Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

বইয়ের পাতা থেকে পর্দায়

পাঠকের কল্পনা যখন জীবন্ত দৃশ্য

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পাঠকের কল্পনা যখন জীবন্ত দৃশ্য

‘আগুনের পরশমণি’ সিনেমার একটি দৃশ্য।

Advertisement

একটি ভালো বই পাঠকের মনে যে ছবি আঁকে, সিনেমা নির্মাতা সেটিকেই ক্যামেরার ভাষায় দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন। কখনো সেই চেষ্টা জন্ম দেয় ‘হ্যারি পটার’, ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’, ‘থ্রি ইডিয়টস’ কিংবা ‘গোলাপী এখন’র মতো সাফল্যের; আবার কখনো বিপুল বাজেট ও জনপ্রিয় সাহিত্যকর্ম থাকা সত্ত্বেও ‘দ্য গোল্ডেন কম্পাস’ বা ‘মর্টাল হঞ্জিনস’ হয়ে যায় ব্যর্থতার উদাহরণ। বর্তমানে সিনেমার পাশাপাশি ওয়েব সিরিজও বিশ্বের বিখ্যাত লেখকদের বই থেকে গল্প নেওয়ার অন্যতম বড় ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে বিনোদন জগতে।

* হলিউডে বই মানেই বড় বাজির গল্প

হলিউডে বই থেকে সিনেমা নির্মাণের সবচেয়ে সফল উদাহরণগুলোর একটি জে কে রাউলিংয়ের ‘হ্যারি পটার’ সিরিজ। ২০০১ সালে ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য সর্সারারস স্টোন’ দিয়ে শুরু হওয়া সিনেমা সিরিজটি বিশ্বজুড়ে বিশাল দর্শকগোষ্ঠী তৈরি করে। ‘হ্যারি পটার অ্যান্ড দ্য ডেথলি হ্যালোস : পার্ট-২’ বিশ্বব্যাপী ১.৩২৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল, ২০১৩ সালের আগে যুক্তরাজ্যের লেখকদের গল্প বা চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত সর্বোচ্চ আয়কারী সিনেমাগুলোর তালিকায় এটি ছিল শীর্ষে।

জে আর আর টলকিনের ‘দ্য লর্ড অফ দ্য রিংস’ও সাহিত্যের পাতাকে অভূতপূর্বভাবে পর্দায় নিয়ে আসে। বিশেষ করে ‘দ্য রিটার্ন অফ দ্য কিং’ বিশ্বব্যাপী এক বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করে। ‘দ্য হাঙ্গার গেইমস’ ‘টুইলাইট’, ‘দ্য হবিট’, ‘ডিউন’র মতো বই-ভিত্তিক সিনেমাও বাণিজ্যিকভাবে বড় সাফল্য পেয়েছে। বক্স অফিসের হিসাবে ‘দ্য হাঙ্গার গেইমস : ক্যাচিং ফায়ার’ যুক্তরাষ্ট্রে ৪২৪.৭ মিলিয়ন ডলার এবং ‘দ্য হাঙ্গার গেইমস’ ৪০৮ মিলিয়ন ডলার আয় করে।

এসব সাফল্যের পেছনে একটি বড় কারণ হলো বইয়ের তৈরি পাঠকভিত্তি। এক্ষেত্রে চরিত্র ও গল্পের সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত থাকায় সংশ্লিষ্ট সিনেমা মুক্তির আগেই একটি সম্ভাব্য দর্শকগোষ্ঠী তৈরি হয়। একইসঙ্গে কল্পনাপ্রসূত জগৎ, বড় বাজেট, তারকাশিল্পীদের উপস্থিতি ও বিপণন এসব গল্পকে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেয়।

তবে বই জনপ্রিয় হলেই সিনেমা সফল, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফিলিপ পুলম্যানের ‘হিজ ডার্ক ম্যাটেরিয়ালস’ অবলম্বনে ২০০৭ সালের ‘দ্য গোল্ডেন কম্পাস’ নির্মিত হয়েছিল ১৮০ মিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেটে। বিশ্বব্যাপী ৩৭২.২ মিলিয়ন ডলার আয় করলেও যুক্তরাষ্ট্রে আয় ছিল মাত্র ৭০.১ মিলিয়ন ডলার। ফলে এর প্রত্যাশিত ফ্র্যাঞ্চাইজি দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। একইভাবে ফিলিপ রিভের উপন্যাস অবলম্বনে ‘মর্টাল ইঞ্জিনস’ প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের বিপরীতে মুক্তির প্রথম সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৭.৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে এবং বিশ্বব্যাপী আয় প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলারে গিয়ে থেমে যায়।

* বলিউডে সাহিত্য থেকে ‘জনপ্রিয়’ সিনেমা

বলিউডের ইতিহাসে বই থেকে সিনেমা তৈরির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ সম্ভবত সবচেয়ে বেশি পুনর্নির্মিত ভারতীয় সাহিত্যকর্মগুলোর একটি। বিমল রায়ের ১৯৫৫ সালের ‘দেবদাস’ থেকে শুরু করে সঞ্জয় লীলা বানসালির ২০০২ সালের সংস্করণ, একই গল্প ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভাষায় দর্শকের কাছে ফিরে এসেছে। শরৎচন্দ্রের ‘পরিনীতা’ অবলম্বনে প্রদীপ সরকারের ২০০৫ সালের সিনেমাও প্রশংসিত হয়। বিদ্যা বালান, সাইফ আলী খান ও সঞ্জয় দত্তের অভিনয়, সময়কালীন আবহ, সংগীত ও প্রেমের আবেগ সিনেমাটিকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

তবে বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত বই থেকে সিনেমা রূপান্তরগুলোর একটি রাজকুমার হিরানির ‘থ্রি ইডিয়টস’। চেতন ভগতের ‘ফাইভ পয়েন্ট সামওয়ান’ অবলম্বনে নির্মিত হলেও সিনেমাটি বইয়ের কাহিনিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনে। তবু শিক্ষাব্যবস্থার চাপ, বন্ধুত্ব, স্বপ্ন ও নিজের পছন্দের পথে চলার বার্তা ভারতীয় তরুণদের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করে। মুক্তির পর এটি বক্স অফিসের প্রচলিত হিসাব বদলে দেওয়া সাফল্য অর্জন করে।

বই থেকে সিনেমা বানানোর আরেক সৃজনশীল উদাহরণ বিশাল ভরদ্বাজের ‘মকবুল’ ও ‘ওমকারা’। শেক্সপিয়রের ‘ম্যাকবেথ ও ‘ওথেলো’কে যথাক্রমে মুম্বাইয়ের অপরাধ জগৎ ও ভারতের গ্রামীণ বাস্তবতায় বসিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, শত বছরের পুরোনো গল্পও নতুন সংস্কৃতি ও সময়ের সঙ্গে মিশে যেতে পারে।

* ঢালিউডে বইনির্ভর সিনেমার জাদু

বাংলাদেশে উপন্যাস বা গল্প তথা সাহিত্য থেকে সিনেমা নির্মাণের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি ঢাকাই সিনেমার জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ (১৯৫৬) নির্মিত হয়েছিল পরিচালক আব্দুল জব্বার খানেরই লেখা ‘ডাকাত’ নাটকের গল্প বা কাহিনি অবলম্বনে। পরবর্তী সময়ে জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন থেকে শুরু করে হুমায়ূন আহমেদের মতো প্রবাদপ্রতিম নির্মাতারা বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী গল্প-উপন্যাসকে সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করেছেন। জহির রায়হান নিজের লেখা জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে সিনেমা নির্মাণের ধারা শুরু করেন। একই সময় অন্য সাহিত্যিকদের লেখা গল্প থেকেও সিনেমা নির্মিত হতে থাকে। যেমন, কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের গল্প নিয়ে তৈরি হয় অ্যাকশন সিনেমা।

স্বাধীনতার পরবর্তী দুই দশক ছিল বাংলাদেশের সাহিত্যনির্ভর সিনেমার সবচেয়ে সোনালি অধ্যায়। এ সময় গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে লেখা বিখ্যাত সব উপন্যাস পর্দায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। শহীদুল্লা কায়সারের বিখ্যাত ‘সারেং বৌ’ উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুন একই নামে সিনেমা নির্মাণ করেন, যা ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পরিচালক আমজাদ হোসেনের নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস থেকে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছিল তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক অনবদ্য দলিল। আবু ইসহাকের কালজয়ী উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ অবলম্বনে মসিহউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী যৌথভাবে একই নামে সিনেমা পরিচালনা করেন। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত। অদ্বৈত মল্লবর্মণের উপন্যাস অবলম্বনে ঋত্বিক ঘটক বানিয়েছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ উপন্যাস নিয়ে চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় ‘দেবদাস’ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অবলম্বনে একই নামে গৌতম ঘোষের সিনেমাও ছিল দর্শকপ্রিয় ও আলোচিত।

নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশের সিনেমায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেন জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তিনি তার নিজের লেখা উপন্যাস থেকে নিজেই বেশ কিছু অসাধারণ সিনেমা উপহার দেন। এগুলোর মধ্যে তার উপন্যাসের রূপান্তর ‘শঙ্খনীল কারাগার’ (পরিচালনা মুস্তাফিজুর রহমান) এবং তার পরিচালনায় ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’ ও ‘শ্যামল ছায়া’ সিনেমাগুলো মধ্যবিত্ত দর্শককে আবার প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনে। এই দশকের আরেকটি অন্যতম সেরা সাহিত্যনির্ভর সিনেমা ছিল জহির রায়হানের ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাস অবলম্বনে কোহিনূর আক্তার সুচন্দার একই নামের সিনেমা। পরবর্তী সময়ে হুমায়ূন আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ (পরিচালক তৌকীর আহমেদ) ও ‘কৃষ্ণপক্ষ’ উপন্যাস নিয়েও সিনেমা নির্মিত হয়।

মূলত, ঢালিউডে সাহিত্যনির্ভর সিনেমার সাফল্যের বড় কারণ হলো পরিচিত গল্প ও চরিত্রের আবেগ। পাঠকের কল্পনায় আগে থেকেই তৈরি চরিত্রকে প্রিয় অভিনেতার অভিনয়ে দেখতে পাওয়ার আকর্ষণ দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে টানে।

* ওয়েব সিরিজে নতুন সম্ভাবনা

স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম বইয়ের রূপান্তরকে আরও বড় পরিসর দিয়েছে। ওয়াল্টার টেভিসের ১৯৮৩ সালের উপন্যাস অবলম্বনে ‘দ্য কুইনস গাম্বিট’ এর অন্যতম সেরা উদাহরণ। ২০২০ সালে মুক্তির প্রথম ২৮ দিনে ৬২ মিলিয়ন পরিবার সিরিজটি দেখেছিল। এর প্রভাবে বইটি ৩৭ বছর পর ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ বেস্টসেলার তালিকায় ফিরে আসে; দাবা খেলা ও দাবার সরঞ্জামের প্রতিও মানুষের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। জুলিয়া কুইনের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ব্রিজারটন’ও একইভাবে বইকে নতুন পাঠক এনে দিয়েছে। প্রথম ২৮ দিনে ৮২ মিলিয়ন পরিবার সিরিজটি দেখেছিল এবং বইগুলোও বেস্টসেলার তালিকায় জায়গা করে নেয়। প্রেম, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বৈচিত্র্যময় চরিত্র, জমকালো পোশাক ও আধুনিক সংগীতের ব্যবহার পুরোনো সময়ের গল্পকে সমকালীন দর্শকের কাছে আকর্ষণীয় করেছে।

* সাফল্যের সূত্র কোথায়

বই থেকে পর্দায় রূপান্তরের সাফল্যের মূল সূত্র শুধু জনপ্রিয় বই নয়; ভালো গল্পের সঙ্গে সঠিক নির্মাণের সমন্বয়। সফল রূপান্তরগুলো সাধারণত মূল গল্পের আবেগ ও চরিত্রের আত্মাকে ধরে রেখে সিনেমার নিজস্ব ভাষা তৈরি করে। ‘থ্রি ইডিয়টস’ বই থেকে অনেকটাই সরে গিয়েও তার মূল বক্তব্য ধরে রেখেছে; ‘মকবুল’ ও ‘ওমকারা’ পুরোনো গল্পকে নতুন সমাজে স্থাপন করেছে; ‘দ্য কুইনস গাম্বিট’ এমন একটি খেলা, দাবাকে নাটকীয় করে তুলেছে, যা সাধারণ দর্শকের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে শুধু তারকা, বিপুল বাজেট বা জনপ্রিয় বই যথেষ্ট হয়নি। ‘দ্য গোল্ডেন কম্পাস’র মতো সিনেমায় বইয়ের জটিল ভাবনা ও আবেগ পর্দায় যথাযথভাবে অনুবাদ না হওয়ার অভিযোগ ছিল; আবার ‘মর্টাল ইঞ্জিনস’র ক্ষেত্রে পরিচিতির অভাবও বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থাৎ, বই থেকে পর্দায় আসার যাত্রা আসলে দুই মাধ্যমের সংলাপ। বই পাঠকের কল্পনার দরজা খুলে দেয়, আর সিনেমা বা সিরিজ সেই কল্পনাকে দৃশ্যমান করে। সেই রূপান্তর যখন সাহিত্যিক আবেগ, নির্মাতার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি এবং দর্শকের সময়ের চাহিদাকে এক সুতায় বাঁধতে পারে, তখন একটি গল্প শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, পৌঁছে যায় প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের মনে।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম