ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল করতে হবে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল করতে হবে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

০৫ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ করবে।

কেজিপ্রতি ২৭ টাকা দরে ধান কিনবে কৃষকের কাছ থেকে, আর কেজিপ্রতি ৪০ টাকা দামে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৮ টাকা দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল কিনবে চালকল মালিকদের কাছ থেকে। এবার ধান ও চালের মূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে এক টাকা ও তিন টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২৮ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়ে তা চলবে আগস্ট পর্যন্ত।

২৬ এপ্রিল এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বোরো ধান-চাল সংগ্রহের এ লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এবারের বোরো সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. কৃষকের স্বার্থরক্ষা হবে কি না, খ. সংগ্রহ অভিযান সফল হবে কি না, গ. চালের আকাশছোঁয়া দাম হ্রাস পেয়ে ভোক্তার জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে কি না।

যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ এবং মূল্য নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল রাখা; যাতে ধানচাষিরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন। এর কারণ, ফসল উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি এসব চাষি ধারদেনা করে ফসল ফলান।

ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের নানা অভাব-অনটন মেটাতে ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতেই তাদের ধান বিক্রি করতে হয়। ধানকে চালে রূপান্তর করে কাটা-মাড়াই মৌসুম শেষে সময়-সুযোগ বুঝে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করে লাভবান হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই।

একাধিক কারণে সরকার অধিকাংশ সময় এসব ধানচাষির স্বার্থরক্ষা করতে সমর্থ হয় না। প্রথমত, সরকার সরাসরি ধানচাষিদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করে তার পরিমাণ চালকল মালিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত চালের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বোরো মৌসুমে সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, ধানের আকারে যার পরিমাণ কমবেশি ২০ লাখ টন।

এর আগের বছরগুলোয়ও বোরো ও আমন ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে একই ধারা লক্ষ করা গেছে। তাছাড়া আমন কাটা-মাড়াই মৌসুমে ধানচাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ না করার উদাহরণও রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধান ও চাল মিলে ধানের আকারে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা হয়, তা উৎপাদিত ধানের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ।

যেমন, চলতি বোরো মৌসুমে সরকারের চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৫ লাখ টন নির্ধারিত হয়েছে বলে জানা যায়। এদিকে কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, অনুকূল আবহাওয়া, গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হওয়া এবং একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় ৩ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে হাইব্রিড জাতের ধানের আবাদ বাড়ায় গতবারের তুলনায় এবার বোরোর উৎপাদন ৯ থেকে ১০ লাখ টন বেশি হবে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, গত বছর বোরো চালের উৎপাদন ১ কোটি ৯৪ লাখ টনে দাঁড়িয়েছিল।

সেক্ষেত্রে এবার বোরো চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। আর ধানের আকারে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ কোটি টনের কাছাকাছি। এদিকে চলতি বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধান ও চাল মিলে ধানের আকারে প্রয়োজন হবে কমবেশি ২৬ লাখ টন ধান, যা সম্ভাব্য উৎপাদনের প্রায় ১২ ভাগের এক ভাগ। আর যদি শুধু সরকারের ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা (৬ লাখ টন) বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে তা হবে বোরো ধানের সম্ভাব্য মোট উৎপাদনের কমবেশি ৫০ ভাগের একভাগ।

সরকারি সংগ্রহ অভিযানে এত স্বল্পপরিমাণ ধান কেনার মাধ্যমে ধানচাষিদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, একদিকে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে খুব সামান্য পরিমাণ ধান কিনে থাকে, অন্যদিকে আবার সে সংগ্রহ প্রক্রিয়া ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে কার্যকর হয় না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ফসল উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের চাহিদা মেটাতে মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন।

ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা কার্যকর না হলে এসব ধানচাষির চালকল মালিকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা আগে অনেকবার ঘটেছে। এ বছরও এর পুনরাবৃত্তি ঘটল। কারণ এ বছরও সরকার নির্ধারিত তারিখে (২৮ এপ্রিল) বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পেরেছে বলে খবর জানা নেই।

বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সাফল্য নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমটি হলো ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ। নব্বইয়ের দশকে খাদ্য সচিবের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযানে, বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য ধান-চাল সংগ্রহে পণ্যটির দাম নির্ধারণের বিষয়টি অনেকটা জটিল। এখানে তিনটি গোষ্ঠীর অনেকটা পরস্পরবিরোধী দাবি বিবেচনায় নিতে হয়।

চাষিদের দাবি ধানের উচ্চমূল্য নির্ধারণ, যাতে উৎপাদন ব্যয় মেটানোর পরও তাদের ভালো লাভ থাকে। চালকল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহের জন্য একদিকে চালের উচ্চমূল্য দাবি করেন এবং অন্যদিকে সরকারের কাছে তদবির করেন ধানের কম দাম নির্ধারণে, যাতে তারা কম দামে ধান কিনে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাল সরবরাহ করে ভালো লাভ করতে পারেন।

আর ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই চান বাজারে চালের দাম কম হোক, যাতে তাদের পণ্যটি সংগ্রহের জন্য অধিক পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে না হয়। তিন গোষ্ঠীর দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। সরকার ধানচাষিদের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করে ধানের দাম এবং চালকল মালিকদের চাল উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে কিছুটা লাভ যোগ করে চালের দাম নির্ধারণ করে।

এ বছর বোরো ধান-চাল সংগ্রহে সরকার এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করেছে। প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১ টাকা বেশি। সিদ্ধ ও আতপ চালের কেজিপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪০ ও ৩৯ টাকা, যা গতবারের চেয়ে উভয়ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৩ টাকা বেশি। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চাল আকারে পাওয়া যায়। যেমন ৬০ কেজি ধান থেকে পাওয়া যায় ৩৯ কেজি চাল। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ধানের দামের তুলনায় চালের দাম নির্ধারণ মোটামুটি যুক্তিযুক্ত হয়েছে বলে মনে হয়। ধান-চালের দাম নির্ধারণ নিয়ে এ পর্যন্ত স্টেকহোল্ডারদের পক্ষ থেকে বিরূপ বক্তব্য এসেছে বলে জানা যায়নি।

দ্বিতীয় যে বিষয়টির ওপর ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সাফল্য নির্ভর করে সেটি হলো ধানের উৎপাদন। গত মৌসুমে একাধিক কারণে ২ কোটি ৪ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-এক. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বোরো চাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কিছুটা কম পরিমাণ জমিতে বোরো চাষ হয়। দুই. করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে পল্লি এলাকায় হাটবাজারে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কৃষকদের সময়মতো সারপ্রাপ্তিতে অসুবিধা।

তিন. ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দেশের উপকূলীয় এবং উপকূলীয় নয় এমন ১৭টি জেলায় বোরো ফসলের ক্ষতি হয়। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় এবং ধান-চালের উৎপাদন খরচের তুলনায় সরকারি সংগ্রহ মূল্য সন্তোষজনক না হওয়ায় গত বছর ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সাফল্য পায়নি। লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হয়নি।

চলতি বোরো মৌসুমে হিটশকে মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কোথাও কোথাও বোরো ধানের কিছুটা ক্ষতি হলেও সরকারি সূত্র ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য মোতাবেক বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা যায়। ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য মোটামুটি যৌক্তিক হওয়ায় এবং ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা থাকায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সাফল্য লাভ করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে চালের দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম। এর একাধিক কারণ রয়েছে। এক. চলতি অর্থবছরে আমন উৎপাদনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় হ্রাস। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে উপর্যুপরি বন্যা এবং করোনার কারণে আমন উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাবে চলতি অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন গত অর্থবছরের ১ কোটি ৪০ লাখ টনের তুলনায় ৭ লাখ টন কমে ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে দাঁড়ায়।

দুই. উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব পড়ে সরকারের আমন সংগ্রহ অভিযানের ওপর। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত আমন মৌসুমে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে চালের আকারে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন। তিন. সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যথাসময়ে ‘প্রয়োজনীয় চাল’ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলেও তা সময়মতো কার্যকর করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাল আমদানি শুল্ক ড্রাস্টিক্যালি হ্রাস করেও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি খাতেও চাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি গুদামে চালের মজুত একযুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেন চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ২০১৭ সালের কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকা ছুঁইছুঁই। আর মাঝারি ও সরু চালের দামে বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি। চার. আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি।

চালের দামে, বিশেষ করে মোটা চালের আকাশছোঁয়া দামে ভীষণ কষ্টে আছেন গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ। করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের আয় হ্রাস পাওয়ায় তাদের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।

মাঝারি ধরনের চালের দামে উল্লম্ফনে মধ্যবিত্তরাও চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমিষজাতীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টি সমস্যা বাড়ছে। এমনিতেই বৈশ্বিক পুষ্টিমানে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। তাই চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সফল করতে হবে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
০৫ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সরকার চলতি বোরো মৌসুমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ঘোষণা অনুযায়ী সরকার ৬ লাখ টন ধান এবং সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহ করবে।

কেজিপ্রতি ২৭ টাকা দরে ধান কিনবে কৃষকের কাছ থেকে, আর কেজিপ্রতি ৪০ টাকা দামে ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ৩৮ টাকা দরে দেড় লাখ টন আতপ চাল কিনবে চালকল মালিকদের কাছ থেকে। এবার ধান ও চালের মূল্য গত বছরের তুলনায় কেজিপ্রতি যথাক্রমে এক টাকা ও তিন টাকা বাড়ানো হয়েছে। ২৮ এপ্রিল থেকে ধান এবং ৭ মে থেকে চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়ে তা চলবে আগস্ট পর্যন্ত।

২৬ এপ্রিল এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বোরো ধান-চাল সংগ্রহের এ লক্ষ্যমাত্রা ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এবারের বোরো সংগ্রহের ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. কৃষকের স্বার্থরক্ষা হবে কি না, খ. সংগ্রহ অভিযান সফল হবে কি না, গ. চালের আকাশছোঁয়া দাম হ্রাস পেয়ে ভোক্তার জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে কি না।

যেসব বিষয় সরকারকে অনেক বছর ধরে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে ধান-চাল সংগ্রহ এবং মূল্য নির্ধারণে প্রভাবিত করে আসছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম-ধান কাটা ও ঘরে তোলার মৌসুমে বাজারে ধানের দাম স্থিতিশীল রাখা; যাতে ধানচাষিরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন এবং অধিক পরিমাণে ধান উৎপাদনে উৎসাহিত হন। এর কারণ, ফসল উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি এসব চাষি ধারদেনা করে ফসল ফলান।

ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের নানা অভাব-অনটন মেটাতে ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতেই তাদের ধান বিক্রি করতে হয়। ধানকে চালে রূপান্তর করে কাটা-মাড়াই মৌসুম শেষে সময়-সুযোগ বুঝে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করে লাভবান হওয়ার মতো আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই।

একাধিক কারণে সরকার অধিকাংশ সময় এসব ধানচাষির স্বার্থরক্ষা করতে সমর্থ হয় না। প্রথমত, সরকার সরাসরি ধানচাষিদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করে তার পরিমাণ চালকল মালিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত চালের পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। উদাহরণস্বরূপ, চলতি বোরো মৌসুমে সরকার চালকল মালিকদের কাছ থেকে সাড়ে ১১ লাখ টন চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, ধানের আকারে যার পরিমাণ কমবেশি ২০ লাখ টন।

এর আগের বছরগুলোয়ও বোরো ও আমন ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহে একই ধারা লক্ষ করা গেছে। তাছাড়া আমন কাটা-মাড়াই মৌসুমে ধানচাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ না করার উদাহরণও রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ধান ও চাল মিলে ধানের আকারে যে পরিমাণ ধান সংগ্রহ করা হয়, তা উৎপাদিত ধানের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশ।

যেমন, চলতি বোরো মৌসুমে সরকারের চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ কোটি ৫ লাখ টন নির্ধারিত হয়েছে বলে জানা যায়। এদিকে কৃষিমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, অনুকূল আবহাওয়া, গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ২০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে বোরো ধানের চাষ হওয়া এবং একই সঙ্গে গত বছরের তুলনায় ৩ লাখ হেক্টরেরও বেশি জমিতে হাইব্রিড জাতের ধানের আবাদ বাড়ায় গতবারের তুলনায় এবার বোরোর উৎপাদন ৯ থেকে ১০ লাখ টন বেশি হবে। প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক, গত বছর বোরো চালের উৎপাদন ১ কোটি ৯৪ লাখ টনে দাঁড়িয়েছিল।

সেক্ষেত্রে এবার বোরো চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে ধরে নেওয়া যায়। আর ধানের আকারে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ কোটি টনের কাছাকাছি। এদিকে চলতি বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধান ও চাল মিলে ধানের আকারে প্রয়োজন হবে কমবেশি ২৬ লাখ টন ধান, যা সম্ভাব্য উৎপাদনের প্রায় ১২ ভাগের এক ভাগ। আর যদি শুধু সরকারের ধান সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রা (৬ লাখ টন) বিবেচনায় নেওয়া হয়, তবে তা হবে বোরো ধানের সম্ভাব্য মোট উৎপাদনের কমবেশি ৫০ ভাগের একভাগ।

সরকারি সংগ্রহ অভিযানে এত স্বল্পপরিমাণ ধান কেনার মাধ্যমে ধানচাষিদের স্বার্থরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, একদিকে সরকার কৃষকদের কাছ থেকে খুব সামান্য পরিমাণ ধান কিনে থাকে, অন্যদিকে আবার সে সংগ্রহ প্রক্রিয়া ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে কার্যকর হয় না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ফসল উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা ধারদেনা পরিশোধ এবং সংসারের চাহিদা মেটাতে মৌসুমের শুরুতেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন।

ধান কাটা-মাড়াই মৌসুমের শুরুতে সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থা কার্যকর না হলে এসব ধানচাষির চালকল মালিকদের কাছে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এতে তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এটা আগে অনেকবার ঘটেছে। এ বছরও এর পুনরাবৃত্তি ঘটল। কারণ এ বছরও সরকার নির্ধারিত তারিখে (২৮ এপ্রিল) বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান শুরু করতে পেরেছে বলে খবর জানা নেই।

বোরো ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সাফল্য নির্ভর করবে মূলত দুটি বিষয়ের ওপর। প্রথমটি হলো ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ। নব্বইয়ের দশকে খাদ্য সচিবের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ অভিযানে, বিশেষ করে প্রধান খাদ্যশস্য ধান-চাল সংগ্রহে পণ্যটির দাম নির্ধারণের বিষয়টি অনেকটা জটিল। এখানে তিনটি গোষ্ঠীর অনেকটা পরস্পরবিরোধী দাবি বিবেচনায় নিতে হয়।

চাষিদের দাবি ধানের উচ্চমূল্য নির্ধারণ, যাতে উৎপাদন ব্যয় মেটানোর পরও তাদের ভালো লাভ থাকে। চালকল মালিকরা সরকারকে চাল সরবরাহের জন্য একদিকে চালের উচ্চমূল্য দাবি করেন এবং অন্যদিকে সরকারের কাছে তদবির করেন ধানের কম দাম নির্ধারণে, যাতে তারা কম দামে ধান কিনে সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাল সরবরাহ করে ভালো লাভ করতে পারেন।

আর ভোক্তারা স্বাভাবিকভাবেই চান বাজারে চালের দাম কম হোক, যাতে তাদের পণ্যটি সংগ্রহের জন্য অধিক পরিমাণে অর্থ ব্যয় করতে না হয়। তিন গোষ্ঠীর দাবি বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করতে হয়। সরকার ধানচাষিদের উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামান্য লাভ যোগ করে ধানের দাম এবং চালকল মালিকদের চাল উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে কিছুটা লাভ যোগ করে চালের দাম নির্ধারণ করে।

এ বছর বোরো ধান-চাল সংগ্রহে সরকার এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করেছে। প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭ টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১ টাকা বেশি। সিদ্ধ ও আতপ চালের কেজিপ্রতি দাম নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪০ ও ৩৯ টাকা, যা গতবারের চেয়ে উভয়ক্ষেত্রে কেজিপ্রতি ৩ টাকা বেশি। সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ ধানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ চাল আকারে পাওয়া যায়। যেমন ৬০ কেজি ধান থেকে পাওয়া যায় ৩৯ কেজি চাল। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ধানের দামের তুলনায় চালের দাম নির্ধারণ মোটামুটি যুক্তিযুক্ত হয়েছে বলে মনে হয়। ধান-চালের দাম নির্ধারণ নিয়ে এ পর্যন্ত স্টেকহোল্ডারদের পক্ষ থেকে বিরূপ বক্তব্য এসেছে বলে জানা যায়নি।

দ্বিতীয় যে বিষয়টির ওপর ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সাফল্য নির্ভর করে সেটি হলো ধানের উৎপাদন। গত মৌসুমে একাধিক কারণে ২ কোটি ৪ লাখ টন বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য-এক. ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বোরো চাষিরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে কিছুটা কম পরিমাণ জমিতে বোরো চাষ হয়। দুই. করোনার প্রাদুর্ভাবের কারণে পল্লি এলাকায় হাটবাজারে দোকানপাট বন্ধ থাকায় কৃষকদের সময়মতো সারপ্রাপ্তিতে অসুবিধা।

তিন. ঘূর্ণিঝড় আম্পানে দেশের উপকূলীয় এবং উপকূলীয় নয় এমন ১৭টি জেলায় বোরো ফসলের ক্ষতি হয়। গত মৌসুমে বোরো চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়ায় এবং ধান-চালের উৎপাদন খরচের তুলনায় সরকারি সংগ্রহ মূল্য সন্তোষজনক না হওয়ায় গত বছর ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সাফল্য পায়নি। লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও পূরণ হয়নি।

চলতি বোরো মৌসুমে হিটশকে মূলত দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কোথাও কোথাও বোরো ধানের কিছুটা ক্ষতি হলেও সরকারি সূত্র ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য মোতাবেক বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে আশা করা যায়। ধান-চালের সংগ্রহ মূল্য মোটামুটি যৌক্তিক হওয়ায় এবং ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের আশা থাকায় চলতি বোরো মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান সাফল্য লাভ করার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে চালের দাম কমার সম্ভাবনা খুবই কম। এর একাধিক কারণ রয়েছে। এক. চলতি অর্থবছরে আমন উৎপাদনের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় হ্রাস। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে উপর্যুপরি বন্যা এবং করোনার কারণে আমন উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) হিসাবে চলতি অর্থবছরে আমন চালের উৎপাদন গত অর্থবছরের ১ কোটি ৪০ লাখ টনের তুলনায় ৭ লাখ টন কমে ১ কোটি ৩৩ লাখ টনে দাঁড়ায়।

দুই. উৎপাদন হ্রাসের প্রভাব পড়ে সরকারের আমন সংগ্রহ অভিযানের ওপর। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত আমন মৌসুমে সাড়ে ৮ লাখ টন ধান-চাল সংগ্রহ লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে চালের আকারে মাত্র ৮৩ হাজার ২০২ টন। তিন. সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যথাসময়ে ‘প্রয়োজনীয় চাল’ আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলেও তা সময়মতো কার্যকর করা হয়নি।

আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় চাল আমদানি শুল্ক ড্রাস্টিক্যালি হ্রাস করেও বেসরকারি খাতকে চাল আমদানিতে তেমন উৎসাহিত করা যায়নি। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সরকারি খাতেও চাল আমদানি সম্ভব হয়নি। ফলে সরকারি গুদামে চালের মজুত একযুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর সুযোগ নেন চালকল মালিক ও চাল ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে দেশের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য মোটা চালের কেজিপ্রতি দাম ২০১৭ সালের কেজিপ্রতি ৫০-৫২ টাকা ছুঁইছুঁই। আর মাঝারি ও সরু চালের দামে বল্গাহীন ঊর্ধ্বগতি। চার. আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম বৃদ্ধি।

চালের দামে, বিশেষ করে মোটা চালের আকাশছোঁয়া দামে ভীষণ কষ্টে আছেন গরিব ও নিম্নবিত্তের মানুষ। করোনা মহামারির দ্বিতীয় ঢেউয়ে মানুষের, বিশেষ করে গরিব, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের আয় হ্রাস পাওয়ায় তাদের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।

মাঝারি ধরনের চালের দামে উল্লম্ফনে মধ্যবিত্তরাও চাল সংগ্রহ করতে গিয়ে আমিষজাতীয় খাদ্য সংগ্রহ করতে পারছেন না। এতে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টি সমস্যা বাড়ছে। এমনিতেই বৈশ্বিক পুষ্টিমানে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। তাই চালের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে সরকারকে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে হবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক খাদ্য সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন