সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে
jugantor
স্বদেশ ভাবনা
সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে

  আবদুল লতিফ মন্ডল  

০৩ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত জুনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তত্ত্বাবধানে সারা দেশে একযোগে পরিচালিত ষষ্ঠ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এ প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা হ্রাস পেলেও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। আবার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তরুণ-যুবারা। তরুণ-যুব জনগোষ্ঠী হিসাবে বিবেচিত ১৫-২৯ বছর বয়সিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৯ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার (১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬) চার ভাগের এক ভাগের সামান্য বেশি।

তরুণ-যুবাদের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ এ সুযোগের কতটা সদ্ব্যবহার করতে পারছে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো-কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি জনসংখ্যার আধিক্য। যখন এ কর্মক্ষম জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকে, তখন ওই দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাসকালে অবস্থান করছে বলে ধরা হয়।

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সিরা ৯ শতাংশ। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিরা মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মক্ষম ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ তরুণ-যুব জনগোষ্ঠী।

২০১৮ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান নিয়ে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ২০১০ সালের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের হারের (৪ দশমিক ২ শতাংশ) চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

আর তরুণ-যুবাদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে যুবকদের বয়সভিত্তিক বেকারত্বের হার থেকে দেখা যায়, ১৫-১৯, ২০-২৪ ও ২৫-২৯ বয়সসীমার তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে-১২ দশমিক ৭, ১২ দশমিক ১ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে।

গড় হার ১১ দশমিক ১ শতাংশে। আর শিক্ষার ভিত্তিতে উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষিত তরুণ-যুবাদের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২২ দশমিক ৩ এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ নেই এমন তরুণ-যুব জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে দেশে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির বেকারত্বের যে হার উঠে আসে, বিগত দুই বছরে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে সে হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুই বছরে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

২০২০ সালের মাঝামাঝি মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের হিসাবে করোনার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার পোশাক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন সূত্রের বরাত দিয়ে ওই বছরের ১ মে যুগান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে কেবল পরিবহণ খাতের ৫০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারি খাতের অনেকে এখন পর্যন্ত হারানো চাকরি ফেরত পাননি, বা পেলেও আগের মজুরি পাচ্ছেন না।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময়ে চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক পদত্যাগ বা অবসরে পাঠানো ব্যাংকাররা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে ১৫ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করছেন। তারা বলেছেন, হঠাৎ চাকরি হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের চাকরি ফেরতের নির্দেশনা দিলেও অনেক ব্যাংক তা মানছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও শক্ত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

দ্রুত চাকরিতে বহালের দাবিতে বাধ্য হয়ে তারা মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে।

দেশে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির, বিশেষ করে তরুণ ও যুব শ্রমশক্তির উল্লম্ফন ঘটছে। কিন্তু সেই শ্রমশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত যুবক প্রতিবছর শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও সে অনুপাতে সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।

এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮ অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিু-আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সরকারি খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। দেশটিতে মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

দুই. শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ফারাক। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার বহুলাংশে মিল না থাকায় বাড়ছে শিক্ষিত যুব বেকারের সংখ্যা। তিন. দেশের বেশির ভাগ শিক্ষিত যুবক নিজস্ব ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে আত্মবিশ্বাসী নয়।

তারা কোনোরকম একটি চাকরি নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনে আগ্রহী। অবশ্য দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা তাদের আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগী হতে সাহস জোগায় না। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-তহবিলের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নীতিমালা উদ্যোক্তাবান্ধব না হওয়া।

চার. প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতে এবং শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চল উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত একটি স্টাডির বরাত দিয়ে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট একটি দৈনিকের (দ্য ডেইলি স্টার) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশের পাঁচটি স্পেশালাইজড ইন্ডাস্ট্রিতে, যেমন-গার্মেন্টস, খাদ্য ও কৃষি, ফার্নিচার, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি এবং লেদার ও ফুটওয়্যারে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার কর্মসংস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে। স্টাডিতে বলা হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে আগামী দুই দশকে এসব কর্মসংস্থান উধাও হয়ে যাবে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান কমবে গার্মেন্ট খাতে। ২০৪১ সাল নাগাদ এ খাতে ৬০ শতাংশ বা ২৭ লাখ কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে।

পাঁচ. কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনায় প্রদত্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পালিত না হওয়া।

উপর্যুক্ত বাধাগুলো ডিঙিয়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে যেসব বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মশক্তি হিসাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, তরুণ-যুবাদের নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমাজে তাদের অবস্থান যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে বজায় রাখতে পারে। খ. শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য বিরাজমান। বিষয়টি মাথায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়বস্তু সংশোধন ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে হবে। গ. তরুণ-যুবাদের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ কর্মশক্তি বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ঘ. অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রণীত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি-২০২২-২০২৫’-এ স্বীকার করা হয়েছে যে, ‘কর্মসংস্থানের সংকোচন দেখা যাচ্ছে।’ তাই পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মসৃজন করতে হবে, যাতে নতুন যারা শ্রমশক্তিতে আসছে তাদের আত্তীকরণ করা যায়। করোনা মহামারির প্রভাবে চাকরি হারানো শ্রমিকদের সম্পূর্ণ আত্তীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। ঙ. বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। চ. পুষ্টিহীনতা কর্মক্ষম শ্রমশক্তির উন্নয়নে একটি বড় অন্তরায়। এ সমস্যাটির সমাধানে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। ছ. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা অটোমেশনের কারণে কয়েকটি স্পেশালাইজড ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মসংস্থান হ্রাসের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে হবে। জ. বর্তমানে কর্মক্ষম ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ মানুষের সবাই উৎপাদনে জড়িত নেই। তারা কর্মদক্ষ হলেও সবাই কাজ পাচ্ছে না। তাই তারা অর্থনীতিতে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখছেন না। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের উৎপাদনমুখী করতে হবে। এটি করা গেলে বাড়বে জিডিপির পরিমাণ।

ডেমোগ্রাফারদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মেয়াদ ৩০-৩৫ বছরের বেশি স্থায়ী হবে না। এ সময়ের পরে দেশে তরুণ-যুবাদের তুলনায় বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা হ্রাস পাবে। উল্লেখ্য, ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এ ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সি জনসংখ্যার হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে, যা ২০১১ সালের জনশুমারিতে ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তাই বর্তমানের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে। এটি না করা হলে বর্তমানের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

স্বদেশ ভাবনা

সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে

 আবদুল লতিফ মন্ডল 
০৩ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত জুনে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তত্ত্বাবধানে সারা দেশে একযোগে পরিচালিত ষষ্ঠ ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে।

এ প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কিছুটা হ্রাস পেলেও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়েছে। আবার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে তরুণ-যুবারা। তরুণ-যুব জনগোষ্ঠী হিসাবে বিবেচিত ১৫-২৯ বছর বয়সিদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৫৯ লাখে, যা মোট জনসংখ্যার (১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬১৬) চার ভাগের এক ভাগের সামান্য বেশি।

তরুণ-যুবাদের সংখ্যা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশ ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বোনাসকালে অবস্থান করছে। বাংলাদেশ এ সুযোগের কতটা সদ্ব্যবহার করতে পারছে, তা পর্যালোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।

ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হলো-কোনো দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অর্থাৎ ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সি জনসংখ্যার আধিক্য। যখন এ কর্মক্ষম জনসংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের বেশি থাকে, তখন ওই দেশ ডেমোগ্রাফিক বোনাসকালে অবস্থান করছে বলে ধরা হয়।

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ। ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশের মধ্যে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সির সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ। ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সিরা ৯ শতাংশ। ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিরা মোট জনসংখ্যার ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ কর্মক্ষম ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ জনসংখ্যার ২৭ দশমিক ৭১ শতাংশ তরুণ-যুব জনগোষ্ঠী।

২০১৮ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা (আইএলও) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থান নিয়ে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮’ শীর্ষক যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ২০১০ সালের ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপের হারের (৪ দশমিক ২ শতাংশ) চেয়ে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ বেশি।

আর তরুণ-যুবাদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের ৬ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিবিএসের ২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে যুবকদের বয়সভিত্তিক বেকারত্বের হার থেকে দেখা যায়, ১৫-১৯, ২০-২৪ ও ২৫-২৯ বয়সসীমার তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে-১২ দশমিক ৭, ১২ দশমিক ১ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে।

গড় হার ১১ দশমিক ১ শতাংশে। আর শিক্ষার ভিত্তিতে উচ্চমাধ্যমিক এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষা সম্পন্নকারী শিক্ষিত তরুণ-যুবাদের বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২২ দশমিক ৩ এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশে। কর্মসংস্থান, শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ নেই এমন তরুণ-যুব জনগোষ্ঠীর বেকারত্বের হার ২৯ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

২০১৬-১৭ সালের শ্রমশক্তি জরিপে দেশে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির বেকারত্বের যে হার উঠে আসে, বিগত দুই বছরে করোনা মহামারির প্রাদুর্ভাবে সে হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ দুই বছরে কর্মসংস্থানে মূল ভূমিকা পালনকারী বেসরকারি খাতের অনেকে চাকরি হারিয়েছেন।

২০২০ সালের মাঝামাঝি মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের হিসাবে করোনার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার পোশাক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশন সূত্রের বরাত দিয়ে ওই বছরের ১ মে যুগান্তরে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, করোনাভাইরাসের কারণে কেবল পরিবহণ খাতের ৫০ লাখ শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেসরকারি খাতের অনেকে এখন পর্যন্ত হারানো চাকরি ফেরত পাননি, বা পেলেও আগের মজুরি পাচ্ছেন না।

সম্প্রতি একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময়ে চাকরিচ্যুত, বাধ্যতামূলক পদত্যাগ বা অবসরে পাঠানো ব্যাংকাররা চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে ১৫ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে মানববন্ধন করছেন। তারা বলেছেন, হঠাৎ চাকরি হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের চাকরি ফেরতের নির্দেশনা দিলেও অনেক ব্যাংক তা মানছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকও শক্ত কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

দ্রুত চাকরিতে বহালের দাবিতে বাধ্য হয়ে তারা মানববন্ধনে অংশ নিয়েছেন। ওয়াশিংটনভিত্তিক জনমত জরিপ প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ পরিচালিত ‘স্টেট অব দ্য গ্লোবাল ওয়ার্কপ্লেস ২০২১’ অনুযায়ী, করোনার সময় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৫৫ শতাংশ মানুষের আয় কমেছে।

দেশে কর্মক্ষম শ্রমশক্তির, বিশেষ করে তরুণ ও যুব শ্রমশক্তির উল্লম্ফন ঘটছে। কিন্তু সেই শ্রমশক্তিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-এক. শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য। বিপুলসংখ্যক শিক্ষিত যুবক প্রতিবছর শ্রমবাজারে যুক্ত হলেও সে অনুপাতে সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।

এশিয়া-প্যাসিফিক এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮ অনুযায়ী, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিু-আয়ের দেশগুলোর মধ্যে সরকারি খাতে কর্মসংস্থান সবচেয়ে কম বাংলাদেশে। দেশটিতে মোট কর্মসংস্থানে সরকারি খাতের অবদান মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ।

দুই. শ্রমবাজারের চাহিদা ও শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে ফারাক। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার বহুলাংশে মিল না থাকায় বাড়ছে শিক্ষিত যুব বেকারের সংখ্যা। তিন. দেশের বেশির ভাগ শিক্ষিত যুবক নিজস্ব ব্যবসা বা আত্মকর্মসংস্থানে আত্মবিশ্বাসী নয়।

তারা কোনোরকম একটি চাকরি নিয়ে নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনে আগ্রহী। অবশ্য দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা তাদের আত্মকর্মসংস্থানে উদ্যোগী হতে সাহস জোগায় না। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো-তহবিলের অভাব, প্রশাসনিক জটিলতা এবং ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নীতিমালা উদ্যোক্তাবান্ধব না হওয়া।

চার. প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এটি অর্থনীতির প্রায় সব খাতে এবং শহরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চল উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সরকারের উদ্যোগে পরিচালিত একটি স্টাডির বরাত দিয়ে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট একটি দৈনিকের (দ্য ডেইলি স্টার) এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে দেশের পাঁচটি স্পেশালাইজড ইন্ডাস্ট্রিতে, যেমন-গার্মেন্টস, খাদ্য ও কৃষি, ফার্নিচার, ট্যুরিজম ও হসপিটালিটি এবং লেদার ও ফুটওয়্যারে ৫৩ লাখ ৮০ হাজার কর্মসংস্থান চ্যালেঞ্জের মুখে। স্টাডিতে বলা হয়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে আগামী দুই দশকে এসব কর্মসংস্থান উধাও হয়ে যাবে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান কমবে গার্মেন্ট খাতে। ২০৪১ সাল নাগাদ এ খাতে ৬০ শতাংশ বা ২৭ লাখ কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে।

পাঁচ. কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনায় প্রদত্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পালিত না হওয়া।

উপর্যুক্ত বাধাগুলো ডিঙিয়ে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে যেসব বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে-ক. দক্ষ কর্মশক্তি গড়ে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি দেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ কর্মশক্তি হিসাবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, তরুণ-যুবাদের নিয়মিত অধ্যয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে পরিবর্তনশীল বিশ্ব পরিস্থিতি মাথায় রেখে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমাজে তাদের অবস্থান যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে বজায় রাখতে পারে। খ. শ্রমবাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য বিরাজমান। বিষয়টি মাথায় রেখে শিক্ষা কার্যক্রমের বিষয়বস্তু সংশোধন ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে শিক্ষা ও শিল্পের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট যোগসূত্র স্থাপনের পদক্ষেপ নিতে হবে। গ. তরুণ-যুবাদের অমিত শক্তি ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষ কর্মশক্তি বিনির্মাণের মধ্য দিয়ে তাদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারি খাতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ঘ. অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ প্রণীত ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতি-২০২২-২০২৫’-এ স্বীকার করা হয়েছে যে, ‘কর্মসংস্থানের সংকোচন দেখা যাচ্ছে।’ তাই পর্যাপ্তসংখ্যক কর্মসৃজন করতে হবে, যাতে নতুন যারা শ্রমশক্তিতে আসছে তাদের আত্তীকরণ করা যায়। করোনা মহামারির প্রভাবে চাকরি হারানো শ্রমিকদের সম্পূর্ণ আত্তীকরণ নিশ্চিত করতে হবে। ঙ. বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। চ. পুষ্টিহীনতা কর্মক্ষম শ্রমশক্তির উন্নয়নে একটি বড় অন্তরায়। এ সমস্যাটির সমাধানে বিশেষ গুরুত্বারোপ করতে হবে। ছ. প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বা অটোমেশনের কারণে কয়েকটি স্পেশালাইজড ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মসংস্থান হ্রাসের যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে হবে। জ. বর্তমানে কর্মক্ষম ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ মানুষের সবাই উৎপাদনে জড়িত নেই। তারা কর্মদক্ষ হলেও সবাই কাজ পাচ্ছে না। তাই তারা অর্থনীতিতে দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখছেন না। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের উৎপাদনমুখী করতে হবে। এটি করা গেলে বাড়বে জিডিপির পরিমাণ।

ডেমোগ্রাফারদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মেয়াদ ৩০-৩৫ বছরের বেশি স্থায়ী হবে না। এ সময়ের পরে দেশে তরুণ-যুবাদের তুলনায় বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। অর্থাৎ কর্মক্ষম জনশক্তির সংখ্যা হ্রাস পাবে। উল্লেখ্য, ‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এ ৬০ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সি জনসংখ্যার হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে, যা ২০১১ সালের জনশুমারিতে ছিল ৭ দশমিক ৪৮ শতাংশ। তাই বর্তমানের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগটির সদ্ব্যবহার করতে হবে। এটি না করা হলে বর্তমানের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

আবদুল লতিফ মন্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

latifm43@gmail.com

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন