তিস্তাচুক্তি হওয়া-না হওয়া
jugantor
তিস্তাচুক্তি হওয়া-না হওয়া

  ডা. জাহেদ উর রহমান  

১০ মে ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’-পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রতি আমাদের দেশের মানুষের অসীম আগ্রহ দেখে প্রবাদটির কথাই মনে পড়ল। আমরা ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের নির্বাচন তো বটেই, মার্কিন নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া উপভোগ করি তুমুল উদ্দীপনায়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটি শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকেই এটি আমাদের দেশের মানুষের আগ্রহের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। আক্ষরিক অর্থেই সর্বশক্তি ব্যবহার করেও বিজেপির মতো প্রতাপশালী দলটি পশ্চিমবঙ্গ ‘দখল’ করতে পারেনি। বরং মমতা ব্যানার্জি আর কারও সঙ্গে জোট না করে একাই হারিয়ে দিয়েছেন পরাক্রমশালী দলটিকে। এই ফলের পর আমাদের সামাজিক মিডিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দখলে গেলে তারা পশ্চিমবঙ্গেও আসামের মতো নাগরিকপঞ্জি খুব দ্রুত তৈরি করবে বলে জোর দিয়ে বলেছিল। এ ছাড়া বিজেপির মাধ্যমে আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় চলে আসা হিন্দুত্ববাদী পলিটিক্স আরও অনেক শক্তভাবে চেপে বসত, যদি তারা এ নির্বাচনে জিততে পারত। এ দুটো ঘটনারই নিশ্চিত প্রভাব পড়ত আমাদের দেশের অভ্যন্তরেও। এ দুটি ব্যাপার মাথায় রেখে যারা স্বস্তি প্রকাশ করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ে, তাদের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে যারা এ দুই ব্যাপারে স্বস্তি প্রকাশ করছেন, তাদেরই একটা অংশ আবার এটি ভেবে হতাশ হচ্ছেন যে, তিস্তাচুক্তি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে গেল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে ভারত সরকার তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করতে পারছে না-এমন একটা কথা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বলা হয়েছে, যদিও এটি যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় নয়। ভারত সরকার তার স্বার্থের কারণে এটি করতেই পারে; কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি এ বয়ানটি বাংলাদেশ সরকারও গ্রহণ করেছে এবং সেটি বলছে দীর্ঘকাল থেকে।

বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ার পেছনে মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে মন্তব্য করতে শুরু করেন। অবিশ্বাস্যভাবে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ মাছ না পাঠানোর সঙ্গে তিস্তার পানি পাওয়াকে আমরা মিলিয়ে ফেলে বলেছিলাম-তিস্তার পানি এলে ইলিশ মাছ যাবে। অথচ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, বাংলাদেশ সরকারের কোনোভাবেই উচিত ছিল না ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোন কারণে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না, সেটি নিয়ে কথা বলা। একটা রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটা রাষ্ট্রের যখন তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেটি সেই পর্যায়ে সীমিত রাখা উচিত।

বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে ফেডারেল রাষ্ট্রগুলোর সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে ভিন্ন ভিন্ন রকম ক্ষমতা দেয়। যেমন কোনো রাজ্যের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকলে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে সবসময় সর্বময় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না; রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। ভারতের সংবিধান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। পড়ে নেওয়া যাক ভারতীয় সংবিধানের আর্টিক্যাল ২৫৩:

‘Notwithstanding anything in the foregoing provisions of this Chapter, Parliament has power to make any law for the whole or any part of the territory of India for implementing any treaty, agreement or convention with any other country or countries or any decision made at any international conference, association or other body.’

তিস্তাচুক্তির সঙ্গে মমতা ব্যানার্জিকে যুক্ত করা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, বলেছিলাম একটু আগেই। ভারতের সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেই রাজ্যের সঙ্গে জড়িত কোনো বিষয় নিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের কোনো রকম সম্পৃক্ততার প্রয়োজন নেই। এরপরও বারবার পশ্চিমবঙ্গকে কারণ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু বিজেপি দখল করতে পারেনি, তাই তারা তাদের নিজ দায়িত্বে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি করবে, এটি এখন আশা করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাহলে প্রশ্ন আসে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জয়ী হলে কি তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হতো? আমি সেই সম্ভাবনাও কম দেখি, কারণ সেটি হলেও তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করা একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি হতো বিজেপির মতো একটি অতি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের জন্য। তবে কেউ কেউ নিশ্চয়ই এ যুক্তি দেবেন, তখন মমতার অনুপস্থিতিতে বিজেপি নিশ্চয়ই কোনো অজুহাত দেখাতে পারত না, অর্থাৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতো। সেই চুক্তি হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, সেই চুক্তি আদতে কেমন হতো আমাদের জন্য?

এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য আমাদের দেখে আসা উচিত ভারতের সঙ্গে আমাদের একমাত্র পানিবণ্টন চুক্তিটির ফল কী হয়েছে সেটি। ১৯৯৬ সালের সরকারের সময় গঙ্গাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বর্তমান সরকার বিরাট কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে আমরা দেশের মিডিয়ার রিপোর্টে দেখি পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি পার হয়। গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে যে পানি আসবে সেটি শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ ভাগাভাগি করবে-এটাই ছিল এ চুক্তির মূল কথা। কিন্তু যদি ফারাক্কা পয়েন্টেই পানি খুব কম আসে, সেই ক্ষেত্রে পানি পাওয়া দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এমনকি ফারাক্কা পয়েন্টের পানি যতটুকু আসে, সেটার ভাগাভাগিতেও যে চুক্তি অনুসরণ করা হচ্ছে না ঠিকমতো, সেটি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক কয়েকদিন আগেই রিপোর্ট করেছিল।

এ চুক্তিটি যে আদৌ সঠিক চুক্তি ছিল না, তার স্বীকৃতি বর্তমান সরকারের কথাতেই আছে। ২০১৭ সালে ভারত সফরের সময় ১০ বছর বাকি থাকতেই গঙ্গাচুক্তি বর্তমান ফর্মে নবায়ন না করে নতুনভাবে করা হবে বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছিলেন।

২০১১ সালে তিস্তার যে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও স্বাক্ষরিত হয়নি, সেটা দুই দেশের সরকারের মুখরক্ষা করতে পারলেও দেশের স্বার্থরক্ষা করতে পারত না। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, তিস্তার গজলডোবা পয়েন্টে যে পানি আসবে সেই পানি ভাগাভাগি হবে। আমরা জানি, তিস্তা নদীর পানির একটা বড় অংশ প্রত্যাহার হয় সিকিমে। এবং গজলডোবা পয়েন্টের আগেই যদি অনেক বেশি পানি পশ্চিমবঙ্গেও প্রত্যাহার করে ফেলা হয়, তাহলে বাংলাদেশ সেই চুক্তিতে অতি তুচ্ছ পরিমাণ পানি পাবে। অর্থাৎ এটি গঙ্গা চুক্তির মতোই স্রেফ একটি কাগুজে চুক্তির বেশি কিছু হতো না।

ভারতের ভেতরেই রাজ্যগুলোর মধ্যে নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কাবেরী নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে তামিলনাড়ু আর কর্নাটকের সমস্যা শুরু হয়েছিল দেড় শতাব্দী আগে। এটি নিয়ে উভয় রাজ্যের মধ্যে বহু সময় সহিংসতাও হয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে ২০১৮ সালে; যখন হাইকোর্ট পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অববাহিকাভিত্তিক পানি ভাগাভাগিকে সমাধান হিসাবে গ্রহণ করে রাজ্যগুলো কে কত কিউসেক পানি পাবে সেটি নির্ধারণ করে দেন।

এ নিয়মে কোনো নদী তার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত যে পরিমাণ অববাহিকা থাকবে সেই অববাহিকার অনুপাত অনুযায়ী পানির হিস্যা পাবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য কিংবা রাষ্ট্র। বলা বাহুল্য, বিশ্বজুড়ে অববাহিকাভিত্তিক পানিবণ্টনই ন্যায্য পানিবণ্টন হিসাবে স্বীকৃত। খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের অভ্যন্তরে তাদের সর্বোচ্চ আদালতের এরকম গুরুত্বপূর্ণ রায় থাকার পরও আমরা কেন একটি বিশেষ পয়েন্টে আসা পানি ভাগাভাগির চুক্তি করতে চাইছি? বিশেষ করে যখন এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা অপ্রীতিকর।

তাহলে কি আমরা এটি বুঝতে পারছি, ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত না হওয়া চুক্তিটি এখন স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই আমাদের স্বার্থের পক্ষে যাবে না। তিস্তাসহ অন্য সব নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানি ভাগাভাগি চুক্তি নিয়ে আমাদের এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা মনে রাখব, একবিংশ শতাব্দীতে বহু যুদ্ধের কারণ হবে পানি সংকট-এমন ভবিষ্যদ্বাণী বহু আগেই করেছে

ভূ-রাজনীতিবিষয়ক অনেক থিংকট্যাংক। আমাদের জন্য শঙ্কার তথ্য হলো, এ হটস্পটগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াও একটি।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

তিস্তাচুক্তি হওয়া-না হওয়া

 ডা. জাহেদ উর রহমান 
১০ মে ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’-পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রতি আমাদের দেশের মানুষের অসীম আগ্রহ দেখে প্রবাদটির কথাই মনে পড়ল। আমরা ভারতের কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের নির্বাচন তো বটেই, মার্কিন নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া উপভোগ করি তুমুল উদ্দীপনায়। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনটি শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকেই এটি আমাদের দেশের মানুষের আগ্রহের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে। আক্ষরিক অর্থেই সর্বশক্তি ব্যবহার করেও বিজেপির মতো প্রতাপশালী দলটি পশ্চিমবঙ্গ ‘দখল’ করতে পারেনি। বরং মমতা ব্যানার্জি আর কারও সঙ্গে জোট না করে একাই হারিয়ে দিয়েছেন পরাক্রমশালী দলটিকে। এই ফলের পর আমাদের সামাজিক মিডিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির দখলে গেলে তারা পশ্চিমবঙ্গেও আসামের মতো নাগরিকপঞ্জি খুব দ্রুত তৈরি করবে বলে জোর দিয়ে বলেছিল। এ ছাড়া বিজেপির মাধ্যমে আমাদের একেবারে দোরগোড়ায় চলে আসা হিন্দুত্ববাদী পলিটিক্স আরও অনেক শক্তভাবে চেপে বসত, যদি তারা এ নির্বাচনে জিততে পারত। এ দুটো ঘটনারই নিশ্চিত প্রভাব পড়ত আমাদের দেশের অভ্যন্তরেও। এ দুটি ব্যাপার মাথায় রেখে যারা স্বস্তি প্রকাশ করছেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়ে, তাদের কথায় যুক্তি আছে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে যারা এ দুই ব্যাপারে স্বস্তি প্রকাশ করছেন, তাদেরই একটা অংশ আবার এটি ভেবে হতাশ হচ্ছেন যে, তিস্তাচুক্তি আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য ঝুলে গেল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির আপত্তির কারণে ভারত সরকার তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করতে পারছে না-এমন একটা কথা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বলা হয়েছে, যদিও এটি যুক্তিগ্রাহ্য বিষয় নয়। ভারত সরকার তার স্বার্থের কারণে এটি করতেই পারে; কিন্তু আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখি এ বয়ানটি বাংলাদেশ সরকারও গ্রহণ করেছে এবং সেটি বলছে দীর্ঘকাল থেকে।

বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় এবং নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ার পেছনে মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে মন্তব্য করতে শুরু করেন। অবিশ্বাস্যভাবে পশ্চিমবঙ্গে ইলিশ মাছ না পাঠানোর সঙ্গে তিস্তার পানি পাওয়াকে আমরা মিলিয়ে ফেলে বলেছিলাম-তিস্তার পানি এলে ইলিশ মাছ যাবে। অথচ সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে, বাংলাদেশ সরকারের কোনোভাবেই উচিত ছিল না ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোন কারণে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে না, সেটি নিয়ে কথা বলা। একটা রাষ্ট্রের সঙ্গে আরেকটা রাষ্ট্রের যখন তার ন্যায্য অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সেটি সেই পর্যায়ে সীমিত রাখা উচিত।

বৈদেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ব্যাপারে ফেডারেল রাষ্ট্রগুলোর সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে ভিন্ন ভিন্ন রকম ক্ষমতা দেয়। যেমন কোনো রাজ্যের স্বার্থ সরাসরি জড়িত থাকলে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে সবসময় সর্বময় কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না; রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। ভারতের সংবিধান এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। পড়ে নেওয়া যাক ভারতীয় সংবিধানের আর্টিক্যাল ২৫৩:

‘Notwithstanding anything in the foregoing provisions of this Chapter, Parliament has power to make any law for the whole or any part of the territory of India for implementing any treaty, agreement or convention with any other country or countries or any decision made at any international conference, association or other body.’

তিস্তাচুক্তির সঙ্গে মমতা ব্যানার্জিকে যুক্ত করা যুক্তিগ্রাহ্য নয়, বলেছিলাম একটু আগেই। ভারতের সংবিধান কেন্দ্রীয় সরকারকে রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই সেই রাজ্যের সঙ্গে জড়িত কোনো বিষয় নিয়ে অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করার ক্ষমতা দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের কোনো রকম সম্পৃক্ততার প্রয়োজন নেই। এরপরও বারবার পশ্চিমবঙ্গকে কারণ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ যেহেতু বিজেপি দখল করতে পারেনি, তাই তারা তাদের নিজ দায়িত্বে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি করবে, এটি এখন আশা করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাহলে প্রশ্ন আসে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জয়ী হলে কি তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষরিত হতো? আমি সেই সম্ভাবনাও কম দেখি, কারণ সেটি হলেও তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করা একটি রাজনৈতিক ঝুঁকি হতো বিজেপির মতো একটি অতি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের জন্য। তবে কেউ কেউ নিশ্চয়ই এ যুক্তি দেবেন, তখন মমতার অনুপস্থিতিতে বিজেপি নিশ্চয়ই কোনো অজুহাত দেখাতে পারত না, অর্থাৎ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতো। সেই চুক্তি হলেও প্রশ্ন হচ্ছে, সেই চুক্তি আদতে কেমন হতো আমাদের জন্য?

এ প্রশ্নের জবাব পাওয়ার জন্য আমাদের দেখে আসা উচিত ভারতের সঙ্গে আমাদের একমাত্র পানিবণ্টন চুক্তিটির ফল কী হয়েছে সেটি। ১৯৯৬ সালের সরকারের সময় গঙ্গাচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে বর্তমান সরকার বিরাট কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে আমরা দেশের মিডিয়ার রিপোর্টে দেখি পদ্মা নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি পার হয়। গঙ্গার ফারাক্কা পয়েন্টে যে পানি আসবে সেটি শুকনো মৌসুমে বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ ভাগাভাগি করবে-এটাই ছিল এ চুক্তির মূল কথা। কিন্তু যদি ফারাক্কা পয়েন্টেই পানি খুব কম আসে, সেই ক্ষেত্রে পানি পাওয়া দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এমনকি ফারাক্কা পয়েন্টের পানি যতটুকু আসে, সেটার ভাগাভাগিতেও যে চুক্তি অনুসরণ করা হচ্ছে না ঠিকমতো, সেটি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি দৈনিক কয়েকদিন আগেই রিপোর্ট করেছিল।

এ চুক্তিটি যে আদৌ সঠিক চুক্তি ছিল না, তার স্বীকৃতি বর্তমান সরকারের কথাতেই আছে। ২০১৭ সালে ভারত সফরের সময় ১০ বছর বাকি থাকতেই গঙ্গাচুক্তি বর্তমান ফর্মে নবায়ন না করে নতুনভাবে করা হবে বলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারতকে জানিয়েছিলেন।

২০১১ সালে তিস্তার যে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও স্বাক্ষরিত হয়নি, সেটা দুই দেশের সরকারের মুখরক্ষা করতে পারলেও দেশের স্বার্থরক্ষা করতে পারত না। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, তিস্তার গজলডোবা পয়েন্টে যে পানি আসবে সেই পানি ভাগাভাগি হবে। আমরা জানি, তিস্তা নদীর পানির একটা বড় অংশ প্রত্যাহার হয় সিকিমে। এবং গজলডোবা পয়েন্টের আগেই যদি অনেক বেশি পানি পশ্চিমবঙ্গেও প্রত্যাহার করে ফেলা হয়, তাহলে বাংলাদেশ সেই চুক্তিতে অতি তুচ্ছ পরিমাণ পানি পাবে। অর্থাৎ এটি গঙ্গা চুক্তির মতোই স্রেফ একটি কাগুজে চুক্তির বেশি কিছু হতো না।

ভারতের ভেতরেই রাজ্যগুলোর মধ্যে নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত কাবেরী নদীর পানি ভাগাভাগি নিয়ে তামিলনাড়ু আর কর্নাটকের সমস্যা শুরু হয়েছিল দেড় শতাব্দী আগে। এটি নিয়ে উভয় রাজ্যের মধ্যে বহু সময় সহিংসতাও হয়েছে। কিন্তু সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে ২০১৮ সালে; যখন হাইকোর্ট পানি ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অববাহিকাভিত্তিক পানি ভাগাভাগিকে সমাধান হিসাবে গ্রহণ করে রাজ্যগুলো কে কত কিউসেক পানি পাবে সেটি নির্ধারণ করে দেন।

এ নিয়মে কোনো নদী তার উৎস থেকে মোহনা পর্যন্ত যে পরিমাণ অববাহিকা থাকবে সেই অববাহিকার অনুপাত অনুযায়ী পানির হিস্যা পাবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য কিংবা রাষ্ট্র। বলা বাহুল্য, বিশ্বজুড়ে অববাহিকাভিত্তিক পানিবণ্টনই ন্যায্য পানিবণ্টন হিসাবে স্বীকৃত। খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতের অভ্যন্তরে তাদের সর্বোচ্চ আদালতের এরকম গুরুত্বপূর্ণ রায় থাকার পরও আমরা কেন একটি বিশেষ পয়েন্টে আসা পানি ভাগাভাগির চুক্তি করতে চাইছি? বিশেষ করে যখন এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃত অভিজ্ঞতা অপ্রীতিকর।

তাহলে কি আমরা এটি বুঝতে পারছি, ২০১১ সালে স্বাক্ষরিত না হওয়া চুক্তিটি এখন স্বাক্ষরিত হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই আমাদের স্বার্থের পক্ষে যাবে না। তিস্তাসহ অন্য সব নদীর অববাহিকাভিত্তিক পানি ভাগাভাগি চুক্তি নিয়ে আমাদের এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা মনে রাখব, একবিংশ শতাব্দীতে বহু যুদ্ধের কারণ হবে পানি সংকট-এমন ভবিষ্যদ্বাণী বহু আগেই করেছে

ভূ-রাজনীতিবিষয়ক অনেক থিংকট্যাংক। আমাদের জন্য শঙ্কার তথ্য হলো, এ হটস্পটগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়াও একটি।

ডা. জাহেদ উর রহমান : শিক্ষক, অ্যাক্টিভিস্ট

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন