ডিজিটাল রূপান্তর ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার : কোন পথে বাংলাদেশ
Advertisement
মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রযুক্তি এখন আর শুধু সহায়ক খাত নয়। বিশ্বজুড়ে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, উৎপাদনশীলতা ও সুশাসনের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডাটা, ক্লাউড কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার অর্থনীতির চরিত্রই বদলে দিচ্ছে। এ বৈশ্বিক রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে এনেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি-অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচিতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে কেন্দ্রীয় উপাদান হিসাবে দেখা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং ডিজিটাল সেবাসম্প্রসারণ, এসব পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তিসচেতন নেতৃত্ব ও বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্তির প্রবণতা। একইসঙ্গে সামাজিক ব্যবসা, স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম এবং প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মূলত, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোকে বোঝায়, যেখানে তথ্য, জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি উৎপাদন, কর্মসংস্থান, সেবা প্রদান, সরকারি কার্যক্রম, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে।
২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে গণজাগরণ ও গণ-আন্দোলনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যার প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সরকারের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন, সংবিধানিক সংস্কার, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, এবং দেশকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির পথে এগিয়ে নেওয়া।
বিশ্ব অর্থনীতি আধুনিক সময়কে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব বলে অভিহিত করছে, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটা, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), রোবটিক্স ইত্যাদি প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা ও সেবার মানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও এ বৈশ্বিক রূপান্তরে অংশগ্রহণে উৎসাহী; তবে সেটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নীতি ও নেতৃত্বের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ পেতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার। দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনরুদ্ধার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিরতা অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অবস্থান অনুযায়ী রিজার্ভ সংকট কমিয়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে দেশে ক্রমে স্থিতিশীলতা আসছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতির গড় হার ৯.০২ শতাংশ ছিল, যা ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ১০.৪৭ শতাংশের কাছাকাছি হয়েছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নভেম্বরে ছিল ৮.২৯ শতাংশ। এক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর থেকে কমে এসেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিভিত্তিক সেবার বিস্তার, অনলাইন ব্যবসা, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার বাড়ানো এসবই দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য ভিত্তি সৃষ্টি করে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে প্রযুক্তি খাতে রাজনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী হিসাবে প্রযুক্তি স্থপতি ফয়েজ আহমদ তৈয়বের অন্তর্ভুক্তি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে আইসিটি নীতিমালাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে সরাসরি কারিগরি দিকনির্দেশনা যুক্ত হচ্ছে।
এ উদ্যোগ অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল সেবা, অনলাইন শাসনব্যবস্থা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করছে।
ড. ইউনূসের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ‘সোশ্যাল বিজনেস’ বা সামাজিক ব্যবসা মডেলকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসাবে একটি বিশেষ ‘মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়, যা উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ব্যাংকিং ও অর্থায়ন সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক প্রকল্প এবং নতুন ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। এ উদ্যোগ একদিকে যেমন টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে আইটি খাত, স্টার্টআপ এবং উদ্ভাবনী পরিবেশকে (ইকোসিস্টেম) আরও শক্তিশালী করবে।
যদিও সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট উদ্যোগের সরকারি ঘোষণা এখনো স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি, তবে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ এবং সরকারি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে ডিজিটাল ও আইসিটি সম্পর্কিত সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সহযোগিতা ও গবেষণায় সরকারের আগ্রহ রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ ডিজিটাল ইকোনমি, উচ্চপ্রযুক্তি খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি)ভিত্তিক সেবা, অনলাইন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা ফিরে এসেছে এবং আইসিটি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশও তুলনামূলকভাবে উন্নত হয়েছে। সোশ্যাল বিজনেস ও মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে সক্রিয় প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের সংখ্যা ১২০০ ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১১৯.৯ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। আইসিটি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে প্রযুক্তি দক্ষ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি নীতিনির্ধারণে প্রযুক্তির ব্যবহার ও অগ্রাধিকার আরও বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে। ডিজিটাল সেবা ও অনলাইন প্রশাসন সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রশাসনিক দক্ষতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষা ও দক্ষতার ঘাটতি বড় একটি বাধা। বিশেষ করে এআই, রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং ব্লকচেইন খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে পিছিয়ে আছে দেশ। এ ছাড়া আইসিটি অবকাঠামোর অসম বিস্তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা; গ্রাম ও শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল সুবিধার সমতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নীতি-পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার ক্ষেত্রে ধারণাগত ও বাস্তব, উভয় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনর্গঠন, নীতিনির্ধারণে প্রযুক্তি সচেতন নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক ব্যবসা ও মাইক্রোক্রেডিটভিত্তিক উদ্যোগকে মূলধারার অর্থনীতিতে যুক্ত করার প্রচেষ্টা, এসবই একটি প্রযুক্তিসমর্থ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেয়। তবে স্থায়ী প্রযুক্তি রূপান্তর ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা চাইলে শিক্ষা, অবকাঠামো, গবেষণা, নিখুঁত নীতি ও রাজনৈতিক স্থায়িত্বের মতো ক্ষেত্রগুলোকে আরও শক্তিশালী করার বিকল্প নেই।
লেখক : প্রকল্প পরিচালক, ডিজিটাল উদ্যোক্তা এবং উদ্ভাবন ইকো-সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প
