Logo
Logo
×
   

আনন্দ নগর

বিশ্ববাজারে শীর্ষ ৩-এ তুর্কি সিরিজ

নেপথ্যের রহস্য কী?

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববাজারে শীর্ষ ৩-এ তুর্কি সিরিজ

হলিউডের অ্যাকশন, কোরিয়ার রোমান্স কিংবা লাতিন আমেরিকার মেলোড্রামার ভিড়ে গত এক দশকে নতুন এক সাংস্কৃতিক শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে তুরস্কের টেলিভিশন সিরিজ। আবেগঘন গল্প, ঐতিহাসিক পটভূমি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের অনন্য মেলবন্ধনের কারণে বিশ্বের শতাধিক দেশে তুর্কি সিরিজ এখন বিপুল জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয়তার বিচারে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের পরই এখন তুরস্কের অবস্থান।

* বিশ্ববাজারে তুরস্কের উত্থান

একসময় আন্তর্জাতিক টেলিভিশন অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযোজনাই ছিল দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু সেই চিত্র দ্রুত বদলে দিয়েছে তুরস্ক। আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান প্যারট এনালাইটিকস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, স্ক্রিপ্টেড বা চিত্রনাট্যনির্ভর টেলিভিশন সিরিজের জনপ্রিয়তায় দক্ষিণ কোরিয়াসহ অনেক দেশকে ছাড়িয়ে তুরস্ক এখন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার কোটি কোটি দর্শক নিয়মিত তুর্কি সিরিজ দেখছেন। ফলে বিনোদন শিল্পের পাশাপাশি তুরস্কের সংস্কৃতি ও ভাষাও বিশ্বব্যাপী নতুন পরিচিতি পাচ্ছে।

* যে ঐতিহাসিক সিরিজগুলো বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছে

► মুহতেশেম ইউজিয়েল-সুলতান সুলেমান : ২০১১ সালে প্রচার শুরু হওয়া এই সিরিজকে তুরস্কের ইতিহাসভিত্তিক নাটকের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসাবে ধরা হয়। এতে অটোমান সম্রাট সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট এবং হুররেম সুলতানের জীবন তুলে ধরা হয়েছে। সিরিজটি ৭০টিরও বেশি দেশে সম্প্রচারিত হয়েছে এবং ৫০ কোটিরও বেশি দর্শকের কাছে পৌঁছেছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এ নাটকই আন্তর্জাতিক বাজারে তুর্কি ধারাবাহিকের বিস্ফোরক উত্থানের পথ তৈরি করে।

► দিরিলিশ-আরতুগ্রুল : অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজীর পিতা আরতুগ্রুল গাজীর জীবনভিত্তিক এ সিরিজ ২০১৪ সালে প্রচার শুরু হয়। তুরস্কের বাইরে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ায় এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যুদ্ধ, নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও ইসলামি মূল্যবোধের সমন্বয়ে নির্মিত এ সিরিজ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও বিপুল দর্শক টানে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তুর্কি ঐতিহাসিক নাটকের নতুন পরিচয় তৈরি করে।

► কুরুলুশ-উসমান : ‘দিরিলিশ : আরতুগ্রুল’-এর ধারাবাহিকতা হিসাবে নির্মিত এ সিরিজে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উসমান গাজীর শাসন ও সাম্রাজ্য গঠনের কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৯ সালে প্রচার শুরু হওয়ার পর এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সম্প্রচারিত হয় এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেও জনপ্রিয়তা লাভ করে।

► আলপারসালান-বুউক সেলজুক : সেলজুক সাম্রাজ্যের বিখ্যাত শাসক আলপারসালানের জীবন ও সামরিক অভিযানের ওপর নির্মিত এ ধারাবাহিক ইতিহাসপ্রেমীদের মধ্যে বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি করে। যুদ্ধ, কৌশল এবং মধ্যযুগীয় ইসলামি সাম্রাজ্যের বিস্তার এতে প্রাধান্য পায়।

► উয়ানিশ-বুউক সেলজুক : সেলজুক সুলতান মালিক শাহ এবং বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক নিজামুল মুলকের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, ষড়যন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার গল্প নিয়ে নির্মিত এ সিরিজও আন্তর্জাতিক দর্শকদের নজর কাড়ে।

► ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরি-কোসেম : এটি বাংলায় সাধারণত ‘সুলতান সুলেমান : কোসেম’ নামে পরিচিত। অটোম্যান সাম্রাজ্যের দাসী আনাস্তাসিয়া পরে সুলতান প্রথম আহমেদের স্ত্রী কোসেম সুলতান হন। বুদ্ধিমত্তা, রাজনৈতিক কৌশল ও ক্ষমতার লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে তিনি সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী নারী হয়ে ওঠেন। প্রেম, ষড়যন্ত্র, রাজনীতি ও রাজবংশের টিকে থাকার সংগ্রামই এ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকের মূল বিষয়।

* আবেগই সবচেয়ে বড় শক্তি

তুর্কি সিরিজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানবিক আবেগের গভীর ও বাস্তব উপস্থাপন। এতে প্রেম, পারিবারিক বন্ধন, আত্মত্যাগ, ঈর্ষা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান-প্রতিটি অনুভূতিকে গল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে তুলে ধরা হয়। এসব আবেগ শুধু নাটকীয়তা তৈরির জন্য নয়; বরং চরিত্রের বিকাশ ও জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দর্শকের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।

তুর্কি সিনেমা নির্মাতা মুরাত পায় ইকোনমিস্টকে বলেন, ‘তুর্কির সংস্কৃতির গভীরে কাব্যিকতা ও মানবিক অনুভূতি এতটাই প্রোথিত যে, ধর্মীয় বা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট না থাকলেও সেই আবেগ স্বাভাবিকভাবেই গল্পে প্রকাশ পায়। আর ঠিক এ কারণেই বিশ্বের নানা ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ এসব গল্পের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পান।’

* ইতিহাস ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

তুরস্কের জনপ্রিয় সিরিজগুলোর আরেকটি বড় শক্তি হলো আধুনিক জীবনধারার সঙ্গে ঐতিহ্যের ভারসাম্য। চরিত্রগুলো আধুনিক পোশাক পরে, সমসাময়িক জীবনযাপন করে; কিন্তু একইসঙ্গে পরিবার, নৈতিকতা, সামাজিক দায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক শিকড়কে গুরুত্ব দেয়। ফলে দর্শক একইসঙ্গে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখতে পান। দেশটির চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক এমরে আভসার এ মূল্যবোধকে ‘আনাতোলীয় প্রজ্ঞা’ বলে উল্লেখ করেন। তার মতে, বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক শিষ্টাচার এবং নৈতিক সীমারেখা তুর্কি গল্পের অন্যতম ভিত্তি।

* মুসলিম সমাজের ভিন্ন এক চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুর্কি সিরিজ আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে মুসলিম সমাজ ও ইসলামের এমন একটি ইতিবাচক ও মানবিক চিত্র তুলে ধরে, যা পশ্চিমা সিনেমায় খুব কমই দেখা যায়। ধর্মীয় মূল্যবোধকে এখানে কঠোর প্রচারণার মাধ্যমে নয়; বরং পারিবারিক সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ, সহমর্মিতা এবং আত্মত্যাগের মতো মানবিক আচরণের মধ্যদিয়ে উপস্থাপন করা হয়। ফলে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির দর্শকরাও এসব গল্পের সঙ্গে সহজেই সংযোগ স্থাপন করতে পারেন।

* কেন বিদেশি দর্শকের কাছে এত আপন

দ্য ইকোনমিস্ট বিভিন্ন দেশের দর্শকদের কাছে ঠিক এ প্রশ্নটি রেখেছিল। উত্তরে পাকিস্তানের লাহোরের দর্শক আইজা রাফি বলেন, ‘তুর্কি সিরিজে পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতির সঙ্গে পাকিস্তানি সমাজের অনেক মিল রয়েছে। তাই এসব গল্প তার কাছে বাস্তব ও পরিচিত মনে হয়।’

মালয়েশিয়ার নুরুল হুদা জাকারিয়া মনে করেন, ‘এসব সিরিজে বিশ্বজনীন মানবিক মূল্যবোধ ফুটে ওঠে, যা বিভিন্ন দেশের দর্শকের অনুভূতির সঙ্গে মিল খুঁজে পায়।’

অন্যদিকে মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার শাইমা বলেন, ‘শক্তিশালী মানবিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং চরিত্রগুলোর আন্তরিকতা তাকে তুর্কি সিরিজের প্রতি আকৃষ্ট করেছে।’

বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে তুর্কি সিরিজের জনপ্রিয়তা প্রায় আকাশছোঁয়া। এখানকার দর্শকদের কাছে উপরোক্ত কারণেই সিরিজগুলো বেশ জনপ্রিয়।

* গল্প বলার শত বছরের ঐতিহ্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, তুরস্কের সাফল্যের মূল ভিত্তি তাদের দীর্ঘদিনের গল্প বলার সংস্কৃতি। লোকনাট্য, ছায়ানাট্য কারাগোজ, ঐতিহ্যবাহী ওরতাওয়ুনু, মৌখিক কাহিনি এবং সংগীতনির্ভর নাট্যরীতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক তুর্কি টেলিভিশন সিরিজের ভাষা। এ ঐতিহ্যই তাদের গল্পকে শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বাহক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে।

* সফট পাওয়ারের নতুন হাতিয়ার

বিশ্লেষকরা মনে করেন, তুরস্কের টেলিভিশন সিরিজ এখন দেশটির অন্যতম কার্যকর ‘সফট পাওয়ার’। এসব সিরিজের মাধ্যমে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ তুরস্কের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, জীবনধারা এবং পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে জানতে পারছেন। অনেক দর্শক তুর্কি ভাষা শেখার আগ্রহও প্রকাশ করছেন, আবার অনেকে সিরিজে দেখা ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখতে তুরস্কে ভ্রমণ করছেন। ইস্তাম্বুল তিকারেত বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক বেদরি মেরমুতলু তুর্কি গণমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ডকে বলেন, ‘মানুষ সব সময় নতুন গল্প ও নতুন সমাজকে জানতে চায়। আর সেই কৌতূহলই তুর্কি সিরিজকে বিশ্বদর্শকের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।’

তবে তুরস্কের টেলিভিশন সিরিজের সাফল্য শুধু উন্নত নির্মাণশৈলী বা বড় বাজেটের গল্প নয়। ইতিহাস, মানবিক আবেগ, পারিবারিক মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক শিকড় এবং আধুনিকতার সমন্বয়ে তারা এমন এক গল্প বলার ধারা তৈরি করেছে, যা ভাষা, ধর্ম ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে বিশ্বজুড়ে দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। তাই আজ তুর্কি সিরিজ শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি তুরস্কের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয়ের এক শক্তিশালী বৈশ্বিক দূত হিসাবেই পরিচিত।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .