Logo
Logo
×
   

Advertisement

বাতায়ন

মিঠে কড়া সংলাপ

এবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হোক

Advertisement

Icon

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

এবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হোক

Advertisement

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং উদ্বোধনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার যে সাফল্য অর্জন করেছে, দেশ-বিদেশে তা ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। আর বঙ্গবন্ধুকন্যা যে অসাধ্য সাধন করতে পারেন, এ ঘটনার মাধ্যমে তাও প্রমাণিত হয়েছে। কারণ দেশ-বিদেশের অনেক ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে তবেই তাকে পদ্মা সেতু নির্মাণে সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে। এ অবস্থায়, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এ সাফল্য যে অতুলনীয় সে কথাটি বলাই বাহুল্য। এ সফলতার মাধ্যমে তার ইচ্ছাশক্তি যে কতটা প্রবল সে কথাটিও তিনি প্রমাণ করেছেন।

অতঃপর শেখ হাসিনা সরকারের বর্তমান মেয়াদের অবশিষ্ট সময়টুকু কীভাবে এগিয়ে চলে বা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যান, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ এ সময়টুকুর মাধ্যমে তাকে জাতীয় নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে হবে এবং সেক্ষেত্রেও একটি নির্বাচনি সেতুর মাধ্যমেই তা করতে হবে!

পদ্মা সেতুর মতো একটি মহাযজ্ঞ যিনি সিদ্ধহস্তে পার করেছেন, আসন্ন নির্বাচনি সেতু নির্মাণের সে কাজটা সহজ বা সম্ভব হবে কিনা বা এ বিষয়ে তার শত্রু কারা সে বিষয়ে কিছুটা আলোচনা-সমালোচনা করাই আমার আজকের লেখাটির মূল উদ্দেশ্য। আর এ বিষয়ে প্রথমেই আমি যা বলতে চাই তা হলো, দেশে কতটুকু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? আর অন্তরে ভয়ভীতি রেখে যদি প্রশ্নটি করি, তাহলে দেশের মানুষসহ রাষ্ট্র বা সরকার কারও জন্যই তা উপকারে আসবে না বিধায় ভয়ভীতি দূরে ঠেলেই আমাকে প্রশ্নটি করতে হবে। কারণ এমনিতেই মেঘে মেঘে অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে।

সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্পসহ অন্যান্য অনেক বড় এবং জটিল বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েই হয়তো তিনি দৃষ্টি দিতে পারেননি বা তাকে সঠিকভাবে অন্য অনেক বিষয়ই জানতে বা বুঝতে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় ভূমিকা না করে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলাই সমীচীন মনে করছি। আর এসব বলতে আমি আমার নিজের চোখে দেখা বা নিজের জানা কিছু বাস্তব ঘটনাই এখানে তুলে ধরতে চাই। সরকারের নাকের ডগায় ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা তারা জানেন কিনা, সে বিষয়টি স্পষ্ট করাও আমার উদ্দেশ্য।

কিছুদিন আগে আমি বিদেশ গিয়েছিলাম। ফেরার পথে ঢাকা বিমানবন্দরে যা দেখলাম, ইতঃপূর্বে এমন বেসামাল অবস্থা আমি কোনোদিন দেখিনি। বেলা ১১টার পর ইমিগ্রেশন কাউন্টারে এসেই দেখি সেখানে গাদাগাদি করে পুলিশ কর্মকর্তা বসানো হয়েছে। অর্থাৎ আগের তুলনায় ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার আধিক্য দেখতে পাওয়া গেল। কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, সেখানে বসা তাদের বেশ কয়েকজনকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেলাম! জানি না সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে কিনা। থাকলে তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষও দৃশ্যটি দেখতে পেতেন!

যা হোক, এ অবস্থায় ঘুমে ঢুলুঢুলু একজন কর্মকর্তার কাছেই আমাদের স্বামী-স্ত্রীর পাসপোর্ট দুটি দেওয়ায় তিনি অনেকক্ষণ ধরে উলটে-পালটে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সামনের মেশিনে আঙুল চালাতে থাকলেন এবং সে কাজটিতেও তিনি প্রায় ১০ মিনিট সময় লাগালেন। অতঃপর একটি পাসপোর্টে সিল মেরে অন্যটি হাতে নিয়ে একই কায়দায় সময়ক্ষেপণ করতে করতে অবশেষে যেদিক থেকে পার হয়ে আমরা ঢুকেছিলাম, সেদিকের একটি ডেস্ক দেখিয়ে আমাদের সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সেখানে পৌঁছে দেখলাম, সেই ডেস্কে কেউ নেই।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে কিছুটা দূরে পুলিশের পোশাক পরিহিত পায়চারীরত একজনকে দেখে তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাওয়ায় সাগ্রহে এসে আবার মেশিনে আঙুল চালিয়ে পাসপোর্টে একটি নাম্বার দিয়ে দেওয়ায়, জিজ্ঞাসিত হয়ে তিনি বললেন, ‘ওসি রিপোর্ট হওয়ায় আমাদের সেখানে যেতে হয়েছিল!’ পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম, কোনো ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃত বা ভুল দুভাবেই যাত্রীদের এমন হয়রানি করতে পারেন। যদিও আমরা দুজনই-ই পাসপোর্টধারী যাত্রী ছিলাম।

এবারে বিদেশ থেকে আগমনের পরবর্তী অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য আরও দুঃখজনক। মাস্কাটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আগত রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং পৃথিবীর অন্যান্য এলাকার দু-একটি ফ্লাইটের যাত্রীদের জন্য ইমিগ্রেশন-পরবর্তী নির্গমনের জন্য কোনোমতে একজন যাত্রী ঢুকতে পারেন এমন একটিমাত্র সরু পথ ছাড়া অন্য কোনো নির্গমন রাস্তা না রাখায় সেই সরু পথে প্রায় দেড়শ ব্যক্তির লম্বা লাইন জমে গিয়েছে।

আর আগত প্রত্যেক ব্যক্তির লাগেজ তল্লাশি এবং স্ক্যান করায় সেক্ষেত্রে লাইন ধরে এগিয়ে তল্লাশি স্থানে পৌঁছাতে একেকজনকে কমপক্ষে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে! অবস্থা বেগতিক দেখে গ্রিন চ্যানেল খুঁজতে আমি এদিক-সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে অন্য একটি গেটে দুজন ব্যক্তিকে বসা অবস্থায় দেখে সেই গেট দিয়ে বের হতে চাইলে তারা আমাদের আগের লাইনে ফিরিয়ে দিলেন। যদিও ইতঃপূর্বে আমি এ গেট দিয়ে পার হয়ে এসেছিলাম।

যা হোক, কোনো গেটেই গ্রিন চ্যানেল লেখা না দেখে আমরা আগের লাইনে ফিরে এলাম এবং দু-চারজন যুবক ছেলে আমাদের একটু এগিয়েও দিলেন। এভাবে এক সময় তল্লাশি কেন্দ্রের কাছাকাছি এলে, সামনে থাকা একজন বয়স্ক ব্যক্তি যিনি আমাদের ফ্লাইটেই বিজনেস ক্লাসে ভ্রমণ করেছেন, তিনি ধৈর্যচুত হয়ে উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘গ্রিন চ্যানেল কোথায়’? আর সেই সঙ্গে তিনি দড়ি দিয়ে ঘেরা সরু পথটির বেড়া ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে বেরিয়ে গেলে তল্লাশিকারী জনৈক ব্যক্তি বাধা দিতে এগিয়ে এলে, তাকে কঠোর ভাষায় ধমক দিয়ে বললেন, ‘এই ব্যাটা, তাহলে গ্রিন চ্যানেল কোথায়?’ এ কথা শুনে দায়িত্বরত ব্যক্তি রণে ভঙ্গ দিলে আমরা স্বামী-স্ত্রীও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া তৈরি করা রাস্তা দিয়ে বের হয়ে এলাম!

আমার জীবনে ঢাকা এয়ারপোর্টে এমন অব্যবস্থাপনা অতীতে আর কখনো দেখিনি! অথচ আমার বিদেশযাত্রার মাত্র দুদিন আগেই বিমানমন্ত্রীকে বলতে শুনেছিলাম, সব ব্যাগেজ তল্লাশির প্রয়োজন নেই, গ্রিন চ্যানেল থাকার কথাও তিনি জোরেশোরে বলেছিলেন।

এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে ঢাকা বিমানবন্দরে কি আইনের শাসন আছে? আর প্রশ্নটির সোজা উত্তর হলো ‘না’। কারণ ঢাকা বিমানবন্দরের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে একটি সিন্ডিকেট! সিন্ডিকেটের হাতে বিমানবন্দর বন্দি। সেখানকার সিভিল এভিয়েশনের একটি সিকিউরিটি গার্ডেরও ৩-৪টি বাড়ি আছে। মোট কথা, বিমানবন্দরের কাস্টমস্ থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় সিন্ডিকেট বা চক্রের মাধ্যমে। আর সেই চক্রটি এতটাই শক্তিশালী যে বিমানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তও সেখানে অচল।

২.

১৯৮৯ সালে পাবনার তদানীন্তন এডিসি রেভিনিউ সাহেব রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে একখণ্ড জমি জনৈক ফজিলাতুন নেছার নামে হস্তান্তর করেন। তারপর থেকেই ওই সম্পত্তি দলিলগ্রহীতা নির্বিবাদে ভোগদখল করতে থাকেন। অতঃপর ২০১২ সালে সরকার, সরকারি বা পরিত্যক্ত সম্পত্তি ‘ক’ এবং ‘খ’ তফসিলভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় তালিকা প্রস্তুতের জন্য সংশ্লিষ্ট এলাকার স্ব স্ব তহশিলদারের (বর্তমানে সহকারী ভূমি কর্মকর্তা) ওপর দায়িত্ব অর্পণ করে। আর আশ্চর্যজনক ঘটনা হলো, উল্লিখিত জমিটি জেলা প্রশাসন কর্তৃক রেজিস্টার্ড দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তরিত হলেও সংশ্লিষ্ট তহশিলদার সেই জমিটুকুও ‘ক’ তফশিলভুক্ত করে দেন।

যদিও জমিটুকু কোনো সংখ্যালঘু বা অবাঙালির মালিকাধীন ছিল না। আর ঘটনা এখানেই শেষ নয়, ইতোমধ্যে জমির মালিক ফজিলাতুন নেছা মারা গেলে তার ওয়ারিশ সুফিয়া খাতুনগং ২০১৩ সালে তহশিল অফিসে ওয়ারিশ হিসাবে নামজারি জমাভাগ করে খাজনা দিতে গেলে, সংশ্লিষ্ট তহশিলদার ২০১২ সালে জমিটি ‘ক’ তফসিলভুক্ত হয়েছে দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঘুস গ্রহণের পর সুফিয়া খাতুনগংয়ের নামে নামজারি জমাভাগ করে খাজনা আদায় করেন। যদিও সংশ্লিষ্ট তহশিলদার নিজ হাতে জমিটি ২০১২ সালে ‘ক’ তপসিলভুক্ত করে রেখেছেন।

এ অবস্থায়, সুফিয়া খাতুনগং সেই নামজারি জমাভাগ এবং খাজনার দাখিলার বুনিয়াদে জমিটি বিক্রয় করতে চাইলে জনৈক ব্যক্তি সেখানে পশ্চাৎপদ শ্রেণির পরিবারের শিশুদের জন্য একটি স্কুল নির্মাণের উদ্দেশ্যে ক্রয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট তহশিল অফিসসহ এসি ল্যান্ড অফিসে খোঁজ নিয়ে বিক্রেতার নামজারি জমাভাগ, দাখিলা, ডিসিআর ইত্যাদি একশত ভাগ সঠিক দেখতে পেয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় করে ২০১৪ সালে জমিটি ক্রয় করেন। অতঃপর ক্রয়কৃত সম্পত্তির জন্য এসি ল্যান্ড অফিসে নামজারি জমাভাগের আবেদন জানানো হলে, বর্তমান মালিকের নামেও নামজারি জমাভাগ মঞ্জুর করে তার নামেও দাখিলা কেটে তাকে জমির মালিক হিসাবে স্বীকার করে নেওয়া হয়।

কিন্তু দুঃখজনক ঘটনা হলো, তারপর খাজনা দিতে গেলে ৫ লাখ টাকা ঘুস দাবি করে বলা হয় যে, জমিটি ‘ক’ তফসিলভুক্ত বিধায় উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ম্যানেজ করতে হয়। অথচ বর্তমান মালিকের নামেও খাজনার দাখিলা আছে। বলাবাহুল্য বর্তমান মালিক সেই ঘুসের দাবি প্রত্যাখ্যান করে জেলা প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত দিয়ে আজ ৫ বছর ধরে দৌড়ের ওপর আছেন। ইতোমধ্যে কোনো কোনো জেলা প্রশাসক আশার বাণী শুনিয়েছেন। কিন্তু তিনি বদলি হয়ে গেলে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তহশিলদারদের (সহকারী ভূমি কর্মকর্তা) শক্তিশালী সংগঠন থাকায় এবং অবৈধভাবে তারা যে অর্থ উপার্জন করেন বহুদূর পর্যন্ত তা বিলি-বণ্টন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট তহশিলদার বহাল তবিয়তেই আছেন। মাঝখানে বর্তমান মালিকের ভোগান্তি বেড়েই চলেছে।

ইতোমধ্যে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হলে সংশ্লিষ্ট জমিটুকু নিষ্কণ্টক, সেখানে বর্তমান মালিকের নিরঙ্কুশ এবং উত্তম স্বত্ব বিদ্যমান মর্মে আদালত রায় প্রদান করায়, রায়ের কপি সংযুক্ত করে আবার তিনি বর্তমান জেলা প্রশাসক সাহেবের কাছে দরখাস্ত দিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করে আরডিসি সাহেবের সঙ্গে বিষয়টির একটি সিদ্ধান্ত বা ফয়সালা প্রার্থনা করলে আরডিসি সাহেব বরং তাকে ভর্ৎসনা করে বলেছেন, ‘এসব অপকর্মের সঙ্গে আপনিও জড়িত, দেখেশুনে জমি কিনতে পারেন না?’

পরিশেষে বলতে চাই, একশ্রেণির সরকারি আমলা দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে এখনো যে আচার-আচরণ করে চলেছেন, তাতে কিন্তু দেশে মোটেই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি বা হচ্ছে না, বরং ওই শ্রেণির আমলা কর্মচারীর কারণে দেশের বড় বড় অর্জনও বৃথা যেতে পারে। কারণ বৃহৎ জনগোষ্ঠী এসব আমলা-কর্মচারীর সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছেন।

ড. মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

Advertisement

আইনের শাসন

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম