আন্তর্জাতিক উৎসবে নজর কাড়ছে বাংলাদেশের সিনেমা
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশি সিনেমা ধীরে হলেও একটি দৃশ্যমান অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এটি এখনো মূলধারার বৈশ্বিক বাজার দখল করতে না পারলেও ‘উৎসবকেন্দ্রিক সিনেমা’ হিসাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলাদা করে নজর কাড়ছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে নিয়মিত অংশগ্রহণ, নির্বাচিত হওয়া এবং পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের সিনেমাকে নতুন করে সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
Advertisement
রিয়েল তন্ময়
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা দেখা যেত বিচ্ছিন্নভাবে। কিন্তু গত এক দশকে সে চিত্র বদলেছে। কান, বার্লিন, লোকার্নো, বুসান, টরন্টো, রটারডাম, গোয়া, কলকাতার মতো উৎসবে বাংলাদেশি সিনেমার উপস্থিতি এখন আর বিরল নয়। দেশের একাধিক নির্মাতার সিনেমা আন্তর্জাতিক দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে। এ ধারাবাহিক অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সিনেমা এখন উৎসব মানচিত্রে একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠছে।
২৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরে বসবে রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবের ৫৫ আসরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের তিন সিনেমা। এগুলো হলো-‘মাস্টার’, ‘রইদ’ এবং ‘দেলুপি’। উৎসবের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা বিভাগের একটি ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’-এ লড়বে নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের পলিটিক্যাল থ্রিলার ‘মাস্টার’। শৈল্পিক মান এবং বাণিজ্যিক আবেদন- উভয়কেই ধারণ করে এমনসব সিনেমাই ঠাঁই করে নেয় ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’-এ। রাজনীতি, সংঘাত ও মানবিকতার গল্প নিয়ে নির্মিত ১২২ মিনিট দৈর্ঘ্যরে এ সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে জহির নামের এক আদর্শবান শিক্ষককে ঘিরে। স্কুল, পরিবার আর নিজের আদর্শ নিয়ে বাঁচতে চাওয়া জহির পরিস্থিতির চাপে একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর তার জীবনে শুরু হয় নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাত। জনমানুষের প্রত্যাশা, অন্যায্য আবদার এবং নিজের বিবেকের দ্বন্দ্বে জহির কি তার আদর্শ ধরে রাখতে পারেন, নাকি বদলে যান অন্য এক মানুষে, তাই উঠে এসেছে এ সিনেমায়। এতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, শরীফ সিরাজ, তাসনোভা তামান্না, আমিনুর রহমান মুকুল ও মাহমুদ আলম। নির্মাতার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘মাস্টার’ বড়পর্দার কথা মাথায় রেখেই নির্মিত, তাই এর কারিগরি দিকগুলোয় দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। সিনেমাটির সম্পাদনা করেছেন অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত সিনেমার (জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া) সম্পাদক এবং একাডেমি মেম্বার ক্রিস্টান স্প্রাগ।
একই উৎসবের ‘ব্রাইট ফিউচার’ বিভাগে স্থান করে নিয়েছে তাওকীর ইসলাম পরিচালিত সিনেমা ‘দেলুপি’। খুলনার মাটির গন্ধ ও নদীর গল্প আর মানুষের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে এটি নির্মিত হয়েছে। রটারডামে ‘দেলুপি’র যাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পরিচালক বলেন, ‘রটারডাম থেকে আমরা যখন প্রথম মেইল পেয়ে জানতে পারি তারা সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করতে চায়, তখন একটু বিপাকেই পড়ে গিয়েছিলাম। কেননা আমরা সিনেমা বানানোর সময় দেলুটি ইউনিয়নের মানুষদের কথা দিয়েছিলাম যে, সিনেমাটা তাদেরই প্রথমে দেখাব। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল আগে বাংলাদেশের মানুষদের সিনেমাটা দেখানোর। আমাদের এ ইচ্ছাটা ফেস্টিভ্যালের অর্গানাইজারদের জানিয়েছিলাম। তারাও রাজি হয় এ ব্যাপারে। রটারডামের মতো বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি সিনেমার অংশগ্রহণ দেশের সিনেমাশিল্পের জন্য গর্বের বিষয়।
এতে বিশ্বের সেরা নির্মাতা, উদীয়মান প্রতিভা ও আর্ট হাউজ সিনেমার প্রতিনিধিত্বকারীরা অংশ নেবেন। সেখানে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি আনন্দিত।’ উল্লেখ্য, ‘দেলুপি’ গত ৭ নভেম্বর খুলনায় মুক্তি পায়। সিনেমার চিত্রনাট্যে উঠে এসেছে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাত্রাশিল্পীদের সংগ্রাম এবং এ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা। এতে অভিনয় করেছেন চিরণজিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, মো. জাকির হোসেনসহ অনেকে। তারা প্রত্যেকেই খুলনার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। নির্মাতা জানান, দেলুপি নামটি এসেছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ন থেকে। সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন, বাস্তবতা আর সম্পর্কের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে দেলুপির গল্প, যা শুধু এই অঞ্চলের নয়, বরং একইসঙ্গে দেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনের গল্প।
অন্যদিকে নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমনের দ্বিতীয় সিনেমা ‘রইদ’ এবারের রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান পেয়েছে। সিনেমাটি নির্বাচিত হয়েছে আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘টাইগার কম্পিটিশন’-এ। এর বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ প্রমুখ। যৌথভাবে রইদের গল্প লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। সেটিকে চিত্রনাট্যে রূপ দিয়েছেন মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। আগামী বছর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘রইদ’।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের যেসব সিনেমা প্রশংসা পাচ্ছে, সেগুলোর বড় শক্তি হলো স্থানীয় বাস্তবতা থেকে উঠে আসা সার্বজনীন গল্প। গ্রামবাংলার জীবন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য, পরিচয় সংকট কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন-এ বিষয়গুলো বিদেশি দর্শকের কাছেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
উৎসবগুলোতে মূলধারার বিনোদন নয়, বরং স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও মানবিক গল্প খোঁজা হয়, আর এ জায়গায়ই বাংলাদেশের সিনেমা সম্ভাবনা তৈরি করছে। সীমিত বাজেট সত্ত্বেও নির্মাতারা গল্প ও নির্মাণ ভাষায় যে সততা দেখাচ্ছেন, সেটিই আন্তর্জাতিক উৎসবের নির্বাচকদের আকৃষ্ট করছে। আন্তর্জাতিক এসব উৎসবে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে দেশের নির্মাতারা শুধু প্রদর্শনী নয়, বরং কো-প্রোডাকশন, ফান্ডিং ও ওয়ার্কশপেরও সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক সিনেমাই এখন ‘ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার’ বা ‘প্রজেক্ট মার্কেট’ থেকে বিদেশি সহযোগী পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের কাজের পথ প্রশস্ত করছে। এ যোগাযোগ ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সিনেমার প্রযুক্তিগত মান, গল্প বলার ধরন ও বাজার বোঝাপড়া-সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেশের সিনেমার অংশগ্রহণ ও আলোচনার মধ্যেও কিছু সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক উৎসবে সাফল্য পেলেও এসব সিনেমার ঘরোয়া প্রদর্শন ও বাণিজ্যিক সাফল্য খুব একটা আশা জাগাতে পারছে না। উৎসবে প্রশংসিত অনেক সিনেমাই দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় না বা পেলেও দর্শকের কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও স্থানীয় দর্শকের মাঝে একটি দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি বিপণন ও আন্তর্জাতিক সেলস এজেন্টের অভাবের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় সিনেমা উৎসবের গণ্ডি পেরিয়ে বড় বাজারে যেতে পারছে না।
বলা যায়, আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা এখন ‘উদীয়মান সম্ভাবনা’র পর্যায়ে রয়েছে। এটি এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্প-সফলতা নয়, কিন্তু স্পষ্ট একটি দিকনির্দেশনা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত উৎসব নির্বাচন, পুরস্কার ও আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি সিনেমা বিশ্ব সিনেমার মানচিত্রে নিজের জায়গা খুঁজে নিচ্ছে। ভবিষ্যতে যদি রাষ্ট্রীয় সহায়তা, প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক বিপণন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে, তবে এ সম্ভাবনা আরও শক্ত ভিত্তিতে রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তখন আন্তর্জাতিক উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমা শুধু উপস্থিতই থাকবে না, বরং একটি শক্তিশালী পরিচয় নিয়ে বিশ্বদর্শকের সামনে দাঁড়াবে।
