‘ওরা ১১ জন’ মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত দলিল
স্বাধীন বাংলায় সেলুলয়েডে মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে রাখার জন্য নির্মাতারা সবসময় আগ্রহ দেখিয়েছেন। সেই ধারা আজও অব্যাহত আছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু সিনেমা। যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে স্বাধীন বাংলার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’। এটি পরিচালনা করেছেন চাষী নজরুল ইসলাম। প্রযোজক ছিলেন মাসুদ পারভেজ (সোহেল রানা)। ১৯৭২ সালের ১১ আগস্ট সিনেমাটি মুক্তি পায়। বাংলাদেশের সিনেমায় নতুন এক ধারার পথিকৃৎ হিসাবে এর স্থান উচ্চাসনে। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
রিয়েল তন্ময়
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী জাতির জীবনে যখন স্বপ্ন আর আশার আলো উঁকি দিচ্ছিল, তখন এ বিজয়গাথাকে সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। সেই ভাবনা থেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এটিই ছিল তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা। অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার মধ্যেও চাষী নজরুল ইসলাম ও তার টিম এই ঐতিহাসিক সিনেমা নির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। তৎকালীন সরকারের প্রত্যক্ষ সমর্থন ও প্রযোজক হিসাবে অবদান এ সিনেমাকে সফলভাবে বড়পর্দায় আনার পথ সুগম করে।
১১ দফা ছাত্র আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ বপিত হয়। যা পরবর্তীকালে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে ১১ জন সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। এ চিন্তা থেকে সবার সম্মতিক্রমে সিনেমার নাম নির্বাচন করা হয়েছিল ‘ওরা ১১ জন’-এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই জানিয়েছিলেন পরিচালক। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের এক সপ্তাহ পর থেকেই সিনেমাটি নির্মাণে মাঠে নেমে পড়েন তিনি। সিনেমা দীর্ঘ হলেও এর গল্পকাঠামো, সংলাপ আর বক্তব্যের কারণেই ‘ওরা ১১ জন’ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সিনেমাগুলোর শীর্ষে।
এর কাহিনি গড়ে উঠেছে ১১ তরুণ মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামকে কেন্দ্র করে। ভিন্ন পটভূমি থেকে আসা এ মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন, স্বপ্ন আর স্বজনদের ত্যাগ করে একত্রিত হন স্বাধীনতা অর্জনের মহান লক্ষ্যে। তাদের প্রতিরোধ, যুদ্ধের কৌশল এবং শত্রুদের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্যগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। যুদ্ধের বিভীষিকার পাশাপাশি জাতির নবজাগরণের গল্পও এতে স্থান পেয়েছে। স্বাধীনতার জন্য যে আত্মত্যাগ ও সাহসিকতার প্রয়োজন হয়েছিল, তারই এক অমর চিত্রায়ণ ‘ওরা ১১ জন’।
সিনেমার প্রযোজক অভিনেতা সোহেল রানা বলেন, ‘এই সিনেমার সঙ্গে আমার নামটি জড়িয়ে আছে এজন্য ভালো লাগে। আমি গর্ববোধ করি। ভাবতে ভীষণ ভালো লাগে, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সিনেমার প্রযোজক আমি। বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে আমার এ সিনেমার নামটি জড়িয়ে আছে। এ ইতিহাস থেকে যাবে। মুক্তিযুদ্ধের একটি দলিলও বটে এ সিনেমা।’
গল্পে দেখা যায়, ঢাকায় মামাবাড়ি থেকেই লেখাপড়া করেন খসরু ও তার বোন মিতা। সেখানেই প্রতিবেশী শীলার সঙ্গে খসরুর বিয়েও ঠিক হয়। অন্যদিকে মেডিকেল কলেজের ছাত্রী মিতার সঙ্গে শীলার প্রকৌশলী ভাই পারভেজের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের এ সম্পর্ক ও বিয়ের বিষয় সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। ঠিক তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তরুণরা যখন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়, তখন খসরুও চলে যান যুদ্ধে। তার নেতৃত্বে আরও দশজন সঙ্গী নিয়ে গঠন করা হয় গেরিলা বাহিনী। এদিকে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করায় পারভেজকে বন্দি করে রাখে পাকিস্তানি বাহিনী। শারীরিক নির্যাতন চালায়, তবুও পারভেজের কাছ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের খবর বের করতে পারে না। এরপর পারভেজের সামনেই তার মা আর ছোট ভাইকে হত্যা করে পাকবাহিনী। বোন শীলাকে অমানবিক নির্যাতন করে। এদিকে মিতা বিক্রমপুরে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় সেখানকার চিকিৎসক দলের সঙ্গে যোগদান করে। একদিন সেও পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্যাতনের শিকার হয়। শত্রুবাহিনীর আত্মসমর্পণ আর মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হয়। যুদ্ধ শেষে অনেকেই ঘরে ফেরে। কারও জন্য পরিবারের সদস্যরা পথ চেয়ে থাকে। কিন্তু তার আর ফেরা হয় না। কেউবা ফিরে এসে পরিবারের খোঁজ পায় না।
বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর সিনেমাটি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ওরা ১১ জন সিনেমাটি সেই সময় খ্যাতিমান পরিচালক মুস্তাফিজ বিনা পারিশ্রমিকে করে দিতে চেয়েছিলেন। তবে প্রযোজক সোহেল রানা বিনয়ের সঙ্গে তাকে ‘না’ করে বলেন, বন্ধু চাষী নজরুল ইসলামকে তিনি কথা দিয়েছেন। স্টার ফিল্মসের সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করা হয়। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়ে চার মাসব্যাপী জয়দেবপুর, গাজীপুর সেনানিবাস, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন স্থানে সিনেমাটির শুটিং করা হয়।
এ সিনেমায় সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদেরও দেখানো হয়েছে। তবে অভিনয়ের যতটুকু দৃশ্য আছে, সেগুলো অভিনয়শিল্পীরা করেছেন। শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়েই সিনেমাটি নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও স্টার ফিল্মসের আবদারে রাজ্জাক, শাবানাদের মতো তারকাদের সিনেমায় যুক্ত করা হয়। মুক্তির আগেই হলমালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ নিয়ে সিনেমার লগ্নি করা টাকা উঠে এসেছিল বলে জানা যায়। এর নির্মাণ ব্যয় ছিল পাঁচ লাখ টাকা, মুক্তির পর আয় করে চল্লিশ লাখ টাকা। মুক্তির পর এটি যেমন ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য পেয়েছে, তেমনি সমালোচকদের প্রশংসাও পেয়েছিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদও সিনেমার শুটিংয়ে ব্যবহার করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউর রহমানের সহায়তায় পাকিস্তান বাহিনীর ফেলে যাওয়া অস্ত্র ও রসদ দিয়ে যুদ্ধের দৃশ্যধারণ করা হয়। সিনেমায় ব্যবহারের জন্য গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মস ও অ্যামুনেশন সরবরাহ করা হয়। মূলত যুদ্ধের দৃশ্যগুলো আরও বাস্তবিক করে তুলতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এতে গাজীপুর সেনানিবাসের সেনা সদস্যরাও অভিনয় করেছেন। সত্যিকারের অস্ত্র ব্যবহারের ফলে ছবির শুটিংয়ে বেশ ঝুঁকিও পোহাতে হয়। জীবদ্দশায় এক সাক্ষাৎকারে নির্মাতা বলেন, ‘একটি মেয়েকে পাকিস্তানি হানাদাররা তাড়া করবে এবং গুলি ছুড়তে থাকবে, কিন্তু মেয়েটির গায়ে কোনো গুলি লাগবে না। যেহেতু আসল গুলি, তাই দৃশ্যটি ধারণ খুব ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। গুলি করলে মেয়েটির গায়ে লাগার সম্ভাবনাই বেশি। গুলি ছোড়ার দায়িত্বটি কেউই নিতে চাইলেন না। এমনকি চিত্রগ্রাহকও দৃশ্যটি ধারণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। শেষ পর্যন্ত খসরু গুলি ছোড়ার দায়িত্ব নিলেন। মেয়েটি দৌড়াচ্ছে আর খসরু একে একে ৩০টি গুলি ছুড়লেন। গুলি মেয়েটির খুব কাছ দিয়ে চলে গেল, কয়েকটা জামাও স্পর্শ করল, কিন্তু একটাও শরীরে লাগল না। সফলভাবে দৃশ্যটি ধারণ শেষে সবাই আনন্দে খসরুকে জড়িয়ে ধরে।’
সিনেমাটির রচয়িতা ছিলেন আল মাসুদ, চিত্রনাট্যকার কাজী আজিজ আহমেদ, সংলাপ রচনা করেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এ সিনেমার জন্য ১৯৭২ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা হিসাবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। সংগীত ও সুরকার ছিলেন খোন্দকার নুরুল আলম। এ সিনেমার ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা’ গানটি গেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। চিত্রগ্রাহক ছিলেন আবদুস সামাদ, চিত্রসম্পাদনা করেছেন বশীর হোসেন। প্রযোজনা কোম্পানি হিসাবে ছিল পারভেজ ফিল্মস ও স্টার ফিল্ম করপোরেশন লিমিটেড। পরিবেশক ছিল স্টার ফিল্ম ডিসট্রিবিউটর্স।
১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর শ্রীনগর থানার সমষপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। ১৯৬০ সালে ফতেহ লোহানীর সঙ্গে ‘আসিয়া’ সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ শুরু করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। যুদ্ধপরবর্তী ১৯৭২ সালে পরিচালনা করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিনেমা ‘ওরা ১১ জন’। তিনি সব মিলিয়ে ৩৫টি সিনেমা নির্মাণ করেন। এর মধ্যে ছয়টি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক। সিনেমা পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতার জন্য পেয়েছেন ‘একুশে পদক’ এবং ‘জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার’সহ অনেক সম্মাননা। ২০১৪ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকে ২০১৫ সালের ১১ জানুয়ারি মারা যান স্বনামধন্য এ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও নির্মাতা।
