় এমন ১৭টি জেলায় বোরো ফসলের ক্ষতি। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টনে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ লাখ টন কম ছিল। এ বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কিনা তা দেখার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

ধান-চাল উৎপাদনে দেশে বোরোর স্থান শীর্ষে। দেশে উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আমন ও আউশ ধান থেকে। তাই গত ১ এপ্রিল হাওড়াঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বোরো ধান কাটা শুরুর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক হাওড়সহ সারা দেশে সময়মতো বোরো ধান কাটার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বোরো ধান কাটার উদ্বোধন করা হলো, যাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে।

হাওড়সহ সারা দেশের বোরো ধান সফলভাবে ঘরে তুলতে পারলে দেশের খাদ্য নিয়ে তেমন ঝুঁকি থাকবে না। সফলভাবে বোরো ধান কর্তনের জন্য সম্মিলিতভাবে সারা জাতিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এখন খাদ্য নিরাপত্তায় হাওড়াঞ্চলে উৎপাদিত বোরো ধানের ভূমিকা, হাওড় এলাকায় বোরো ফসল মাঠ থেকে নিরাপদে ঘরে তোলায় প্রতিবন্ধকতা এবং চলতি মৌসুমে অবিলম্বে বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, মোট ৩৭৩টি হাওড় সমৃদ্ধ উপর্যুক্ত সাত জেলায় মোট ভূমির পরিমাণ ১৯ লাখ হেক্টরের সামান্য বেশি, যার মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমবেশি ৯ লাখ হেক্টর। বিশাল এ এলাকায় চাষ হওয়া বোরো ধান দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অকাল বন্যার কারণে ‘শস্যভাণ্ডার খ্যাত’ হাওড়াঞ্চল কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপর্যুক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী গত ২০ বছরে ৬টি আগাম বন্যা হাওড়াঞ্চলে দেখা দেয় এবং এসব বন্যায় উৎপাদিত বোরো ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব আকস্মিক বন্যার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. হাওরের পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা; খ. ধানচাষি ও মাছ উৎপাদনকারীদের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব;

গ. সঠিক সময়ে বাঁধ সঠিকভাবে নির্মাণ ও মেরামত না হওয়া; ঘ. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। হাওড়াঞ্চলে সর্বশেষ অকাল বন্যা দেখা দেয় ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে। টানা বৃষ্টি ও উজান (ভারত) থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওড় রক্ষা বাঁধ ডুবে ও ভেঙে গেলে মাঠের বোরো ফসলের প্রভূত ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে ওই বন্যায় ১০ লাখ টন বোরো ধান নষ্ট হয়, যদিও বেসরকারি মতে নষ্ট হওয়া ফসলের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারি খাতে কোনো চাল আমদানি না হওয়া এবং চাল আমদানিতে উচ্চহারের (২৫ শতাংশ) শুল্ক চালু থাকায় বেসরকারি খাতে খুব স্বল্প পরিমাণ চাল আমদানি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাজারে চালের দামে।

মোটা চাল বিক্রি হয় কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে এবং গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। মাঝারি ও সরু চালের দামও অনেকটা বেড়ে যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপর্যুক্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সাধারণত দুই বছর পর পর হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের পর অর্থাৎ গত তিন বছর হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়নি। তাই এ বছর হাওড়াঞ্চলে অকাল বন্যা দেখা দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অনেক বছর ধরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে আসা কৃষিশ্রমিকরা হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটা ও ঘরে তোলার কাজ করে আসছেন। গত বছর মার্চে দেশে করোনা মহামারি দেখা দিলে সরকার এক অঞ্চল বা জেলা থেকে অন্য অঞ্চল বা জেলায় মানুষের যাতায়াতের সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করলে কৃষিশ্রমিকের অভাবে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার সংকট সৃষ্টি হয়। সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে লাখ লাখ কৃষিশ্রমিক নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার উদ্ভূত সমস্যার সমাধান হয়। বন্যা আসার আগেই ঘরে ধান ওঠায় একদিকে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, অন্যদিকে উৎপাদিত বোরো ধান দেশে খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রাখে। সম্প্রতি করোনা মহামারির প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য এক অঞ্চল বা জেলা থেকে অন্য অঞ্চল বা জেলায় মানুষের যাতায়াতের জন্য সব ধরনের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এ নিষেধাজ্ঞা কমপক্ষে আরও এক সপ্তাহ বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে আকস্মিক বন্যা যে কোনো সময় হাওড়াঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। আগাম বন্যার ভয়ে ভীত হাওড়াঞ্চলের বোরো চাষিরা কৃষিশ্রমিকের অভাবে মাঠের পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে না পারায় দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

এমতাবস্থায় সরকারের উচিত হবে গতবারের মতো বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে কৃষিশ্রমিক এনে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে ধান কাটার জন্য গতবারের মতো হারভেস্টার মেশিন সরবরাহের ব্যবস্থাও নিতে হবে। এমনিতেই দেশে বর্তমানে চাল সংকট চলছে। প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৫০ টাকা ছুঁই ছুঁই করছে, যা গরিব ও নিম্নবিত্তের জীবনে দুঃখের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এক কেজি মাঝারি ধরনের চাল ৫৬ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

আর এক কেজি সরু চাল কিনতে লাগছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। এতে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের খাদ্য বাজেটে টান পড়েছে। চাল কিনতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের আমিষজাতীয় খাবার ক্রয়ে খরচ কমাতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে। আর কৃষিশ্রমিক ও পরিবহণ সংকটে চলতি মৌসুমে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটতে দেরি হওয়ার কারণে বন্যায় ফসল নষ্ট হলে খাদ্য সংকট আরও গভীর হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটা কেন জরুরি

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
০৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যুগান্তরে গত ৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরগঞ্জ জেলার হাওড়ের বিস্তীর্ণ মাঠে চলতি সপ্তাহে পূর্ণোদ্যমে শুরু হবে বোরো ধান কাটার কাজ। কিন্তু হাসি নেই বোরো চাষির মুখে। কারণ গত বছরের মতো এবারও মৌসুমি কৃষিশ্রমিক ও পরিবহণ সংকট দেখা দিয়েছে।

তাই ধান কেটে কীভাবে ঘরে তোলা হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা। প্রতিবেদনে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকার বোরো চাষিদের দুশ্চিন্তার কথা বলা হলেও বাস্তবে এ ক্ষেত্রে হাওরাঞ্চলে অবস্থিত দেশের অন্য ছয়টি জেলা-নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বোরো চাষিদেরও দুশ্চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে।

কারণ আকস্মিক বন্যায় এসব জেলার বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজিরের অভাব নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে ২০০০, ২০০২, ২০০৪, ২০১০, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ফসলের ক্ষতির বর্ণনা রয়েছে।

তাই আগাম বন্যার কবল থেকে কষ্টের বোরো ফসল রক্ষা ও ঘরে তোলা নিয়ে এ জেলাগুলোর চাষিদের অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। এ বছরও এর ব্যতিক্রম নয়। তারা জানেন, বন্যার আগে বোরো ফসল ঘরে তুলতে না পারলে তাদের পথে বসা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যসূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে সারা দেশে বোরো আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৮৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর জমিতে, যা গত মৌসুমের তুলনায় ৭৮ হাজার হেক্টরের কিছুটা বেশি। তবে এ বছর দেশের হাওড়াঞ্চলে অবস্থিত সাতটি জেলায় কত হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা জানা যায়নি। গত বছর হাওড়াঞ্চলের সাত জেলায় ৯ লাখ ৩৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়, যা ছিল দেশে বোরোর মোট আবাদি জমির (৪১ লাখ ২৮ হাজার হেক্টর) প্রায় ২৩ শতাংশ।

গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশে বোরো আবাদের মোট জমির পরিমাণ ৭৮ হাজার হেক্টর বৃদ্ধি পেলেও হাওড়াঞ্চলে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ কমবেশি ৯ লাখ হেক্টর হওয়ায় এ বছরও সেখানে বোরো আবাদি জমি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। চলতি মৌসুমে সরকার দেশে ২ কোটি ৫ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলে জনা যায়, যা গত মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রার (২ কোটি ৪ লাখ টন) চেয়ে ১ লাখ টন বেশি। গত মৌসুমে একাধিক কারণে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-এক. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বোরো চাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কম পরিমাণ জমিতে বোরো চাষ। দুই. করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে পল্লি এলাকায় হাটবাজারে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কৃষকদের সময়মতো সার প্রাপ্তিতে অসুবিধা।

তিন. ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় এবং উপকূলীয় নয় এমন ১৭টি জেলায় বোরো ফসলের ক্ষতি। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৯৪ লাখ টনে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ লাখ টন কম ছিল। এ বছর বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কিনা তা দেখার জন্য কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

ধান-চাল উৎপাদনে দেশে বোরোর স্থান শীর্ষে। দেশে উৎপাদিত চালের ৫৫ শতাংশ আসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আমন ও আউশ ধান থেকে। তাই গত ১ এপ্রিল হাওড়াঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় বোরো ধান কাটা শুরুর অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক হাওড়সহ সারা দেশে সময়মতো বোরো ধান কাটার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বোরো ধান কাটার উদ্বোধন করা হলো, যাতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ে।

হাওড়সহ সারা দেশের বোরো ধান সফলভাবে ঘরে তুলতে পারলে দেশের খাদ্য নিয়ে তেমন ঝুঁকি থাকবে না। সফলভাবে বোরো ধান কর্তনের জন্য সম্মিলিতভাবে সারা জাতিকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এখন খাদ্য নিরাপত্তায় হাওড়াঞ্চলে উৎপাদিত বোরো ধানের ভূমিকা, হাওড় এলাকায় বোরো ফসল মাঠ থেকে নিরাপদে ঘরে তোলায় প্রতিবন্ধকতা এবং চলতি মৌসুমে অবিলম্বে বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করা যাক।

প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, মোট ৩৭৩টি হাওড় সমৃদ্ধ উপর্যুক্ত সাত জেলায় মোট ভূমির পরিমাণ ১৯ লাখ হেক্টরের সামান্য বেশি, যার মধ্যে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমবেশি ৯ লাখ হেক্টর। বিশাল এ এলাকায় চাষ হওয়া বোরো ধান দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অকাল বন্যার কারণে ‘শস্যভাণ্ডার খ্যাত’ হাওড়াঞ্চল কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপর্যুক্ত রিপোর্ট অনুযায়ী গত ২০ বছরে ৬টি আগাম বন্যা হাওড়াঞ্চলে দেখা দেয় এবং এসব বন্যায় উৎপাদিত বোরো ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এসব আকস্মিক বন্যার জন্য যেসব কারণ চিহ্নিত করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- ক. হাওরের পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা; খ. ধানচাষি ও মাছ উৎপাদনকারীদের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দ্বন্দ্ব;

গ. সঠিক সময়ে বাঁধ সঠিকভাবে নির্মাণ ও মেরামত না হওয়া; ঘ. প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। হাওড়াঞ্চলে সর্বশেষ অকাল বন্যা দেখা দেয় ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রথম দিকে। টানা বৃষ্টি ও উজান (ভারত) থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওড় রক্ষা বাঁধ ডুবে ও ভেঙে গেলে মাঠের বোরো ফসলের প্রভূত ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাবে ওই বন্যায় ১০ লাখ টন বোরো ধান নষ্ট হয়, যদিও বেসরকারি মতে নষ্ট হওয়া ফসলের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সরকারি খাতে কোনো চাল আমদানি না হওয়া এবং চাল আমদানিতে উচ্চহারের (২৫ শতাংশ) শুল্ক চালু থাকায় বেসরকারি খাতে খুব স্বল্প পরিমাণ চাল আমদানি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাজারে চালের দামে।

মোটা চাল বিক্রি হয় কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকায়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ফেলে এবং গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। মাঝারি ও সরু চালের দামও অনেকটা বেড়ে যায়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপর্যুক্ত প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, সাধারণত দুই বছর পর পর হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের পর অর্থাৎ গত তিন বছর হাওড়াঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়নি। তাই এ বছর হাওড়াঞ্চলে অকাল বন্যা দেখা দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অনেক বছর ধরে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে আসা কৃষিশ্রমিকরা হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটা ও ঘরে তোলার কাজ করে আসছেন। গত বছর মার্চে দেশে করোনা মহামারি দেখা দিলে সরকার এক অঞ্চল বা জেলা থেকে অন্য অঞ্চল বা জেলায় মানুষের যাতায়াতের সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করলে কৃষিশ্রমিকের অভাবে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার সংকট সৃষ্টি হয়। সরকার বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে লাখ লাখ কৃষিশ্রমিক নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার উদ্ভূত সমস্যার সমাধান হয়। বন্যা আসার আগেই ঘরে ধান ওঠায় একদিকে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, অন্যদিকে উৎপাদিত বোরো ধান দেশে খাদ্যনিরাপত্তায় অবদান রাখে। সম্প্রতি করোনা মহামারির প্রকোপ বৃদ্ধি পেলে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের জন্য এক অঞ্চল বা জেলা থেকে অন্য অঞ্চল বা জেলায় মানুষের যাতায়াতের জন্য সব ধরনের যানবাহন চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

এ নিষেধাজ্ঞা কমপক্ষে আরও এক সপ্তাহ বাড়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে আকস্মিক বন্যা যে কোনো সময় হাওড়াঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। আগাম বন্যার ভয়ে ভীত হাওড়াঞ্চলের বোরো চাষিরা কৃষিশ্রমিকের অভাবে মাঠের পাকা ধান কেটে ঘরে তুলতে না পারায় দুশ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

এমতাবস্থায় সরকারের উচিত হবে গতবারের মতো বিশেষ ব্যবস্থায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলসহ সারা দেশ থেকে কৃষিশ্রমিক এনে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটার ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে ধান কাটার জন্য গতবারের মতো হারভেস্টার মেশিন সরবরাহের ব্যবস্থাও নিতে হবে। এমনিতেই দেশে বর্তমানে চাল সংকট চলছে। প্রতি কেজি মোটা চালের দাম ৫০ টাকা ছুঁই ছুঁই করছে, যা গরিব ও নিম্নবিত্তের জীবনে দুঃখের বোঝা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এক কেজি মাঝারি ধরনের চাল ৫৬ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।

আর এক কেজি সরু চাল কিনতে লাগছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা। এতে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের খাদ্য বাজেটে টান পড়েছে। চাল কিনতে খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের আমিষজাতীয় খাবার ক্রয়ে খরচ কমাতে হচ্ছে, যা বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে। আর কৃষিশ্রমিক ও পরিবহণ সংকটে চলতি মৌসুমে হাওড়াঞ্চলে বোরো ধান কাটতে দেরি হওয়ার কারণে বন্যায় ফসল নষ্ট হলে খাদ্য সংকট আরও গভীর হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন