Logo
Logo
×
   

Advertisement

আনন্দ নগর

বাংলাদেশে ওটিটি কনটেন্টে বাস্তব কাহিনির ব্যবহার

সত্য ঘটনা যখন গল্পের উপাদান

Advertisement

এফ আই দীপু

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সত্য ঘটনা যখন গল্পের উপাদান

নাটকের দৃশ্য।

Advertisement

একটি ঘটনা যখন সংবাদপত্রের পাতা পেরিয়ে পর্দায় আসে, তখন সেটি আর শুধু ঘটনা থাকে না, হয়ে ওঠে গল্প, চরিত্র ও আবেগের অংশ। বাংলাদেশের ওটিটি প্লাটফর্মের বিস্তারের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত কনটেন্টের প্রবণতাও দৃশ্যমান হয়েছে। ব্যাংক জালিয়াতি, পারিবারিক ট্র্যাজেডি, শিশু নির্যাতন, অপরাধ, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কিংবা সামাজিক বঞ্চনা, বিভিন্ন বাস্তবতা জায়গা করে নিয়েছে ওয়েব সিরিজ ও ওয়েব ফিল্মে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্মাতারা সরাসরি ‘হুবহু ঘটনা’ তুলে ধরেননি; বাস্তব ঘটনাকে ভিত্তি করে চরিত্র, সংলাপ ও পরিস্থিতিতে কল্পনার সংযোজন করেছেন।

* ব্যাংক কেলেঙ্কারি থেকে ‘মানি হানি’

বাংলাদেশের ওটিটিতে বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ‘মানি হানি’। হইচইয়ের এই ওয়েব সিরিজটি পরিচালনা করেছেন তানিম নূর ও কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা থেকে এর মূল ভাবনা নেওয়া হয়। তানিম নূর নিজেই জানিয়েছেন, সংবাদপত্রে ঘটনাটি পড়ে তার মনে হয়েছিল, এটি আকর্ষণীয় গল্পে রূপ দেওয়া সম্ভব। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, সিরিজটি বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করলেও বড় অংশই কল্পিত।

এখানেই বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা, দর্শকের কাছে গল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। আবার বাস্তবতা থেকে দূরে গিয়ে থ্রিলার নির্মাণের স্বাধীনতাও থাকে।

* ‘একাত্তর’ : ইতিহাসের অপ্রকাশিত অধ্যায়

তানিম নূর পরিচালিত হইচইয়ের ‘একাত্তর’ নির্মিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ‘অপারেশন ব্লিটজ’কে ঘিরে। এর উৎস হিসাবে মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসেন রাজার লেখা ‘অ্যা স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’ বইয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে নির্মাতা তানিম নূর ওই সময় গণমাধ্যমে বলেছেন, সত্য ঘটনা অবলম্বনে হলেও এটি ফিকশন; কয়েকজন সাধারণ মানুষের গল্পের মধ্যদিয়ে সময়টিকে দেখানো হয়েছে।

এ পদ্ধতি ইতিহাসকে শুধু তথ্য হিসাবে নয়, মানুষের অভিজ্ঞতা হিসাবে দর্শকের সামনে হাজির করার সুযোগ দেয়।

* ‘আগস্ট ১৪’ : আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ছায়া

বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে সবচেয়ে আলোচিত কনটেন্টগুলোর একটি ‘আগস্ট ১৪’। শিহাব শাহীন পরিচালিত বিঞ্জের এ সিরিজ ২০১৩ সালে ঢাকার চামেলীবাগে পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। তাদের মেয়ে ঐশী রহমানের বিরুদ্ধে বাবা-মাকে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

এ ধরনের গল্প দর্শকের কৌতূহল তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু একইসঙ্গে নৈতিক প্রশ্নও সামনে আনে, বাস্তব ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের যন্ত্রণা কতটা বিনোদনের উপাদান হতে পারে?

* ‘চক্র’ : ময়মনসিংহের নয় সদস্যের মৃত্যু

২০২৪ সালে আইস্ক্রিনে মুক্তি পাওয়া ‘চক্র’ পরিচালনা করেন ভিকি জাহেদ। ২০০৭ সালে ময়মনসিংহের কাশর এলাকায় একই পরিবারের নয় সদস্যের ট্রেনের নিচে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা থেকেই সিরিজটির ভাবনা। ঘটনাটি তখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

‘চক্র ২’-এর প্রসঙ্গে ভিকি জাহেদ জানিয়েছেন, বাস্তব ‘অ্যাডাম ফ্যামিলি’র ঘটনা তাকে ভাবিয়েছিল; বাস্তব গবেষণা ও ঐতিহাসিক সূত্রের সঙ্গে কল্পনাকে মিশিয়েই সিরিজের জগৎ তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তব ঘটনা এখানে শুধু সূচনা-বিন্দু; পর্দার কাহিনি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত।

* নিজের মেয়ের অভিজ্ঞতা থেকে ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’

বাস্তব ঘটনার সবচেয়ে ব্যক্তিগত উদাহরণ শিহাব শাহীন পরিচালিত ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’। ২০১৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে তার মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি আতঙ্কজনক ঘটনার ভিত্তিতে এটি নির্মিত। গভীর রাতে মেয়ে ফোন করে জানায়, কেউ তাকে অনুসরণ করছে এবং নিরাপদে থাকতে বাবাকে ফোনে কথা বলে যেতে বলে।

তবে পরিচালক ঘটনাটিকে হুবহু তুলে ধরেননি। তার ভাষায়, তিনি এমন পরিস্থিতিতে একজন অসহায় বাবা কী করতে পারেন, সেটিকে কল্পনার সাহায্যে বিস্তৃত করেছেন।

* ‘তনয়া’: বাস্তবতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুখ

ইমরাউল রাফাত পরিচালিত চরকি ফ্লিক ‘তনয়া’ ২০১২ সালে ঘটে যাওয়া একটি সত্য ঘটনা থেকে নির্মিত। পরিচালকের পরিচিত একজনের কাছ থেকে ঘটনাটি শোনার পর তিনি সেটিকে পর্দায় আনার সিদ্ধান্ত নেন। গল্পে স্কুলপড়ুয়া এক কিশোরীর জীবন একটি ভয়াবহ ঘটনার পর আমূল বদলে যায়; তাকে সামাজিক বিচার, পরিবার ও বাস্তবতার কঠিন চাপের মুখোমুখি হতে হয়।

এখানে বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের বড় শক্তি হলো, ‘তনয়া’র মতো গল্প দর্শককে ভুক্তভোগীর অবস্থান থেকে সমাজকে দেখতে বাধ্য করতে পারে।

* ‘প্রিয় মালতী’ : ব্যক্তিগত ঘটনা থেকে সামাজিক প্রশ্ন

শঙ্খ দাশগুপ্ত পরিচালিত ‘প্রিয় মালতী’ও সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। শাঁখারী বাজারের একটি পরিবারের বাস্তব ঘটনা থেকে নির্মিত গল্পে স্বামীর মৃত্যুর পর একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক লড়াই উঠে এসেছে।

শঙ্খ দাশগুপ্তের বক্তব্য, মালতীর সংগ্রাম শুধু একজন নারীর নয়; এগুলো দেশের মানুষের বৃহত্তর সমস্যা ও সংগ্রামের প্রতিফলন।

* কেন বাস্তব ঘটনা এত আকর্ষণীয়

সিনেমা ও ওটিটি নির্মাতাদের কাছে বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের প্রধান সুবিধা তিনটি-বিশ্বাসযোগ্যতা, আবেগ এবং সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা। দর্শক জানেন, গল্পটির শিকড় বাস্তবে; ফলে কৌতূহল বাড়ে। একইসঙ্গে বাস্তব ঘটনা সমাজের চাপা সমস্যা নিয়ে আলোচনা তৈরির সুযোগ দেয়। পরিচালক সৈয়দ আহমেদ শাওকী ‘তাকদীর’ নির্মাণের অভিজ্ঞতায় বলেছিলেন, বাংলাদেশের গল্পে বাংলাদেশকে দৃশ্যমান করাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, বিদেশি দর্শকের চাহিদাও ছিল এমন গল্প, যেখানে বাংলাদেশের মানুষ ও বাস্তবতা প্রতিফলিত হবে।

* তবে ঝুঁকিও কম নয়

বাস্তব ঘটনা পর্দায় আনার সবচেয়ে বড় সমস্যা বাস্তব মানুষ ও ভুক্তভোগীর প্রতি দায়বদ্ধতা। ঘটনার নাটকীয়তা বাড়াতে অতিরঞ্জন করা হলে বাস্তবতার বিকৃতি ঘটতে পারে। বিশেষ করে হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, আত্মহত্যা বা শিশু নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগীকে ‘চরিত্র’ বানানোর নৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়।

আরেকটি ঝুঁকি হলো, দর্শক ফিকশন ও বাস্তবের সীমারেখা ভুলে যেতে পারেন। ‘চক্র’-এর মতো ঘটনায় বাস্তব গবেষণার সঙ্গে কল্পনা মেশানো হলে কোনটি সত্য, আর কোনটি নির্মাতার কল্পনা, তা পরিষ্কার রাখা জরুরি। ভিকি জাহেদ নিজেও জানিয়েছেন, বাস্তব সূত্রের সঙ্গে কল্পনাকে মিলিয়েই সিরিজের আখ্যান তৈরি করা হয়েছে।

* সামনে কোন পথ?

বাংলাদেশের ওটিটিতে বাস্তব ঘটনা ব্যবহারের প্রবণতা দেখাচ্ছে, দর্শক শুধু কাল্পনিক বিনোদন নয়, নিজেদের সমাজের গল্পও দেখতে চান। ‘মানি হানি’র আর্থিক অপরাধ, ‘আগস্ট ১৪’-এর পারিবারিক হত্যাকাণ্ড, ‘চক্র’-এর রহস্যময় ট্র্যাজেডি, ‘বাবা, সামওয়ানস ফলোয়িং মি’-এর ব্যক্তিগত আতঙ্ক কিংবা ‘তনয়া’র সামাজিক বাস্তবতা, সবই ভিন্ন ভিন্ন দরজা খুলেছে।

কিন্তু বাস্তব গল্পের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে নির্মাতার দায়িত্বশীলতার ওপর। সত্য ঘটনা গল্পকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা হারালে সেই শক্তিই হয়ে উঠতে পারে দুর্বলতা। বাংলাদেশের ওটিটির পরবর্তী চ্যালেঞ্জ তাই শুধু ‘সত্য ঘটনা’ খুঁজে পাওয়া নয়, সেই সত্যকে কতটা সংবেদনশীল, সৎ ও শিল্প সম্মতভাবে পর্দায় তুলে ধরা যায়, সেটিই মূল প্রশ্ন।

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম